ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান মাকর্সবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খ-কালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

আমি আগেই বলেছি যে, আমি ডায়রী লিখতাম না। কিন্তু আলবেনিয়া সফরের সময় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু নোট করেছিলাম। কাজেই নোটে লিখিত তারিখ ছাড়া অন্য কোন তারিখে কোথায় গিয়েছিলাম সেটা সঠিকভাবে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তবে তাতে বিশেষ ক্ষতি নেই। যা দেখেছিলাম তার বর্ণনাই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্কোড্রার পর প্রথম দিকেই আমি গিয়েছিলাম আলবেনিয়ার উত্তর দিকে আরও কয়েকটি জায়গায়। তার মধ্যে ছিল অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে আলবেনিয়ার সব থেকে বড় সমুদ্র বন্দর দুরে। সেটা ছিল তিরানার বেশ কাছে। একদিন দুপুরের দিকে রওয়ানা হয়ে সেখানে গেলাম। আমরা ছিলাম চারজন। আমি, ওবায়েদ, পিরো মিশো এবং ড্রাইভার আকরাম। দুরে একটা ছোটখাটো শহর। আমরা শহরে একটা চক্করে দিয়ে সমুদ্রের ধারে গেলাম। সেখানে অনেক লোককে বেড়াতে দেখা গেল। আমরা সেখানে কিছুক্ষণ থেকে সমুদ্রের ধারেই একটা বড় হোটেলে গেলাম চা খেতে। চা খেতে খেতে অনেক রকম গল্প হচ্ছিলো। ড্রাইভার আকরাম ছিলেন বেশ রসিক লোক। তিনি বললেন, তোমাদেরকে একটা গল্প শোনাই। আলবেনিয়ার কোন গ্রামে এক বাড়ীতে একজন অপরিচিত অতিথি এসে বললেন, কয়েকদিন তিনি সেখানে থাকতে চান। গৃহকর্তা তাঁকে সফরে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু দেখা গেল যে অতিথি কয়েকদিন থাকার কথা বললেও দিনের পর দিন সেখানে থাকতে লাগলেন। ব্যাপারটা গৃহকর্তার পছন্দ না হলেও তিনি অতিথিকে বিদায় না দিয়ে তাঁর বাড়ীতে রাখলেন। এর পর একদিন অতিথি বললেন, আপনার বাড়ীতে অনেকদিন থাকা হলো, এবার আমি যাবো এটা বলার পর দিন তিনি রওয়ানা হলেন। দীর্ঘদিন অতিথি তাঁর বাসায় থাকার কারণে গৃহকর্তা বললেন, চলুন আপনাকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আসি। বিদায়ের মুহূর্তে গৃহকর্তা ভদ্রতা করে তাঁকে বললেন আর কয়েকদিন থেকে গেলেই হতো। একথা শুনে অতিথি বললেন, তাহলে চলুন ফেরৎ যাই। এর পর তাঁরা দুজনেই ফেরৎ গেলেন। অতিথির সাথে একটা গাধাও ছিল। বাড়ী পৌঁছে অতিথি গৃহকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর গাধাটিকে কোথায় বেঁধে রাখবেন। অতিথি আবার ফেরৎ আসায় গৃহকর্তা ভয়ানক বিরক্ত হয়েছিলেন। তাঁর নিজের ওপর খুব রাগও হচ্ছিলো। তিনি বললেন, ওদিকে আমার জিভে বেঁধে রাখুন, কারণ জিভই আপনাকে আবার এখানে ফিরে আসার জন্য বলেছিল!
জিরো কাস্ত্রা আমরা সরাসরি তিরানা থেকে যাই নি। মধ্যে আমরা তিরানা থেকে গিয়েছিলাম অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে ভেøারা বন্দরে। সেখান থেকে জিরো কাস্ত্রা। তিরানা থেকে বের হয়ে আমরা লুশানী  (Lushnie) নামে একটা এলাকার মধ্যে দিয়ে ভ্লোরার দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই ধারে ছিল জলপাইয়ের বাগান, আঙ্গুর ক্ষেত। পরে আমরা ফেরার সময় এক বিশাল কমলার বাগানের ভেতর দিয়ে এসেছিলাম। এছাড়া রাস্তার ধারে ছোট ছোট কমলার বাগানও ছিল। তবে আঙ্গুরের ক্ষেত বেশী। এই আঙ্গুর থেকে আলবেনিয়ায় রেড ওয়াইন তৈরী হয়।
যে রাস্তা দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম সেখান থেকে দূরে পাহাড় দেখা যায়। তবে এলাকাটা সমতল। এখানে গম ও তুলার চাষ হয় সব থেকে বেশী। আগে এই পুরো এলাকাটা ছিল জলাভূমি, যাকে বলে মার্শি ল্যান্ড। রাস্তা থেকে কিছু দূরে একটা পানির রিজাব ভ্যয়ার আছে। এ রকম রিজাব ভ্যয়ার রাস্তার পাশে মাঝে মাঝেই দেখা যেতো। সারা পথেই কিছু দূর পর পর কৃষি সমবায় ও পশুপালন কেন্দ্র আছে। তবে পশু পালন প্রধানত: হয় পূর্ব দিকের পার্বত্য এলাকায়।
আলবেনিয়ায় সোয়াবিনের চাষ হয় বড় আকারে। ১৯৯০ সালে সোয়াবিন উৎপাদন হয়েছিল ১৯৬০ সালের কুড়ি গুণ। তুলো আমদানী করতে হয় না। টেক্সটাইল মিলগুলির জন্য তুলো উৎপাদন করা হয় প্রয়োজন অনুযায়ী। পশমও যা উৎপাদন হয় তাতে দেশের প্রয়োজন মিটে যায়। সবজির মধ্যে টমেটো, শশা, বাঁধাকপি রপ্তানী হয়। লাল ওয়াইন ও কনিয়াক তৈরী হয় দেশেই। এখানে বলা দরকার যে, আলবেনিয়ার যেখানেই গেছি সেখানেই সব সময় একই সাথে দেওয়া হতো কফি ও কনিয়াক (ব্র্যান্ডি)। এটাই তাদের অতিথি আপ্যায়নের ঐতিহ্য। আলবেনিয়ানরা কফি খেতে খুব অব্যস্ত। কিন্তু কফি তারা একেবারেই উৎপাদন করে না। পুরো প্রয়োজনেই তারা মিটায় আমদানীর মাধ্যমে।
দক্ষিণের দিকে আমরা নানা ধরনের বাগানের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের পাশ দিয়ে এবং সমুদ্র তীর ধরেও চলেছিলাম। মেয়েরা অনেকেই কাজ করছিল ক্ষেতে। সব জায়গাতেই দেখা যেতো পাহাড়ের গায়ে টেরামিং করা অর্থাৎ খাঁজ কেটে কেটে ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা। পাহাড়ী এলাকায় জলপাইয়ের বাগান প্রচুর। চাষের জন্য ঘোড়ার ব্যবহার কিছু কিছু আছে। একবার দেখা গেল রেলাগাড়ী খড় বোঝাই হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া রেলগাড়ী পেট্রোলও নিয়ে যাচ্ছে উত্তর দিকে তেলের ডিপোগুলোতে। এর মধ্যে গাড়ীতে যেতে যেতে দেখলাম পথের ধারে এক লোক আর একজনকে লাঠি দিয়ে বেদম মার দিতে শুরু করলো। তাড়াতাড়ি অন্য লোকেরা আশে পাশে থেকে দৌড়ে এলো লাঠি পেটানো বন্ধ করার জন্য। গাড়ীর ড্রাইভার আকরাম এবং অন্য সঙ্গী ফাতোস ককোলী বিদেশীদের চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটতে দেখে একটু বিব্রত বোধ  করলো। কিন্তু কেউ আমরা এ নিয়ে কোন কথা বললাম না।
ভেøারা হলো অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে একটা সুন্দর শহর। আলবেনিয়ার সব শহরই সুন্দর, তবে প্রত্যেকটি ছোট। রাজধানী তিরানাকেও বড় শহর বলা যাবে না। ভেøারা আমরা থাকলাম একটা সুন্দর হোটেলে, একেবারে প্রায় সমুদ্রের তীরে। এছাড়া হোটেলের সামনে এক পাশে ছিল একটা ছোটখাট সুন্দর লেক। তার পাশে একটা বাজার। মনে হলো সেটাই ভ্লোরার সব থেকে বড় বাজার। আমি সেখানে গেলাম  চুল কাটার জন্য। ড্রাইভার আকরাম আমাকে সঙ্গে করে সেখানে নিয়ে গেলেন। যে বিল্ডিংএ সেলুনটা ছিল তার ভেতরে আশে পাশে অনেক ধরনের দোকানপাট দেখা গেল।
ভেøারায় ছিল শ্রমিকদের বিনোদন ও বিশ্রামের জন্য একটা বড় ভবন। আলবেনিয়ায় শ্রমিকদেরকে বছরে তিন চার সপ্তাহের জন্য সবেতন বিনোদন ছুটি দেওয়া হতো। সে সময় তাঁরা সপরিবারে এই ধরনের বিনোদন কেন্দ্র এসে থাকতে পারতেন। তার জন্য কোন খরচ তাঁদের করতে হতো না। খাওয়া থাকা সব কিছুই ছিল ফ্রি। ভবনটি ছিল একেবারে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে। আমরা সেটা দেখতে গেলাম। অনেকগুলি পরিবার সেখানে দেখলাম। সব ব্যবস্থা ভালই মনে হলো।
ভেøারা থেকে আমরা আরও দক্ষিণে জিরো কাস্ত্রার দিকে রওয়ানা হলাম। সারা পথই ছিল খুব সুন্দর। একবার আমরা একেবারে সমুদ্রের ধার ঘেষে বেশ কিছুক্ষণ চললাম। পরে উঠতে থাকলাম পাহাড় বেয়ে ওপরের দিকে। পাহাড় পার হয়ে আমাদেরকে যেতে হলো জিরো কাস্ত্রার দিকে। একেবারে পাহাড়ের চূড়ায় একটা রেস্তোঁরায় আমরা চা খাওয়ার জন্য কিছুক্ষণ থামলাম। সেখান থেকে একদিকে সমুদ্র এবং অন্য দিক পাহাড়ের সারির দৃশ্য ছিল অপূর্ব।
আলবেনিয়ার মত সুন্দর দেশে টুরিজম খুব বড় আকারে থাকার কথা। কিন্তু আলবেনিয়া সরকারের টুরিজম নীতির ছিল বেশ কড়াকড়ি। কোন ব্যক্তিগত টুরিষ্টকে আলবেনিয়ায় ঢুকতে দেওয়া হতো না। ২৫ জনের এক একটি গ্রুপকে আসতে দেওয়া হতো। তাঁরা সরকারী তত্ত্বাবধানেই বিভিন্ন জায়গা ঘুরতেন। তাছাড়া এই সংখ্যাও মাত্র কয়েক হাজারের বেশী ছিল না। টুরিষ্টরা এসে দেশে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এবং অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতে এবং তা উৎসাহিত করতে যাতে সক্ষম না হয় তার জন্যই ছিল এই ব্যবস্থা। মাঝে মাঝে কয়েকটা টুরিষ্ট বাস আমরা দেখেছিলাম।
তিরানা থেকে জিরো কাস্ত্রা যাওয়ার সময় কোন কোন পথ দিয়ে কোন সময় কোন জায়গায় গিয়েছিলাম সেটা বলা আমার পক্ষে এখন সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন জায়গায় আমি যা দেখেছিলাম তার একটা বর্ণনা এখানে দেওয়া হচ্ছে। আলবেনিয়ায় কোন রাস্তাতেই আমি বেশী গাড়ী বা বাস চলাচল করতে দেখিনি। মাঝে মাঝে দুই একটা রেলগাড়ী চলতে দেখেছি। তবে সে রেলগাড়ীর কোনটিতেই যাত্রী দেখিনি। সেগুলি ছিল মালবাহী ট্রেন।
বাল্্শ তেলের শহর। ঢোকার আগেই একটা বড় তেল শোধনাগার। তার চার পাশে অনেক তেলের ডিপো। এটা একটা বড় তেলের এলাকা। সোভিয়েটরা বলেছিল এই এলাকায় তেল নেই। তাদের সাথে সম্পর্ক ছেদের পর আলবেনিয়ানরা নিজেরা এখানে তেল ক্ষেত্র আবিস্কার করে। তেলের প্রযুক্তিও তারা নিজেদের চেষ্টায় আয়ত্ত্ব করে। এই তেলক্ষেত্র গড়ে তোলা হয় ১৯৬০ সালের পর। সারা এলাকা তেলের গন্ধে ভরে ছিল। আমরা এখানে তেল কারখানার শ্রমিকদের কাজ করতে দেখলাম।
ফেরার পথে আমরা অনেক ধরনের এলাকা পার হচ্ছিলাম। মাঝে মাঝে বড় পাহাড়ী এলাকা দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। কখনো চড়াই, কখনো উৎরাই। পাহাড়ের গায়ে গায়ে এভারগ্রীন গাছ। এই গাছ থেকে এক ধরনের তরল পদার্থ বের করা হয় যা চামড়া শিল্প ও কিছু কাঠের কাজে ব্যবহার করা যায়। ভিয়েসা নামে একটা নদীর পাশ দিয়ে এক সময় যাচ্ছিলাম। নদীটি সরু হয়ে বইছিল। কিন্তু অন্য সময়ে অনেক চওড়া ও খরস্রোতা হয় কোন কোন জায়গায়। এ নদীতে পরে হাইড্রো ইলেকট্রিক শক্তি তৈরী করা হবে। টেপেলেন নামে একটা  পাহাড়ী শহরও আমরা পার হলাম। এই এলাকায় আমরা একটা দুর্গের পাশ দিয়ে গেলাম। এই দুর্গ থেকে অতীতে অটোম্যান  তুর্কীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া হয়েছিল। প্রমেত নামে একটা শহর ছিল আমাদের যাত্রা পথের থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে। ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় প্রতিরোধ কেন্দ্র ছিল প্রমেত। এখানেই প্রথম প্রতিরোধ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।
আর একটা জায়গার কথা আমার খুব মনে আছে। আমরা একটা বিশাল কমলার বাগানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। তার আাশেপাশে ছিল পাহাড় ও সেই পাহাড়গুলি থেকে ঝরণার স্বচ্ছ পানি ঝরছিল অনেক জায়গায়। এইভাবে পাহাড় থেকে পড়া ঝরণার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল, যা খাওয়া ও কৃষি কাজের জন্য ব্যবহৃত হতো। আমরা বাগানের মধ্যে এক জায়গায় দাঁড়ালাম। সেটা মনে হয় ছিল বাগান দেখাশোনা ও তদারকির একটা কেন্দ্র। আমাকে সেখানে কমলা খেতে দিল। আমি খেলাম একটা। ড্রাইভার আকরাম গাড়ীর পেছনে অনেক কমলা বোঝাই করলেন তিরানা নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরা তখন ছিলাম ফিরতি পথে।

আরো খবর

Disconnect