ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান মাকর্সবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

আমরা ১৯৮৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত কয়েক বছর ছিলাম মহম্মদপুরে তাজমহল রোডে। তারপর এ সময় আমরা থাকছিলাম মহম্মদপুরেই কাজী নজরুল ইসলাম রোডের এক বিল্ডিং এর তিন তলায়। ঢাকায় এসে শুনলাম কয়েকদিন আগে শান্তি সেনের মৃত্যু হয়েছে। শান্তিদার মৃত্যু আমার জন্য ছিল খুব দুঃখজনক ব্যাপার। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) তে যোগদানের পর তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়। আমি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পার্টি থেকে পদত্যাগ করা পর্যন্ত এবং তার পরও তাঁর সাথে আমার সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত ছিল। আমি ১৯৮১ সালের নভেম্বরে ইংলান্ড যাওয়ার আগে তাঁর সাথে দেখা করে গিয়েছিলাম। তিনি তখন বেশ অসুস্থ ছিলেন। তখন ভাবি নি যে তাঁর সাথে আর দেখা হবে না। পার্টিতে তাঁর মত সৎ এবং অঙ্গীকারবদ্ধ নেতা আর কাউকে পাই নি। তাঁকে কখনো কোন চক্রান্তের মধ্যে থাকতে দেখি নি। এ কারণে তাঁর থেকে বেশী পছন্দ আমি অন্য কোন পার্টি নেতাকে করতাম না।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন আশীর দশকের মাঝামাঝি থেকে বিস্তার লাভ করছিল তা এ সময় বেশ জোরদার হয়েছিল, যদিও তার মধ্যে দুর্বলতার অভাব ছিল না। বাম ও দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল ও বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দল গঠন করেছিল। এ সময় তারা একটা পাঁচ দফা কর্মসূচীও ঘোষণা করেছিল। এরশাদের অধীনে কোন নির্বাচন তারা করবে না এ ঘোষণাও তারা দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি এরশাদ নির্বাচন ঘোষণা করে এই মর্মে হুমকি দেন যে, নির্বাচন যদি বিরোধী দল বয়কট করে তাহলে তিনি জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে সব রাজনৈতিক আন্দোলন নিষিদ্ধ করবেন। সন্ধ্যায় এরশাদের এই হুমকির পর ঐ রাত্রেই আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী এরশাদের সাথে সমঝোতা করে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ এ কাজ করার পর তাদের নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ভেঙে যায় এবং ৫টি বামপন্থী দল পৃথক জোট গঠন করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে থাকে আটটি দল।
আমরা ১৯৮৭ সালের ২৪শে জানুয়ারী গঠন করেছিলাম ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট’ নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৪ই আগস্ট ১৯৮৮ সালে তৎকালীন পরিস্থিতি এবং ৮, ৭ ও ৫ দলের আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে ও সেই সাথে এই সব বুর্জোয়া দলগুলির আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিষয়ে আমাদের বক্তব্য আমরা প্রদান করি, যা ইস্তেহার আকারে প্রকাশিত হয়। তার থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করলে ১৯৯০ সালে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হলেও তার চরিত্র ও দুর্বলতার দিকগুলি স্পষ্ট হবে।
ইস্তেহারটিতে আমরা বলেছিলাম, “আমাদের জোট গঠিত হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে ১৫ দল ও ৭ দলের পাঁচ দফা কর্মসূচীভিত্তিক আন্দোলন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়, যখন তাদের কর্মসূচীর প্রতি শুধু যে জনগণের আস্থাই দ্রুত কমে আসে তাই নয়, ঐ সব জোট ও সেগুলির অন্তর্ভূক্ত দলগুলি নিজেরাই ঐ কর্মসুচীর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তাদের নিজেদের কর্মসূচীর প্রতি তাদের এই আস্থাহীনতার কারণ আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা উপলব্ধি করে যে, পাঁচ দফার মধ্যে সামরিক শাসন উচ্ছেদের যে কর্মসূচী ছিল সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে তাদের দ্বারা অনুসৃত পথে এবং প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে অটুট রেখে সেটা সম্ভব নয়। উপরন্তু ভূমি ব্যবস্থা, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রশাসন ইত্যাদি থেকে মৌলিক পরিবর্তনের সংগ্রাম ও সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রাম একই সূতোয় গাথা। তারা আরও উপলব্ধি করে যে, এই সংগ্রাম তাদের পক্ষে সম্ভব নয় কারণ তার ফলে বিভিন্ন ধরনের সম্পত্তি মালিক শ্রেণী রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে জমি, শিল্প, ব্যবসা ইত্যাদি ব্যক্তিগত সম্পত্তির রক্ষক হিসেবে সেই সংগ্রাম যা শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী অভ্যুত্থানে পরিণত হতে বাধ্য তাদের নিজেদের আর্থ সামাজিক অবস্থান উচ্ছেদের সমান। কাজেই পাঁচ দফা আন্দোলনের কোন ভবিষ্যৎ নেই, তার পরিবর্তন দরকার এবং এমনভাবে দরকার যাতে সামরিক শাসন উচ্ছেদ না করে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আপোষের মাধ্যমে ক্ষমতায় কিছুটা ভাগ বসানো সম্ভব হয়। সম্পত্তিশালী শোষক শ্রেণীর ক্ষমতা বহির্ভূত অংশ এভাবেই তার ক্ষমতাশীন অংশের সঙ্গে সমঝোতায় আসার জন্য সামরিক শাসন উৎখাতের পরিবর্তে শুধুমাত্র বর্তমান সামরিক শাসক এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তৈরী করে তাদের এক দফা কর্মসূচী। এই কর্মসূচীর আওয়াজ হয়, ‘এক দফা এক দাবী, এরশাদ তুই কবে যাবি’। এই আওয়াজ যে পাঁচ দফা দাবীর মধ্যে যেটুকু গণতান্ত্রিক উপাদান ছিল তার থেকে সরে এসে শুধু ক্ষমতায় ভাগ বসানোর আওয়াজ এটা বোঝার কোন অসুবিধা সচেতন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছিল না।”
এখানে বলা দরকার যে,  এরশাদের শাসন উৎখাতের এই আন্দোলনে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে টেনে আনার কোন ক্ষমতা এবং উদ্যোগ এই জোটগুলির ছিল না। তবে শহরের জনগণ এবং শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা এ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের চাপে আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী ১৯৮৬ সালে গঠিত জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এরপর এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে ১৯৮৮ সালের ৩ রা মার্চ সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এরশাদের দালাল আব্দুর রবের ভূয়া সংগঠন জাসদ ছাড়া সকল রাজনৈতিক দলই সে নির্বাচন বয়কট করে এবং জনগণও ব্যাপকভাবে ভোট দানে বিরত থাকেন। শুধু তাই নয়, সর্বস্তরের জনগণ এরশাদের এই নির্বাচন প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত থাকলেও তিন জোটের কোনটিই সক্রিয়ভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া বানচালের জন্য তাঁদের কাছে কোন আহ্বান জানায় নি। এক দফা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী জোটগুলি নির্বাচন প্রতিরোধের কোন উদ্যোগ না নেওয়ার কারণ হলো যে, আন্দোলন শুরু হলে তা অবশ্যম্ভাবীরূপে অভ্যুত্থানমুখী হতো। জনগণের ব্যাপক অভ্যুত্থান ছিল তাদের সকলের জন্যই ভয়ের ব্যাপার। কারণ তার মধ্যে আর্থ-সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের শর্ত সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকতো। কাজেই উপরোক্ত তিনটি জোট আন্দোলনের নামে যে দুটি লক্ষকে জনগণের সামনে উপস্থিত করেছিল তা হলো, তাদের নিজেদের সুবিধামত কয়েকটি সংশোধনীকে রেখে ও বাকীগুলি বাতিল করে ১৯৭২ সালের সংবিধানকেই বহাল রাখা ও প্রেসিডেন্ট এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে একটি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও সেই সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, এক দফা আন্দোলনের এই লক্ষ্য শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ছিল না। ১৯৮৬ সালে ১৫ দল থেকে বের হয়ে বামপন্থী নামে পরিচিত দলগুলি যে ৫ দলীয় জোট গঠন করেছিল তাদের অবস্থান ছিল একই রকম। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ এই তথাকথিত বাম দলগুলি ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ এরশাদের দেওয়া নির্বাচনে শরীক দলগুলির সাথে কোন আলোচনা না করেই একতরফা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধন্ত ঘোষণা করার পর বাধ্য হয়ে তারা ১৫ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে ৫ দল গঠন করলেও তারা ছিল আওয়ামী ঘরাণারই রাজনৈতিক দল। শ্রেণীগতভাবে ও নীতিগতভাবে আওয়ামী লীগের সাথে তাদের কোন পার্থক্য ছিল না। এই ৫ দলের মধ্যে সাম্যবাদী দল নামে দিলীপ বড়–য়ার নেতৃত্বাধীন ভুয়া দলটিও ছিল। আসলে এই দলটি ছিল দিলীপ বড়–য়ার এক সুবিধাবাদী চক্র, যারা পরিস্থিতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ বিএনপি দুই দলের সাথেই যোগাযোগ রাখতো। তবে দিলীপ বড়ূয়া মূলত: ছিল শেখ হাসিনার খেদমদগার। এ প্রসঙ্গে আন্দোলন চলার সময়ে ১৯৮৮ সালের একটা ঘটনা আমার মনে পড়েছে।
আমরা তখন থাকতাম মহম্মদপুরের তাজমহল রোডে। একদিন দিলীপ বড়ূয়া আমার বাসায় এসে বললো, শেখ হাসিনা আমার সাথে দেখা করতে চান। আমি তাকে বললাম, ভাল কথা সময় করে তাঁকে আমার বাসায় আসতে বোলো। আমার এই কথা শুনে দিলীপ বড়ূয়ার চোখ বড় বড় হলো। তার মুখে এক মহা বিস্ময়ের দাগ দেখলাম। সে প্রায় বাক শক্তিহীন অবস্থায় আমার দিকে তাকিয়ে প্রথমে এক লম্বা টান দিয়ে শুধু বললো, স্যা...র। শেখ হাসিনাকে আমি আমার বাড়ীতে এসে আমার সাথে দেখা করতে বলছি, এ কথা তার কাছে মনে হলো এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব। দিলীপ বড়ূয়া বললেন, আপনি তাঁর বাড়ীতে গেলেই ভাল হয়। আমি বললাম, দেখা করতে চাইলে ভাইঝির উচিৎ চাচার সাথে বাড়ীতে এসে দেখা করা। আমার কথা শুনে দিলীপ বড়ূয়া আর কিছু না বলে চলে গেল। কয়েক দিন পর সে আবার এলো। এসে আমাকে বললো, আপনাকে দেখা করার ব্যাপারে যা বলেছিলেন সেটা শেখ হাসিনাকে বললাম। তিনি হেসে বললেন, চাচারও তো উচিত ভাইঝিকে দেখতে আসা। আমি বললাম, আমার বাড়ীতে আসতে হাসিনার অসুবিধা কি? আপনি বলেন, এভাবে তার সাথে দেখা করার জন্য তার বাড়ীতে যাওয়া তো সম্ভব নয়। দিলীপ বড়ূয়া চলে গেল। এর থেকেই বোঝা যায়, শেখ হাসিনার টাউট হিসেবে সে কতদুর যেতে পারে। এই ধরনের খেদমতগারীর পুরস্কারস্বরূপ শেখ হাসিনা পরে তাকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। কাজেই এ রকম নেতা ও দল নিয়ে গঠিত ৫ দলীয় বামপন্থী জোট যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিজস্ব কোন লাইন নির্ধারণ করতে অক্ষম হবে এতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না।
জোটগুলি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বললেও তার সম্ভাবনা আমরা দেখি নি। এর কারণ খুব সহজ  ছিল। এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে এ ধরনের একটি সরকারের প্রধান কে হবে এবং ঠিক কাদেরকে নিয়ে এই সরকার গঠিত হবে এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ঐক্যমত হওয়া ছিল এক অসম্ভব ব্যাপার। কারণ বাধ্য হয়ে এক সাথে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করলেও তারা ছিল পরস্পরের চরম শত্রু। আমি এ নিয়ে তখন নিজেও লিখেছিলাম। আমাদের এই চিন্তার সঠিকতার দিক ছিলো গণঅভ্যুত্থান ব্যতীত কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়, এ বিষয়টি উপলদ্ধি করা। কিন্তু সে চিন্তার মধ্যে যে এক ধরনের ভ্রান্তি ছিল তা হলো, এই ধরনের গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনা সেই সময়ে দেখতে না পাওয়া। যেহেতু গ্রামাঞ্চলে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন প্রায় অনুপস্থিত ছিল সেটাই ছিল আমাদের ভ্রান্তির একটা কারণ। ১৯৫২, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সালের মার্চ মাস যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল তা শুধু ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রাম গ্রামান্তরে সে আন্দোলন ছড়িয়ে গিয়েছিল এবং শহর ও গ্রামের আন্দোলন একাকার হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে সে রকম কিছু ছিল না। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শহরের জনগণ ও কারখানা শ্রমিকদের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও তা প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল গ্রামাঞ্চালের জনগণও থেকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরশাদের সরকার এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং শহর ও শিল্পাঞ্চলে তাঁর শাসন বিরোধী আন্দোলন এতো জোরদার হয়েছিল যাতে এমন এক শহর কেন্দ্রিক গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, যা বাঙলাদেশের মত অভ্যুত্থানের দেশে আগে কোন দিন দেখা যায় নি।
নভেম্বর মাসে ঢাকা শহরে এবং অন্যান্য জেলা শহরে আন্দোলন আগের যে কোন সময়ের থেকে জোরদার হয়েছিল। ঢাকায় সেক্রেটারিয়েট ঘেরাও থেকে নিয়ে সভা সমাবেশ মিছিল প্রত্যেক দিন বিরাট আকারে হচ্ছিলো। অভ্যুত্থানের মুখে সরকার ঢাকার রাস্তায় পুলিশ পর্যন্ত মোতায়েনের সাহস করে নি। তাদেরকে ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই অবস্থায় আন্দোলন উত্তাল তরঙ্গের মত যে অবস্থান প্রাপ্ত হয়েছিল তাতে সামরিক বাহিনীর মধ্যে এরশাদের পক্ষে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব ছিল না। সেই অবস্থায় ডিসেম্বরের ৬ তারিখে তিনি পদত্যাগ করে তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং ঐ দিনই মওদুদ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন প্রধান বিচারপতির কাছে।
সেই অবস্থায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শত্রুতার সম্পর্ক এই পরিবর্তনে কোন বাধা সৃষ্টি করার মত অবস্থায় না থেকে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়ায় তারা অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি নোতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাদের দায়িত্ব হয় তিন মাসের মধ্যে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নোতুন করে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন, সংসদীয় নির্বাচন ও নোতুন সরকার গঠন। এভাবেই শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলির নানা চক্রান্ত ব্যর্থ করে এক নাগরিক গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙলাদেশে সরাসরি সামরিক শাসন উচ্ছেদ হয়। সামরিক বাহিনীও এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করা সমীচীন মনে না করে কোন রকম হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকে।

আরো খবর

Disconnect