ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

সাংগঠনিক কাজের ক্ষেত্রে পত্রিকার গুরুত্ব আমি বরাবরই উপলব্ধি করেছি। এ ব্যাপারে লেনিনের নির্দেশ ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনের ক্ষেত্রে পত্রিকার গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে তিনি তাকে তুলনা করেছিলেন বাড়ী তৈরীর ক্ষেত্রে ভারার (scaffolding) সাথে। বাড়ী তোলার সময় যেমন ভারায় চড়ে ইট গাঁথতে হয়, তেমনি সংগঠন গড়ে তোলার সময় প্রয়োজন হয় পত্রিকার। এটা বিপ্লবী পার্টির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রয়োজন হয় এ কারণে যে, শাসক শ্রেণীর দলগুলি যেমন তাদের শ্রেণীর মালিকানায় প্রকাশিত পত্র পত্রিকার সাহায্য পেয়ে থাকে সে রকম সাহায্য তারা এ ধরনের পত্রিকা থেকে পায় না। তারা উপেক্ষিত থাকে অথবা তাদের কথা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। এজন্যই প্রয়োজন হয় বিপ্লবী পার্টির নিজস্ব পত্রিকার, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের আদর্শগত ও তত্ত্বগত বিষয় প্রচার করতে পারেন এবং নিজেদের কাজকর্ম বিষয়ে অন্যদেরকে অবহিত করা যায়। আইনগত বাধা না থাকলে আইনসম্মত পত্রিকা এবং সে সুযোগ না থাকলে বেআইনীভাবেও পত্রিকা প্রকাশ এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
এ চিন্তা থেকেই আমি নিজে ১৯৭২ সাল থেকেই একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের চেষ্টা করতে থাকি। অনেক বাধা বিপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত মাসিক সংস্কৃতির ডিক্লারেশন বা প্রকাশের সরকারী অনুমতি লাভ করি। এ ব্যাপারে আমার বন্ধু সাইয়িদ আতীকুল্লাহ আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেন। মাসিক পত্রিকা ‘সংস্কৃতি’ ১৯৭৪ সালের এপ্রিল থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে থাকে, সে বছরই শেখ মুজিব ডিসেম্বর মাসে দেশে জরুরী অবস্থা জারী করে নিজেদের কয়েকটি সরকারী দৈনিক পত্রিকা ছাড়া বাকী সব পত্রিকা নিষিদ্ধ করা পর্যন্ত। পরে ডিক্লারেশন না থাকা সত্ত্বেও আশীর দশকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আইন বাঁচিয়ে আমি অনিয়মিত সংকলন হিসেবে সংস্কৃতি বের করতে থাকি। ১৯৯১ সালে নোতুন করে ‘সংস্কৃতি’র ডিক্লারেশন পাওয়া যায়।
‘সংস্কৃতি’ যখন ১৯৭৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তার আগে আমি পার্টি থেকে ১৯৭১ এর ডিসেম্বরে পদত্যাগ করার কারণে তখন কোন পার্টির সদস্য ছিলাম না। রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা পরিবর্তন পরিস্থিতিতে নোতুন ভাবে শুরু করা এবং চিন্তাভাবনা সংগঠিত করার প্রয়োজনেই ‘সংস্কৃতি’র মত একটি পত্রিকার প্রয়োজন বোধ করেছিলাম। কিন্তু ১৯৯১ সালে অবস্থা অন্য রকম ছিল। ১৯৯১ সালে আমরা মূল রাজনৈতিক দল ছাড়াও তার সাথে সম্পর্কিত অন্য কয়েকটি সংগঠন গঠন করেছিলাম। এজন্য বাস্তব রাজনৈতিক কাজের জন্য এবং সংগঠনগুলি শক্তভাবে দাঁড় করানোর জন্য রাজনৈতিক পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা আমরা বোধ করেছিলাম। এজন্য আমরা ‘জনযুগ’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকার ডিক্লারেশন চেষ্টা করি এবং সেটা পেয়ে যাই। কোন দৈনিক তো নয়ই, এমনকি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করার মত সাংগঠনিক এবং আর্থিক অবস্থা আমাদের ছিল না। কাজেই পাক্ষিক পত্রিকার চিন্তাই করেছিলাম। কিন্তু দেখা গেল যে, মাসে দুটো সংখ্যা বের করারও অসুবিধা। এ কারণে আমরা পত্রিকাটি মাসে একবার বের করার সিদ্ধান্ত নেই। ট্যাবলয়েড সাইজের দুই ফর্মার পত্রিকা হিসেবে ‘জনযুগ’ সম্পাদনা ও প্রকাশকের দায়িত্ব আমি নিজেই গ্রহণ করি। একটা ছোট সম্পাদকীয় কমিটি থাকলেও মূল কাজ আমিই করতাম এবং ছাপা থেকে নিয়ে বিলিবন্টন, হিসাব ইত্যাদির দায়িত্ব পালন করতো ফিরোজ আহসান।
১৯৯১ সালে মাদ্রাজের ‘শংকর নেত্রালয়’ নামে বিখ্যাত চোখের হাসপাতালে আমার ডান চোখে ক্যাটার‌্যাক্টের অপারেশন করেছিলাম। তখন ঢাকায় তো নয়ই, এমনকি কলকাতাতেও এ অপারেশনের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছিল না। এজন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকেও লোক মাদ্রাজেই যেতো ক্যাটার‌্যাক্ট অপারেশনের জন্য। ১৯৯৩ সালের দিকে আমার অপারেশন করা চোখটিতে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমি অল্প কয়েকদিনের জন্য কলকাতা গেলাম। এজন্য মাদ্রাজ যাওয়ার কোন চিন্তা করি নি। কিন্তু কলকাতায় কোন চিকিৎসকের কাছে যাবো তার ঠিক ছিল না। আমার এক ভাইপো আবাদী ভাইয়ের ছেলে, নাজেস আফরোজ আমাকে বললো তার পরিচিত একজন মহিলা চোখের ডাক্তার আছেন, বেশ ভালো। আমি তাঁর কাছে যাওয়াই ঠিক করলাম।
ডাক্তারের নাম এখন আমার মনে নেই। তিনি আগে চোখ পরীক্ষা করে বললেন, দুটো ছোট অপারেশন করতে হবে। তার মধ্যে একটা করতে হবে লেজার দিয়ে। দুটো অপারেশন তিনি করালেন দুটি পৃথক হাসপাতালে। তিনি ডাক্তার ভালই ছিলেন। অপারেশনের পর আমার অসুবিধা দূর হলো।
নাজেসের বিয়ে হয়েছিল মৌসুমী ভৌমিক নামে একটি মেয়ের সাথে। তার ডাক নাম ছিল ঝিলমী। আগে বলেছি, সে যে খুব ভাল গান গাইতে পারে এটা আমি জেনেছিলাম ১৯৯২ সালে অশোক নগরের সম্মেলনের সময়। সেবারে কলকাতায় ঝিলমী আমাকে তার গানের একটা ক্যাসেট দিল। তাতে বেশ কয়েকটি ভাল গান ছিল। ঢাকায় এসে আমি সে ক্যাসেটটা দিয়েছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে। তার গান ইলিয়াসের খুব ভালো লেগেছিল। পরে আমি নাজেসকে একথা কলায় তারা ইলিয়াসের বাসায় গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করেছিল। সেই থেকে তাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ ছিল। ইলিয়াস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যখন কলকাতা গিয়েছিল চিকিৎসার জন্য তখন নাজেস তাকে খুব সাহায্য করেছিল। সে কথা পরে হবে।
১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে আমার জীবনে এক বড় আঘাত এলো। আমার মায়ের মৃত্যু হলো ৬ই মার্চ। তিনি খুব হালকা পাতলা ছোটখাট মানুষ ছিলেন। তাঁর স্বাস্থ্য বেশ ভালই ছিল। তাঁর কোন রোগই ছিল না। তিনি তাঁর ৮০ বছর বয়সেও কোন ওষুধ খেতো না। তাঁর পান খাওয়ার অভ্যাস ছিল। ৫ তারিখ রাত্রে খাওয়ার পর পান খাওয়ার সময় তিনি খুব বেশী পরিমাণ জর্দ্দা খেয়ে ফেললেন। তাঁর বমি শুরু হলো। পরে বমি বন্ধ হলেও তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমাদের বাড়ীওয়ালা কাউয়ী সাহেবের ছেলে ডাক্তার ছিলেন। পরদিন তাকে দেখালাম। তিনি কিছু ওষুধ দিলেন। কিন্তু তাঁর অবস্থার কোন উন্নতি হলো না। অবস্থা খারাপ হওয়ায় আমি ডাক্তার সাঈদ হায়দারকে নিয়ে এলাম। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলন খ্যাত। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের শহীদ মিনারের নকশা তৈরীর কাজ তিনি করেছিলেন। তিনি সে সময় আমাদের রাস্তা কে এম দাস লেনের মাথায় টিকাটুলির একটি ওষুধের দোকানে আসতেন রুগী দেখতে। তাঁর কাছে মাঝে মাঝে যেতাম। তিনি এসে আম্মাকে দেখে বললেন অবস্থা ভাল নয়। তাঁর বয়স হয়েছিল এবং ঐভাবে জর্দ্দা খেয়ে ফেলার পর তাঁর দূর্বল শরীর সেটা আর সহ্য করতে পারে নি। সে অবস্থায় চিকিৎসার জন্য তাড়াতাড়ি অন্য কোন ব্যবস্থা করাও সম্ভব হলো না। ৬ই মার্চ বিকেল চারটের দিকে আমার মায়ের মৃত্যু হলো।
১৯৭৪ সালে আব্বার ও আমার ফুপুর মৃত্যুর সময় কবরস্থানে জায়গা ঠিক করা ইত্যাদির কাজ করেছিল আমাদের এক আত্মীয় তৌহিদ। আম্মার মৃত্যুর পর সে এলো এবং তার সাথে আমি কথা বললাম। ঠিক করলাম আম্মার লাশ দাফন করা হবে দুদিন পর ৮ই মার্চ। কারণ আমার এক বোন মনোয়ারা ঢাকায় থাকলেও অন্য বোন পুতনী ছিল চট্টগ্রামে। আমার ছেলে সোহেল ছিল খুলনায় এবং বড় মেয়ে মসিহা কলকাতায় বেড়াতে গিয়েছিল তার শ্বশুরবাড়ীর লোকদের সাথে। তাদের জন্যই এ সিদ্ধান্ত নিতে হলো। আমার ছোট বোন জীনাত ছিল ব্রাসেলস এ। তার আসার কোন সম্ভাবনা ছিল না। দুদিন লাশ রাখার ব্যবস্থা হলো বারডেমের হিমাগারে। সে ব্যবস্থা করলো আমার ফুপাতো ভাই রফীর ছেলে শামীম।
পরদিন আমি ও তৌহিদ গেলাম জুরাইন কবরস্থানে। আম্মা জিজ্ঞেস করতেন আব্বার কবরের পাশে কোন জায়গা আছে কি না। জায়গা ছিল না। কিন্তু সেদিন কবরস্থানের অফিসে গিয়ে শুনলাম আব্বার কবরের পাশেই জায়গা আছে। সেটা আগে রাখা হয়েছিল একজনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর কবরের জায়গা হিসেবে। কিন্তু সে ভদ্রমহিলা আবার বিয়ে করায় তাঁর পরিবারের লোকেরা জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছিল। কাজেই সেটা আমরা পেতে পারি। কবরের জায়গা দেওয়ার এখতেয়ার ছিল করপোরেশনের অন্য এক অফিসের। সেখানে আমরা দুজন গেলাম। একজন অল্প বয়স্ক আর্মি অফিসার তার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমাকে নামে চিনতেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজের চেয়ারের পেছনে একটা বুক সেলফ রাখা আমার বই দেখিয়ে বললেন, আমার লেখা তিনি পড়েন। যাই হোক, আব্বার কবরের পাশের জায়গাটা তিনি আম্মার কবরের জন্য দিলেন। আম্মা যা চেয়েছিলেন তাই হলো, কিন্তু তিনি তো তা আর জানলেন না।
সপরিবারে পুতনী, শাহাবুদ্দীন ও বিলকিস এবং সোহেল ও দীনা ঢাকায় এলেন ৭ই মার্চ। ৮ তারিখে সকালের দিকে আম্মার লাশ বারডেম থেকে বাসায় আনা হলো। ঠিক হলো, বায়তুল মোকাররমে জোহরের নামাজের পর তাঁর জানাজা হবে। তার পর লাশ নেওয়া হবে জুরাইন কবরস্থানে। আমি আর বায়তুল মোকাররমে গেলাম না। সোজা চলে গেলাম জুরাইন। আমার সাথে গেলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আমার এক বন্ধু আজিজুল হক সাহেব এবং ফিরোজ আহসান। আব্বার কবরের পাশেই আম্মার লাশ দাফন করা হলো।
শাহাবুদ্দীনের ছেলে মাহমুদের বিয়ে স্থির হয়েছিল সিলেটের লন্ডন প্রবাসী এক পরিবারের মেয়ের সাথে। তারিখ ছিল ১৯ই মার্চ। আমি শাহাবুদ্দীনকে বললাম তারিখ পিছিয়ে দিতে। কিন্তু তিনি সম্মত হলেন না। বললেন, মেয়ের পরিবারের লোকদের লন্ডন ফেরৎ যাওয়ার তারিখ ঠিক করা আছে। তাদের পক্ষে বিয়ে পেছানো সম্ভব নয়। একথা শুনে খুব খারাপ লাগলো। তাছাড়া আম্মার মৃত্যুর বারো দিন পরে বিয়েতে যাবো কিভাবে? মানসিকভাবে আমার তখন খুব বিপর্যস্ত অবস্থা। তবু শাহাবুদ্দীন বললেন বিয়েতে যাওয়ার কথা। দুই একদিন থেকে তিনি সিলেট ফিরে গেলেন।
আম্মার মৃত্যুর চারদিন পর আমার জীবনে আর এক শোক, দুঃখের ব্যাপার ঘটলো। আমার খুব ঘনিষ্ঠ এবং দীর্ঘ দিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু তরিকুল আলমের মৃত্যু হলো ১০ই মার্চ। সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিল। শেষ দিকে ছিল শমরিতা হাসপাতালে। সেখানে তাকে দেখতে যেতাম। কয়েকদিন আগেও গিয়েছিলাম। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে ফোন করলাম শামসুর রাহমানকে। তরীকুল আলম ছিল শামসুর রাহমানেরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি বললেন, তিনি তরীকুল আলমের বাসার দিকে যাচ্ছেন। সেখানে শামছুর রাহমানের সাথে দেখা হলো।
আম্মার মৃত্যুর পর তরীকুল আলমের মৃত্যু হওয়ায় আমার অবস্থা আরও বিপর্যস্ত হলো। আম্মা তাকে খুব স্নেহ করতেন। ভাইপোর বিয়ে একটা আনন্দের ব্যাপার হতো স্বাভাবিক অবস্থায়। কিন্তু এ অবস্থায় বিয়েতে যাওয়া আমার জন্য ছিল এক যন্ত্রণার ব্যাপার। তবু শেষ পর্যন্ত যাওয়াই স্থির করলাম। আমার সাথে গেল আমার এক খালাতো ভাই, শাহাবুদ্দীনের ছোট শ্যালক হালিম (মুন্না) এবং আসাদের ছেলে সাদ। বিয়ে উপলক্ষে দিন তিনেক সিলেটে ছিলাম। সেখানে শুনলাম, মাহমুদের শ্বশুর ও তাঁদের পরিবার আরও কিছুদিন সিলেটে তাঁদের গ্রামে থাকবেন। বিয়ে হলো সেই গ্রামে। বিয়ের পর আমরা ঢাকা ফিরলাম।

আরো খবর

Disconnect