ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

আমাদের ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ) এর অন্যতম সংগঠক লুৎফর রহমান (বকুল) এর বাড়ী ছিল মীরপুরের আহমদনগর এলাকায়। সেখানে আমরা মাঝে মাঝে সাংগঠনিক বৈঠক করতাম। দুই একবার কর্মীসভাও করেছিলাম। জায়গাটা খোলামেলা ছিল, পরিবেশ ছিল অনেকটা গ্রামের মত। বকুলের সেই বাড়ীতেই আমার প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের উষাতন তালুকদার ও রবিশংকর চাকমার সাথে। তাঁদের সংগঠনের নাম ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ১৯৯৭ সালে বাঙলাদেশ সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির শান্তি চুক্তির পর সংগঠনটি দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে পরে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই বিভক্তির সময় উষাতন তালুকদার সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিতেই থেকে যান এবং রবিশংকর চাকমা যান ইউপিডিএফ এ।
লুৎফর রহমানের সঙ্গেই প্রথম যোগাযোগ হয় জনসংহতি সমিতির। তার পর তাঁরা আমার সাথে দেখা করতে চান। সেই সাক্ষাতের ব্যবস্থা লুৎফর রহমান করেছিলেন তাঁদের আহমদনগরের বাড়ীতে। আমার সাথে সেই বৈঠকের সময় ছিলেন উষাতন তালুকদার, রবিশংকর চাকমা ও লুৎফর রহমান। বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতির উপর সাধারণভাবে আলোচনা হলেও তার বিবরণ আমার এখন মনে নেই। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার সম্ভবত সামরিক বাহিনীর শাসন জারি করে সেখানকার জনগণের উপর যে নির্যাতন করেছিল সে বিষয়েই আমরা সাধারণভাবে আলোচনা করেছিলাম। তাঁদের থেকে শুনেছিলাম সব নির্যাতনের বিবরণ। আমি নিজে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতির বিষয়ে কিছু খোঁজ খবর রাখতাম এবং সাংগঠনিকভাবে সেখানকার সাথে যোগাযোগের চিন্তা করতাম। তাঁরাও আমাদের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। এ কারণেই আমাদের মধ্যে যোগাযোগ হয় এবং আমরা তাঁদের সাথে এই বৈঠকের ব্যবস্থা করি। লুৎফর রহমানের যে বাড়িতে এই বৈঠক হয়েছিল সে বাড়ি বিক্রি করে তাঁরা অন্য বাড়িতে উঠে যান ১৯৯১ সালের প্রথম দিকে। জনসংহতি সমিতির সাথে এই বৈঠক ঠিক কোন সময়ে হয়েছিল সেটা মনে নেই। তবে সময়টা ছিল ১৯৮৯ সালের শেষ অথবা ১৯৯০ সালের কোন এক সময়ে।
১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে একদিন আনু মুহাম্মদ এর স্ত্রী বাপী আমাকে ফোন করে বললেন, আনু পরের দিন আমেরিকা যাচ্ছে। সেখানে কাউকে যদি চিঠি অথবা বইপত্র দিতে চাই তাহলে সে তা নিয়ে যাবে। আমি বাপীর এই ফোন পেয়ে খুবই বিস্মিত হলাম। যাই হোক, বাপীকে বললাম, কাউকে আমার চিঠি দেওয়া অথবা বইপত্র পাঠানোর কোন প্রয়োজন নেই। আমেরিকা যাওয়ার কথা আমাকে নিজে না জানিয়ে বাপীর মাধ্যমে আমাকে তা জানানোতেই আমি আরো বিস্মিত হলাম।
আনু আমাদের সংগঠনের একজন নেতা ছিল। কিন্তু তার আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারে সে আমাকে অথবা আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনকে কিছইু না জানাবার বিষয়টি যে তার চরম সাংগঠনিক শৃংখলা বিরোধী কাজ ছিল এতে সন্দেহ নেই। আনুর মধ্যে শৃংখলার অভাব আমরা অনেকেই লক্ষ্য করতাম। কিন্তু সে যে এত বড় শৃংখলা বিরোধী কাজ করবে এটা ধারণার বাইরে ছিল। আনু কর্তৃক তার আমেরিকা যাওয়ার বিষয়টি আমাদের থেকে গোপন রাখার কারণ সে অসৎ এবং আমাদের সংগঠনের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোন কিছু এতে আমাদের কোন সন্দেহ থাকেনি। সে কোন প্রোগ্রামে, কাদের অর্থ সহযোগীতা, কোথায় এবং কি ধরনের সম্পর্কের মাধ্যমে কতদিনের জন্য আমেরিকা গেল এটা গোপন করার উদ্দ্যেশেই এ কাজ করেছিল।
১৯৯৪ সালে নিউ ইয়র্কে থাকার সময় আমি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বক্তৃতার জন্য গিয়েছিলাম, এটা আগেই বলেছি। সেসময় রওনক জাহানের সাথে আমি আফ্রিকান-আমেরিকানদের বসতি দেখার জন্য পার্শ্ববর্তী হারলেম গিয়েছিলাম এটাও আগে বলেছি। হারলেম থেকে হেঁটে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সময়ে একটা বিল্ডিং দেখিয়ে রওনক আমাকে বললেন, এই বিল্ডিংটার একটা রুমে আনু মুহাম্মদ ছিল। আমি রওনকের কথায় অবাক হলাম। তাঁকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন আনুর জন্য তিনি কলম্বিয়ায় তিন মাসের একটা স্টাডি প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করেছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখনই সে এখানে ওই বিল্ডিং এ ছিল।
প্রথমত: বলা দরকার যে, আনু এ ধরনের একটা একাডেমিক প্রোগ্রামে কলম্বিয়া গেলে তার মধ্যে দোষের কিছু ছিল না। তাতে বাঁধা দেওয়ার কোন প্রশ্ন ছিল না। এ ধরনের প্রোগ্রামে যেতেই পারে। কিন্তু এই প্রোগ্রামের ব্যবস্থা বেশ কিছুদিন ধরেই নিশ্চয়ই করতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও আমাদের কাছে ব্যাপারটি একেবারে গোপন রাখায় তার মধ্যে যে গলদ ছিল এটা স্পষ্ট। এনজিওদের কার্যকলাপ বাংলাদেশে এরূপ  হওয়ার পর আমি তার বিরুদ্ধে অনেক লিখেছিলাম। আনুও অনেক লিখেছিল। ‘এনজিও মডেল’ নামে একটা বইও সে লিখেছিল, সেটা ছিল তার প্রথম প্রকাশিত বই। তা সত্ত্বেও রওনক জাহান তার তিন মাসের স্টাডির ব্যবস্থা নিশ্চই এমন কোন সংস্থার মাধ্যমে করেছিলেন যা এনজিও বা ওই ধরনের কোন দুষ্ট সংস্থার আর্থিক সহায়তাতেই হয়েছিল। অন্যথায় এটা গোপন করার কোন কারণই ছিল না। আমাদের এ অনুমান যে সঠিক এটা পরবর্তীকালে বেশ ভালোভাবেই প্রমাণিত হয়েছিল। কারণ পরবর্তীকালে আনু একজন এনজিও বান্ধব ব্যক্তি হিসেবেই কোন রাখ-ঢাক না করেই পরিচিত হয়েছেন। আমাদের সংগঠন থেকে পরে বের হয়ে যাওয়ার অল্পদিন পরেই তিনি এনজিওদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একেবারেই বেপরোয়া হয়েছিলেন। তাদের আর্থিক সহায়তায় নানা দেশে তিনি বহুবার সফর করেছেন।
আনু এইভাবে সেখানে আমেরিকা যাওয়ার প্রোগ্রাম এক চরম শৃংখলা বিরোধী কাজ ছিল। কিন্তু সে আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পর তার বিরুদ্ধে শৃংখলা বিরোধী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা তার বিরুদ্ধে সেইরকম কোন পদক্ষেপ নেইনি। এটা আমাদের দিক থেকেও ছিল এমন এক ধরনের উদারনীতির দৃষ্টান্ত যা ছিল সংগঠনের জন্য বিপজ্জনক। সে বিপদ পরে বেশ ভালোভাবেই ঘটেছিল। এখানে উল্লেখ করার দরকার যে, আনুর এ অপকর্মের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৯৭ সালে সে আবার এক প্রোগ্রামে অল্পদিনের জন্য হঠাৎ করেই লন্ডন গিয়েছিল আমাদেরকে কিছু না জানিয়েই। সেখানে সে একটা পেপার পড়েছিল। কিন্তু আমি সে পেপারের কপি তার কাছে কয়েকবার চাওয়া সত্ত্বেও সেটা আমাকে আনু দেয়নি। কাজেই তার এই লন্ডন সফরও আমাদের কাছে ছিল এক রহস্যের মত। এসময় থেকেই আনুর কাজকর্মের মধ্যে শৃংখলার অভাব বেশি করে দেখা দিতে থাকে। সে বেপরোয়াভাবে নানা কাজ করে যাওয়া সত্ত্বেও এই ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, একজন নেতা ও লেখক হিসেবে সে এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যাতে তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়! করে যাওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোন সাংগঠনিক পদক্ষেপ না নেওয়ায়, তার মধ্যে আমাদের উদারনীতিবাদের ফল যে কত বিষময় ও বিপজ্জনক হয়েছিল তার বিবরণ পরে দেওয়া যাবে। তবে শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয়েছিল যাতে আমরা আনুকে আমাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
আনুর প্রতি আমি নিজে খুব দুর্বল ছিলাম। সে কারণে সে সংগঠন থেকে চলে যাওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে আমি দুঃখ পেয়েছিলাম। কিন্তু আনু নিজের কাজকর্মের কারণে আমাদেরকে নিরুপায় করেছিল।

আরো খবর

Disconnect