ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

এখানে কিছু আগের কথা বলা দরকার। ১৯৯২ সালের  কোন এক সময়, তারিখ ঠিক মনে নেই, তবে মনে হয় শেষের দিকে, আমি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতার এক আমন্ত্রণ পেলাম, সেই সাথে আমন্ত্রণ পেলাম বর্ধমান থেকে প্রকাশিত সিপিএম এর পত্রিকা “নুতন চিঠি’র সম্পাদক জ্যোতিময় ভট্টাচার্যের থেকে তাঁদের দ্বারা দুর্গাপুরে আয়োজিত সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে এক সেমিনারে আলোচনার জন্য। সেটাও ছিল প্রায় একই সময়ে। আমি এই দুই আমন্ত্রণই গ্রহণ করলাম।
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামটিই ছিল প্রথম দিকে। বর্ধমানে আমার থাকার জায়গার অভাব ছিল না। কিন্তু এবার ঠিক করলাম বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন দিনের প্রোগ্রামে তাদের গেস্ট হাউসে থাকবো। আমি কলকাতায় ছিলাম আসাদুর রহমান সাহেবের বাসায়। তাঁকে অনুরোধ করলাম আমার সাথে বর্ধমানে যেতে। তিনি সম্মত হলেন। সেই অনুযায়ী আমি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়কে জানালাম দুই জনের থাকার ব্যবস্থা জন্য। নির্ধারিত দিনে আমরা বর্ধমান গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে উঠলাম। দোতলায় একটি বড় কামরায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।
আমরা যেদিন বর্ধমান গেলাম তার পর দুদিন আমার বক্তৃতার আমন্ত্রণ ছিল। প্রথমটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, দ্বিতীয়টা বর্ধমানের রাজবাড়ীতে, যে অংশে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ইত্যাদি আছে। দ্বিতীয় বক্তৃতাটির ব্যবস্থা হয়েছিল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ও সিপিএম এর পত্রিকা ‘নুতন চিঠি’র উদ্যোগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসটা ছিল গোলাপবাগ এর সীমানার পাশেই, কিন্তু বাইরে। গোলাপবাগ ছিল বর্ধমানের মহারাজার চিড়িয়াখানা ও বাগানবাড়ী। সেখানে তাঁরা কেউ থাকতেন না। বর্ধমানে স্কুল, কলেজে পড়ার  সময় বন্ধুরা সব মিলে প্রায়ই আমরা সাইকেলে চড়ে বেড়াতে আসতাম গোলাপবাগে। বিশাল এলাকাজুড়ে সেই গোলাপবাগ বর্ধমানের মহারাজা দান করেছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়কে, যেখানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কর্মক্ষেত্র। মহারাজা উদয় চাঁদ মাহতাবের নির্দেশ ছিল তাঁর এই দানের কথা কোথাও যেন লেখা না থাকে। সেখানে অনেক নোতুন ভবন তৈরী করা হয়েছে বিভিন্ন বিভাগের জন্য কিন্তু মহারাজার নামে কোন ভবনের নামকরণ করা হয় নি।
গেস্ট হাউসে সকালের দিকে পাশের ক্ষেতে আমরা এক দৃশ্য দেখলাম। সেখানে ফসল কাটা শেষ হয়েছিল। এর পর শষ্যের কিছু দানা যেভাবে দাড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সেভাবে ছিল, যা খাওয়ার জন্য নেমেছিল এক বড় ঝাঁক টিয়াপাখী। এমনিতেই টিয়াপাখী অনেক দিন দেখি নি। তার ওপর এত বেশী টিয়াপাখী যা জীবনে এর আগে একত্রে দেখি নি। খুব ভাল লাগলো। অনেকক্ষণ আমরা সেই দৃশ্য দেখলাম। কিন্তু এর পরের দুদিন আর কোন টিয়া পাখী সেই ক্ষেতে আর দেখি নি।
প্রথম দিন সন্ধ্যায় বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এলেন গেস্ট হাউসে আমার সাথে দেখা করতে। তাঁর নাম এখন ভুলে গেছি। খুব অমায়িক ভদ্রলোক। অনেকক্ষণ নানা বিষয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা হলো। দুর্গাপুরে যে সেমিনারে আমার যাওয়ার কথা সেখানে তিনিও যাবেন বলে জানালেন। শুধু তাই নয়। তিনি সেখানে সভাপতিত্ব করবেন এবং থাকবেন কোঅর্ডিনেটর হিসেবে। তিনি বললেন, আমরা বর্ধমান থেকে সেখানে একসাথে তাঁর গাড়ীতে করে যাবো।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের হলে বক্তৃতার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরী ঘুরে দেখলাম। বক্তৃতার সময় কিছু শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন, ছাত্ররাই বেশী, শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের নয়, অন্য বিভাগেরও। বক্তৃতার পর কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হতে থাকলো এবং আমি সেগুলোর ওপর আলোচনা করলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আলোচনা সভার থেকে রাজবাড়ীতে পরদিন অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় উপস্থিতি ছিল বেশী এব আলোচনা বেশ জমজমাট ছিল। কারণ দ্বিতীয় অনুষ্ঠানটি ছিল মূলতঃ রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন বেশী।
রাজবাড়ীর যে অংশে এই বক্তৃতা হলো, সেটা আমার খুব পরিচিত ছিল। বর্ধমান থাকতে সেখানে কয়েকবার গেছি। দেখলাম আগে সিড়ির পাশে দেওয়ালে এবং ভেতরের কামরায় যে সব পেন্টিং টাঙানো থাকতো সেগুলি প্রায় একই অবস্থায় সেথানে টাঙানো আছে। দেখে ভাল লাগলো।
তিন দিন বর্ধমানে থাকার পর চতুর্থ দিন আমরা দুর্গাপুরের অনুষ্ঠানের জন্য সকাল করেই বর্ধমান থেকে রওয়ানা হলাম উপাচার্যের সাথে তাঁর গাড়ীতে। বর্ধমান থেকে অনেকে গিয়েছিলেন দুর্গাপুরে। তাঁদের জন্য কয়েকটি বাস ছিল। আমার ফুপাতো ভাই সৈয়দ মহবুবুল্লাহও গিয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে বাসে। দুর্গাপুরে তাঁর সাথে দেখা হলো। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল তিনটের দিকে। তার আগে সকলের জন্য দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
আমি ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের কথা ছিল অন্য তিন জনের। তাঁরা ছিলেন সিপিএম এর দৈনিক পত্রিকা ‘গণ শক্তির’ সম্পাদক অনিল বিশ্বাস, দৈনিক ‘আজকাল’ পত্রিকার সম্পাদক। এ ছাড়া দিল্লী থেকে আসার কথা ছিল এম জে আকবরের। তিনি তখন ছিলেন, মনে হয় ঞরসবং ড়ভ ওহফরধ এর সম্পাদক। তাঁদের কথা ছিল লাঞ্চের আগেই দুর্গাপুর পৌঁছানোর। কিন্তু তাঁরা সে পর্যন্ত এলেন না। আয়োজকরা কলকাতায় যোগাযোগ করলে জানা গেল তাঁরা তখনো রওয়ানাই হয় নি। এর কারণ ঐদিন সকালে কলকাতার বড়বাজার এলাকায় এক বড় বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। বড়বাজার হলো ব্যবসায়ীদের এলাকা, বিশেষতঃ মাড়োয়ারীদের। বোমা বিস্ফোরণের পর সারা কলকাতায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাত্র কিছুদিন আগে মুম্বাইএর এক হোটেলে এক মহা বিস্ফোরণ ঘটে অনেক লোকের মৃত্যু হয়েছিল। অনেকে আহত হয়েছিল। তার মামলা এখন ঝুলছে। যাই হোক, বড়মানের বোমা বিস্ফোরণ হলেও তা নিয়ে সারা কলকাতায় ইসলামী মৌলবাদীদের হামলার ভয়ে লোকজনের এভাবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ ছিল না। এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়েছিল ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর ভারতের তৎকালীন প্রধান সেনাপতি জেনারেল করিয়াপ্পার এক মন্তবের কথা। তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানীরা যদি যুদ্ধের সময় কলকাতায় দুই একটা বোমা ফেলতো তাহলে সারা পশ্চিমবঙ্গের যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়তো! এটা তিনি বলেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতার কয়েক দফা জাপানী বিমানের বোমা হামলার সময়কার পরিস্থিতির কথা ভেবে। সে সময় কলকাতার দুই তৃতীয়াংশের বেশী লোক কলকাতা ছেড়ে বিভিন্ন জেলায় চলে গিয়েছিল। কলকাতা ফাঁকা ও প্রায় জনশূন্য হয়েছিল। এমনকি ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার জায়গা কলকাতা থেকে সরিয়ে জেলা শহরগুলোতে নেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধের সময় এ ধরনের ঘটনা অন্য কোন দেশে ঘটেছিল বলে জানা নেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীদের বোমা হামলার মত অবস্থা কিছুটা দাঁড়িয়েছে বড়বাজারে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পরে। আতঙ্ক এমন হোল যাতে হাওড়া স্টেশনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে থাকলো। উপাচার্য জানালেন যে, ‘গণশক্তি’ ও ‘আজকাল’ পত্রিকার সম্পাদক হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত এসেও ট্রেনের অভাবে আটকে পড়েছেন এবং তাঁদের পক্ষে আসা আর সম্ভব নয়। তিনি আরও বললেন যে, হাওড়া স্টেশন থেকে তাঁদের লোকেরা জানিয়েছেন যে, সেখানে এখন মানুষের থেকে পুলিশের কুকুরের সংখ্যা নাকি বেশী! দিল্লী থেকে আসার কথা ছিল ঞরসবং ড়ভ ওহফরধ এর সম্পাদক এম জে আকবরের। কিন্তু সেখান থেকে কলকাতার প্লেন ছাড়ে নি। কাজেই তিনিও আসতে পারছেন না।
এই পরিস্থিতিতে সেমিনারের এতো বড় এক আয়োজন পণ্ড হওয়ার উপক্রম হলো। কথা ছিল চার জনের আলোচনার এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোঅর্ডিনেশনের। কিন্তু এখন বক্তা দাঁড়ালাম শুধু আমি। দূর্গাপুরে ইস্পাত কারখানার বিশাল মিলনায়তনে আলোচনা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দূর্গাপর হচ্ছে শ্রমিকদের শহর। অন্ততঃ দুতিন হাজার লোকের বসার ব্যবস্থা ছিল। তাছাড়া বাইরেও মাইক ছিল। এসব নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিল হাজার হাজার লোক। সেই অবস্থায় উপাচার্য আমাকে বললেন, কোঅর্ডিনেটর হিসেবে তো তাঁর এখন করার কিছু নেই। কাজেই তাঁকেও বক্তার কাজ করতে হইবে, তবে তিনি বেশী বলবেন না। আমাকে তিনি অনুরোধ করলেন দীর্ঘ সময় নিয়ে বক্তৃতা  করতে, অন্ততঃ ঘন্টা দুয়েক। দীর্ঘ বক্তৃতার জন্য আমি তৈরী ছিলাম না। তবু আলোচনার বিষয়বস্তুর সাথে আমার ভাল পরিচয়ের কারণে আমি তাঁকে বললাম, ঠিক আছে অসুবিধা নেই। ভারত ও বাঙলাদেশে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ওপর আমি দুই ঘন্টা ধরেই বক্তৃতা করলাম। তার পর উপাচার্য সভাপতি হিসেবে তাঁর ভাষণ দিলেন। আমাদের বক্তৃতা রেকর্ড করা হয়েছিল। আমার বক্তৃতার একটা লিখিত ও সম্পাদিত বিবরণ ‘নুতন চিঠি’তে পরে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘নির্বাচিত বক্তৃতা’ নামে আমার একটা বইয়ে দুর্গাপুরের সেই বক্তৃতাটি অন্তর্ভূক্ত আছে।

আরো খবর

Disconnect