ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

পরদিন সকালে পূর্ব কথামত নিশাত কায়সার একজনকে সঙ্গে নিয়ে ণডঈঅ তে নিয়ে এলেন। সেখান থেকে আমরা গেলাম মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের ফ্ল্যাটে। মবু চাচা তখন ছিলেন দিল্লীর বাইরে। কিন্তু আমায় তিনি বলে গিয়েছিলেন আমার সেখানে যাওয়ার কথা। দিল্লীতে তিনি স্বপরিবারে থাকতেন না, যদিও তাঁর স্ত্রী ও ছেলেরা মাঝে মাঝে দিল্লী যেতেন। দিল্লীতে তিনি থাকতেন একাই। তাঁর পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন বর্ধমান থেকে নির্বাচিত সিপিএম এর এমপি নিখিল সর। তিনিও থাকতেন একাই। তাঁর নিজের কোনো রান্নার ব্যবস্থা ছিল না এজন্য তিনি মবু চাচার ফ্ল্যাটেই খাওয়া দাওয়া করতেন। সেখানে একটি অল্প বয়সী চটপট ছেলে রান্নার কাজ করতো। এছাড়া অন্য একজনও ছিল।
ফ্ল্যাটে আমার জন্য একটা কামরা ঠিক করেছিল। সেখানেই থাকলাম আমি। দিল্লীতে তখন প্রচন্ড শীত। ঘরের মধ্যে হিটার জ্বালিয়ে রাখতে হতো। ফ্ল্যাটে পৌঁছে জিনিষপত্র কামরায় রেখে আমি বসার ঘরে নিশাত ও তাঁর বন্ধুর সাথে বসে গল্পসল্প করলাম। নিশাতকে পেয়ে আমার খুব সুবিধা হয়েছিল। কারণ তাঁর মাধ্যমে যেসব যোগাযোগ হয়েছিল সেটা তিনি না থাকলে হতো না। দিল্লীতে আমি বেশি না হলেও কয়েকদিন থাকা ঠিক করেছিলাম। এ সময় প্রায় প্রত্যেক দিনেই নিশাত মবু চাচার বাসায় আসতেন এবং তাঁর সাথে বের হতাম। কখনো সখনো এমনি ঘোরাঘুরির জন্যও।
দিল্লীতে তখন ছিলেন শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সেখানে গান্ধী আশ্রম বা ওই ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন। আমার সাথে তাঁর কোনো সাক্ষাত পরিচয় ছিল না। তবে তিনি জিন্নাহ ও পাকিস্তানের ওপর একটা খুব ভালো বই লিখেছিলেন। গান্ধীবাদী এবং গান্ধীভক্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি জিন্নাহ এবং পাকিস্তান আন্দোলনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসী কায়দায় বিষোদগার না করে ভারতের রাজনীতিতে জিন্নাহর ভূমিকা ও পাকিস্তান আন্দোলনের একটা বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের চেষ্টা করেছিলেন। বইটি তিনি নিজে ঢাকায় আমার ডাক ঠিকানায় পাঠিয়েছিলেন ও সেই সাথে চিঠি দিয়েছিলেন। আমি তাঁর চিঠির জবাব দিয়েছিলাম। সেই থেকে তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। ১৯৪৭ সালে অখন্ড বাঙলার আন্দোলন এবং বঙ্গভঙ্গের ওপর আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি তাঁর বইটিতে লিখেছিলেন যে, অখন্ড বাঙলার আন্দোলনের সাথে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম যুক্ত হলেও এবং আবুল হাশিম ও শরৎ বসু একত্রে কাজ করলেও অখন্ড বাঙলা আন্দোলনে সব থেকে বড় ভূমিকা ছিল আবুল হাশিমের।
আমি শৈলেশ বাবুর সাথে দেখা করতে চাইছিলাম, বিশেষ করে এ কারণে যে, তিনি আমাকে লিখেছিলেন যে, দিল্লী গেলে আমি যেনো অবশ্যই তাঁর সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তাঁর কোনো ফোন নম্বর আমার কাছে ছিল না। মনে হয় নিশাতই তাঁর ফোন নম্বর কোনোভাবে যোগাড় করে আমাকে দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে ফোন করলাম এবং তাঁকে পেয়ে গেলাম। তিনি খুব খুশি হলেন এবং বললেন, আমার সাথে দেখা করার জন্য তিনি মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের বাসায় আসবেন। সেই অনুযায়ী একদিন তিনি এলেন। তিনি দীর্ঘদেহী ও সুপুরুষ ছিলেন। আমার থেকে বয়সে কিছু বড়। অমায়িক ভদ্রলোক। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমিও খুশি হলাম। বেশ কিছুক্ষণ আমরা নানা বিষয়ে কথা বললাম। তাঁর অন্য কয়েকটি বইও প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ‘দাঙ্গার ইতিহাস’ নামে একটা বই পরে ঢাকায় জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। দিল্লীর এই সাক্ষাতের পর তাঁর সাথে একটা যোগাযোগ থাকলেও আর দেখা হয়নি। গত বছর জুন মাসে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ডক্টর অশোক মিত্রের সাথে দীর্ঘদিন আমার যোগাযোগ ছিল। এ বছর ১ লা মে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। মাঝে মাঝে আমরা চিঠিপত্র আদানপ্রদান করতাম। তিনি শেষ দিকে ‘আরেক রকম’ নামে যে পত্রিকাটি বের করতেন তাতে আমাকে লিখতে বলায় আমি কয়েকবার লিখেছিলাম। কলকাতায় গেলে তাঁর সাথে দেখা করতাম। তাঁর সাথে একাধিকবার ঢাকাতেও দেখা হয়েছে। যাই হোক, ডক্টর মিত্র আমাকে বলেছিলেন, দিল্লী গিয়ে আমি যেন তাঁর সাথে যোগাযোগ করি। তিনি তখন ছিলেন দিল্লীতে ভারতীয় পার্লামেন্টে সিপিএম এর রাজ্যসভার সদস্য। আমাকে তাঁর বাসায় থাকার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু আমি তো মবু চাচার বাসাতেই থাকা স্থির করেছিলাম। দিল্লী গিয়ে তাঁর সাথে ফোনে যোগাযোগ করেছিলাম।
আমি দিল্লীতে কয়েকদিন থাকার সময় মবু চাচাকে সে সময় দিল্লীর বাইরে থাকতে হয়েছিল। আমি তাঁর বাসায় ওঠার সময় তিনি বাইরে ছিলেন। ফিরে আসার পরেই হঠাৎ করে তাঁকে আবার যেতে হলো পূর্ব বিহারে সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে এক জরুরি অবস্থা দেখা দেওয়ায়। সে সময় তিনি ছিলেন ভারতের কৃষক সভার সভাপতি। তখন ভারতের পার্লামেন্টে শীতকালীন অধিবেশন চলছিল। আমি তাঁকে বললাম, একদিন আপনাদের পার্লামেন্টের অধিবেশন দেখার জন্য যেতে চাই। তিনি নিখিল সর এর সাথে কথা বলে তাঁর ব্যবস্থা করলেন। একদিন নিখিল সর আমার জন্য প্রবেশ পত্রের ব্যবস্থা করলেন। আমি ডক্টর অশোক মিত্রকে জানালাম ঐদিন আমার পার্লামেন্ট হাউজে যাওয়ার কথা। তিনি আমাকে সেখানে লাঞ্চের দাওয়াত করে বললেন তখনই কথা হবে।
মবু চাচার একজন সহকারীর সাথে আমি পার্লামেন্ট ভবনে গেলাম। তখন লোক সভার অধিবেশন চলছিল। ভেতরে গিয়ে আমি ভিজিটার্স গ্যালারিতে বসলাম। সেখানে আরো কিছু লোক বসেছিল। সেটা ছিল বিজেপি সরকারের আমল। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাজপেয়ী। তিনি, লাল কৃষ্ণ আদভানী, যশোবন্ত সিং এবং মন্ত্রীরা অনেকেই ছিলেন। কোনো একটা বিষয় নিয়ে তুমুল বির্তক চলছিল। কী বিষয় মনে নেই। তবে তাকে বির্তক বলা চলে না। দুই পক্ষ থেকেই এমন হৈ হল্লা চিৎকার চলছিল যে, ভালোভাবে কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। বিরোধী দলীয় সদস্যরাই চিৎকার করছিল বেশি। এটা নোতুন ব্যাপার ছিল না। ভারতীয় পার্লামেন্টের লোকসভা ও অন্য সভা উভয় পক্ষেই এ ধরনের চিৎকার চেঁচামেচি প্রায় নিয়মিত ব্যাপার। এখানে তাই দেখা যায়। সুস্থির আলাপ এইসব প্রতিনিধি সভায় খুব কমই হয়ে থাকে। কিছুক্ষণ বসে থেকে এসব শুনতে শুনতে ও দেখতে দেখতে বিরক্ত লাগল। আমি ভেতর থেকে বাইরে এলাম। করিডরে এসেই দেখা হলো শিশির বসুর সঙ্গে। শিশির বসু ছিলেন শরৎ চন্দ্র বসুর ছোট ছেলে। তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণা বসু তখন ছিলেন লোক সভায় তৃণমূলের এমপি। শিশির বসুর সাথে কথা বলতে থাকার সময়েই কৃষ্ণা বসু এলেন। শিশির বসু তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। কৃষ্ণা বসুর সাথে পরিচয় হলো। তাঁদের পরিবারের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। শরৎ বসু বেঁচে থাকতে আব্বার সাথে কলকাতায় তাঁদের বাড়ি ১ নং উডবার্ন পার্কে আমি একাধিকবার গেছি, ডিনার খেয়েছি। পরে অমিয় বসুর কাছেও আমি গেছি। তিনি আমাকে শরৎ বসু সম্পর্কিত কিছু কাগজ পত্র ফটোকপি করে দিয়েছিলেন।
পার্লামেন্ট হাউজের যেখানে অশোক মিত্রের সাথে দেখা হওয়ার কথা সেখানে আমাকে নিয়ে গেলেন নিখিল সর। তাঁর সাথে দেখা হলো। খেলাম সেখানেই। কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফিরলাম মবু চাচার ফ্ল্যাটে। দিল্লীতে এমনিতেই শীত পরে বেশি। সেবার শীত ও তাঁর সাথে কুয়াশা দুয়েই বেশি ছিল। একমাত্র ভেতরের বসার ঘর ছাড়া হিটিংয়ের ব্যবস্থা অন্য কোন ঘরে ছিল না। এজন্য বসার সেই ঘরেই বেশি সময় থাকতাম।
এর মধ্যে একদিন সকালের দিকে নিশাত কায়সার তাঁর দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এলেন এবং বললেন, আমাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাবেন যদি আমার অন্য কোনো কাজ না থাকে। সেদিন কোন কাজ ছিল না। বললাম অসুবিধা নেই, ভালো হবে। নিশাতের দুই সঙ্গীই বাঙালী। নিশাত নিজে ছিলেন ঊর্দূভাষী বিহারি কিন্তু বাঙলা জানতেন এবং বাঙালীদের অনেকের সাথেই তাঁর জানাশোনা ছিল। তাঁর দুই বন্ধুরই বয়স অল্প, তিরিশের কোঠায়। একজনের দাড়ি ছিল। দুজনই ছিলেন দিল্লীতে প্রবাসী বাঙালী পরিবারের।
সেদিন ছিল রবিবার। অনেক দোকান পাট বন্ধ ছিল। আমরা ঘোরাঘুরি করে কনট প্লেসের আশেপাশে এক রেস্তোরাঁয় গিয়ে লাঞ্চ খেলাম। দাড়িওলা ছেলেটির নাম এখন আর মনে নেই। সে খুব রসিক ছিল। অনেক রকম মজার গল্প করেছিল। সে বললো, দিল্লীতে শেখ মুজিব সম্পর্কে একটা চালু গল্প আপনাকে শোনাই। ঢাকার এক হাই স্কুলে এক স্কুল ইন্সপেক্টর গিয়েছিলেন পরিদর্শনে। তিনি উপরের ক্লাসে ঢুকে সামনের বেঞ্চে বসা এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, সোমনাথ মন্দির কে ধ্বংস করেছিল? সে ছেলেটি ভয় পেয়ে বললো, স্যার আমি করিনি। তাঁর উত্তর শুনে ইন্সপেক্টর বিরক্ত হয়ে আবার তাঁকে বললেন আমি জিজ্ঞেস করেছি, সোমনাথ মন্দির কে ভেঙেছিল। ছেলেটি তাঁর প্রশ্ন করা দেখে এবার কেঁদে ফেললো। বললো সত্যিই স্যার আমি মন্দির ভাঙিনি। ছেলেটির অবস্থা দেখে ক্লাস টিচার ইন্সপেক্টরকে বললেন, ও ঠিকই বলেছে স্যার। ও খুব ভালো ছেলে, এরকম কাজ করতেই পারে না। ইন্সপেক্টর আরও বিরক্ত ও বিস্মিত হয়ে টিচারকে বললেন, আপনি এসব কি বলছেন? টিচারও এবার ভয় পেয়ে বললেন, আমি সত্যিই বলছি স্যার এ কাজ ও কখনই করতে পারে না। ক্লাসের এই অবস্থা দেখে ইন্সপেক্টর হেডমাস্টারের কামরায় বসে তাঁকে এ বিষয়টি জানালেন। হেডমাস্টার তাঁর কথা শুনে বললেন, সোমনাথ মন্দির যদি ভাঙাই হয়ে থাকে তাহলে ছেলেটি নিশ্চয়ই তা করেনি। আমাদের টিচার খুব ভালো লোক এবং ছাত্রদের খবরাখবর ভালোই রাখেন। তিনি যখন বলেছেন তখন ছেলেটি নির্দোষ। তাছাড়া আমাদের স্কুলের কোনো ছাত্র এরকম কাজের সাথে কখনই যুক্ত থাকতে পারে না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। হেডমাস্টারের কাছ থেকেও একই কথা শুনে ইন্সপেক্টরতো শিক্ষার বেহাল অবস্থা দেখে বিচলিত হলেন। তিনি বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানালেন। শিক্ষামন্ত্রীও ব্যাপারটা শুনলেন। তিনি ভাবলেন, বিষয়টা জরুরী কাজেই সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে জানানো দরকার। তিনি গিয়ে শেখ মুজিবকে বিষয়টি বললেন। সোমনাথ মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে, কিন্তু কে ভেঙেছে এটা জানা যাচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রীর কথা শুনে শেখ মুজিব বললেন, শুনলাম সোমনাথ মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে! তারপর খুব ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ব্যাপারটা জানেন না তো!
সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে দেখলাম আবাদি ভাইয়ের ছোট ছেলে বাপী ও তাঁর স্ত্রী এসেছে। তাঁরা বর্ধমান থেকে বেড়াতে বেড়িয়ে আগ্রা, জয়পুর, আজমীর ইত্যাদি গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরেছে। মনে হয় এর আগেই প্রথমে তারা দিল্লী এসেছিল এবং পরে আরও পশ্চিমে গিয়েছিল। মবু চাচা তখনো ফেরেননি বিহার থেকে।
নিশাত কায়সার আমাকে বললেন, ওয়ারা ওয়ারা রাও এখন দিল্লীতে আছেন। আপনি দিল্লীতে আসার খবর পেয়ে তিনি জানিয়েছেন আমার সাথে দেখা করতে চান। আপনি চাইলে ব্যবস্থা করতে পারি। নিশাতের কথায় আমি অবাক হলাম। সিপিআই (এমএল- জনযুদ্ধ) পার্টির সাথে তাঁর কোনো যোগাযোগ আছে আমি ভাবিনি। ওয়ারা ওয়ারা রাও এর সাথে হায়াদ্রাবাদে ১৯৯৫ সালে আমার পরিচয় হয়েছিল। তিনি ছিলেন মাওবাদী নামে পরিচিত সে পার্টির এখানে উচ্চ পর্যায়ের নেতা। একজন তেলেগু হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। যাই হোক, নিশাতের কথা শুনে আমি খুশি হলাম। দিল্লীতে এসে হঠাৎ করে এ ধরনের একটা যোগাযোগ হবে ভাবিনি। আমি নিশাতকে বললাম, আমি দেখা করতে আগ্রহী। তিনি যেন ব্যবস্থা করেন। আমি তখন ঢাকায় ফেরার জন্য প্লেনে সিট বুকিং এর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু সিট পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে যেকোন সময় পাওয়া যেতে পারতো। কাজেই আমি নিশাতকে বললাম, দেরী না করে তাড়াতাড়ি করতে। নিশাত বললেন দেরী হবে না, আগামী কালই হতে পারবে।
পর দিন সকালের দিকেই নিশাত বললেন যে, সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়েছে। তিনি আমাকে নিতে আসছেন। তিনি একাই এলেন এবং আমি তাঁর সঙ্গে বের হলাম। জায়গাটা ছিল অনেক দূরে। এটা অটোরিক্সা করে আমরা নিজামুদ্দীন, আরও পরে মহারানীবাগ পার হয়ে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু দূর গিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছালাম। সেটা ছিল তাঁদের পার্টির ডেরা বা ডেন। বুঝলাম নিশাত কায়সারের সাথে তাঁদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। যদিও তিনি তাঁদের পার্টির সদস্য ছিলেন কিনা জানি না।
ওয়ারা ওয়ারা রাও ছাড়া সেখানে ছিলেন আরও তিন চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন কাঞ্চন কুমার। তিনি ছিলেন বেশ লম্বা ও সুদর্শন। পশ্চিমবঙ্গে বাড়ি, তবে পার্টির কাজে থাকতেন দিল্লীতে। দিল্লীতে এবং পরে কলকাতায় তাঁর সাথে কয়েকবার দেখা হয়েছে। দিল্লী থেকে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল কলকাতায়। তিনি আমার সাথে দেখা করার জন্য দুবার কলকাতায় আমার খালার বাড়ি ১৫ নম্বর আলীমুদ্দিন স্ট্রিটেও এসেছিলেন। এসব পরের কথা।
রাজনীতি বিষয়ে এবং বিশেষতঃ বাঙলাদেশ ও ভারতের পরিস্থিতির ওপর তাঁদের সাথে অনেক আলোচনা হলো। আমার সেখানে দুপুরে যাওয়ার কথা ছিল। থাকার কথা ছিল বিকেল পর্যন্ত। কাজেই কোনো তাড়াহুড়া ছিল না। ওয়ারা ওয়ারা রাও আমাকে বললেন, তাঁরা দিল্লীতে কিছুদিন পর একটা সম্মেলন করবেন। আমাকে সেখানে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন এবং বললেন পরে এ নিয়ে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। কথা প্রসঙ্গে আমি আমার ঢাকা যাওয়ার প্লেনে সিট পাওয়ার সমস্যার কথা বললে কাঞ্চন কুমার বললেন, তিনি চেষ্টা করে দেখবেন। এজন্য পরদিন তাঁর সাথে একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা হলো। বিকেলের দিকে সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে নিশাত আমাকে বাসায় পৌঁছে দিল।
কাঞ্চন কুমারের জানাশোনা ছিল। টিকিটের বুকিংয়ের জন্য তাঁর সাথে ভারতীয় এয়ারলাইন্সের অফিসে গেলাম। তাঁর চেষ্টাতেই কাজ হয়েছিল। আমার যাওয়ার দিন নিখিল সরও একই প্লেনে কলকাতা ফিরেছিলেন, তাঁর সাথে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য এক ভদ্রমহিলা। তাঁর সাথে মনসুর ভাইয়ের বাড়িতে আগে আমার একবার দেখা হয়েছিল।
দিল্লী ছাড়ার আগের দিন নিশাত কায়সার বললেন, বিকেলের দিকে তাঁর বাসায় নিয়ে যাবেন এবং রাত্রে আমরা একসাথে খাবো। তিনি এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। যে এলাকায় তাঁর বাসা সেটা মবু চাচার বাসা থেকে অনেক দূরে ছিল। জায়গার নামটা আমার পরিচিত, কিন্তু এখন মনে পড়ছে না। নিশাত একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন বিল্ডিংয়ের দোতালায়। সেখানে তাঁর দু তিন জন নোতুন বন্ধুর সাথেও দেখা হলো। আমরা অনেকক্ষণ গল্পসল্প করলাম। নিশাত একটু অস্বস্তি বোধ করেছিলেন আমি গৌরীকে বাসায় না দেখতে পাওয়ায়। এ কারণে তিনি আমাকে একসময় আস্তে করে বললেন যে, গৌরীর সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। সে কিছু দিন গিয়ে প্যারিসে ছিল এবং একটা কাজ করছিল। তাঁর দিল্লী ফেরার ব্যবস্থা অনিশ্চিত ছিল, এজন্য সে নিশাতকে বলেছিল চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্যারিসে তাঁর সাথে চলে যেতে। কিন্তু নিশাত তাতে সম্মত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিয়ে ভেঙে গেছে। পরে গৌরী প্যারিসে একজন ফরাসিকে বিয়ে করেছে। নিশাত আর বিয়েশাদী করেননি। এটা শুনে খারাপ লাগলো, কারণ নিশাত কায়সার খুব ভালো মানুষ ও ভালো স্কলার। এর আগে আমার ভাইপো নাজেশের সঙ্গে ঝিল্লীরও (মৌসুমী ভৌমিক) বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল। তাঁদের একটা ছেলে আছে। নিশাতের কোনো সন্তান নেই।
নিশাতের বাসায় চায়ের ব্যবস্থা ছাড়া রান্নাবান্নার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর ছিল হোটেল থেকে এনে খাবার ব্যবস্থা। ছুটির দিন ছাড়া দিনের বেলা তিনি জামিয়া মিলিয়াতেই খেতেন। বাসা থেকেই নিশাত হোটেলে ফোন করে কাবাব, তন্দুরি এবং অন্য এটা ওটা তাঁর বাসায় আনার ব্যবস্থা করলেন। খাবার খুব ভালোই ছিল। আমরা সন্ধ্যার পার  হওয়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ একসাথে কাটালাম। সে সময় নিশাতের থিসিসের কাজ শেষ হয়েছিল। তাঁর একটা কপি আমাকে দিয়েছিলেন। অনুরোধ করেছিলেন ঢাকা থেকে প্রকাশ করা যায় কিনা চেষ্টা করে দেখতে। পরে আমি ইউনিভার্সিটি প্রেসের মহিউদ্দীনের সাথে কথা বলেছিলাম। কিন্তু তিনি বললেন, সেটা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি নিজের প্রকাশনার বই অন্যভাবে নির্বাচন করে থাকেন এমন ব্যবসায়ী স্বার্থে যাতে এ ধরনের বই প্রকাশের সুযোগ নেই।
নিশাত আমাকে অটোরিক্সা করে মবু চাচার বাসায় পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিলেন। একটু রাত হয়েছিল। যাই হোক, তাঁর মাধ্যমেই আমি আমার ব্যাগেজ গুছিয়ে নেওয়ার কাজ করলাম। এর আগের দিন মবু চাচা ফিরেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পরদিন নাগপুর যাওয়ার প্রোগ্রাম হলো।
আমাদের কলকাতাঁর প্লেন ও মবু চাচার নাগপুরের প্লেন ছাড়ার সময় কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু আবহাওয়া খুব খারাপ ছিল। ঠান্ডা তো ছিলই কিন্তু তাঁর জন্য প্লেন সময়মত ছাড়ার অসুবিধা ছিল না। অসুবিধা হলো কুয়াশার জন্য। সেবার দিল্লীতে যে কুয়াশা পড়েছিল পরে দেখেছিলাম এমন কুয়াশা আগে কোথাও দেখিনি। বিমান বন্দরের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এমনকি যে লাউঞ্জে আমরা বসেছিলাম তাঁর পেছন দিকের সব দরজা খোলা থাকায় সেই পথ দিয়ে কুয়াশা ভেতরে হু হু করে ঢুকতে থাকায় ভেতর পর্যন্ত কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়েছিল। আমাদেরকে বলা হলো যে, ফ্লাইট দেরী হবে, অনিশ্চিত। অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে মবু চাচার প্লেন ছেড়ে গেল। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার পর বলা হলো যে, সেদিনের মতো আমাদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। আমাদেরকে বিমান বন্দরের কাছে হোটেলে রাত্রি বাসের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। আমরা সেখানে গেলাম। পরদিন দুপুরের পর আমাদেরকে বিমান বন্দরে নিয়ে এলো। মালপত্রের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম আমার দুটো ব্যাগের মধ্যে একটা নেই। শেষ পর্যন্ত সেটা আর পাওয়া গেল না। বিমান দাড়ালো বিকেলের দিকে। বিমানের সিটে বসে ঐ দিনের সংবাদপত্র দেখতে গিয়ে চোখে পড়লো এক খবর। ভারতের সিপিআই (এম এল) এর এক অংশের নেতা বিনোদ মিশ্রের হঠাৎ করে মৃত্যু হয়েছে আগের দিন। তাঁদের সংগঠনের প্রধান নেতা ছিল বিহারে। কলকাতা পৌঁছাতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেল। আমার কথা ছিল কলকাতায় দুতিন দিনের জন্য যাত্রা বিরতি দেওয়া। সেই অনুযায়ী আমি কলকাতায় থেকে তার পর ঢাকা ফিরলাম।

আরো খবর

Disconnect