ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

এখানে আমি কয়েকজন বড় মাপের মানুষের সাথে আমার পরিচয় ও সম্পর্কের কথা সংক্ষেপে বলবো। কলকাতায় কমরেড সুনীতি কুমার ঘোষ এর সাথে আমার পরিচয় করে দিয়েছিলেন এককালে নকশাল বাড়ী আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত সংস্কৃতি কর্মী ও নাট্যকার মনোরঞ্জন বিশ্বাস। কলকাতায় থাকার সময় একদিন তিনি বললেন, চলুন আপনাকে কমরেড সুনীতি কুমার ঘোষ এর বাড়ীতে নিয়ে যাই। আমি খুশী হয়ে সম্মত হলাম। তাঁর কথা আমি প্রথম শুনেছিলাম ১৯৭০ সালে আমাদের পার্টির সেক্রেটারী সুখেন্দু দস্তিদারের তাছে। সুনীতি ঘোষ ছিলেন কমরেড চারু মজুমদারের ঘনিষ্ট এবং পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতা। তিনি Liberation নামে পার্টির ইংরেজী মুখপত্রের সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।
কমরেড সুনীতি কুমার ঘোষ এর সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ ও সরাসরি পরিচয় না থাকলেও তিনি আমার কথা জানতেন, কারণ ১৯৭০-৭১ সালে আমি আমাদের পার্টির প্রকাশ্য মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক গণশক্তি’র সম্পাদক ছিলাম। মনোরঞ্জন বিশ্বাস সুনীতি ঘোষের সাথে যোগাযোগ করে তাঁর কাছে যাওয়ার তারিখ ও সময় ঠিক করলেন। সেই অনুযায়ী আমরা গেলাম তাঁর ১০ নং রাজা রামকৃষ্ণ রোডের বাড়ীতে। সেখানে একাধিক বিল্ডিং ছিল। তিনি থাকতেন গেট থেকে ঢুকে একেবারেই বাঁ হাতে একটা বিল্ডিং এর দোতলার ফ্ল্যাটে।
প্রথম সাক্ষাতের পরই তাঁর সাথে এমন সম্পর্ক দাঁড়ালো যাতে মনে হলো, তিনি আমার অনেক দিনের চেনা। আমি আমার ছেলেবেলায় বর্ধমানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের দেখেছিলাম, যাঁরা কয়েকজন পরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ও সারা ভারত কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে ও পরে বাঙলাদেশে রাজনীতি করতে এসে আমি ঐ মাপের কোন নেতা এখানে পাইনি। সুনীতি ঘোষের সাথে প্রথম পরিচয় ও আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়েই বুঝলাম আমি একজন বড় মাপের কমিউনিস্ট এর সান্নিধ্যে এসেছি। যে বার এই প্রথম পরিচয় হলো সে বারই আমি ঢাকা ফেরার আগে তাঁর সাথে আবার একবার দেখা করলাম। এরপর কলকাতা গেলে তাঁর বাসায় একাধিকবার যেতাম এবং অনেকক্ষণ ধরে থাকতাম।
প্রথম প্রথম তাঁর সাথে কথাবার্তার সময় তিনি গান্ধীর কথা খুব বেশী বলতেন। Indian Big Bourgeoisie এবং India and the Raj বই দুটি লেখার সময় তাঁকে গান্ধীর রচনাবলী পড়তে হয়েছিল। তিনি বলতেন এজন্য গান্ধীর ৯৬ খন্ড রচনাবলীর অর্ধেক তাঁকে ঘাটতে হয়েছে। প্রথম দিকে বেশ কয়েকবার তাঁর সাথে দেখা হওয়ার সময় ভারতের কিছু পুঁজিপতিদের প্রতিনিধি হিসাবে গান্ধীর কথা তিনি এতো বলতেন যা আমার ভালো লাগতো না। অন্য কারণে নয়, শুধু এই কারণে যে আমি চাইতাম তাঁর সাথে অন্য বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতে। কাজেই একদিন আমি তাঁর বাড়ীতে গিয়ে কোন কথাবার্তার আগেই বললাম, আপনার কাছ থেকে আমি গান্ধীর কোন কথা আর শুনবো না। গান্ধী বাদ দেন। এরপর তিনি আর কোন দিনই আমার সাথে গান্ধীর কথা বলেননি।
২০০০ সালে সৈয়দ মনসুর আহমদের সম্পাদনায় আমার পিতা আবুল হাশিমের ওপর একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ‘আবুল হাশিম : তাঁর জীবন ও সময়’ নামে (জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ)। যেহেতু বাঙলা ভাগের ওপর সুনীতি ঘোষের সঙ্গে অনেক কথা হতো, সে কারণে আমি তাঁকে অনুরোধ করি ওই স্মারক গ্রন্থটিতে একটি লেখা দেওয়ার জন্য। তিনি সম্মত হন এবং ‘বাঙলা কেন দ্বিখন্ডিত হলো এবং কাদের স্বার্থে’ এই নামে প্রায় ৮০ পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। স্মারক গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমি কলকাতায় তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় তিনি বললেন উপরোক্ত গ্রন্থটি লেখার সময় তিনি অনেক তথ্য পেয়েছেন, যার সামান্যই তাঁর ঐ রচনায় ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ের ওপর আরও বিস্তারিতভাবে গ্রন্থাকারে কিছু লিখবেন কি না তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন। আমি তখন তাঁকে বললাম যে, আপনি যখন কষ্ট করে এতো তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তখন কাজটা অবশ্যই করা দরকার। তাছাড়া বিষয়টা এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ। এরপর ‘বাংলা বিভাজনের রাজনীতি অর্থনীতি’ নামে তিনি একটি তথ্যসমৃদ্ধ বড় বই লেখেন ও প্রকাশ করেন। পরে বইটি ঢাকা থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা আমি করি। এ বিষয়ের ওপরই The Tragic Partition of Bengal নামে ইংরেজীতে তিনি অন্য একটি বই লেখেন।
কমরেড সুনীতি ঘোষের সাথে আলাপের সময় তাঁর কাছ থেকে পুরানো অনেক ঘটনার কথা শুনতাম। আমি তাঁকে একবার বললাম, আপনি অন্য কিছু না হলেও সংক্ষিপ্তভাবে আপনার কমরেডদের ওপর এবং নকশালবাড়ী আন্দোলনের সময়কার ওপর কিছু স্মৃতিচারণমূলক রচনা লিখুন। এ নিয়ে আমাদের ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকায় তাঁকে লিখতে বললাম। তিনি প্রথমে তিন কিস্তিতে লিখলেন দিনাজপুরের স্মৃতি। পরে ‘শেষ দেখা’ নামে সরোজ দত্ত, সুশীতল রায় চৌধুরী ও চারু মজুমদারের ওপর তিনটি লেখা ‘সংস্কৃতি’তে ছাপা হয়েছিল। তাঁর এ ধরনের আরও কয়েকটি লেখা ‘সংস্কৃতি’ এবং ভারতের কয়েকটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ‘ফিরে দেখা’ নামে এই লেখাগুলোর একটা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল, যেটি আমি ২০০৭ সালে ঢাকা থেকেও প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলাম।
তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’র (মার্কসবাদী) ওপর একটি বই লেখেন। তাদের বুর্জোয়া চরিত্র এবং মার্কসবাদ- লেনিনবাদ বিরোধী নানা নীতি ও কার্যকলাপের তথ্যপূর্ণ বিবরণ দিয়ে তিনি তাদের অকমিউনিস্ট চরিত্র এ বইটির মাধ্যমে উন্মোচন করেন। বইটি পাওয়ার পর আমি তাঁকে বলি যে, যেভাবে আপনি সিপিএম এর নীতি ও কার্যকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেছেন, ঠিক সেভাবেই আপনাদের নকশালবাড়ী আন্দোলনের ওপর একটি বই লিখুন। তাঁর সঙ্গে আমার এতোই নিকট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল যে, আমার কথা তিনি রাখতেন। একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, বোম্বাইর রজনী কোঠারী এবং আমিই হলাম তাঁর নিকটতম সুহৃদ। কাজেই এর পর তিনি লিখলেন, ‘নকশালবাড়ী একটি মূল্যায়ন’। এর একটি স্বতন্ত্র ইংরেজী ভাষ্যও তিনি লিখেছিলেন। যার নাম ছিল Naksalbari Before and After। আমাকে বলতেই হয় যে, বইটিতে তিনি যেভাবে নিজেদের আন্দোলন ও সংগঠনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা করেছেন, সেটা আমি আশা করিনি। এ বইটি চোখ খুলে দেওয়ার মত একটি কাজ।
 আমার মনে হয় ২০০৯-১০সালের দিকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাঁর মেয়ে ডাক্তার স্বাতী ঘোষ ও জামাতা মুক্তেশ ঘোষ তাঁকে কলকাতা থেকে আসানসোলে নিজেদের বাড়ীতে নিয়ে যান। কলকাতায় সুনীতি ঘোষ ও তাঁর স্ত্রীর পক্ষে থাকা আর সম্ভব ছিল না। তাঁদের দুজনেরই বয়স হয়েছিল। তাঁরা আসানসোল যাওয়ার পর বর্ধমান থেকে দুবার আমি আমার এক চাচাতো ভাই নোমানকে সঙ্গে করে সেখানে গিয়েছিলাম তাঁর সাথে দেখা করতে। তিনি খুব খুশী হয়েছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ এর ওপর এবং স্বাস্থ্য ভাল যাচ্ছিলো না। দুবারই তিনি বলেছিলেন, আমার তো আর করার কিছু নেই। যাওয়ার অপেক্ষায় আছি কিন্তু দরজা তো খুলছে না। অবশেষে দরজা খুললো ২০১৪ সালের ১১ ই মে তাঁর ৯৭ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন।
কমরেড সুনীতি ঘোষ ছিলেন একজন অতি প্রচার বিমুখ মানুষ। এ কারণে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী মহলে তাঁর একটা বড় পরিচিতি থাকলেও তার বাইরে তাঁর তেমন পরিচয় নেই। কিন্তু এ ধরনের একজন সৎ ও ধীশক্তি সম্পন্ন ও পণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যক্তির সংখ্যা, দক্ষিণ এশিয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলনে সামান্যই দেখা গেছে। কমরেড সুনীতি ঘোষের মৃত্যুর পর এ ধরনের আর কেউ এমন আছেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর মৃত্যুতে ব্যক্তিগতভাবে আমার অশেষ ক্ষতি হলো। তাঁর মত মানুষের সান্নিধ্য যে আর পাবো না এটা এক বেদনাদায়ক বিষয়।
১৯৯৫ কি ১৯৯৬ সালের দিকে একবার কলকাতা গেলে দিলীপ ব্যানার্জী আমাকে বললেন, হীরেন মুখার্জী একবার আমাকে তাঁর কাছে যেতে বলেছেন। তাঁর সাথেই গেলাম হীরেন মুখার্জীর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে। তিনি বসেছিলেন বসার ঘরের লম্বা সোফার এক কোণে। সোফার এই নির্জন কোণেই তাঁকে বরাবর বসে থাকতে দেখেছি। হীরেন মুখার্জীর পরিবারের সঙ্গে ছিল আমাদের তিন পুরুষের সম্পর্ক। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন আমার দাদো আবুল কাসেম সাহেব তাঁর বাবা শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে খুব স্নেহ করতেন।
বেশ কিছুক্ষণ তাঁর বাড়ীতে থাকলাম। অনেক গল্প করলেন তিনি। তাঁর স্মৃতি শক্তি ছিল অসাধারণ। কাব্য সাহিত্য পাঠ তাঁর খুব ভাল ছিল। বাংলা, ইংরেজী, উর্দু কবিতা যে কত আবৃত্তি করতেন তার ঠিক নেই। উর্দু অনুবাদের মাধ্যমে হাফিজের কবিতার সাথেও তাঁর পরিচয় ছিল। এছাড়া উর্দু কবিদের মধ্যে ছিলেন জওক, দাগ, গালিব, ইকবাল। রবীন্দ্রনাথের তিনি বড় ভক্ত ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর মনের তারুণ্যের পরিচয় পাওয়া যেতো যখন তিনি শেলী আবৃত্তি করতেন। তাঁর কাছেই আমি দেখেছিলাম কলকাতার বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাঙালীর গান’ নামে বাঙলা গানের এক বৃহদাকার বই, যাতে প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত নানা ধরনের হাজার খানেকের ওপর গান অন্তর্ভুক্ত আছে। পরে বইটি আমি কিনেছিলাম।
 হীরেন মুখার্জী ও আমি দুজনেই যেহেতু রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত লেখক, সেজন্য তাঁর সঙ্গে রাজনীতির কথাও অনেক হতো। বর্তমান দুনিয়ার বেহাল অবস্থা তাঁকে পীড়িত করতো। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি সম্পর্কেও তিনি আলোচনা করতেন। একবার আমাকে বললেন জানেন, জ্যোতি বসু লোকটা গত ৫০ বছরে একটা বইও পড়েনি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তিনি তাঁর (হীরেন মুখার্জী) ওপর বিশ্বের ভার অর্পন করেননি। তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন, কিন্তু অন্যদের মধ্যে এই বিরোধীতা সেভাবে না দেখে তিনি তাঁর মনের বেদনার কথা বলতেন। এখানে বলা দরকার যে, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্তির সময় তিনি মস্কো লাইনের সমর্থক ছিলেন। কাজেই তিনি সিপিআই এ তেই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্ট্যালিন বিরোধী এই তথাকথিত মস্কোপন্থী পার্টির একজন নেতা হওয়া সত্ত্বে স্ট্যালিনের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষের সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। এজন্য তিনি লিখেছিলেন, The Stalin Legacy : I vory Flawed but I vory Still নামে একটা বই, যাতে তিনি বলেছিলেন যে, স্ট্যালিনের সব ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও স্ট্যালিন ছিলেন একজন মহান কমিউনিস্ট। কমিউনিস্ট আন্দোলনে ও সোভিয়েট ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্ব অস্বীকারের উপায় নেই।
আমার সম্পাদিত মাসিক ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকায় ১৯৯৮ সালের নভেম্বর সংখ্যায় আমি অমর্ত্য সেনের দুর্ভিক্ষ তত্ত্বের (Famine theory) ওপর দীর্ঘ এক কড়া সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখেছিলাম। আমার সেই প্রবন্ধের সমর্থনে হীরেন মুখার্জী আমাকে এক দীর্ঘ চিঠি দিয়ে সেটি ‘সংস্কৃতি’তে প্রকাশের জন্য অনুরোধ করেছিলেন এবং আমি তা প্রকাশ করেছিলাম। ১৯৯৯ সালে আমি একবার কলকাতা গেলে ডক্টর অশোক মিত্র ফোনে আমাকে বললেন, আমি যেন অবশ্যই হীরেন মুখার্জীর সাথে দেখা করি। তিনি তাঁর একটি বইয়ে তাঁকে ও আমাকে জড়িয়ে তার মুখবন্ধ লিখেছেন। আমি তো এমনিতেই তাঁর সাথে দেখা করতাম। এর পর তাঁর কাছে গেলাম। তিনি আমাকে দিলেন তাঁর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ এর দ্বিতীয় খন্ড। প্রথম খন্ড আগেই দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় খণ্ডের মুখবন্ধে তিনি আমাদের সম্পর্কে যা লিখেছিলেন তা হলো নিম্নরূপ- “সংকলনের দুই খণ্ডে মাঝে মাঝে হয়তো একটু প্রখরভাবেই সমাজবাদ-সাম্যবাদী প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছে। সেজন্যই বুঝি মনে এলো আমার দুই অনুজ বন্ধুর কথা, যাদের যুক্ত চিন্তা অথচ মূলগতভাবে মার্কস তত্ত্বে প্রত্যয় সিদ্ধ দেশাভিমান ও আন্তর্জাতিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরা হলেন কেবল অর্থনীতি নয়, সাহিত্য ক্ষেত্রেও স্বচ্ছন্দবিহারী আর বাংলা-ইংরেজী উভয় ভাষায় অনবদ্য রচয়িতা অশোক মিত্র, আর বাংলাদেশে সুকঠিন পরিস্থিতির মধ্যে সৃজনশীল মার্কসবাদের অকুতভয় প্রবক্তা বন্ধু গুণান্বিত দেশব্রতী বদরুদ্দীন উমর। ‘উৎসর্গ’ শব্দটি এঁদের নামের সাথে জড়িয়ে দিতে চাই না। শুধু ভাবছি এঁদের কথা আর আশা করছি এই রচনা তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।” এই সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে।
হীরেন মুখার্জীর মৃত্যু হয়েছিল ২০০৪ সালের ৩০ শে জুলাই। আমি তাঁর সর্বশেষ চিঠি পেয়েছিলাম ১১ ই জুন তারিখে লেখা। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া আমার সংক্ষিপ্ততম চিঠি। সেটা ছিল এ রূপ- “কল্যাণীয়েষু, বদরুদ্দীন, তোমার ‘সংস্কৃতি’র বিশেষ সংখ্যা স্মৃতি সংখ্যা পেয়ে প্রচুর আনন্দ পেয়েছিলাম। এখন আর সহজে পড়তে পারি না। তবু বেঁচে রয়েছি।  তুমি এ দিকে এলে একবার দেখা করো। আমার এখন সময় হয়েছে নিকট। এবার বাঁধন ছিঁড়তে হবে। সবাই ভালো থেকো। শুভার্থী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।”
বাঁধন যে তিনি সত্যি সত্যি এতো তাড়তিাড়ি ছিঁড়বেন এটা ভাবিনি। তাঁকে লিখেছিলাম সে বছরের শেষ দিকে কলকাতা যাবো, তখন দেখা হবে। সে চিঠি মনে হয় তাঁর কাছে পৌঁছায়নি, দেরী হয়ে গিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশতঃ ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে মুম্বাই রেজিটেন্স, MR 2004, এ উদ্বোধনী বক্তৃতা দিতে মুম্বাই যাওয়া-আসার সময় তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকায় তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কথাটা মনে হলে বড় খারাপ লাগে।

আরো খবর

Disconnect