ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

১৯৯৯ সালের জুলাই মাসের দিকে হঠাৎ সোহেলের ছেলে জেহীনের চোখে এক সমস্যা দেখা দিল। ডান চোখ লাল হলো এবং চোখের কোণায় একটা জায়গা ফুলে উঠলো। মনে হলো, কোন ধরনের গ্রোথ হয়েছে। কোন ব্যথা ছিল না। কিন্তু চোখের ব্যাপার। কাজেই আমরা বেশ ভয় পেলাম। প্রথমে একজন চোখের ডাক্তার দেখানো হলো। তিনি বললেন একটা গ্রোথ হয়েছে। কিন্তু রোগ নির্ধারণ করতে পারলেন না। এর পর আমরা জেহীনকে নিলাম ডাক্তার মনিরুল হক এর কাছে। তিনি খুব ভালো ক্যাটারাক্টের অপারেশন করতেন। তিনিও দেখে শুনে বললেন যে, একটা গ্রোথ হয়েছে। হয়তো অপারেশনের দরকার হতে পারে। কিন্তু তিনিও সঠিকভাবে কিছু নির্ধারণ করতে পারলেন না। তিনি বললেন, তিনি নিজে কোন অপারেশন বা অন্য চিকিৎসা করতে পারবেন না। আমাদেরকে পরামর্শ দিলেন মাদ্রাজে শংকর নেত্রালয়ে যাওয়ার। তিনি নিজে শংকর নেত্রালয় এ বিষয়ে একটা চিঠি লিখে দিলেন। আমি তার কোন প্রয়োজন বোধ করি নি, কিন্তু তিনি নিজে থেকেই চিঠিটা দেওয়ায় আমি সেটা রাখলাম।
জেহীনের চোখের অবস্থা দেখে প্রথম থেকেই আমি চিন্তা করছিলাম শংকর নেত্রালয়ে যাওয়ার। আমি নিজের চোখের চিকিৎসার জন্য আগে ১৯৯০ ও ১৯৯৬ সালে তিন বার সেখানে গিয়েছিলাম। আমরা শংকর নেত্রালয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি শুরু করে তাদের সাথে যোগাযোগ করলাম। আগস্ট মাসের দিকে যাওয়া স্থির হলো। আমরা ঢাকা থেকে বাসে কলকাতা গেলাম সেদিনই যেদিন সরকারী পর্যায়ে ঢাকা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু হলো। সল্ট লেকে গিয়ে বাস থেকে নেমে আমরা গেলাম সেখানে শিরীনের বাড়ী। মাদ্রাজের টিকেট ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে দুতিন দিন সময় গেল। তার পর আমরা ট্রেনে মাদ্রাজ রওয়ানা হলাম- সোহেল, দীনা, সোহেলের মেয়ে ইনশা ও ছেলে জেহীন। দীর্ঘ ট্রেনে যাওয়াতে আমাদের কোন অসুবিধা হয় নি। ট্রেনেই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ভালই ছিল। আমরা সময় মতই মাদ্রাজ পৌঁছালাম এবং একটা হোটেলে উঠলাম। হোটেলের ভাড়া কম না হলেও সেখানে ব্যবস্থা ভাল না থাকায় দুই এক দিন পর আমরা অন্য একটা হোটেলের খবর পেয়ে সেখানে উঠে গেলাম হোটেলটির মালিক ছিলেন এক মাদ্রাজী মুসলমান। হোটেলটিতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ভালই ছিল।
মাদ্রাজে ট্যাক্সি কম। অটো রিক্সা বা স্কুটারেই যাতায়াত করতে হতো। মাদ্রাজে যাওয়ার পরদিনই আমরা সকালের দিকে শংকর নেত্রালয়ে গেলাম। আমি প্রথম ১৯৯০ সালে যখন শংকর নেত্রালয়ে যাই তখন সেখানকার বিল্ডিং ছোটই ছিল, রুগীর ভীড় থাকলেও বেশী ছিল না। ১৯৯৬ সালে নোতুন বিল্ডিং কিছু হয়েছিল এবং রুগীদের ভীড় বেড়েছিল। কিন্তু এবার দেখলাম আরও বড় বড় বিল্ডিং তৈরী হয়েছে এবং ভীড় খুব বেশী, যদিও সব কিছু খুব সুশৃঙ্খল।
এক মহিলা ডাক্তার জেহীনের চোখের প্রাথমিক পরীক্ষা করলেন। আমরা সকলেই তাঁর কামরায় গেলাম। প্রথমে তাঁকে ডাক্তার মনিরুল হক এর চিঠি দিলাম, তিনি সেটিতে একবার চোখ বুলিয়ে পাশে ময়লা কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিলেন। অল্পক্ষণ চোখ পরীক্ষা করেই তিনি বললেন গুরুতর কিছু নয়। চোখের কোনে লিলি ফুলের একটা রেনু আটকে আছে। তার জন্যই চোখ লাল হয়েছে এবং বাইরের দিকে একটা গ্রোথ হয়েছে। তার সাথে চোখের কোন সম্পর্ক নেই। বললেন রেনুটা বের করে দিয়ে একটা ছোট Invision করতে হবে। অর্থাৎ গ্রোথ যেটা হয়েছে সেটা কেটে ফেলে দিতে হবে।
এর পর ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন লিলি ফুল আছে নাকি আপনাদের বাসায়? সোহেল বললেন, না। কিন্তু তখন তাঁর মনে পড়লো কুমিল্লায় তাঁরা বেড়াতে গিয়ে যে রেস্ট হাউজে ছিলেন সেখানকার বাগানে অনেক লিলি ফুল ছিল এবং ইনশা ও জেহীন দুজনেই সেখানে অনেক ছোটাছুটি করেছিল। ঢাকার ডাক্তাররা কিছুই ধরতে পারলো না অথচ সেখানকার ডাক্তার অল্পক্ষণ দেখেই রোগের কারণ নির্ণয় করলেন, চমৎকৃত হওয়ার মত ব্যাপার। যাই হোক, ডাক্তার বললেন Invision করা হবে। সেই মত ব্যবস্থা হলো। Invision হবে কয়েকদিন পর। তার জন্য কিছু প্রস্তুতি দরকার।
যেহেতু হাতে কিছু সময় পাওয়া গেল, আমরা ঠিক করলাম মাদ্রাজ শহরের কিছু জায়গা ঘুরে দেখার। ১৯৯০ সালে যখন প্রথম মাদ্রাজ গিয়েছিলাম তখন দেখেছিলাম সেখানকার বিখ্যাত সমুদ্রতীর, Golden Beach। হোটেলের সাথেই ছিল ট্যাক্সি ভাড়ার ব্যবস্থা Rent a Car। একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমরা গেলাম সেখানে। কিন্তু এবার Golden Beach এর অবস্থা দেখে আমার ভাল লাগলো না। আগে সমুদ্রতীরের যে পুরো জায়গাটা খোলামেলা ছিল সেটা একটা পার্টিশন দিয়ে দু’ভাগ করা হয়েছে। তাছাড়া তখন সেখানে যে একটা সুন্দর কাঠের তৈরী রেস্তোরা দেখেছিলাম সেটাও আর দেখলাম না। তবু আমরা ভেতরে ঢুকে সমুদ্রের তীর পর্যন্ত গেলাম। এমনিতে ভালই লাগলো। তখন চারিদিকে অনেক ধরনের দোকান পাট। কিন্তু আমাদের তো কেনাকাটার কোন ব্যাপার ছিল না।
অন্য একদিন সারা দিনের জন্য চুক্তিতে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে আমরা কয়েক জায়গায় গেলাম। যতদুর মনে পড়ছে তার মধ্যে ছিল মাদ্রাজে একটা বড় খোলা পার্ক। চিড়িয়াখানা না হলেও সেখানে মাঝে মাঝে বেশ কিছু জীবজন্তু এক একটা খোয়ার ও খাচার মধ্যে ছিল। এসব দেখার সাথে সাথে সেখানে বেড়াতে বেশ ভাল লেগেছিল। বাইরে এসে সেখানকার রেস্তোরায় আমরা গেলাম। হোটেলের নিয়মিত খাওয়া ছাড়া এমনিতেই আমরা মাঝে মাঝে বাইরে যেতাম।
এছাড়া একটা স্টুডিওতেও গিয়েছিলাম। যে স্টুডিওটা আমরা দেখতে গেলাম সেটা মাদ্রাজের বিখ্যাত এক স্টুডিও, নাম মনে নেই। তবে এলাকাটা অনেক বড়। শুটিংএর জন্য প্রয়োজনীয় অনেক ব্যবস্থা সেখানে ছিল। কিন্তু আমরা যাওয়ার সময় সেখানে কোন শুটিং হচ্ছিলো না। সিনেমার কোন লোকজন আমরা দেখি নি। তবে কিছু লোক মনে হয় আমাদেরই মত দর্শক, সেখানে ঘোরাফেরা করছিল।
একদিন বিকেলের দিকে আমরা গেলাম মেরিন বীচ নামে মাদ্রাজের অন্য এক সমুদ্রতীরে। সেখানে কোন জাঁকজমক ছিল না। কিন্তু লোকের ভীড় ছিল বেশ। অনেক লোক সেখানে বসেছিল, ঘোরাফেরা করছিল। এবার গোল্ডেন বীচ তেমন ভাল না লাগলেও মেরিন বীচ ভালই লাগলো। আগে যে কবার মাদ্রাজ গিয়েছিলাম তখন এ বীচটায় আসি নি।
জেহীনের প্রাথমিক চোখ পরীক্ষার পর তার চোখ Invision এর তারিখ দিয়েছিলেন সাত দিন পর। সেদিন সকালের দিকেই আমরা গেলাম শংকর নেত্রালয়ে। এবার প্রথম দিনই দেখেছিলাম মূল বিল্ডিং এর বাইরে বড় জায়গা জুড়ে একটা শামিয়ানা টাঙানো এবং সেখানে বসার ব্যবস্থা। অপেক্ষমান রুগী ও তাদের সঙ্গের লোকজনদের জন্য সেখানে চেয়ার সাজানো। জেহীনের সাথে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি ছিল শুধু সোহেল ও দীনার। আমি ও ইনশা বাইরে থাকলাম শামিয়ানার নীচে। সোহেলরা ভেতরে ঢোকার পর কয়েক ঘন্টা আমরা বাইরে থাকলাম। ইনশার বয়স তখন ছিল প্রায় পাঁচ বছর। কিন্তু সে খুব ধৈর্য্যরে সাথেই বসেছিল। মাঝে মাঝে চকলেট, চীনা বাদাম, সেভেন আপ ধরনের কিছু খাওয়া হচ্ছিলো। এক আধবার চেয়ার থেকে উঠে সামান্য এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটিও করছিলাম। দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল এবং অবশেষে সোহেল ও দীনা জেহীনকে নিয়ে বাইরে এলেন। জেহীনের যে চোখে Invision হয়েছিল সেটা বাঁধা। শুনলাম লোকাল অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে অপারেশন করেছিল এবং জেহীন বেশ শান্তই ছিল। কোন রকম চীৎকার বা অসুবিধা করে নি।
অপারেশনের পরেও আমাদেরকে কয়েকদিন থাকতে হলো জেহীনের চোখের ব্যান্ডেজ খুলে আবার পরীক্ষা হওয়া পর্যন্ত। সেজন্য পরে আমরা আবার গেলাম শংকর নেত্রালয়ে। ডাক্তার বললেন চোখের অবস্থা ভাল। কোন অসুবিধা নেই। সামান্য কিছু ওষুধ দিয়ে বললেন আমরা ফিরতে পারি। মাদ্রাজে আমরা মনে হয় সবসুদ্ধ দুই সপ্তাহের মত ছিলাম। তার পর আমরা ট্রেনে কলকতা ফিরলাম এবং সল্ট লেকে শিরীনের বাড়ীতে উঠলাম। তার দুই এক দিন পরই ঢাকা রওয়ানা হলাম সরকারী বাসে সল্ট লেক থেকেই। সেবার কলকাতার বাইরে বর্ধমান বা অন্য কোথাও যাওয়া হয় নি। সেটা সম্ভবও ছিল না।

আরো খবর

Disconnect