ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

আগেই বলেছি ১৯৯০ সালের পর থেকে আমাদের সংগঠনে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামে অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে সংকট দেখা দিয়েছিল। সেই সংকট কারও কারও মধ্যে চক্রান্তের প্রবণতা সৃষ্টি করেছিল। এই  চক্রান্তকারীরা পার্টি ও পার্টির সাথে সম্পর্কিত সংগঠন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও সততার সাথে যে কাজ করার মত অবস্থা তাদের ছিল না। দল পরিবর্তন করার সময় সংগঠনকে বিশেষতঃ আমাকে দোষারোপ করে নিজেরা সাধু সেজে পার্টি থেকে বের হওয়ার চিন্তাই তারা করেছিল।
১৯৯৮ সালে পার্টি বিরোধী চক্রান্ত দানা বাঁধার মত অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল। পরে দুবছরের মধ্যে সেটা পরিস্কার হয়ে উঠে। ১৯৮০-৮১ সালে সংগঠনের মধ্যে যে চক্রান্ত হয়েছিল তার মূল কলকাঠি নাড়া হয়েছিল লেখক শিবিরের মধ্য থেকে। এবার যে চক্রান্ত হলো সেটার কেন্দ্র হলো ছাত্র ফেডারেশন। আগের চক্রান্তের কৌশল তৈরী করেছিল শাহরিয়ার কবীর। এবার  সে কৌশল তৈরী করলো জোনায়েদ সাকী। তবে এই দুই চক্রান্তের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য ছিল। শাহরিয়ার চক্রান্ত করে পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটা ভাঙ্গন ধরিয়ে তার কাজ শেষ। তারপর সে রাজনীতি থেকে সরে পড়ে। কিন্তু সাকীর উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন সে আমাদের সংগঠনের মধ্য থেকে চক্রান্তের মাধ্যমে নিজের নেতৃত্বাধীন একটা স্বতন্ত্র দল গঠনের জন্যই সক্রিয় ছিল। এদিক দিয়ে সাকীর ভূমিকা ও তার চক্রান্তের চরিত্র ছিল বেশী বিপদজনক।
জোনায়েদ সাকীর অনেক গুণ। তার মধ্যে থেকে উল্লেখযোগ্য হলো তার সাংগঠনিক দক্ষতা। সে খুব বুদ্ধিমান। কিছু পড়াশোনার অভ্যাস ও তাত্ত্বিক আলোচনার ক্ষমতা তার আছে। মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষমতা তার যথেষ্ট। তার মধ্যে ঔদ্ধত্য আছে, কিন্তু সে তার ঔদ্ধত্য বোকার মত প্রকাশ করে না। এ বিষয়ে তার কান্ডজ্ঞান প্রশংসনীয়। সে সহজেই অন্যের সরলতা, দূর্বলতার হিসাব করতে সক্ষম এবং বুদ্ধির সাথে এই হিসাব কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তার দক্ষতা আছে। সততাকে তার চরিত্রের অলঙ্কার বলা যাবে না। তবে নিজেকে সৎ হিসেবে উপস্থিত করা এবং অন্যকে তা বিশ্বাস করানোর ব্যাপারে তার যোগ্যতা ছোট করে দেখার উপায় নেই।
এতখানি গুরুত্ব দিয়ে এখানে সাকীর বিষয়ে বলার কারণ, ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালে আমাদের সংগঠনে যে চক্রান্ত হয়েছিল তার শরহমঢ়রহ ছিল জোনায়েদ সাকী। শাহরিয়ার কবীরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সে-ই অন্য চক্রান্তকারীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। শাহরিয়ার কবীর ছাড়া যেমন ১৯৮০-৮১ সালের চক্রান্ত দানা বাঁধতে পারতো না, তেমনি ১৯৯৮-২০০০ সালের চক্রান্ত দানা বাঁধতে পারতো না জোনায়েদ সাকী ছাড়া।
এদিক দিয়ে শাহরিয়ারের চক্রান্তের মিল থাকলেও অন্য দিক দিয়ে ১৯৬৮-৬৯ সালের তৎকালীন পার্টির মধ্যে কাজী জাফরের চক্রান্তের একটা বড় মিল ছিল। নিজের কোন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্দেশ্যে শাহরিয়ার চক্রান্ত করে নি। তার লক্ষ্য ছিল শুধু আমাদের পার্টির মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। কিন্তু মেনন ও রনোকে সাথে নিয়ে কাজী জাফর যে চক্রান্তের হোতা ছিল তার লক্ষ্য ছিল, পার্টি, ট্রেড ইউনিয়নে নিজেদের অবস্থানকে ভিত্তি করে নিজস্ব একটা দল গঠন করা। ছাত্র জীবনে তারা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। পরে পার্টি তাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছিল টঙ্গী শ্রমিক এলাকায় কাজের। সেখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)র ভাল সংগঠন ছিল। শফিকুর রহমান সেখানে কাজ করতেন। তাঁর জেল হওয়ায় জাফরদেরকে সেখানে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জাফরের লক্ষ্য ছিল পার্টি থেকে বের হয়ে নিজের নেতৃত্বাধীন দল গঠন করা। জাফর সে ক্ষেত্রে কৃতকার্য হয়েছিল। টঙ্গী শ্রমিক এলাকায় কাজ করা নিয়ে জাফর পার্টির ট্রেড ইউনিয়ন ও পার্টি সংগঠনের পরিবর্তে শ্রমিকদের মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এই প্রক্রিয়া কাজে লাগিয়ে তারা পার্টির সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র দল খাড়া করে। জোনায়েদ সাকীও ছাত্র ফেডারেশনে কাজের মধ্য দিয়ে, বিশেষতঃ ১৯৯৮ সালে ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হওয়ার পর থেকে, বেশ দ্রুত ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃস্থানীয় কিছু কর্মী ও তার বাইরে কয়েকজনকে নিয়ে তার নেতৃত্বাধীন একটা চক্র গঠন করেছিল। কাজী জাফর এবং সাকীর নেতৃত্বাধীন দুই চক্রের চারিত্রিক বৈশিষ্টের মিল খুব লক্ষণীয়।
সাকী ছাত্র ফেডারেশনের একটা বড় অংশের মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ও কয়েকজন বেশ ভাল ছাত্রকে নিজের গ্রুপে ভেড়াতে সক্ষম হলেও সাধারণভাবে কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে নিজের চক্রান্তের মধ্যে নিতে পারে নি, একমাত্র আনু মুহাম্মদ ছাড়া। আনু চক্রান্তের নেতৃত্ব দেন নি, কিন্তু সাকীর চক্রান্তের সাথে গলায় গলায় জড়িত হয়ে পার্টির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কারণে তার একটা খারাপ প্রভাব সংগঠনের কিছু লোকের মধ্যে পড়েছিল। অবশ্য ফিরোজ আহসান, শাহ আতিউল ইসলাম, আর্কিটেক মাহবুবুর রহমানের মত কয়েকজন সাকীর সাথে যোগ দিলেও তাদের কোন সাংগঠনিক অবস্থান ও গুরুত্ব সংগঠনে ছিল না। এদিক দিয়ে ১৯৮০-৮১ সালের চক্রান্তের সাথে তার চক্রান্তের পার্থক্য ছিল। সে সময় সংগঠনের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি শাহারিয়ারের চক্রান্তের শরীক হয়েছিলেন এসব কথা আগে বলা হয়েছে।
একদিন ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে এক সময় অফিসে কয়েকজন বসে কিছু আলাপের সময় সাকী আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ফিরোজ আহসান লেখক হয় নি কেন? মনে হয়, সে সময় আনু মুহাম্মদও উপস্থিত ছিলেন। সাকীর প্রশ্ন শুনে আমি অবাক হলাম, যা স্বাভাবিক। আমি তাকে বললাম, ফিরোজ কেন লেখক হয় নি সেটা তাকে জিজ্ঞেস করো। সকলকে সব কিছু হতে হবে তার তো মানে নেই। সে তো ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকার লোক ছিল। ছাপার মত কোন কিছু লিখলে তো তা অবশ্যই ছাপা হতো। কিন্তু কোন দিন তো সে রকম কিছু লিখতে দেখিনি। আমার কথার জবাবে সাকীর কথা হলো, আমাদের পত্রিকার মধ্যে গণ্ডগোল আছে, সাকীর এই কথা যতই নির্বোধ এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ হোক, এর থেকেই আমি প্রথম বুঝলাম যে, ফিরোজ বেশ ভালভাবেই সাকীর চক্রান্তের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিছুদিন থেকে ফিরোজের ব্যবহারের মধ্যে পরিবর্তন আমি লক্ষ্য করেছিলাম। সাকী যে চক্রান্ত করছিল এটা আমার ১৯৯৯ সালের প্রথম থেকেই ধরে দেখেছিলাম। চট্টগ্রামে তার এই চক্রান্ত যে অনেক দূর এগিয়েছিল তার ওপর আমাদের কাছে রিপোর্ট ছিল। অন্যান্য কিছু জায়গার রিপোর্টও ছিল। তাছাড়া ঢাকায় তার গতিবিধির খোজখবর তো আমরা রাখতাম।
সাকী ছাত্র ফেড়ারেশনে যোগ দেওয়ার পর সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, মহানগর কমিটি ইত্যাদিতে ছিল। এক সময় আমার সাথে তার যোগাযোগ হয়। তার কাজ কর্ম দেখে ও তার সাথে কথাবার্তা বলে আমি ভেবেছিলাম সে একজন যোগ্য রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করবে। এ ধরনের কর্মীর প্রতি বরাবরই আমার খুব দূর্বলতা ছিল। এজন্য সাকীকে আমি অনেক সময় দিয়েছিলাম। মনে হয় বেশ কয়েক শত ঘন্টা। তার সাথে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ইত্যাদি অনেক আলোচনাই হতো। কিন্তু যে মতলব নিয়ে সে আমার সাথে দেখা, সাক্ষাৎ এবং আলাপ আলোচনা করতো সে বিষয়ে তাকে আমি কোন দিন সন্দেহ করে নি। কারণ সে খুব সতর্কতার সাথে নিজের উদ্দেশ্য আড়ালে বা গোপন রেখেই থাকতো। তাকে আমি তার যোগ্যতার জন্য খুব স্নেহ করতাম এবং আমার এই স্নেহপরায়নতাই আমাকে বোকা বানিয়েছিল। কাজেই সাকীর চক্রান্ত একেবারে নাখের ডগায় না আসা পর্যন্ত আমি কিছু টের পাই নি।
১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর সংখ্যা ‘সংস্কৃতি’তে আমি ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। গরীব ও ধনিকশ্রেণীর, গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে শিক্ষার মধ্যে বৈষম্য বিষয়ে আলোচনা ছিল। এক্ষেত্রে বাঙলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার শ্রেণী  চরিত্রের কথাই বলা হয়েছিল। প্রবন্ধটিতে বামপন্থী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সমালোচনাও করা হয় এই মর্মে যে, তারা অনেক সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করলেও এই বৈষম্য  বিরোধী আন্দোলন করতে তাদেরকে দেখা যায় না। এর জবাবে আমার প্রবন্ধটি বক্তব্যের সমালোচনা করে বাসদ সমর্থিত ছাত্র সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট তাদের ‘অভিমত’ নামক পত্রিকায় বলেছিল, বদরদ্দীন উমর আমাদের বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের যে সমালোচনা করেছেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট অন্তর্ভুক্ত ছাত্র সংগঠন বাঙলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন একই কাজ করছে। আমার প্রবন্ধের বক্তব্য যেমন সঠিক ছিল তেমন ছাত্র ফেডারেশনের যে সমালোচনা তারা করেছিল তার মধ্যেও সঠিকতা ছিল। আমি আমার লেখায় অবশ্য ছাত্র ফেডারেশনের নাম করে তাদেরকে ছাড় দিয়ে কথা বলি নি। যাই হোক, এ সময়ে শুনলাম, সাকী আমার উপরোক্ত প্রবন্ধটির বিরোধিতা করে ছাত্রদের মধ্যে ও তার বাইরেও বক্তব্য দিচ্ছে! একথা জেনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। শ্রেণী বৈষম্যের কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে বাঙলাদেশে যে বৈষম্য আছে তার ওপর আমি যা লিখেছিলাম আমাদের সংগঠনের কেউ তার জোর বিরোধিতা করতে পারে এটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। বিশেষ করে সাকী যেভাবে অনেকের কাছে তার পরিচয় দিয়ে এসেছিল তাতে সে যে এ কাজ করতে পারে, এ চিন্তা আমি করতেই পারতাম না। তবে সাকীর এই বিরোধিতা থেকেই আমরা বুঝলাম যে, শুধু ছাত্র ফেডারেশনই নয়, সমগ্র সংগঠনের মধ্যেই চক্রান্ত করছে।
বাসদ এর  ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফ্রন্টের পত্রিকা ‘অভিমত’ এ প্রকাশিত প্রবন্ধের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশন কমিটি একটা আলোচনা সভা করে। পরে তারা সংগঠনের সভাপতি সাকীর কথাকে দাবী করে ‘অভিমত’ এ প্রকাশিত প্রবন্ধের জবাব দিয়ে ছাত্র ফেডারেশনের পত্রিকা ‘ছাত্র আন্দোলন’ এ লেখা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সাকী তা হতে দেয় নি। কারণ সে তো তার প্রবল বিরোধী ছিল এবং নিজেই প্রবন্ধটির বিরুদ্ধে সংগঠনের মধ্যে চক্রান্ত থেকে প্রচারটি করেছিল। এর মধ্যে দিয়েই সাকী তার প্রকৃত শ্রেণী চরিত্র উম্মোচিত করেছিল। এর থেকেই বোঝা গিয়েছিল, সে আমাদের মত একটি সংগঠনে ঘাপটি মেরে থাকা লোক বলতে যা বোঝায় তাই।
২০০০ সালের মাঝামাঝি থেকে ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আভ্যন্তরীন বিরোধ বাড়তে থাকে। ঐ বছরেই নভেম্বর মাসে ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর সাকীর উপস্থিতিতে চক্রান্ত প্রকাশ্যে হয়। সে পরবর্তী সভাপতি ও কমিটির ওপর নিজের প্রাধান্য রাখার চেষ্টায় নিজের সংগঠিত চক্রকে ব্যবহার করতে থাকে। এ সময় ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিল উজ্জ্বল বালো। ঠিকমত চিন্তা করার ও তা নিয়ে আলোচনার ক্ষমতা তার ছিল, কিন্তু সাকীর মত সে জোর দিয়ে কাজ করতে পারতো না। এ সময় সাকীর চক্রান্ত শুধু ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটি নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগর কমিটি, খুলনা মহানগর কমিটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি ইত্যাদিতে দানা বেঁধেছিল। সাকীর প্রতি আমাদের, বিশেষ করে আমার, নিশ্চিন্তে আস্থার কারণেই যে তার পক্ষে এইভাবে সমাপ্তির সাথে চক্রান্ত কার্যকর করা সম্ভবপর হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।
আমাদের সংগঠনে ১৯৯৯-২০০০ সালে যে চক্রান্ত হয়েছিল সে বিষয়ে অনেক কিছু তথ্য থাকলেও বিস্তারিত তার ওপর লেখার কোন প্রয়োজন এখানে নেই। সে কাজ পরে অন্যেরা করতে পারে। কিন্তু তবু এ বিষয়ে কিছু কথা অবশ্যই বলা দরকার। ছাত্র ফেডারেশনের  কেন্দ্রীয় কমিটিতে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল। সে সম্মেলনে সাকী প্রায় প্রকাশ্যভাবে নিজেদের অনুগত সভাপতি ও কমিটি করার চক্রান্ত কার্যকর করার সব অবস্থা তৈরী করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির ওপর তার নির্দেশে কাজ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। সেই পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি কারও সাথে পরামর্শ না করে হঠাৎ পদত্যাগ করে। এ সিদ্ধান্ত খুব ভুল ছিল। এর ফলে সংকট ঘনীভূত হয়। ছাত্র ফেডারেশন যে প্রকৃত পক্ষে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে এটা পরিস্কার হয়।
সেই অবস্থায় ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল বালো ১লা নভেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির এক বৈঠক আহবান করে। উজ্জ্বল বালোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে সাকীসহ তার প্রধান কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গকে  ছাত্র ফেডারেশন থেকে বহিস্কার করা হয় এবং সম্মেলনের নোতুন তারিখ এগিয়ে নিয়ে এসে নির্ধারিত হয় ১০ই নভেম্বর। পরদিন সংবাদপত্রে এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সাকীরা ২রা নভেম্বর পুরানা পল্টনের জোট অফিসে পৃথক বৈঠক করে। অফিসের তালা খুলে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সেখানে শাহ আতিউল ইসলাম টাফ এর কয়েকজন লোক নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। এর থেকে বোঝা যায় তিনি সাকীর চক্রান্তের সাথে কতখানি ঘনিষ্টভাবে যুক্ত ছিলেন। এ ধরনের কাজ ছাড়া সংগঠনে তাঁর অন্য কোন কাজই ছিল না।
১০ই নভেম্বর ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে নোতুন কমিটি গঠিত হয়। সাকীরা সম্মেলন করে ২২-২৩ শে নভেম্বর এবং তাতে আমাদের সংগঠনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে গঠিত হয় সাকীর পরিচালিত ছাত্র ফেডারেশনের নোতুন কমিটির। সেই সম্মেলনে অতিথি হিসেবে তারা আনু মুহাম্মদ এবং আতিউল ইসলামকে আমন্ত্রণ জানায়। পার্টির সাথে সেই সম্মেলনের কোন সম্পর্ক না থাকায় ও তারা পার্টি বিরোধী হওয়ায় পার্টি সেই সম্মেলনে না যাওয়ার জন আনু মুহাম্মদকে নির্দেশ দেয়। সে সময় আনু কোলকাতায় গিয়েছিলেন। তিনি ফেরার পর ১৬ই নভেম্বর ফয়জুল হাকিম লালা আনুর বাড়ীতে সন্ধ্যার সময় যান তাঁকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানোর উদ্দেশ্যে। লালার রিপোর্ট করেন যে, আনু বাড়ীতে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁকে তাঁদের বসার ঘরে দুই ঘন্টা বসিয়ে রাখেন। এর পর তিনি বসার ঘরে আসার সময় লালা দেখেন সাকীরা ভেতরের ঘর থেকে বের হয়ে পেছন দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আনু মুহাম্মদ লালাকে বাইরে বসিয়ে রেকে দীর্ঘক্ষণ সাকীদের সাথে কথা বলছিলেন। আনুর এই আচরণ লালার ছিল খুব অসম্মানজনক। কিন্তু তা সত্ত্বেও পার্টি তাঁকে যে দায়িত্ব দিয়েছিল তা পালনের উদ্দেশ্যেই তিনি এই অপমান সহ্য করেন। যাই হোক, সাকীদের সম্মেলনে তাঁকে না যাওয়ার জন্য পার্টির নির্দেশের কথা তাঁকে জানানো হয়। এর জবাবে আনু মুহাম্মদ ফয়জুল হাকিম লালাকে বলেন ‘তোমরা বসে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ ঠিক কিন্তু আমাকে সাকীদের সম্মেলনে যেতে হবে। আমার এতে দায় আছে।’ আনুর এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে খুব বিস্ময়কর এবং আনুর অবস্থান বোঝার পক্ষে সহায়ক। আনু বললেন ‘তোমরা বসে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ! তাহলে ইতিমধ্যেই তিনি তখন পর্যন্ত সে সংগঠনের একজন কেন্দ্রীয় নেতা সে সংগঠনকে তিনি আমরার জায়গায় ‘তোমরা’ বানিয়ে বসে আছেন। অর্থাৎ কার্যত তিনি আর সে সংগঠনে নেই, যদিও তিনি যেখান থেকে পদত্যাগ করেন নি। তাছাড়া সাকীদের পক্ষে তিনি নিজের দায়বদ্ধতার কথা বলেছেন। কিসের দায়বদ্ধতা? যারা পার্টির প্রকাশ্য বিরোধিতা করে একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র গঠন করে বের হয়ে গেছে পার্টির একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার অর্থ কি? এর অর্থ বেশী দিন আমাদের কাছে দূর্বোধ্য থাকে নি। আবরার চৌধুরী এবং অন্য কারও কারও মত আনুর কোন সততা ছিল না। কারণ আবরার এবং অন্যরা সংগঠনে কাজ করতে ব্যক্তিগত কারণে নিজেদের অপারগতার কথা জানিয়ে সম্মানজনকভাবে সংগঠন থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সংগঠনের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এভাবে বিদায় নেওয়ার মধ্যে আন্তরিকতা বা সততার অভাব ছিল না। কিন্তু আনুর সে রকম কোন সৎ সাহস ছিল না। তিনি সংগঠন থেকে বের হতে চেয়েছিলেন এবং বেশ  কয়েক বছর ধরেই এই চিন্তা নিয়ে কাজ করছিলেন। কিন্তু নিজের অক্ষমতা জানিয়ে বের হওয়ার মত সততার অভাবে তিনি চেয়েছিলেন নিজেকে সৎ ও পবিত্র দেখিয়ে আমাদেরকে দোষারোপ করে পার্টি শৃংঙ্খলার বাইরে বের হয়ে নিজের রাস্তা দেখতে। সাকীদের চক্রান্ত এ কারণেই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল এবং তিনি তাদের সাথে যোগ দিয়ে নিজের মত করে বের হওয়ার পথ খুঁজে বেরিয়েছিলেন। এটাই তাঁকে সাকীদের প্রতি দায়বদ্ধ হতে বাধ্য করেছিল। এ কারণেই তিনি ২২ তারিখে সাকীদের সম্মেলনে গিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী ভাষণ প্রদান করেছিলেন। অন্যভাবেও সহযোগিতা করেছিলেন।
সাকীদের সম্মেলনের আগে ১০ই নভেম্বরের ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিনিধি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম আমি, কথা সাহিত্যিক শওকত আলী, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি সজীব রায়, ডাক্তার টি আলী।

আরো খবর

Disconnect