ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

১৯৮৬-৮৭ সালে আমরা বড় আকারে একটি কার্যকর রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তার জন্য আমরা অনেক বামপন্থী দল ও গ্রুপের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তাদের অনেকের সাথে দীর্ঘ বৈঠকও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা অজুহাতে ও নানা কারণ দেখিয়ে অন্যেরা জোট প্রক্রিয়া থেকে একে একে বিদায় নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট নামে একটি জোট গঠন করেছিলাম কিন্তু তাতে আমাদের নিজেদের কয়েকটি সংগঠন ছাড়া আর কেউ থাকে নি। ১৯৮৭ সালের ২৪শে এপ্রিল ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট’ নামে গঠিত এই সংগঠনের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, বাংলাদেশ লেখক শিবির, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।
২০০৩ সালে আমরা উপলব্ধি করলাম যে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট (গবিজ) রাজনীতি ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করলেও তা যথেষ্ট নয়। তৎকালীন পরিস্থিতিতে বৃহত্তর একটা জোট গঠন প্রয়োজন এবং এ দিক থেকে আগের চেয়ে পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূল। এ নিয়ে প্রাথমিকভাবে কয়েকটি নির্দিষ্ট দলের সাথে আলোচনা করলাম এবং নোতুন এক জোটের মাধ্যমে জনগণের একটা অংশকে এর সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিলাম। এর জন্য আমরা সকলের কাছে আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।
গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনার সময় শওকত আলী বললেন যে, এই ঐক্যের আহ্বান জোটের থেকে দিলে এটা একটা দলীয় ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তাতে অন্যদের সাড়া দেওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা নেই। কাজেই এই জোট গঠনের জন্য আমার নামেই আহ্বান জানাতে হবে। অর্থাৎ যে আহ্বান পত্র আমরা প্রচার করবো সেটা আমার নামে যেতে হবে। এ নিয়ে জোটের মধ্যে আলাপ আলোচনা হলো। অন্যদের সাথেও আলোচনা হলো, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং কমরেড রউফের নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী দল এর সাথে। তাঁরা এতে সম্মত হলেন। গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট, ইউপিডিএফ ও সাম্যবাদী দলের সমন্বয়ে একটি  অঘোষিত ‘লিয়াজোঁ কমিটি‘ গঠন করা হলো।
কনভেনশনের তারিখ ঠিক হলো ২৪ শে অক্টোবর ২০০৩। এর জন্য আমার নামে একটি আহ্বান পত্র তৈরী করে প্রচার করা হলো লিয়াজোঁ কমিটিতে আলোচনার পর। কয়েক দফায় আমরা ৯৬ হাজার আহ্বান পত্র ছাপলাম। তার সাথে ছাপলাম কয়েক হাজার পোস্টার। কনভেনশনের জায়গা ঠিক হলো ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন। এ সময় একটা ব্যাপার ঘটলো। আমরা আমাদের কনভেনশনের তারিখ ঘোষণার পর তেল গ্যাস রক্ষা কমিটি ঢাকা থেকে মংলা পর্যন্ত একটা ‘লংমার্চ’ এর কর্মসূচী ঘোষণা করলো ২১ থেকে ২৫ শে অক্টোবর। অর্থাৎ এমনভাবে তারা এ কর্মসূচী ঘোষণা করলো যাতে তেল গ্যাস রক্ষা কমিটির সাথে সম্পর্কিত কেউ আমাদের কনভেনশনে উপস্থিত হতে না পারে। এটা কোন গণতান্ত্রিক বন্ধুসুলভ আচরণ ছিল না। সে সময় মোশরেফা মিশুর সংগঠনের শহিদুল ইসলাম সবুজ ফয়জুল হাকিম লালাকে বলেন যে, সে বৈঠকে এই তারিখ নির্ধারণ করা হয় সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন ২৪শে অক্টোবর আমাদের কনভেনশন আছে। কাজেই তার মাধ্যমে লংমার্চের তারিখ না রেখে এমনভাবে রাখা দরকার যাতে তাঁদের সাথে সম্পর্কিত লোকজন কনভেনশনে উপস্থিত থাকতে পারেন। কিন্তু তাঁর কথা অগ্রাহ্য করেই তারিখ অপরিবর্তিত রাখা হয়।
আমার নিজের পক্ষ থেকে কনভেনশন আহ্বান প্রসঙ্গে আহ্বান পত্রে আমি বলেছিলাম, “আমাদের ইতিহাসের এই পরম সন্ধিক্ষণে এই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য এক শক্তিশালী আন্দোলন গঠনের উদেশ্যে আমি একটি কনভেনশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এটা হবে এমন এক আন্দোলন যাতে জনগণের শত শত সংগঠন নিজস্ব স্বাতন্ত্র খর্ব না করেই অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এই কনভেনশনে বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্য সামনে রেখে আশু কর্মসূচী উপস্থিত করা হবে। এর পর আমি বলেছিলাম, “আমি একটি রাজনৈতিক সংগঠন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট এর সদস্য। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে কনভেনশনটি আহ্বান করলে এর একটি দলগত চরিত্র দাঁড়াবে এবং এর ফলে অন্যেরা এতে উপস্থিত হতে এবং অংশগ্রহণে উৎসাহিত হবেন না, এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের সংগঠনের সহকর্মী এবং সংগঠনের বাইরে অবস্থিত বন্ধুদের তাগিদ ও পরামর্শ অনুযায়ী বর্তমান জরুরী পরিস্থিতিতে আমি এই কনভেনশন আহ্বান করতে সম্মত এবং এর জন্য উদ্যোগ গ্রহণে প্রস্তুত হয়েছি।”
কনভেনশনের এই আহ্বান পত্র প্রচারের পর থেকেই এর সপক্ষে আমরা যে সাড়া পেয়েছিলাম তাতে আমরা নিজেরাই বিস্মিত হয়েছিলাম। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেখানে এই আহ্বান পত্র পৌঁছেছিল সেখানকার অপরিচিত ব্যক্তিদের থেকেও আমরা চিঠি পেয়েছিলাম পোষ্টার, লিফলেটসহ অন্য কাগজপত্র পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে। কনভেনশনের অস্থায়ী কার্যালয়েও উপস্থিত হয়ে অথবা ফোনেও অনেকে যোগাযোগ করেছিলেন। আহ্বান পত্র, পোষ্টার, লিফলেট নিয়ে গিয়েছিলেন। এক কথায় বলা চলে কনভেনশনের সপক্ষে সারা দেশে আমরা যে সাহায্য সমর্থন পেয়েছিলাম সেটা আমাদের প্রত্যাশাকেও অনেকখানি ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
কনভেনশন ছিল এক দিনের। এর জন্য ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আমরা প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নিয়েছিলাম খাওয়া দাওয়া সহ। এছাড়া আমরা খুব ভালভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। সে সময়ে বাঙলাদেশে বোমাবাজী চলছিল চারদিকে। আমাদের শত্রুর অভাব ছিল না। পুলিশও আমাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। এজন্য ২৩ শে অক্টোবর রাতেই আমরা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন হলের ভেতর সার্চ করেছিলাম, বিশেষতঃ মঞ্চের নীচে। পরদিন সকালেও আমরা আর এক দফা সার্চ করেছিলাম। এছাড়া কনভেনশন চলার সময় প্রবেশ পথগুলিতে আমাদের কর্মীরা ছিল। কাউকে কোন ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় নি। ব্যাগ রাখা ও হেফাজতের ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম। এসব ব্যবস্থা খুব সুশৃংখলভাবেই হয়েছিল।
কনভেনশনে প্রতিনিধির সংখ্যা ছিল নয় শোর মত। তার মধ্যে ইউপিডিএফ এর প্রতিনিধি ছিল দুই আড়াই শোর মত। এছাড়া বাইরের লোকদের সংখ্যা ছিল শ পাঁচেকের মত। সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ, আব্দুল মতিন, নাট্যকার মামুনুর রশীদ এবং আরও কেউ কেউ উপস্থিত ছিলেন যাঁদের নাম এখন মনে করতে পারছি না। তবে বিকেলের দিকে এসেছিলেন আনু মুহাম্মদ। তেল গ্যাস কমিটির সম্পাদক হওয়া সত্ত্বেও আনু এসেছিলেন। সে সময় তেল গ্যাস কমিটির লোকদের মধ্যে কিছু আওয়ামী লীগের লোক ঢুকেছিল। তারা লংমার্চর সময় মানিকগঞ্জে আনুর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিল।
সম্মেলনের আগের দিন সতর্কতা হিসেবে আমি আমাদের বাড়ী থেকে অন্য এক বাড়ীতে গিয়েছিলাম এবং রাতে সেখানেই ছিলাম। সেই রাতেই আমি কনভেনশনে আমার উদ্বোধনী ভাষণটি লিখেছিলাম। ২৪ তারিখে কনভেনশন শুরু হওয়ার বেশ কিছুটা আগেই সকাল করে আমি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের ভেতরে ঢুকেছিলাম।
অন্য অনেক কথার মধ্যে আমি আমার উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলাম, “আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বাংলাদেশের বুর্জোয়া শাসক শ্রণীর রাজনৈতিক মূলস্রোত হিসাবে বিরাজ করছে। যাঁরা এ দেশের নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তন চান তাঁদের মধ্যেও অধিকাংশের ধারণা এই মূল স্রোতের বাইরে দাঁড়িয়ে কোন রাজনৈতিক আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। এ জন্য তাঁরা অন্য কোন উপায় না দেখে দুই দলের সাথে আপোষ করে অথবা তাদের তল্পিবাহক হিসেবেই কিছু করার চেষ্টা করেন। রাজনীতির মূল স্রোত বিষয়ে এই ভুল ধারণার অবসান দরকার এবং এই সাথে অবসান দরকার এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে রাজনৈতিক মৈত্রী ও আন্দোলনের চিন্তা। মনে রাখা দরকার যে, মূল স্রোত বলে স্থায়ী কিছু নেই। আজকের মূল স্রোত রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের মাধ্যমে আগামীকাল ক্ষীণ স্রোত অথবা শুন্য রেখায় পরিণত হতে পারে। বৃটিশ আমলে ও পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ছিল রাজনীতির অন্যতম মূল স্রোত। ১৯৪৭ সালের অল্প কয়েক বছর পরই ১৯৫৪ সালে তারা কিভাবে ক্ষীণ স্রোতে পরিণত হয়েছিল এবং এখন তাদের সেই স্রোতের রেখা পর্যন্ত যে অবশিষ্ট নেই একথা সকলেরই জানা। বাংলাদেশে এখন সমগ্র শাসক শ্রেণীই যেভাবে ভেঙে পড়ছে তাতে এই শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলি যে মূল স্রোত হিসেবে বেশী দিন টিকে থাকবে এমনটি মনে করার কারণ নেই।”
এই কনভেনশনে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল গঠনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এতে বলা হয়, “জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মসূচী সামনে রেখে এই কনভেনশন ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সংগঠনটি কাউন্সিল (সংক্ষেপে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল)’ নামে একটি সংগঠন গঠনের প্রস্তাব করছে। এই সংগঠনের দায়িত্ব হবে কনভেনশনে গৃহীত কর্মসূচীর ভিত্তিতে আন্দোলন সংগঠিত করা, ব্যাপক শ্রমজীবী জনগণের ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য গড়ে তোলার এবং তাকে সম্প্রসারিত করা। এর লক্ষ হবে সকল প্রকার সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী ও সা¤্রাজ্যবাদী সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তির মোকাবেলা করে এদেশে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
এর পর কনভেনশনে লিয়াজোঁ কমিটির দ্বারা তৈরী একটি ১৮ দফা কর্মসূচী কনভেনশনে পেশ করা হয় এবং তার ওপর কিছু আলোচনার পর সেটি গৃহীত হয়। এই ১৮ দফা কর্মসূচীর ভূমিকাতে বলা হয়, “আমরা যে কর্মসূচী কনভেনশনের মাধ্যমে উপস্থিত করছি এটা এক মৌলিক রণনীতিগত কর্মসূচী। এই কর্মসূচী বাস্তবায়নের অর্থই হলো, সমাজের এক মৌলিক পরিবর্তন সাধন করা। কাজেই এই কর্মসূচীতে এমন বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যেগুলির বাস্তবায়ন হলে অন্য হাজার রকম গণতন্ত্র ও গণমুখী কর্মসূচীর বাস্তবায়ন এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অব্যাহত থাকবে।”
লিয়াজোঁ কমিটির গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট, ইউপিডিএফ ও সাম্যবাদী দলের পক্ষ থেকে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের জাতীয় কমিটির সদস্যর জন্য যে নাম দেওয়া হয়েছিল তাঁদেরকে ও তার বাইরে কয়েকজনকে নিয়ে ২৯ জনের একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হলো। কনভেনশনের কাজ শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যার দিকেই নবগঠিত এই জাতীয় কমিটির প্রথম বৈঠক হলো।

আরো খবর

Disconnect