ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

২০০৫ সালের মার্চ মাসের এক সময়ে কলকাতা থেকে কৌশিক ব্যানার্জী আমাকে ফোন করে বললেন তাঁরা অন্ধ্র প্রদেশের রাজামুন্দ্রীতে এপ্রিল মাসে একটা আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করছেন। আমাকে তিনি তাঁদের পার্টি সিপিআই (এমএল জনশক্তি) এর পক্ষ থেকে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। এর আগে তাঁদের আয়োজিত এক মার্কসবাদী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১৯৯৫ সালে আমি হায়দারাবাদে গিয়েছিলাম, যার বিবরণ আগে দিয়েছি। আমি কৌশিককে বললাম, যেতে পারি। পরে তাঁকে জানালাম আমার সাথে ফয়জুল হাকিম (লালা) যাবেন। আমরা দুজন যাবো। কৌশিক বললেন অসুবিধা নেই, দুজনের জন্যই তাঁরা ব্যবস্থা করবেন।
ঢাকা থেকে বেনাপোল হয়ে, এপ্রিল মাসের কোন তারিখ মনে নেই, আমি ও লালা বেনাপোল হয়ে কলকাতা গেলাম। কলকাতায় তারা একটা সভার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেটা হয়েছিল কলেজ ষ্ট্রীটে কফি হাউসের পাশে এক জায়গায়। সম্মেলনে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন আমেরিকার জধু ঙ খরমযঃ এর রিচার্ড, ইরাকী রেজিসটেন্ট মুভমেন্টের একজন প্রতিনিধি এবং ইংলা- প্রবাসী এক ভারতীয়। তাঁরা তিন জনেই সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন।
হাওড়া স্টেশনে আমরা একত্রিত হলাম রাজামুন্দ্রীর ট্রেন ধরার জন্য। আমাদের সাথে থাকলেন আলোক মুখার্জী। তিনি ছিলেন তাঁদের পার্টির পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। পরে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ট্রেনে আমরা একই কম্পাটমেন্টে গেলাম। পরদিন রাজামুন্দ্রী পৌঁছানোর পর স্টেশনের বাইরে দেখলাম বেশ কিছু কর্মী সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে নাচ গানও হলো। পরে আমরা গেলাম একটা হোটেলে।
হোটেলটা ভাল ছিল। আমি এবং ইরাকী রেজিসটেন্ট মুভমেন্টের প্রতিনিধি এক কামরাতে ছিলাম। তাঁর নাম এখন মনে নেই। তিনি থাকতেন এ্যামসটারডাম এ। সেখান থেকেই এসেছিলেন। তাঁর কাছে ইরাকের অভ্যন্তরের কিছু খবরাখবর পেলাম। ইরাক তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্ত। তারাই সেখানে সরকার চালাচ্ছিলেন তাদের দালালদেরকে দিয়ে। তার বিরুদ্ধে অনেক ইরাকী মহল থেকেই প্রতিরোধ হচ্ছিলো। আমাকে ও লালাকে এক কামরায় না রাখার কারণ পুলিশের নজরদারী। আলোক মুখার্জী লালাকে হোটেলে একটু আলাদা জায়গায় রেখেছিলেন প্রবাসী ভারতীয় কমরেডের সাথে এক কামরায়। তাঁর ব্যাপারেও তাঁরা সতর্কতা নিয়েছিলেন। কারণ তাঁদেরকে পুলিশ ধরলে তাঁদের ছাড়া পাওয়া মুশকিল হতো। হোটেলেই আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সম্মেলনের জায়গাতেও দুপুরে খাওয়া হতো।
সম্মেলনের মূল অধিবেশনে প্রথম দিনই আমি আমার লিখিত বক্তৃতা দিয়েছিলাম। ততে আমি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর বেশ কিছু আলোচনার পর বাঙলাদেশ সম্পর্কে বলেছিলাম, “Bangladesh, a client state of the u.s., is now in a serious crisis. The ruling classes of the country are almost united in maintaining this client state, but at the same time their two major political parties, the Awami League and The Bangladesh Nationalist Party (BNP) are locked in political enmity without any logic, or even significant, difference in matters of principal. The enmity and opposition is so complete that they are not in a position even to sit together and discus any issue whatsoever, not ever extremely serious matters, which concern the basic interests of the country and the people. This only concern is grabbing power and to use that power for plundering the resources of the country. However harmful this rivalry might be for the country, it gives the u.s. and other imprialist countries definite advantage in playing their divide and rule game in Bangladesh”  বাঙলাদেশে তখনো পর্যন্ত ভারতের কোন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি এখনকার মত।
মূল অধিবেশনে আমেরিকার কমিউনিষ্ট সংগঠন Ray O Light এর রিচার্ডও বক্তৃতা করলেন। তাঁর বক্তৃতাও লিখিত ছিল। এছাড়া অন্য কয়েকজনও বক্তৃতা করলেন, আলোচনা হলো। দুই দিন এ সব আলোচনা হয়েছিল। তার সাথে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচগান। ১৯৯৫ সালে সিপিআই (এমএল জনশক্তি) এর সম্মেলনের সময় দেখেছিলাম তাঁদের নারী কর্মীদের বড় উপস্থিতি। এবার রাজামুন্দ্রীতে দেখলাম অনেক নারী কর্মী এবং প্রতিনিধি। খোলা ময়দানে একটা জনসভাও হয়েছিল যাতে আমি বক্তৃতা করেছিলাম ইংরেজীতে। এছাড়া উপায় ছিল না। কারণ এখানে উর্দু বক্তৃতার প্রশ্ন ছিল না এবং আমি তেলেগু ভাল জানি না। দক্ষিণ ভারতের লোকেরা খুব উর্দু বিরোধী। ইংরেজীর ব্যবহার উত্তর ভারতের থেকে দক্ষিণেই বেশী। তৃতীয় দিন আমাদের হোটেলের পাশেই, তবে হোটেলের এলাকার মধ্যে, একটা খোলা জায়গাতে একটা ছোট খাট সভা হলো। আমরা সেখানে বক্তৃতা করলাম। একটা বড় মিছিল হয়েছিল, যাতে নারীর সংখ্যা অনেক ছিল। আমি সে মিছিলে যাই নি।
সন্ধ্যার পর আমরা হোটেলের কামরাতেই বসে আড্ডা দিতাম। রিচার্ডের গল্প খুব ভাল ছিল। তিনি এক সন্ধ্যায় বেশ কিছু আমেরিকান গণসঙ্গীত গাইলেন, বেশ শক্তিশালী গণসঙ্গীত। তৃতীয় দিন বিকেলের দিকে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো ইংরেজ আমলে  তৈরী একটা বিশাল ও বিখ্যাত hydro electric barrage দেখতে। আমরা শহরে কিছুক্ষণ বেড়ালাম কয়েকটা জায়গায়।
এখানে একটা কথা বলা দরকার। দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে হঠাৎ পুলিশ এলো আমাদের হোটেলে এবং আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো। আমি নীচে লাউঞ্চে বসে তাদের সাথে কথা বললাম। অনেক প্রশ্ন। কেন রাজামুন্দ্রী এসেছি ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলো। একটা আইনগত সম্মেলনে আগত বিদেশী প্রতিনিধিদেরকে এভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা এক ভয়াবহ ব্যাপার। আমি তো অনেক সম্মেলনে গেছি। কোন দিন এ ধরনের কিছু হয় নি। অন্ধ্র প্রদেশের পুলিশের এই ব্যবহার বিস্ময়কর ছিল। রিচার্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় তিনি বেশ মজা করেই তাদের সাথে কথা বললেন। তিনি ছিলেন খুব মোটা। বললেন দেখছেন তো, আমি কত মোটা। আমার ভারতে বেড়াতে আসার খুব ইচ্ছে ছিল। এই আমন্ত্রণ পেয়ে এখানে এলাম। এর পর আরও মোটা হয়ে গেলে এবং বয়স বেড়ে গেলে তো আর আসা যাবে না। লালা এবং ইংলান্ড প্রবাসী ভারতীয় কমরেডকে উদ্যোক্তারা সরিয়ে দিয়েছিলেন বলে তাদের সাথে পুলিশের কোন কথাবার্তা হয় নি।
আমাদের বিদায় জানাবার জন্য এসেছিলেন অন্ধ্র প্রদেশের পার্টি সেক্রেটারী। তাঁর নাম মনে করতে পারছি না। তিনিই সম্মেলনের সব আয়োজন করেছিলেন। অমায়িক ব্যক্তি। অন্ধ্রে তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। পরে খবর পেয়েছিলাম, সম্মেলনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছিল।
সম্মেলনের পর ট্রেনে করে আমরা কলকাতা ফিরলাম। ট্রেনে আমাদের সাথে থাকলেন আলোক মুখার্জী। কলকাতায় ফিরে আমি সেখানে কয়েকদিন থেকে গেলাম। লালা দেরী না করে কলকাতা ফেরার পরই সেখান থেকে একা ঢাকা ফিরলেন। ঢাকা ফিরে তাঁর এক বড় বিপদ হলো। পরদিনেই তার হার্ট অ্যাটাক হলো। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলেন এবং তাঁর হার্টে অপারেশন হলো। এসব আমি জানলাম ঢাকা ফেরার পর।
এখানে একটা বিষয়ের উল্লেখ করা দরকার। রাজামুন্দ্রী সম্মেলনে যাওয়ার আগে এক সঙ্গে কাজ করার উদ্দেশ্যে বাসদ এর সাথে আমাদের বেশ কয়েক দফা আলাপ আলোচনা হয়েছিল। তাঁরা আমাদের সঙ্গে আমাদের অফিসে কয়েকবার বৈঠক করেছিলেন। খালেকুজ্জামান, মবিনুল হায়দার চৌধুরী এবং অন্য বাসদ নেতারা এই সব আলোচনায় উপস্থিত থাকতেন। একবার আমরা গিয়েছিলাম বাসদের অফিসে। সেখানে দুপুরে খাওয়া দাওয়াও হয়েছিল। আলোচনা অনেক দূর অগ্রসর হয়ে ঐক্যমতও দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু রাজামুন্দ্রী থেকে ফিরে শুনলাম তাঁরা আমাদের সাথে কোন আলাপ-আলোচনার তোয়াক্কা না করে নিজেরা অন্য কয়েকটি দলের সাথে মিলে একটা জোট খাড়া করেছেন।

আরো খবর

Disconnect