ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

২০০২ সালে বিএনপি সরকার হঠাৎ আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণার পর যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় সে পরিস্তিতিতে ১৬ই জুলাই আমাদের গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট এর পুরানা পল্টন অফিসে সিপিবির নেতা মনজুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও রুহিন হোসেন প্রিন্স এর সাথে আমাদের আলাপ আলোচনা হয়। আমাদের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলাম আমি, ফয়জুল হাকিম (লালা) ও হাসিবুর রহমান। এর আগে নভেম্বর মাসে কিছু সংখ্যক বামপন্থি রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে মত বিনিময় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এ বৈঠক ছিল সে প্রক্রিয়ারই অন্তর্গত।
নভেম্বর ২০০১ এ প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় সিপিবির সভাপতি মনজুরুল আহসান খানের বাড়ীতে। সেখানে কিছু আলোচনার পর দুটি বিষয়ে স্পষ্ট মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমটি হলো, বামপন্থীরা নিজেরা একটি স্বাধীন শক্তি হিসেবে রাজনৈতিকভাবে দাঁড়াবে ও তার জন্য যতদুর সম্ভব প্রশস্ত ভিত্তির ওপর নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলবে যে ঐক্যের মূল নীতি হবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীর মত শাসক শ্রেণীর কোন অংশের সাথেই ‘গণতান্ত্রিক প্রতিরোধে’র কোন কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ না হওয়া। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত ছিল, ওপরের ঐক্য মতের ভিত্তিতে মত বিনিময়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা। এই দুই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম বৈঠকের কয়েকদিন পর ৫ই ডিসেম্বর ২০০১ তারিখে ফয়েজ আহমদ সাহেবের বাসায় দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এই দ্বিতীয় বৈঠকে আরও সুস্পষ্টভাবে এ বিষয়ে ঐক্যমত হয় যে, যাদের মধ্যে ঐক্য হবে (Policy of induction) সেটা নির্ধারিত হতে হবে যাদেরকে এই ঐক্যের বাইরে রাখা হবে (Policy of exclusion) তার ওপর। এক্ষেত্রে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয় যে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ইত্যাদি বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলিকে একেবারে বাইরে রেখেই বামপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ও স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে হবে। কারণ এই দলগুলির একাংশ ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দল হিসেবে থাকলেও তারা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীরই রাজনৈতিক দল এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল, শোষক, লুণ্ঠনজীবী ও সন্ত্রাসী, এক কথায় বাঙলাদেশের জনগণের শত্রু। এ দিকটি খেয়ালে না রেখে অতীতে অধিকাংশ বামপন্থী দল সরকার বিরোধিতার নামে সেই একই শ্রেণীর সরকার বিরোধী দলের সাথে একত্রে আন্দোলন করে তাদের ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রক্রিয়াকেই সাহায্য করেছে। তাতে বামপন্থীদের শক্তি বৃদ্ধি তো হয়ই নি, উপরন্ত জনশত্রুদের একটি অংশের পরিবর্তে অন্য অংশ ক্ষমতাসীন হয়ে একইভাবে লুটতরাজ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক জীবন বিপর্যস্ত করেছে।
উপরের দুই বৈঠকে আমরা ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিপিবি‘র মনজুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, বিমল বিশ্বাস, বাসদের খালেকুজ্জামান, বাসদের মাহবুবুল হক, সাম্যবাদী দলের আবদুর রউফ, গণফ্রন্টের টিপু বিশ্বাস এবং ইউপিডিএফ এর প্রসীত বিকাশ খীশা ও রবিশংকর চাকমা প্রভূতি।
এ দুটি বৈঠকের পর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের সাথে উপরোক্ত দলগুলির দ্বিপাক্ষিক বা যৌথ আলাপ আলোচনা হয়। এই সব আলোচনাই ওপরে উল্লিখিত দুই মূল সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। এখানে আরও বলা দরকার যে, মনজুরুল আহসান খানের বাড়ীতে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকের আগে আওয়ামী লীগ আহুত ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বিরোধী কনভেনশন’-এ অংশ গ্রহণের জন্য শেখ হাসিনা বামফ্রন্টের সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টিকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং পৃথক পৃথক ভাবে মনজুরুল আহসান খান ও রাশেদ খান মেনন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাতের বিষয়টিও প্রথম বৈঠকে আলোচিত হয় এবং উভয় পার্টির নেতারা এবং উপস্থিত বামপন্থীরা সে কনভেনশনে অংশ না নেওয়ার সাথে মতামত ব্যক্ত করেন। বাস্তবতঃ তাঁরা সেই অনুযায়ী কাজ করেন এবং প্রায় সার্বজনীন বয়কটের কারণে আওয়ামী লীগের কনভেনশন নিছক একটি দলীয় ব্যাপারে পরিণত হয়। সেই কনভেনশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তার নিজের হৃত শক্তি পুনরুদ্ধারের যে চেষ্টা করে সেটা ব্যর্থ হয়।
বিভিন্ন বামপন্থী দলের মধ্যে যে আলাপ আলোচনা চলছিল তার সর্ব শেষ বৈঠক হয় ২৪শে জুলাই সিপিবি অফিসে। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিপিবির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, বিমল বিশ্বাস, ও সাইফুল হক এবং বাসদের খালেকুজ্জামান, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট এর পক্ষে ছিলাম আমি এবং ফয়জুল হাকিম ও হাসিবুর রহমান। এই শেষ বৈঠকের লক্ষণীয় দিক ছিল এর ঢিলেঢালা কথাবার্তা।
এই বৈঠকের পরই আমরা একাধিক সূত্রে খবর পাই যে, আওয়ামী লীগের সাথে সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টির বৈঠকের ব্যবস্থা হচ্ছে। ২৪ তারিখ আমাদের সাথে সর্বশেষ আলোচনার দুদিন পর এ নিয়ে আওয়ামী লীগের আবদুস সামাদ আজাদ এবং অন্যদের সাথে মনজুরুল আহসান খান ও রাশেদ খান মেননের ফোনে আলাপ হয় ২৬শে জুলাই রাত্রে যার রিপোর্ট প্রকাশিত হয় দৈনিক আজকের কাগজে। পরদিন ২৭শে জুলাই সন্ধ্যায় সিপিবি অফিসে আওয়ামী লীগের সাথে সিপিবির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। মনজুরুল আহসান খান আওয়ামী লীগের নেতাদেরকে তাঁদের অফিসে চায়ের আমন্ত্রণ জানান! সে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে সেখানে উপস্থিত হন আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, সুরজ্ঞিৎ সেনগুপ্ত এবং মোহাম্মদ নাসিম। সিপিবির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন মনজুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শহীদুল্লাহ চৌধুরী প্রভৃতি। ২৮ তারিখে দৈনিক আজকের কাগজের রিপোর্ট অনুযায়ী বিভিন্ন চলমান ইস্যু নিয়ে উভয়পক্ষে আলোচনা হয় এবং তাঁরা এসব ইস্যুতে একমত পোষণ করেন।
বৈঠক থেকে সিপিবি সভাপতি মনজুরুল আহসান খান এক যুক্ত বিবৃতি পাঠ করেন। ২৮ তারিখে দৈনিক যুগান্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর অন্যতম সদস্য আমির হোসেন আমু জানান, তাঁরা আলোচনায় সন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জোট সরকার দেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তা মোকাবেলার জন্য গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ সিপিবির সাথে আলোচনার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া শুরু করলো। আওয়ামী লীগের সাথে এই ঐক্য প্রক্রিয়া সৃষ্টির উদ্দেশ্য ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস আওয়ামী লীগের আবদুস সামাদ আজাদের বাসায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন ২৭শে জুলাই।
মনজুরুল আহসান খানের বাড়ীতে ডালভাতের দাওয়াত অর্থাৎ প্রথম বৈঠকের সময়টা ছিল এমন যখন সাধারণ নির্বাচনে ১৭৫টি প্রার্থী খাড়া করার পর তারা প্রত্যেকটিতেই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল এবং মাত্র চার পাঁচটি আসন ছাড়া বাকীগুলিতে তাদের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। অন্যদিকে নির্বাচনে বড় আকারে পরাজিত হয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। কাজেই সেই পরিস্থিতিতে সুবিধাবাদী চিন্তার বশবর্তী হয়ে এবং অন্য উপায় না দেখে বামফ্রন্টের নেতারা, বিশেষতঃ সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা আন্তরিক না হলেও কৌশলগত কারণে বামপন্থীদের স্বাধীন অবস্থান গড়ে তোলার আলাপ আলোচনায় বসে।
২৪শে জুলাই তাদের সাথে আমাদের সর্বশেষ বৈঠকের আগেই চক্রান্তমূলকভাবে তারা আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধ কাজের সিদ্ধান্ত নিলেও আমাদের সাথে তারা যেভাবে কথা বলে সেটা ছিল তাদের অধঃপতিত চরিত্রেরই পরিচায়ক। এই অধঃপতিত চরিত্র তাদের বেঈমানীর সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টি এই বেঈমানী শুধু আমাদের সাথে নয়। এ বেঈমানী ছিল অন্যান্য গণতান্ত্রিক সংগঠন ও দলের সাথে, তাদের নিজেদের আন্তরিক কর্মীদের সাথে, এ দেশের শোষিত নির্যাতিত জনগণের সাথে।
সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টির এই বেঈমানীর পর আমি ৩০শে জুলাই আমাদের পত্রিকা ‘গণতান্ত্রিক জনযুগ’ এ “লুন্ঠনজীবী বুর্জোয়া শ্রেণীর ভাসমান সুবিধাবাদীরা”  শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে সিপিবির সভাপতি মনজুরুল আহসান খান তাঁদের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘একতা’য় ২রা সেপ্টেম্বর ২০০২ তারিখে ‘রাখাল’ ছদ্মনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন যার শিরোনাম ছিল ‘সিপিবি লইয়া নানা মহলে গবেষণা’।
সিপিবি নেতা মনজুরুল আহসান খানের চরম অক্ষমতার অনেক দৃষ্টান্ত তাঁর উল্লেখিত রচনাটির মধ্যে ছিল। তার একটি হলো নিম্নরূপ। তিনি লিখেছিলেন, “উমর সাহেব লিখিয়াছেন ‘কাজেই আওয়ামী লীগের সাথে কোন ঐক্যতেই আর ঐক্যবদ্ধ কাজ না করার সিদ্ধান্ত ছিল প্রধান ব্যাপার। এই ভিত্তিতেই এ পর্যন্ত আমাদের সাথে বামফ্রন্টের মূল কয়েকটি দল এবং অন্যদের সাথে আলাপ আলোচনা চলে আসছিল।’ তাহা হইলে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বড় কথা নয়। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামই তাহাদের কাছে প্রধান।” এসব কোন কথাই আমার উপরোক্ত প্রবন্ধে ছিল না। থাকা সম্ভবও ছিল না। কিন্তু মিথ্যাচারী মনজুরুল আহসান খান আমার কথার নামে অনায়াসে কতকগুলি মিথ্যা কথা বললেন! যেহেতু জনযুগ-এ প্রকাশিত আমার লেখাটি একতা-র অল্পসংখ্যক পাঠক পড়েছিলেন এবং একতার এই সংখ্যা পড়ার সময় মিলিয়ে দেখার জন্য কারও সামনে জনযুগ-এর সেই কপি না থাকার কথা এটা চিন্তা করে মনজুরুল আহসান খান এক্ষেত্রে কিভাবে একতা’র পাঠককে অর্থাৎ মূলতঃ নিজেদের কর্মীদেরকে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন এটা দেখে আমরা যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলাম।
মনজুরুল আহসান খানের বাড়ীতে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে আমার আলোচ্য লেখাটিতে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, “সেখানে কিছু আলোচনার পর দুটি বিষয়ে মূল মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমটি হলো, বামপন্থীরা নিজেরা একটি স্বাধীন শক্তি হিসেবে রাজনৈতিকভাবে দাঁড়াবে ও তার জন্য যতদূর সম্ভব প্রশস্ত ভিত্তির ওপর নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলবে যে ঐক্যের মূল নীতি হবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীর মত শাসক শ্রেণীর কোন অংশের সাথেই একত্রে কাজ না করা এবং সরকার বিরোধিতার নামে এদের কোন অংশের সাথেই গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের কোন কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ না হওয়া।” ফয়েজ সাহেবের বাড়ীতে দ্বিতীয় বৈঠকের বিষয়ে লিখেছিলাম “এই দ্বিতীয় বৈঠকেও আরও স্পষ্টভাবে এ বিষয়ে ঐক্যমত হয়”। আমার প্রবন্ধটিতে আমি এ বিষয়ে বলেছিলাম, এই দলগুলির একাংশ ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দল হিসেবে থাকলেও তারা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীরই রাজনৈতিক দল এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল, শোষক, লুন্ঠনজীবী, সন্ত্রাসী। এক কথায় বাঙলাদেশের জনগণের শত্রু।
উপরোক্ত দুই বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তু ও সে বিষয়ে ঐক্যমতের উল্লেখ সে লেখাতে যেভাবে করা হয়েছিল তার থেকে কোন সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ লোক বা রাজনৈতিক ব্যক্তির কি এটা মনে হওয়া সম্ভব ও স্বাভাবিক ছিল যে, আমি যা বলেছিলাম তার মধ্যে ‘বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে, গোটা লুটেরা ধনিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রধান বিষয় ছিল না। সম্পূর্ণ মিথ্যাভাবে আমার বক্তব্য সম্পর্কে নানা আবোল তাবোল বলার পর মনজুরুল আহসান খান তাঁর ‘রাখাল-এর কথায়’ বেশ আত্মপ্রসাদের সুরেই বলেছিলেন, “ইহাই হইতেছে উমর সাহেবদের আসল রূপ। এই রূপদ্রষ্টা ‘কমিউনিস্ট’ আমার বিরুদ্ধে কাছা খুলে কুৎসা করতে গিয়ে বলেছিলেন “ক্ষমতার প্রশ্ন বাদ দিয়া সিপিবি বিশুদ্ধতা ও বিপ্লবী বুলির আড়ালে ক্ষমতাসীনদের পঞ্চম বাহিনী হিসেবে কাজ করিতে রাজী নহে।” আমি এর জবাবে বলেছিলাম, “তাঁদের এই নোতুন ঘোষিত সংকল্প অনুযায়ী আশা করা যায় ভবিষ্যতে তাঁরা হুকুম শোনা মাত্র দৌড় দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতানেত্রীদের বাড়ী এবং অফিসে হাজিরা দিতে যাবেন না।”
নিজের লেখাটিতে মনজুরুল আহসান আরও যা লিখেছিলেন সেটা উম্মাদতুল্য ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কিছু ছিল না। তিনি লিখেছিলেন “বিপ্লবী শুদ্ধতার নামে উমর সাহেবদের মত বিএনপির দালালী করিতে রাজী নহি।” যারা কথায় কথায় শাসক শ্রেণীর যে কোন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর কাছে ভাল মানুষ সাজার জন্য প্রকাশ্যেই সশরীরে হাজির হয় এবং যাদের সেই হাজিরার ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় তারা আমাদের মত লোককে যখন বিএনপির দালাল বলে তখন সেটা মূলতঃ এক বড় শয়তানী হলেও এর মধ্যে নিকৃষ্ট মতলববাজী এবং হিতাহিতজ্ঞানশূন্যতাও ছিল।
এসবের জবাবে আমি ‘রাখাল এর কথা’ শীর্ষক আমার লিখিত প্রবন্ধটিতে অনেক কিছু লিখেছিলাম যার মধ্যে ছিল “রাখাল এর কথা হলো, ‘সিপিবি সভাপতি মনজুরুল আহসান খানের বাসভবনে বামপন্থীদের নিমন্ত্রণ এবং কমরেড উমরের উদ্যোগে আলোচনা ও পরবর্তীকালে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচী বামপন্থী মহলে আশার সঞ্চার করিয়াছিল। কিন্তু উমর ভাই বেশিদিন কাহারও সঙ্গে চলিতে পারেন বলিয়া মনে হয় না।’ এর থেকে অবশ্যই বোঝা গেল বদরুদ্দীন উমর নামক ব্যক্তি বামপন্থীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং এর ফলে বামপন্থী মহলে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তার পর কি হলো? যা হলো, তার কারণ রাখালের মতে ‘উমর ভাই বেশী দিন কাহারও সাথে চলিতে পারেন না।’ কিন্তু এটা কি ঠিক, যা এর কারণ মনজুরুল আহসান খানদের মত কমরেডরা বেশী দিন আওয়ামী লীগের সাথে বিরহ যন্ত্রণা সহ্য করতে অপারগ? কোনটা? যে ভিত্তিতে যৌথ আলোচনা এবং আন্দোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে অফিসে চায়ের নিমন্ত্রণ করে এনে তাদের সাথে যৌথ আলোচনার কথা শুরু না করলে ‘উমর ভাই’ নিশ্চয় সিপিবির সাথে একত্রে কাজের কথা চালিয়ে যেতেন, এক সাথে কাজও করতেন, যেমন তাঁরা আশা করেন ভবিষ্যতে আবার অন্য পরিস্থিতিতে এ রকম কাজের শর্ত ও সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
সিপিবির মনজুরুল আহসান খানরা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রস্তাবিত বাম ঐক্যের প্রকৃত ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করে আওয়ামী লীগের দালাল পার্টি হিসেবে ভূমিকা রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে উদ্যোগ যারা নেয় তাদের সাথে কাজ করা অন্য যাদের পক্ষেই সম্ভব হোক, আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সে রকম কোন ঐক্যের মধ্যে বেশী দিন থাকার তো প্রশ্নই নেই, এক দিনও থাকা চলে না। কাজেই আমরা কারও সাথে বেশী দিন থাকতে পারি না, বলে যে কুৎসা আমাদের বিরুদ্ধে এভাবে করার চেষ্টা হয়েছে সেটা নির্লজ্জ ও নির্ভেজাল অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই  ছিল না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা অবশ্যই দরকার যে, ক্লিনটনের বাঙলাদেশ সফরের সময় গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট এর পক্ষ থেকে আমি তার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের যৌথ প্রতিরোধের জন্য আমাদের অফিসে যে বৈঠক ডেকেছিলাম তাতে সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদসহ প্রায় সকল বামপন্থী সংগঠন উপস্থিত হয়েছিল। এই উদ্যোগের ফলে সে সময় বামপন্থীদের যে সমাবেশ ও মিছিল হয়েছিল তার থেকে বামপন্থীদের বড়ো কোন যৌথ কর্মসূচী বাঙলাদেশে আজ পর্যন্ত হয় নি।

আরো খবর

Disconnect