ফনেটিক ইউনিজয়
ধর্মে জাদুবিদ্যা ও মন্ত্রের চর্চা
রঞ্জনা বিশ্বাস

নৃবিজ্ঞানীদের ধারণা মানবসমাজে ধর্মের অস্তিত্ব ৬০ হাজার বছরের পুরোনো। মানব সমাজের ওপর ধর্মের রয়েছে অপরিসীম সামাজিক প্রভাব, যা মানুষের মনোজগৎকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে তার বিশ্বাস ও সংস্কারকে আমূল পাল্টে দেয়। ধর্ম বলতে আমরা কতিপয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে বুঝি, অথচ এর আগেও মানুষের মধ্যে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রতি ছিল অগাধ বিশ্বাস। ধর্ম শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থেকে বলা হয় যে মানুষ যা ধারণ করে। ধর্মের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে নৃবিজ্ঞানী ই বি টাইলর বলেন, আত্মায় বিশ্বাস স্থাপনের প্রক্রিয়াই হলো ধর্ম। ধর্মবিশ্বাসী মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই বিশ্বাস স্থাপন দ্বারা যেকোনো ধর্মশ্রেণির আওতাভুক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই হোক, আর অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রকৃতিবাদী আদি মানুষের ধর্মই হোক, অতিপ্রাকৃত শক্তি বা পবিত্র শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপনের সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগেই।
কীভাবে এবং কখন থেকে মানুষের মধ্যে ধর্মের ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল, তার সঠিক কাল নিরূপণ সহজ নয়। তবে এ কথা সত্যি যে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, এই কথা বুঝতে তাকে পার করতে হয়েছে হাজার হাজার বছর। শুরুতেই মানুষ ছিল নাম মাত্র প্রাণী। ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্য সংগ্রহই ছিল তার একমাত্র কাজ। আর এ জন্য তাকে কৌশল আবিষ্কার করতে হয়েছে। সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য চিন্তার পরিধিকে বাড়াতে হয়েছে। প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ মধ্য প্রস্তর যুগে এসে পরিবর্তনের সূচনা করে। এ পরিবর্তন সূচিত হয় অর্থনৈতিক কারণেই। চাহিদা আমাদের মধ্যে অর্থনীতির ধারণা দেয়, সৃষ্টি করে দ্বন্দ্ব এবং সংগ্রাম। বেঁচে থাকার এই দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে সে অর্জন করে জ্ঞান-বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতা। প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ তাই মধ্য প্রস্তর যুগে এসে দলবব্ধ হয়ে শিকার করতে শেখে। তিন লাখ বছর আগ থেকে ২৫০০০ খ্রি. পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মানুষ কৌশলী হয়ে ওঠে। সে গুহাকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে পশুর চামড়া গায়ে জড়াতে শেখে। এরা নিয়ান্ডারথাল মানুষ। এরা মৃতদেহ সৎকার করত তবে এদের মধ্যে ধর্মের কোনো ধারণা ছিল না।
২৫০০০ খ্রি.পূর্ব থেকে ১০০০০ খ্রি.পূর্ব পর্যন্ত সময়কে বলা হয় শেষ প্রস্তর যুগ, এ সময়ের মানুষ মৃতদেহের যত্ন নিত। গায়ে রং দিত, মৃতের হাত দুটি বুকের ওপর রাখত এবং কবরে মৃতের সঙ্গে বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিত। এ সময় থেকেই মানুষ জাদুবিদ্যার সঙ্গে পরিচিত হয়।
এ যুগেই সৃষ্টি হয় দলনেতার এবং এ সময়ই নিজ নিজ দলের টোটেম হিসেবে তারা কোনো পশু-পাখি বা গাছপালাকে বেছে নেয়। এই টোটেম হল একটি দলের বা গোষ্ঠীয় চিহ্ন। এই টোটেমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নানা রকম বিধিনিষেধ ট্যাবু-মানা। এ যুগে নিজ নিজ দলের টোটেম হিসেবে যে পশুকে তারা বেছে নিত, তারা সেই টোটেম পশু শিকার করত না। আর বিশেষ অনুষ্ঠানে এই টোটেম পশুকে বলী দেওয়া হতো। এভাবে এ যুগের মানুষের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ধর্মের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন। কিন্তু মানুষের মধ্যেও পুনর্জন্মের ধারণা স্থায়ী আসন লাভ করার আগে মানুষ ছিল প্রকৃতির কাছে অসহায়। টোটেমকে কেন্দ্র করে মৃত্যুর ওপর কর্তৃত্ব করার প্রবল ইচ্ছাশক্তি মানুষের মধ্যে কাজ করতে শুরু করে। কল্পনার পাখায় ভর করে সে উড়ে যায় নক্ষত্রলোকে। খুঁজে বের করে তার কাক্সিক্ষত দেব-দেবী। এসব দেব দেবীর জন্য সে নির্ধারণ করে দেয় নক্ষত্রালোক আর তাদের বশীভূত করার জন্য সে সৃষ্টি করে তন্ত্র-মন্ত্রের।
যে যুগে মানুষ কৃষিকাজ জানত না এমনকি আগুন আবিষ্কার করতে শেখেনি-সে যুগেও মানুষ মৃতদেহের পরিচর্যা করেছে। তার গায়ে রং দিয়েছে, ফুল দিয়েছে তার সঙ্গে খাবার এবং শিকারের অস্ত্রও দিয়েছে। এর অর্থও তো ছিল খুব পরিষ্কার যে তারা আবার বেঁচে উঠবে এবং তাদের এসবের প্রয়োজন হবে।
এই আত্মার ধারণা মানুষ পেল কী করে? সে-ও এক চমৎকার ব্যাপার। ঘুমের মধ্যে আদিম মানুষ যখন স্বপ্ন দেখল যে সে নিজে কোনো প্রাণীর শিকারে পরিণত হচ্ছে, সে তার হাত থেকে বাঁচার জন্য দৌড়ে পালাচ্ছেন ঘুমের মধ্যেই সে কামনা করছে তার আরাধ্য দেবতার হস্তক্ষেপ-হয়তো তার নিজের গোত্রের টোটেম পশু বা গাছ বা পাথর তাকে আশ্রয় দিয়েছে, যাকে সে মান্য করে। ঘুম ভেঙেই সে তার শরীরে ক্লান্তিও অনুভব করতে পারল-আর সে ধরে নিল ঘুমের মধ্যে তার আত্মা বেরিয়ে যায় এবং তা দেহে ফিরে আসে। এই ভাবনা থেকেই নানা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মা সম্পর্কিত পুরো কাহিনি প্রচলিত আছে। প্রচলিত আছে নানা সংস্কার। আজকের মিসরের যে পিরামিড বা মানুষের দেহকে মমি করে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, সে তো অমরতা লাভের আকাঙ্খাজাত। মিসরীয়রা বিশ্বাস করত দুটি আত্মায়-যার একটির নাম ‘বা’ এবং অন্যটির নাম ‘কা’। এই দুটি শক্তির সমন্বয় ঘটলেই কেবল মৃত মানুষ প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
নৃবিজ্ঞানীরা একেই বলেন আত্মার ধারণা। এই ধারণার ফলই হলো সর্বাত্মাবাদ। ‘সর্বাত্মাবাদ আত্মা এবং অপদেবতায়’ও বিশ্বাস করে। এর প্রবক্তা হলেন-এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর।
এদিকে আদিবাসী সমাজে যে টোটেমকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা এবং ধর্ম বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে তা সর্বপ্রাণবাদ নামে পরিচিত। সর্বপ্রাণবাদের ধারণা প্রথম প্রকাশ করেন ম্যারেট। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা-ঝড়-বৃষ্টি; তুষারপাত-বন্যা-মহামারী ইত্যাদি সবকিছুর পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে এক অমোঘ প্রাণ শক্তি। যেসব আদিবাসী, বিভিন্ন শিকারি যাযাবর সংগ্রহজীবী জনগোষ্ঠী পাথর বৃক্ষ-পশু পাখির পূজা করে তারা মনে করে এদের মধ্যে রয়েছে অতিপ্রাকৃত ‘প্রাণশক্তি’। এই ‘প্রাণশক্তির’ ধারণাই হলো সর্বপ্রাণবাদ। এদিকে গাছপালা ও প্রকৃতির অন্যান্য বস্তুতে যে শক্তির ধারণা আরোপিত হলো, তাকে টাইলর বলছেন প্রকৃতিবাদ। এই প্রকৃতি পূজা থেকেই পরবর্তী সময় এসেছে টোটেম বাদ এবং অন্যান্য দেব-দেবীর ধারণা। প্রকৃতিবাদের মধ্যেও নিহিত রয়েছে সর্বপ্রধানবাদের অস্তিত্ব। টোটেম শব্দটি আমেরিকার ওজিবোয়া ইন্ডিয়ান আদিবাসী গোষ্ঠীর ও টোটেমমান (totemman)  শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থই হলো, ‘আমার আত্মীয়’ (ড. সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়, সা. সা. নৃ/পৃ. ১৫০)। এ কারণে একই টোটেম পরিবারের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। বিয়ে করতে হলে অন্য টোটেমভুক্ত পরিবারে বিয়ে করতে হয়। আর এভাবে একটি গোত্র অন্য গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত হয়ে সমাজ তৈরি করে। এখনো আদিম সমাজের টোটেমভিত্তিক বিশ্বাস থেকে আধুনিক মানুষও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।
আধুনিক মানবসমাজের ধর্মেও টোটেমের পরিবর্তিত রূপ প্রতীকের ব্যবহার প্রচুর। যেমন খ্রিস্টধর্মের ক্রুশ হিন্দুধর্মে স্বস্তিকা প্রভৃতি। এই প্রতীকের সঙ্গে ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও  অনুভূতিগত ব্যাপার জড়িত থাকে। এই প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজের মধ্যে সংঘবদ্ধতা বাড়ে। এমিল ডুর্খেইম সর্বপ্রথম এই প্রতীকী স্বরূপটি উদ্ঘাটন করেন। ধর্মের সংজ্ঞায় তিনি বলেন-
‘.Each religion is best understood as a Society’s symbolic worship of itself’... (প্রাগুক্ত, পৃ-১৪৫)।
শুধু টোটেমকেন্দ্রিক প্রতীকের কথাই বা বলি কেন? প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম এখন পর্যন্ত প্রাচীন বিধি নিষেধের সংস্কৃতি থেকেও বের হতে পারেনি। যেমন মুসলিম ধর্মে শূকরের মাংস খাওয়া নিষেধ। এই লক্ষণ সেমিটিক জাতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রাচীনকালে তারা শূকরের মাংস খেতনা (ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, ভারতীয় সমাজ পদ্ধতি, পৃ; ১৮১)। ফলে এর সঙ্গে কোন টোটেমভিত্তিক বিশ্বাস জড়িত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে যায়। আবার মদ কোরানে নিষিদ্ধ কিন্তু খ্রিস্টধর্মে তা ধর্মীয় আচারের অংশ, যা আদিবাসী সমাজের প্রাণস্বরূপ।
বাংলাদেশের বেদে জনগোষ্ঠী ধর্মে মুসলিম হলেও এরা হিন্দু সংস্কৃতি এবং ধর্ম বিশ্বাস দ্বারা সমানভাবে প্রভাবিত। ঠিক হিন্দু সংস্কৃতি বললে ভুল হবে। হিন্দু সমাজে ব্যবহৃত সিঁদুর কিন্তু প্রাচীন আদিবাসীদের সংস্কৃতির অংশ। সাঁওতালরাও সিঁদুর ব্যবহার করে। যা হোক বাংলাদেশের ‘বেদে জনগোষ্ঠী’ ভারতীয় যাযাবর বেদিয়া থেকেই উদ্ভূত হোক আর আদিবাসী থেকেই উদ্ভূত হোক, তাদের সংস্কৃতিগত প্রভাব বাংলাদেশের মুসলিম বেদে জনগোষ্ঠীর ওপর রয়েই গেছে।
বেদে সমাজে মনসাপূজার প্রচলন আছে। মানিকগঞ্জের গড়পাড়ায় মনসাপূজা করে বেদেরা। এ ছাড়া ঝিনাইদহের কালীগঞ্জেও মুসলমান বেদেরা মনসাপূজা করে থাকে। মনসা হলেন সাপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত খাসিয়ারা সর্পদেবতার পূজা করে (অতুল সুর, ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, পৃ; ২১৩)।
সিন্ধু সভ্যতার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পূজা। অনার্যদেব-দেবীদের তখন জয়-জয়কার। এই আধিপত্যকে ড. সুর বলছেন, প্রাগবৈদিক ধর্মের উত্তরাধিকার (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৩)। সিন্ধুসভ্যতার আর একটি বড় নিদর্শন হলো বৃক্ষপূজা। যেমন তুলসী, বট-অশ্বত্থ-প্রভৃতির পূজা এখনো হিন্দুধর্মে বিদ্যমান। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও এর ব্যতিক্রম নজরে আসে না। বেদে সমাজে সিজগাছের শিকড় এবং আঠাকে চিকিৎসার উপকরণ হিসেবেই কেবল দেখা হয় না। এই গাছকে মনসা প্রতীকে সম্মানও করা হয়। বাংলাদেশে এই গাছকেÑমনসাগাছও বলে (প্রাগুক্ত, পৃ; ২৫৩)। নাগ বা সর্পপূজা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে চলে আসছে বলে মনে করেন ড. সুর।
বেদেরা কলমা পড়ে মৌলভীর কাছে বিয়ে করলেও তার আগে পরের আনুষ্ঠানিকতায় আদিবাসী এবং হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা যায়।
তারাশঙ্কর তার নানা গল্প উপন্যাসে বেদেদের এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ‘বেদেনী’ গল্পে বেদেদের সংস্কৃতির একটি মনোগ্রাহী বাস্তব বর্ণনা রয়েছে যা সমাজ গবেষকদের গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে বিবেচ্য।
‘বিচিত্রজাত বেদেরা। জাত জিজ্ঞাসা করিলে বলে বেদে। তবে ধর্মে ইসলাম। আচারে পুরা হিন্দু...বিবাহ আদান-প্রদান সমগ্রভাবে ইসলাম ধর্ম সম্প্রদায়ের সঙ্গে হয় না। নিজেদের এই বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ। বিবাহ হয় মোল্লার নিকট ইসলামী পদ্ধতিতে, মরিলে পোড়ায় না, কবর দেয়।’
‘নারী ও নাগিন’ গল্পে সিঁদুরের উপস্থিতি হিন্দু মুসলিম সংস্কৃতির মেলবন্ধ তৈরি করে। নাগিনী কন্যার কাহিনিতে বিষ বেদেরা নাগপঞ্চমীর দিনে মনসাপূজা করে। বেদে সমাজের বিয়েতে বর বা কনের সামনে যে বরণডালা থাকে, তাতে সিঁদুর কৌটার উপস্থিতি প্রমাণ করে এটা তাদের পূর্ব সংস্কৃতির অংশ।
যেকোনো আদিবাসী সমাজে ঐন্দ্রজালিক  ক্ষমতাকে বড় করে দেখা হয়। আদিম মানুষের ধর্মের মূল নিহিতই রয়েছে জাদুবিদ্যা ও ঐন্দ্রজালিক শক্তির মধ্যে। নৃবিজ্ঞানে-বিশেষ করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের আলোচনায় জাদুবিদ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কোন কোন নৃবিজ্ঞানী ধর্ম ও জাদুকে আলাদা বিষয় বলেই মনে করেন। তারা মনে করেন ধর্মের ‘sacred’ জগতের বাইরে আলাদাভাবেই জাদুর অবস্থান। বিবর্তনবাদীরা মনে করে যে ধর্ম জাদুবিদ্যায় বিবর্তনের ফসল। জাদুবিদ্যা > ধর্ম > আধুনিক বিজ্ঞান।
মজার ব্যাপার হলো জাদুবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের মধ্যে ‘কার্যকারণ’ প্রক্রিয়া নিহিত। ফলে অনেকে জাদুবিদ্যাকে ছদ্মবিজ্ঞান  (Pseudo-Science) বলেন (ড. সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ: ১৪৭)। আর এইচ ক্রাপো জাদুবিদ্যার সংজ্ঞায় বলেন যে-
‘জাদুবিদ্যা অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কাছে আবেদন-নিবেদন করে না; এক শক্তিশালী ও কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করে অতিপ্রাকৃতিক শক্তিকে প্রার্থিত ফলদানে বাধ্য করে’ (প্রাগুক্ত, পৃ: ১৪৭)। জাদুবিদ্যার উৎপত্তি কবে কোথায় হয়েছে তা বলা সম্ভব নয়। তবে নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের ইতিহাস মানেই হলো জাদুবিদ্যার ইতিহাস।
অমরত্ব লাভ এবং ধনসম্পত্তি ও পার্থিব সুখ সমৃদ্ধির আশায় মানুষ দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা ও স্তব করত। অতীন্দ্রিয় শক্তিকে বশীভূত করতে গিয়ে জাদুবিদ্যার উন্মেষ ঘটে। মানুষ দেব-দেবী, ভূত-প্রেত প্রভৃতিকে জাদুবিদ্যার শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে।
পালিওলিথিক যুগের গুহা চিত্র থেকে জাদুবিদ্যার যে প্রামাণ্য ভাস্কর্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় সেখানে এক গুহায় মুখোশ পরা মানুষ ও নানা জীবজন্তুর চিত্র রয়েছে। এই মানুষের আঙুল কাটা। নৃবিজ্ঞানীরা  এই মানুষ সম্পর্কে নানা মত প্রকাশ করেন। কেউ বলেন এরা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়েছিল আবার কেউ বলেন যে এরা মৃত্যুকে এড়ানোর জন্য একটি আঙুল দেবতাকে উৎসর্গ করেছিল। ফ্রান্সের এক গুহায় হরিণের মুখোশ পরা শিংওয়ালা মানুষের চিত্র আছে। জীবজন্তুর শিং জাদুবিদ্যার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। ইউরোপে এটি শয়তানের প্রতীক।
আনুমানিক ১০০০ অব্দে পারস্যে ম্যাজিয়ান ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। এটি জাদুবিদ্যার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। প্রাচীন ইরানি ভাষায় ‘মাগু’ শব্দের অর্থ ‘মাজি’ ও ‘ম্যাগাস’ শব্দ থেকে এসেছে। ম্যাজিরা ছিলেন পুরোহিত সম্প্রদায়ের লোক। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। এরা জ্যোতিষী, গণৎকার ও জাদুবিদ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন। বাইবেলে ওল্ড টেস্টামেন্টের যাত্রা পুস্তক অধ্যায়ে মোশি বা মুসা ঐশী শক্তির মাধ্যমে নানা ধরনের অদ্ভুত কাজ দেখান। তিনি একটি লাঠিকে সাপে পরিণত করেনÑজাদুর দ্বারা ব্যাঙ, পঙ্গপাল সৃষ্ট করেন এবং জলকে রক্তে পরিণত করেন। মধ্য লোহিত সাগরের মাঝখানে শুকনো পথ তৈরি করেন। ফেরাউনের লোকেরাও অনুরূপ জাদু দেখাতে সমর্থ হয়েছিল।
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া ট্যাবলয়েট গুলোতেও নানা ধরনের পুরহিত শ্রেণির আবির্ভাবের প্রমাণ মেলে। যেমন-
বারু পুরোহিত শ্রেণি ছিল গণৎকার। রাজা হাম্বুরাবির সময় এদের প্রভাব ছিল। এরা ভবিষ্যৎ বলতে পারত। আসিপু শ্রেণির পুরহিতরা ভূত-প্রেত তাড়াতে পারত। আর জ্যাম্মায় পুরোহিত শ্রেণি ছিল মন্ত্র গুনিন। মন্ত্রে এদের অগাধ জ্ঞান ছিল। মেসোপটেমিয়ায় মন্ত্র-সংক্রান্ত নানা ধরনের শিলালিপি পাওয়া গেছে, যা দেখে এদের পা-িত্য সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে।
মেসোপটেমিয়াকে সভ্যতার লীলাভূমি বলা হলে মিসরকে বলা যায় জাদুবিদ্যার উৎসভূমি। সমসাময়িক মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতা তাদের ধর্ম বিশ্বাস এবং জ্যোর্তিবিদ্যাকে যে খাতে প্রবাহিত করেছিল তার থেকে মিসরীয় ধর্ম বিশ্বাস এবং জাদুবিদ্যার গতিপ্রকৃতি ছিল অনেক বেশি গভীর এবং অনিবার্য। সুমেরীয় সভ্যতায় ধর্ম বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু মিসরীয় ধর্মে জাদুবিদ্যার স্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিসরের রাজা টথ, হোরাস ও আসটাটেরকে অত্যন্ত ঐন্দ্রজালিক শক্তিসম্পন্ন মানুষ বলে গণ্য করা হতো। হোরাসের মা আইসিস ছিলেন অত্যন্ত ঐন্দ্রজালিক শক্তিসম্পন্ন নারী। দুষ্ট শক্তির হাত থেকে তিনি মানুষকে রক্ষা করতেন  বলে দেবীর মর্যাদা পেয়েছিলেন। তিনি মৃতের আত্মার মাধ্যমে ভবিষ্যৎদ্বাণী করতেন। বাইবেলে রাজা শৌল সেই রকম এক ঐন্দ্রজালিক শক্তিসম্পন্ন নারীর সাহায্য নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ জানতে চেয়েছিলেন।
মিসরের আদিবাসী সংস্কৃতির মূল প্রতিপাদ্য ছিল টোটকা জানা। সব মানুষেরই সম্যক ধারণা ছিল যে ভূত-প্রেতের কুনজরে পড়লে আমাদের অবশ্য করণীয় কী তা সম্পর্কে।
সাপে বা বিছায় কাটলে, দৈত্য-দানবের উৎপাত হলে কিংবা রোগ ব্যাধির প্রকোপ দেখা দিলে বিশেষ বিশেষ ওঝা ডাকা হতো।
মিসরীয়রা বিশ্বাস করত যে ওঝারা নানা ধরনের কাজ করতে পারে, এমনকি কারও হৃদয় চুরি করতেও পারে। তারা কারও বংশকে ধ্বংসও করতে পারে। ধারণা করা হয় যে তৃতীয় রামেসেসের রাজত্বে ওঝারা তার পরিবারে সব সদস্যর মূর্তি তৈরি করে জাদুবিদ্যার সাহায্যে সমূলে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
মিসরীয়রা শুধু জাদুবিদ্যা দিয়ে ভূত-প্রেত তাড়াত বা কাউকে ধ্বংস করত এমন নয়। এরা মানুষের ভাগ্য গণনার জন্য রাশিচক্র ব্যবহার করত। যদিও আমরা জানি রাশিচক্রের হিসাব করতে হলে গ্রিকদের চেয়ে দক্ষ আর কেউই হতে পারে না তবু তাদের চেয়ে অনেক আগেই মিসরীয়রা রাশিচক্রের ব্যবহার করে। মিসরের রাজা অর্থাৎ ফারাওদের আগ্রহই তাদের দিয়ে তৈরি করে নিয়েছে এই রাশিচক্র। এদের রাশিচক্র ও ১২টি নামে বিভক্ত প্রতিটি রাশি আবার সময়ানুযায়ী বিভক্ত করা হয়েছে। মিসরের দেবতাদের নামের সঙ্গে এই রাশিগুলোর নামকরণ করা হয়েছে।
যেমনÑথাত (জ্ঞানের দেবতা) ২৯ আগস্ট -২৭ সেপ্টেম্বর, হোরাস (সূর্যের দেবতা) ২৮ সেপ্টেম্বর-২৭ অক্টোবর),
ওয়াজ্জেত-(দেবী) ২৮ অক্টোবর-২৬ নভেম্বর।
সিখামত (যুদ্ধও  প্রতিদ্বন্দ্বিতার দেবতা) ২৭ নভেম্বর-২৬ ডিসেম্বর,
স্ফিঙ্কস-(মানুষের মাথাওয়ালা সিংহের দেবতা) ২৭ ডিসেম্বর-২৫ জানুয়ারি,
শু-(আলো ও বাতাসের দেবতা) ২৬ জানুয়ারি-২৪ ফেব্রুয়ারি,
ইসিস (অনুশাসনের দেবতা) ২৫ ফেব্রুয়ারি-২৬ মার্চ,
ওসিরিসি-(নরকের দেবতা) ২৭ মার্চ-২৫ এপ্রিল,
আমুন-(পৃথিবী সৃষ্টির দেবতা) ২৬ এপ্রিল-২৫ মে,
হ্যাতোর-(আকাশ ও জমিনের দেবী) ২৬-২৪ জুন,
ফিনিক্স-(জীবন ও পুনর্জীবনের পাখি) ২৫ জুন-২৪ জুলাই,
আনুবিস-(নরকের প্রহরী) ২৪ জুলাই-২৮ আগস্ট।
মিসরীয়দের থেকে ক্যালেডিয়, গ্রিসের অধিবাসীরাই নয় কেবল, ভারতীয়রাও তাদের ব্যক্তিজীবনের উৎস এবং শেষ পরিণতির সন্ধানে ব্যাপৃত থেকেছেন।
গ্রিক পুরাণ হলো জাদুবিদ্যার এক বিশাল জাদুঘর। মিসরীয়দের মতো গ্রিকরাও বিশ্বাস করে অসুখ বিসুখ-রোগবালাইয়ের মূল কারণ হলো মৃতদের দুষ্ট আত্মা। দেবী হেকাটী হলো এই জাদুশক্তির আরাধ্য দেবী। গোরস্থান-রাস্তার সঙ্গমস্থল তাদের জাদুচর্চার প্রধান ও উপযুক্ত স্থান বলে ধরে নেওয়া হতো। গ্রিকরাই প্রথম জাদুবিদ্যার জন্য বিশেষ বর্ণমালার প্রচলন করেছিল। এগুলো আবার লেখা হতো পবিত্র কালি দিয়ে। বশীকরণ ছিল তাদের একটি বিশেষ ক্ষমতা। ফেব্রুয়ারি বা মার্চের প্রথম সপ্তাহে তারা তিন দিন মৃতের প্রেতাত্মার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠান করত।
গ্রিকরাও রাশিচক্রের মাধ্যমে মানুষের ভবিষ্যৎ গণনা করত। এসব রাশির উৎপত্তি-সংক্রান্ত মিথ ও প্রচলিত রয়েছে তাদের মধ্যে। গ্রিকদের রাশিচক্রই এখন সর্বজন জ্ঞাত। এগুলো হল-মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, কন্যা, মকর, মীন ও কুম্ভ।
রোমান সভ্যতা গ্রিকদের প্রায় সমসাময়িক। এরা গ্রিকদের জাদুবিদ্যা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। কারও বদনজর থেকে রক্ষা পেতে এরা জননেন্দ্রিয়ে কবচ ব্যবহার করত। রোমান ওঝারা দেবতার সামনে রক্ত উৎসর্গ করত, গর্ত খুঁড়ে জন্তু-জানোয়ারের রক্ত রক্ষা করত এবং মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে ভূত-প্রেতদের আহ্বান জানাত সেই রক্তভোজে অংশ নিতে। রোমে স্বপ্ন ব্যাখ্যার জন্য জাদুবিদ্যার প্রচলন ছিল।
অন্যদিকে ইহুদিদেরও ছিল জাদু-সম্পর্কিত নানা রকম বই। এসব বইয়ের মধ্যে দ্য বুক অব রাজিয়েল অন্যতম। তারা বিশ্বাস করত উজ্জা ও আজাইল একজন নারীকে জাদুবিদ্যা শিখিয়েছিল। কিসাস নামের একধরনের জাদুর সাহায্যে ডাইনি ও ঐন্দ্রজালিকরা নিজেদের নানা রকম জন্তু-জানোয়ারের মূর্তিতে রূপান্তরিত করতে পারত। তারা মানুষের ছায়া দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারত।
জাদুবিদ্যা তন্ত্রমন্ত্রের অন্য দেশ হলো ভারত। ধারণা করা হয় যে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পাতে প্রাচীনকালে প্রচলিত ছিল জাদুবিদ্যা। সেই সময় পাথরের শক্তি আছে বলে মানুষ বিশ্বাস করত। অনেকে মনে করে আর্যরা ভারতে জাদুবিদ্যা বয়ে এনেছে। আসলে এটি সত্য নয়। কারণ পৃথিবীর পৃথক পৃথক জাতিগোষ্ঠীর আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করে নৃতাত্ত্বিকেরা আবিষ্কার করেছেন যে প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নানা রকম সংমিশ্রণ ঘটলেও তাদের নিজস্ব কিছু বিশ্বাস ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ছিল এবং থাকবে। গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বিচার করে মানুষের ভাগ্য গণনায় ভারতীয়রা অগ্রগামী। ডাইনি-ভূত-প্রেতের ভয় ছিল ভারতীয় সমাজে, তাই ওঝারা সেই ভয় তাড়ানোর মন্ত্রও ব্যবহার করতেন। ভারতীয়রা মাতৃপূজা করত, এ ছাড়া শিবলিঙ্গের পূজাও প্রচলিত ছিল। তারা কোষ্ঠির সাহায্যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করত। বলা হয়ে থাকে যে ভারতীয় ওঝারা ৫২ জোড়া বান মন্ত্র জানত, যার সাহায্যেও অন্যের ক্ষতি করতে পারত তারা। ভারতীয়দের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদেও উল্লেখ আছে নানা রকম মন্ত্রের। দস্যু বা ডাকাত দ্বারা গৃহস্থকে ঘুম পাড়ানোর মন্ত্র উল্লেখ আছে ঋগ্বেদের সপ্তম ম-লের ৫৫ সুক্তে। মন্ত্রটি এ রকম-
‘হে সার মেয়। তুমি যে স্থান হতে গমন কর
পুনরায় সে স্থানে এস
তুমি চোর ও ডাকাতের প্রতি গমন কর।
ইন্দ্রের স্তোতাগণের নিকট কেন যাও?
আমাদের কেন বাধা দাও?
সুখে নিদ্রা যাও।
তোমার মাতা নিদ্রা যান, তোমার পিতা নিদ্রা যান
কুক্কুর নিদ্রা যাক, গৃহস্বামী নিদ্রা যাক,
বন্ধুগণ নিদ্রা যাক, চাতুর্দিকবর্তী জনগণ নিদ্রা যাক,
যে ব্যক্তি এস্থানে আছে, যে বিচরণ করছে
যে আমাদের দেখছে, তাদের চক্ষু সকল বিনাশ
করব। এই হর্ম যেরূপ তারাও সে রূপ হবে।
যে সহস্র শৃঙ্গ বৃষও সমুদ্র হতে উদ্ধত
হলো সে অভিযোগকারীর সাহায্যে আমরা
জনগণকে নিদ্রিত করব।
যে স্ত্রীগণ প্রাঙ্গণে শয়ন করে আছে, যারা তল্পে
শয়ন করে আছে, যারা পুণ্যগান্ধা তাদের
সকলকে নিদ্রিত করব।’
চৌর্য-বৃত্তির সাফল্যের জন্য ভারতীয় সমাজে  ইন্দ্রজালের প্রভাব লক্ষ করা যায়-ঘনরাম চক্রবর্তীর-শ্রীধর্ম মঙ্গল কাব্যেও-
বর পেয়ে অভয় আনিল ইন্দুর মাটি
মন্ত্র পরি জাগায়ে ছোঁয়াল সিদ কাটি॥
জাগ জাগ জাগ মাটি কাজে লাগ মোর।
ময়না নগর জুড়ে নিদ্রা ঘোর॥
আগাম ডাকিনী তন্ত্রেমন্ত্রে পড়ে মাটি।
কলিকা দেবীর আজ্ঞা লাগেরে নিদুটি
লাগ লাগ নগরজুড়ে গড় বেড়ে লাগ।
যেখানে যেরূপে যেবা জাগে বীর ভাগ॥
ঘাটে বাটে ভূমে পড়ে যে জন ঘুমায়
ভূপতি ভোজের আজ্ঞা আগে লাগে তায়
শয্যায় আসনে শুয়ে বসে যেবা জাগে
ঘোর নিদ্রা নিদুটি নয়নে তার লাগে॥
চৌকিতে প্রহরায় জাগে আগে লাগে তায়
বাঙ্গুরে কামিক্ষা দেবী চণ্ডীর আজ্ঞায়।
মাটি পড়ে দিল কুম্ভকর্ণের দোহাই
উড়াইতে শহর সবার ওঠে হাই॥
নারীর গর্ভপাত নিবারণ মন্ত্র উল্লেখ আছে ঋগ্বেদের ১০ম ম-লে-
রাক্ষস নিধনকারী অগ্নি স্তোত্রের সাথে একমত হয়ে এ স্থান হতে গর্ভের সে সমস্ত বাধা, উপদ্রব ও রোগ দূর করে দিন, হে নারী! যার দ্বারা তোমার যোনি আক্রান্ত হয়েছে।
 হে নারী! যে মাংসভোজী রাক্ষস অথবা যে রোগ বা উপদ্রব তোমার যোনি আক্রমণ করে রাক্ষস নিধনকারী অগ্নি স্তোত্রের সাথে মিলিত হয়ে সে সমস্ত বিনাশ করুন।
পুরুষের শুক্রসঞ্চারকালেই হোক অথবা গর্ভ উৎপন্নকালেই হোক অথবা গর্ভমধ্যে আন্দোলিত হবার কালে হোক অথবা ভূমিষ্ট হবার সময় হোক তোমার গর্ভকে যে নষ্ট করে বা নষ্ট করতে ইচ্ছা করে, তাকে আমরা এ স্থান হতে দূরীভূত করলাম (১০ম মণ্ডল-১৬২ সুক্ত)।

যক্ষ্মারোগ নিরাময় মন্ত্র-
হে রোগী! এ যজ্ঞসামগ্রী দ্বারা তোমাকে অপরিজ্ঞাত যক্ষ্মারোগ হতে, রাজযক্ষ্মা রোগ হতে মোচন করে দিচ্ছি। তাহলে তোমার জীবন রক্ষা হবে (১০ম মণ্ডল-১৬১ সুক্ত)।

স্বামী বশীকরণ মন্ত্র আছে-১০ম ম-লের ১৪৫ নং সুক্তে।
এই যে তীব্র শক্তিপূর্বক উদ্ধৃত করছি, এ দ্বারা স্বামীর প্রণয় লাভ করা যায়।
তুমি স্বামীর প্রিয় হবার উপায়স্বরূপ দেবতারা তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমার তেজ অতি তীব্র, তুমি আমার স্বপতিœকে দূর করে দাও, যাতে আমার স্বামী আমারই বশীভূত থাকেন, তুমি তা করে দাও।
হে ওষধি। তুমি প্রধান আমি যেন প্রধান হই, প্রধানের ওপর প্রধান হই। আমার সপতœী যেন নিচের ও নিচে থাকে।
শুধু ঋগ্বেদেই নয়, অথর্ব বেদের সর্বত্রই মন্ত্রের প্রভাব লক্ষ করা যায়। ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ধর্ম ও সংস্কার সম্পর্কে বলেন, ‘এই প্রভাব (মন্ত্রের) ভারতীয় তান্ত্রিক সাধনার সঙ্গে তান্ত্রিক ধর্ম নামে যাহা প্রচলিত, তাহার মূলে নিঃসন্দেহে আদিম আর্যতর জাতির ধর্ম-বিশ্বাস ও সংস্কার নিহিত’ (বাংলার বাউল ও বাউলগণ পৃ: ১৮২)।
ভারতীয় সমাজে যে জাদু বিশ্বাস তা এখন লোকধর্মের অন্তর্গত হয়েছে। এখনো বাঙালিরা সন্তান কামনায় কার্তিক পূজা করে। লোকের বিশ্বাস কার্তিক পূজায় সন্তান লাভ হয়। ভালো বর লাভের জন্য কুমারীদের শিবপূজা সর্বজনবিদিত। সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে বলীদান প্রথা এখনো প্রচলিত।
এসব কিছুই আদি জাদুবিদ্যার অন্তর্গত রূপ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেবদেবীর সঙ্গে বৃক্ষের সহাবস্থান ও তাদের পূজা ভারতের সিন্ধুসভ্যতাজাত। যেমন তুলসী, দূর্বা, বেল, কলা, সিজগাছ বা তার শিকড়, ধান, কচু, অশোক ইত্যাদি। এসব গাছের পাতা, বাকল শিকড় ওঝারা মন্ত্রপুত করে নানা কাজে ব্যবহার করে। এ ছাড়া এদেরও রয়েছে নানা ঔষধি গুণ।
যাহোকÑযুগ যুগ ধরে মানবসভ্যতার নানা স্তরে জাদুবিদ্যা বা ঐন্দ্রজালিক শক্তির যে প্রভাব ও তাদের বিকাশ আমরা লক্ষ করি, তা হাস্যকর নয়। বরং এগুলো মানুষকে পর্যায়ক্রমে ধর্মের দিকে টেনে নিয়ে গেছে, যা কালক্রমে মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে দর্শনে, বিজ্ঞানে।
ফলে এখনো বেদে সমাজের মধ্যে বা যেকোনো আদিম সমাজের মধ্যে যে ঐন্দ্রজালিক শক্তির প্রতি অগাধ বিশ্বাস বিদ্যমান, তা পশ্চাৎপদতার কারণ নয় বা অশিক্ষার ফল নয়। আমরা তাদের প্রাচীন বা ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির একনিষ্ট ধারক হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।
বেদে জনগোষ্ঠীর পেশাগত জীবনে এই ঐন্দ্রজালিক শক্তির প্রয়োগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি পেশার বাইরেও এর প্রভাব অনস্বীকার্য। পশু-পাখি শিকার বা মাছ শিকারে সফলতা পাবার জন্য আদিম জনগোষ্ঠী তার এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করত বলে জানা যায় (অল সুর, প্রাগুক্ত, পৃ: ২৪)। এই প্রকার বিশ্বাস নিয়ে শানদার বেদেদের কাছে অনেকেই শিকারের অস্ত্র নিয়ে আসে। এ কথা স্বীকার করেন তোরাব আলী মান্তা। বেদেরা মাছ মারা ঝুপি, টেঁটা লেজা ইত্যাদি তৈরি করে দিলে বা ছুঁয়ে দিলে তাতে বেশি বেশি মাছ শিকার সম্ভব হয় বলে স্থানীয় বাঙালিরাও বিশ্বাস করে। এ জন্য অবশ্য বেদেকে খুশি হওয়ার মতো পারিশ্রমিক দিতে হয়।
বেদে সমাজে তন্ত্রমন্ত্র বা মায়া বিদ্যার প্রচলন রয়েছে। মানুষের তুকতাক করার প্রবণতা বহু প্রাচীন বলে মনে করেন নৃবিজ্ঞানীরা। তুক তাক মূলত অসৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত জাদুক্রিয়া। তুক-তাকের সাথে ব্যবহৃত হয় কিছু দ্রব্যসামগ্রী, যেগুলোকে বলে জড়িবুটি। বেদে সমাজে এর প্রচলন খুব বেশি। বেদে নামটার অর্থই এসেছে বিষ বৈদ্য থেকে। এদের পরিচয় তো এদের নামের মধ্যেই লুকায়িত। মন্ত্র চর্চাকারী এসব বেদেকে বলা হয় ওঝা বা গুনিন। যে যত বড় বেদে, সে তত বড় ওঝা। বড় ওঝারা মন্ত্রের শিক্ষা করেন, চিকিৎসা করেন। তারাশঙ্করের গল্পেও বেদেদের তন্ত্রমন্ত্রের উপস্থিতি লক্ষ করার মতো। ‘বরমলাগের মাঠ’ গল্পে-সাপকে দেবতা মানা ও নটবরের কষ্ট কাউরের বিদ্যা অর্জন করে সাপকে বশীভূত করার বর্ণনা আছে। এসব মন্ত্র সে পেয়েছে বেদের মেয়ে লাল মণির কাছ থেকে।
‘ডাকিনী বাউরী ডান্ডা না তুলে পরনের কাপড়খানা খুলে, মন্তর পড়ে গণ্ডবন্ধন করে লাগের দিকে ছুড়ে দিয়ে, ছুটে চলে এল। বলল থাক থাক, ওই পর্যন্তই থাক। কাউরের মা কামিখ্যের হুকুম, বিষহরির দোহাই। ওই হ’ল লক্ষ্মণের গণ্ড বন্ধনের আঁক। রাম সীতা লক্ষ্মণের দোহাই।
নাগ সত্য সত্যই আর অগ্রসর হতে পারল না।’
‘জাদুকরের মৃত্যু’ গল্পে নাদের বান তৈরি করেছে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। কিন্তু ওস্তাদের নিষেধ অমান্য করে সে বান মারতে পারেনি। ‘বরমলাগের মাঠ’ গল্পে বেদেনী লালমণি বান মারতে পারত। নটবর পালাতে চাইলে সে প্রতিশোধ নিত বান মেরে কিংবা নাগ ছেড়ে দিয়ে। ‘জাদুকরী’ গল্পে বাজিকর মুখুজ্জে গিন্নির প্রতিবেশীর বাড়িতে বসে বশীকরণ কর্ম সমাধা  করেছে। মন্ত্রপুত এলাচ দিয়ে সে উক্ত নারীর স্বামীকে বশীভূত করার পরামর্শ দিয়েছে। এই রকম তুক তাক সুপ্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রচলিত ছিল। সাঁওতাল সমাজেও ওঝা বা গুনিনদের দেখা মেলে। আর শবরদের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। আদিবাসী গারোরাও বেদেদের শিক্ষাগুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় বলে জানান-বেদে সর্দার-লস্কর মিয়া। মন্ত্রের শেষ অংশে দোহাই দেওয়া শব্দগুচ্ছে তো গুনিনের বিশ্বাসের ভিত্তিকে প্রবলতরভাবে আঁকড়ে ধরতে হয়। সেখানে কালী, মহাদেব-শীতলা মনসা দেবীদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি ও স্তুতি প্রকাশ পেয়েছে। এতে তার প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের বর্মেও ফাটল দেখা দেওয়ার কথা। দেয় না বলে জানাল-সরদার লস্কর মিয়া। বেদে সমাজের এই সমন্বিত সংস্কৃতি দেখে জেমস টেলর বলেন তারা কোন ধর্মের তা নির্ণয় করা কঠিন। জেমস ওয়াইজও বেদেদের সমন্বিত সংস্কৃতি বা ধর্মাচার স্বীকার করেছেন।
 কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে ছোঁয়া ছুঁয়ির ব্যাপারে বা কোন আচার-আচরণ পালন করার ক্ষেত্রে নানা সমাজে নানা রকম বিধিনিষেধ রয়েছে যেগুলোকে বলা হয় ট্যাবু। এই ট্যাবুর চরিত্রও ধর্মীয় অনুভূতিনির্ভর। দুরখ্যাঁ বলেন, ধর্মের মধ্যে দিয়ে সমাজ আসলে নিজেই নিজের পূজা করে। তিনি ধর্মের উৎপত্তির পশ্চাতে সামাজিক সম্পর্কের উৎসের কথা ব্যাখ্যা করেন। দুরখ্যাঁ যে সমাজিক সংঘবদ্ধতার কথা বলেছিলেন, তা বহুলাংশেই ধর্মকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। এখানে ধর্মীয় আবেগের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ধর্মের মনস্তাত্ত্বিক কাজই হচ্ছে যৌথ মানসিকতা গড়ে তোলা। নৃবিজ্ঞানী মেলিওনস্কি তো বলেই দিয়েছেন, ‘ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাকে দৃঢ়বদ্ধ করে ধর্ম।’ বাস্তবে দেখা যায় যে, বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দেশীয় ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এবং চর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এদিকে বিবর্তনবাদীরা মনে করেন ধর্ম আসলে জাদুবিদ্যার বিবর্তনের ফল এমনকি বিজ্ঞানও। সমাজে বা ধর্মে যেসব ট্যাবু বা মানা আছে, তা জাদুবিদ্যাজাত বিষয়। ট্যাবু ধর্মেও পবিত্রবস্তুর পবিত্রতা রক্ষা করে, সমাজের সদস্যদের সংঘবদ্ধ করে এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এসব ক্ষেত্রে বিধিবিধান প্রণয়ন করে সমাজ; পরোক্ষভাবে তা পুরোহিতই করেন। তাই সমাজে পুরোহিতের একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে সেই সমাজ প্রতিষ্ঠিত ধর্ম সম্প্রদায়েরই হোক কিংবা আদিবাসী সম্প্রদায়েরই হোক। পুরোহিতরা প্রকাশ্য ধর্মীয় কাজে নিযুক্ত থাকলেও কখনো কখনো তারা ভবিষ্যৎ বক্তা ও লোকচিকিৎসক হিসেবে জাদুটোনার কাজ করে থাকে। যেমন ভীল, শবর রাজবংশী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের পুরোহিতেরা।

আরো খবর

Disconnect