ফনেটিক ইউনিজয়
ক্রী ড়া ব্য ক্তি ত্ব
‘খেলাধুলা জীবনের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং নয়’-মাশরাফি

এক বিরক্তিকর বিকেলে মোবাইলে ফোন করে লেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত জানালেন, এবার ঈদ করতে নড়াইলে যেতে হবে। যেখানে বাস করেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের কিংবদন্তি মাশরাফি বিন মুর্তজা। তো নড়াইলে গিয়ে আমরা থাকব কই? হোটেলের খোঁজ করার জন্য ফোন করতে গেলে মাশরাফি জানিয়ে দিলেন, নড়াইলে গিয়ে হোটেল নেওয়া চলবে না। তাঁর গোয়াল ঘরে আটটা গরু আছে। দুটো গরু বের করে দিয়ে সেখানে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হবে। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত খড়-ভূষি ইত্যাদি প্রভাইড করা হবে!
খবরে দেখলাম, দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে সিরিজ জেতার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ঈদের ছুটি বাড়িয়ে নিয়েছেন মাশরাফি। ফলে এবার ঈদে কপালে সত্যিই যদি গোয়াল ঘর লেখা থাকে, তাহলে কী আর করা! ডেভ হোয়াটমোর তো ওকে ‘পাগলা’ বলেই ডাকত। বয়স বা ইনজুরির ছোবল মাশরাফির পাগলা চেহারাটা এতটুকু ম্লান করতে পারেনি কখনো। এখনো আমাদের সঙ্গে এলাকার ভাষায় অপ্রকাশযোগ্য সব আড্ডা দেন। দুনিয়ার অনেক ভারী ও হালকা বিষয় নিজস্ব শব্দচয়নে একেবারে হাস্যকর বানিয়ে ফেলতে ওস্তাদ এই মাশরাফি।
মাশরাফির বাড়িতে ঈদ করব বলে আগে আগেই চলে এসেছিলাম নড়াইলে। ফলে, ব্যাগ-প্যাক কাঁধে জোর করে তাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরটিতে আমাদের ‘বন্দি’ করা হলো। মাশরাফির মা-বাবার আন্তরিক আতিথেয়তা নিয়ে আস্ত একটা বই লেখা সম্ভব! গল্পে গল্পে জানা গেল, মাশরাফির বিয়ের পর বউভাত অনুষ্ঠানে কোনো প্রকার উপহার না নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। আমন্ত্রণপত্রে পরিষ্কার করে লেখা ছিল, ‘দয়া করে কোনো উপহার সঙ্গে আনবেন না, এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।’
শহরের ঠিক মাঝখানেই মাশরাফির বাসা। আর সামনের রাস্তাটাই শহরের প্রধান সড়ক। পাশে একটা টং দোকানে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দিতে রাত একটার দিকে দেখা গেল সেই রাস্তার একদম মাঝখানে গোল হয়ে বসে আছি আমরা। সবার মাঝখানে যিনি বসে আছেন, তিনি গান করেন। জনপ্রিয় সব গানের সুর তিনি ভালো জানেন, তবে লিরিক ভুলে গেছেন। ফলে, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নিজের প্রতিভাবলে স্ব-রচিত লিরিক উৎপাদন করে যাচ্ছেন। মাশরাফি বলেন, এই উপায়ে কফি হাউস গানটা একটানা তিন ঘণ্টা গাইতে পারেন তিনি। বাদ্যযন্ত্র বলতে স্টিলের পানি ভরা কলসি আর হাতলবিহীন মগ। শ্রোতা আর গায়কেরা তৃষ্ণার্ত হলে সেখান থেকে পানি পান করেন, বাকি সময় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই কলস। তো, মিউজিকে ভেরিয়েশন আনতে কলসের গায়ে বাড়ি দেওয়ার জন্য দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো বাঁশের কঞ্চি সংগ্রহে। তারা বাঁশ না পেয়ে এক বিশাল সাইজের কাঠের টুকরো নিয়ে হাজির হলো। ফলে, সেই লম্বা কাঠের সাহায্যে রাস্তার পাশের গাছ থেকে আমড়া পেড়ে খাওয়া গেল। মাশরাফি বলেন, এই আমড়া এত মিষ্টি যে, খেতে লবণ লাগে না। মাশরাফির বন্ধুদের গল্প বলতে থাকলে আর শেষ হবে না। বাইক চালানোর গল্প ছাড়াও পুরো নড়াইল শহরে, চিত্রা নদীতে আর তুলসী-বাগানে তাঁর দুরন্তপনার গল্পগুলো অধিক রোমাঞ্চকর!
মাশরাফি যখন নড়াইলে, তখন তিনি অন্য এক মাশরাফি। স্থানীয় বন্ধুদের আড্ডায় এই মাশরাফির বাইক চালানোর গল্পের স্মৃতিচারণা চলছিল। তাঁর বাইকে কেউ উঠলে নাকি ফেরত আসার পর অন্তত তার নাক-চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। দ্বিতীয়বার আর উঠতে রাজি হয় না কেউ। কারণ, মাশরাফির বাইকের গতি তাঁর পেস বলের চেয়ে কম না। মাশরাফি তখন সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাদের নিয়ে বাইকে ঘুরবে! ঈদের আগের রাত, প্রায় পৌনে বারোটা। মফস্বল তখন ঘুমন্ত। বাইক চালাচ্ছেন ম্যাশ, পিছে দেবব্রতদা আর আমি। অন্ধকার পিচঢালা নড়াইলের সুনসান রাস্তায় মাশরাফি প্রস্তাব করলেন, নদীতে যাবেন? কাছেই চিত্রা নদী! এই গভীর রাতেও নদী দেখতে পারার রোমান্টিসিজম নিয়ে ঘুরতে থাকেন তিনি। নদীর কাছাকাছি এসে বাইক থামিয়ে বেশ অবাক হয়ে তিনি বললেন, ‘নদীটা কেমন ছোট হয়ে গেছে না!’ এটা অন্য আরেক মাশরাফি, যে কিনা চিত্রা নদী দেখলেই তাঁর ইনজুরি কিংবা চিকিৎসকের ভয়াবহ সব ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না।
প্রতিটি খেলোয়াড়ই তাঁর খেলাকে জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলতে পছন্দ করেন। সাংবাদিকেরাও এসব প্রশ্নের ক্ষেত্রে গৎবাঁধা উত্তর পাবেন বলে অপেক্ষা করেন। মাশরাফিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দলকে জয়ের পথে ফেরানোটা জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল কি না। মাশরাফি একটু হাসলেন। একেবারে চমকে দিয়ে বললেন, ‘ক্রিকেট মাঠে কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে থাকতে পারে না। মানুষের জীবনে প্রতিটি দিনই একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ বলতে আমি শুধু বুঝি আমার একটা ছেলে আছে, একটা মেয়ে আছে, তাদের মানুষের মতো মানুষ করে তোলাই আমার চ্যালেঞ্জ। খেলাধুলা অবশ্যই বড় ব্যাপার। তবে জীবনের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং সেটা হতে পারে না।’ মাশরাফির কাছে কখনোই জাগতিক জয়-পরাজয় জীবনের প্রতিশব্দ নয়। জয়ের পেছনে ছোটাটা সব সময়ই তাঁর কাছে অপছন্দের ব্যাপার। সেই কথাটা বেশ কিছুদিন ধরে বলছিলেন।
জয় আর ক্রিকেট দুটিকে সমার্থক মনে করেন না মাশরাফি! দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হারের পর খেলাধুলার অর্থেই এই জয়ের নেশার বিপদটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছিলেন ম্যাশ, ‘বিশ্বকাপ থেকে আমরা প্রায় সব ম্যাচই জিতেছি। জিততে জিততে জেতার একটা নেশা তৈরি হয়, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নেশাটা অতিরিক্ত হতে হতে একটা সময় মানুষ মূল ব্যাপারটা ভুলে যায়। কীভাবে জয় আসে, সেই প্রসেসটা নিয়ে ভাবে না। শুরু থেকেই আমরা যখন জেতা জেতা করি, তখন মাঝখান থেকে ক্রিকেট অনেক দূরে সরে যায়।’
-শোয়েব সর্বনাম

Disconnect