ফনেটিক ইউনিজয়
প্রত্যাশার চাপ কেন শুধু ক্রিকেটেই?
তারিক আল বান্না

ক্রিকেট, বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশকে চিনিয়েছে একটি স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে। তুলনামূলকভাবে ব্যাটে-বলের খেলায় বাংলাদেশ ভালো করছে বলে দর্শকদের প্রত্যাশার চাপটাও ক্রিকেটের প্রতিই। তবে এটা কাম্য নয়।
স্বাধীন বাংলাদেশে খেলাধুলার চাহিদা ছিল আগে থেকেই। সবার আগে ১৯৭৩ সালে শুরু হয় ফুটবল। স্বাধীনতার আগে থেকেই ফুটবল জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। এরপর ক্রিকেট-হকিসহ বিভিন্ন খেলার চর্চা শুরু হয়, মাঠে গড়ায় লিগ। ফুটবলের পর জনপ্রিয়তার কাতারে ছিল হকি। ক্রিকেট ছিল ৩ নম্বর জনপ্রিয় খেলা। ১৯৭৭-৭৮ সালে প্রথম বিদেশি দলের বিপক্ষে ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশ। তবে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জেতার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের আমুল পরিবর্তন আসে। দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে ক্রিকেট। এখন ওয়ানডে, টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত খেলছে বাংলাদেশ। ওয়ানডে ক্রিকেটের সাবেক ও বর্তমান বিশ^কাপ চ্যাম্পিয়ন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ , দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও ক্রিকেটের আদিভূমি ইংল্যান্ডসহ সব দেশের বিরুদ্ধেই কম-বেশি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।
এভাবে ক্রিকেট এগিয়ে যেতে থাকলেও বাংলাদেশ ফুটবল ও হকিতে পিছিয়ে পড়তে থাকে। এখন দর্শকদের ক্রীড়া বিনোদন বলতে ক্রিকেটকেই মনে করা হয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম খেলা বলতেই বোঝে ক্রিকেট। ক্রিকেট থেকেই দেশের সুনাম কামনা করে।
এখন অন্য কোনো খেলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত। এ কারণে ক্রিকেটের ওপর চাপ দিন দিন বেড়েই চলছে। দর্শকরা চায়, বাংলাদেশ বিশে^র সব দেশের বিরুদ্ধে জয়লাভ করুক। ফুটবলে বাংলাদেশ দুই হালি গোল খেলেও দর্শকদের মনে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া থাকে না। হকিতে বাংলাদেশ এক ডজন গোল হজম করলেও সেটা আলোচনায় আসে না। কিন্তু ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক কোনো ম্যাচে সামান্য খারাপ হলেই সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। কারণ একটাই। ক্রিকেটের ওপর প্রত্যাশা থাকে আকাশচুম্বী। ফুটবলের পর জনপ্রিয়তার কাতারে ছিল হকি। অথচ হকি এখন ফুটবলের মতোই ‘মৃতপ্রায়’ খেলায় পরিণত হয়েছে।
১৯৮৫ সালে এশিয়া কাপে বাংলাদেশ বিশ^কাপ ও অলিম্পিক শিরোপাধারী পাকিস্তানের সঙ্গে সমানে সমানে লড়ে মাত্র ০-১ গোলে পরাজিত হয়। হকিতে এত ভালো ফলাফল আর হয়নি। ওই ম্যাচের পর সারা দেশে হকির জোয়ার বয়ে যায়। কিন্তু আমরা হকির সেই জোয়ার ধরে রাখতে পারিনি। হকিতে এশিয়ার প্রথম সারির দেশগুলোর তালিকায় নেই বাংলাদেশ। ফুটবলের মতোই হকি পিছিয়ে পড়ায় ক্রিকেটে প্রত্যাশার চাপ আরও বেড়ে গেছে।
১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ হকিতে চমক দেখানো কিংবা ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারের মাটিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল আসরের শিরোপা লাভ অথবা ২০০২ সালে কমনওয়েলথ গেমসে আসিফের স্বর্ণপদক জয়ের গৌরব, এসব কিছুরই আর দেখা মেলে না। ফুটবল-হকি ছাড়াও ভলিবল, বাস্কেটবল, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস কোনো খেলাতেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কোনো মান নেই। ফলে খেলা মানেই ক্রিকেট, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সুনাম মানেই ক্রিকেট, ক্রীড়া আইকন মানেই ক্রিকেটার, দর্শক মানেই ক্রিকেটÑ অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমনই। প্রত্যাশার চাপে এখন বন্দি ক্রিকেট।

Disconnect