ফনেটিক ইউনিজয়
ভারোত্তোলনেই আলোকিত মাবিয়া
মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

অন্য সব খেলায় যেমন শক্তির প্রয়োজন পড়ে ভারোত্তোলনে তেমনটি নয়। এখানে শক্তি খাটিয়ে দুই হাতে ওজন তুলতে হয়। খুব কম সময়ের মধ্যে একেকটি পদক জিতে নাম কামানোরও সুযোগ হয়। আবার ভাগ্য সহায় না হলে পা পিছলে পড়ে যেতে হয়। এখানেই নিজেকে আলাদা করে রেখেছেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। বাংলাদেশের ভারোত্তোলনে আলোকোজ্জ্বল একটি নাম। ২০১৬ সাউথ এশিয়ান গেমসে (এসএ) প্রথমবারের মতো সোনার পদক জিতেছিলেন। গলায় পদক নিয়ে জাতীয় সংগীতের সুরে যে কান্না সীমান্ত কেঁদেছিলেন, সেটা এখনও দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। এখন ভারোত্তোলন বলতে তাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। এক বুক আশা নিয়ে ২১তম কমনওয়েলথ গেমসে গিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রোঞ্জ জয়ের খুব কাছে পৌঁছেও পারেননি। ষষ্ঠ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাকে। শুটিং ছাড়া বাকি ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়রা যেখানে হিটেই বাদ পড়ে গেছেন, সেখানে ব্যতিক্রম সীমান্ত। একটা সময় ভারোত্তোলনে অনেকেই আলো ছড়িয়েছেন।
বাংলাদেশে ভারোত্তোলন অতিপরিচিত খেলাগুলোর একটি। শুরুর সময়টাতে সেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য না পেলেও ধীরে ধীরে পদক জিতেছেন খেলোয়াড়রা, যার সর্বশেষ উদাহরণ ২০১৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ান (এসএ) গেমসে স্বর্ণপদক জিতেছে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। আসরে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক ছিল এটি। এর আগে ২০১০ সালে ঢাকা এসএ গেমসেও স্বর্ণপদক জিতেছিলেন হামিদুল ইসলাম। তারও আগে বারবার স্বর্ণজয়ের স্বপ্ন দেখলেও তা বাস্তবে রূপ লাভ করতে পারেনি। বলা বাহুল্য, ভারোত্তোলনেও দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রেষ্ঠত্বের জায়গায় প্রথম স্বর্ণপদক জয় ছিল এটি। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডাশেনের। ১৯৭৭ সালে এফিলিয়েটেড হয় ফেডারেশনটি। এরপর জন্ম দিয়েছে একের পর এক ভারোত্তোলক। যারা দেশে ও দেশের বাইরে আলোকিত করেছেন, তুলে ধরেছেন লাল-সবুজ পতাকা। নানা চড়াই-উতরাই আর সমস্যাসংকুল সময়কে পেছনে ফেলে এখন সাফল্যের রাস্তায় রয়েছে সম্ভাবনাময় এ খেলাটি। বাংলাদেশের ভারোত্তোলনের ক্ষেত্রে খুব বড় একটা জায়গা করে নিয়েছেন বিদ্যুৎ কুমার রায়। দেশে অত্যন্ত সফল এ ভারোত্তোলক যদিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিততে পারেনি সোনার মেডেল। দেশের বাইরে অনেক পদকই জিতেছে বাংলাদেশ। এই যেমন থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে এশিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে ৭০ কেজি ওজন শ্রেণিতে রুপা জিতেছেন ফাহিমা আকতার ময়না। তবে খেলাটিকে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোকিত করেছেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। তাকে যদি ভারোত্তোলনের ‘ব্র্যান্ড’ বলা হয়, তাহলে কোনো অংশেই ভুল বলা হবে না।
খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন সীমান্ত। এছাড়া মেয়েদের মধ্যে বিভিন্ন সময় ভালো করেছেন মোল্লা সাবিরা সুলতানা, ফাহিমা আক্তার ময়না, জহুরা আক্তার রেশমা, শাহরিয়ার সুলতানা শুচি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে সাফল্যই প্রমাণ করে নিয়মিত পরিচর্যা আর দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন বড় সাফল্য এনে দিতে পারে। ২০১০ এসএ গেমসে যেমন প্রথম স্বর্ণপদকটি এসেছিল ভারোত্তোলকের হাত ধরে, ২০১৬তেও ঘটেছে একই ঘটনা। এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। যেখানে নিজেরাই হতে পারেন নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী।

ওজন তুলেই আলোকিত সীমান্ত
বাংলাদেশে মেয়েদের খেলায় অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মেয়েরা থাকবে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি, এমনটাই প্রতিষ্ঠিত ছিল বছরের পর বছর ধরে। তবে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে সবকিছু। মাবিয়া আক্তার সীমান্ত তেমনি পাল্টে যাওয়া সময়ের প্রতিনিধি হিসেবে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। বদলে দিচ্ছেন পরিচিত চারপাশ, সাহস জোগাচ্ছেন যারা এখনো সামনে আসতে পারেন না তারা। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের পদচারণা আর পথচলা এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই যেমন সংগঠক হিসেবে মাহফুজা আক্তার কিরণ এখন বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফায় নির্বাচিত সদস্য। তার দেখিয়ে দেয়া পথে দুরন্ত, দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রা। তবে ভারোত্তোলক সীমান্ত কি কখনো ভেবেছিলেন এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জিতে নিজে কাঁদবেন, আর দেশের মানুষকেও কাঁদাবেন? ৬৩ কেজি ওজনশ্রেণিতে স্বর্ণপদক জিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। এখন মেয়েদের ভারোত্তোলনের প্রতিশব্দই যেন এই ‘সীমান্ত’।
অথচ একসময় বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল সমস্যাগুলো। ইচ্ছে থাকলেও অনেক কিছু করতে পারতেন না। দরিদ্রতাই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। রাজধানীর খিলগাঁও সিপাহীবাগের ঝিলপাড়ের একটি টিনের বাসায় হারুনুর রশীদ ও আক্তার বানুর তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চলছিল সংসার। বাবা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক, সে কারণেই সংসার চলছিল টেনেটুনে। হঠাৎই দেবদূতের মতো আবির্ভাব ঘটে কাজী শাহাদাত হোসেন নামে একজনের। সম্পর্কে সীমান্তর মামা হওয়ায় অনেকটা নিজের চেষ্টাতেই ঘর থেকে বের করে আনেন। ছোটবেলা থেকে শক্তপোক্ত আর পেটা শরীর থাকার কারণে ওজন তোলার কঠিন কাজে নামিয়ে দেন ভাগ্নিকে। তাতেই ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। ২০১০ সালে ক্যারিয়ার শুরু করা সীমান্তর ভাগ্য খুলে যায় ২০১৬ সালে এসে। ভারতের গৌহাটি-শিলংয়ে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জিতে দেশের মানুষের ভালোবাসা, আর্থিক পুরস্কার, বসবাসের জন্য ফ্ল্যাট সবই পেয়েছেন তিনি। বলতে গেলে সীমান্তর জীবন পাল্টে দিয়েছে সেই একটি স্বর্ণপদক। মামার হাত ধরে ভারোত্তোলনে এসেছিলেন সীমান্ত। তবে ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে একসময় খেলাটি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল তার জন্য। সেই দুঃসময়ে ভারোত্তোলন ফেডারেশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশে ভারোত্তোলনের উন্নয়নের অগ্রপথিক উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তার দিকে। হারুনুর রশীদকে প্রতিবেশীদের কম কথা সহ্য করতে হয়নি। ছোট মেয়ে সকালে গিয়ে রাতে বাসায় ফেরে। ‘কই যায়? কী করে?’ এমন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো সীমান্তর বাবাকে। এখন যারাই তাকে নিয়ে বাজে কথা বলেছেন তারাই সাফল্যে অভিনন্দিত করছেন।

এসএ গেমসের সেই স্বর্ণ
ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্তকে দেশীয় ক্রীড়াঙ্গনে সেলিব্রিটিদের অন্যতম হিসেবেই ধরা হয়ে তাকে। এক স্বর্ণ জয়ই পাল্টে দিয়েছে সবকিছু। দুই বছরের বেশি সময় আগে শিলং আর গৌহাটি এসএ গেমসে স্বর্ণ জিতে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য অবস্থানে। বিশেষ করে গৌহাটির বিজয় মঞ্চে যেভাবে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় কেঁদেছিলেন সেটা অনেকদিন স্মৃতির মানসপটে ভেসে বেড়াবে। পুরস্কারস্বরূপ তাই ভাঙা কুঁড়ে ঘর থেকে এখন তার জায়গা হয়েছে মনোরম ফ্ল্যাট বাড়িতে।
এসএ গেমসের শুরুতে সোনার জন্য হাপিত্যেশ করতে থাকা বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) কর্মকর্তাদের মুখে হাসি ফোটালেন দেশের প্রথম সোনা উপহার দিয়ে। স্বর্ণ জয়ের নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সীমান্ত। তার স্বর্ণ জয়টা অনেকটাই নাটকীয়তায় ভরা ছিল। স্ন্যাচে ভারতের বীনার ছিল ৮৯ কেজি আর সীমান্তর ৬২। ক্লিন অ্যান্ড জার্কে সীমান্ত ৮২ কেজি স্পর্শ করেন। স্ন্যাচ ও জার্ক মিলিয়ে ১৪৯ পয়েন্ট হয় তার। বীনা ছিলেন শেষ প্রতিযোগী। ৯০ কেজি ভার ওঠালেই তার সামনে শিরোপা জয়ের হাতছানি ছিল। তার প্রত্যাশিত ভার ছিল ১১০ কেজি। কিন্তু তা ঠিকমতো উঠাতে না পারায় ব্যর্থ হন। তাতেই সীমান্তর সামনে তৈরি হয় সম্ভাবনা। স্বর্ণ পাওয়ার পর অনুভূতি ছিল, ‘প্রথমত আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে স্বর্ণ জিততে পারব। আর যখন জিতেই গেলাম, তখন তো খুবই গর্ববোধ করছিলাম। আমার জন্য গেমসে প্রথম জাতীয় সংগীত বেজেছে, এটা মনে হতেই কান্না চলে আসে। আর যখন জাতীয় পতাকার দিকে তাকালাম, তখন কান্নাটা আর ভেতরে রাখতে পারিনি। যদিও অনুশীলনের সময় ব্যথা পেয়েছিলাম। ব্যথা নিয়ে খেলতে চিকিৎসকরা নিষেধ করেছিলেন। আমি তাদের নিষেধ মানিনি।’ সীমান্ত এর আগে মালয়েশিয়ায় ২০১৩ সালে কমনওয়েলথ ভারোত্তোলন চ্যাম্পিয়নশিপে রুপা জেতেন। এরপর উজবেকিস্তানে আফ্রো-এশিয়া কাপে রুপা জেতেন ২০১৪ সালে। একই বছর থাইল্যান্ডে কিংস কাপেও ব্রোঞ্জ জেতেন। তারও আগে নেপালে প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ২০১২ সালে ব্রোঞ্জ জেতেন। এসএ গেমসের আগে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ভারতের পুনেতে ২০১৫ সালে কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণ জেতা। সেখানেও ভারতের প্রতিযোগীকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসেন। এখন জীবিকা নির্বাহের পথ হিসেবে বাংলাদেশ আনসারে চাকরি পেয়েছেন। খেলার মাঠে ভালো করার পুরস্কারস্বরূপ বেশকিছু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সুরম্য ফ্ল্যাট বাড়িতে ওঠার আগে পানির ওপর টং ঘরে ১৫ বছর কাটিয়েছেন। ঢাকায় তাদের থাকার জায়গা ছিল না। এছাড়া ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসএ গেমসে সোনাজয়ীদের বাড়ি দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটাও পূরণ হয়েছে। উত্তরায় স্বর্ণজয়ীদের জন্য বাড়ি তৈরি করেছে সরকার, যেখানে শাকিল আহমেদ, মাহফুজা খাতুন শিলার সঙ্গে জায়গা হয়েছে সীমান্তরও।

কমনওয়েলথ গেমসে খুব কাছে গিয়েও পারেননি
অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টে গত ৪-১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় কমনওয়েলথ গেমসের আসর। সেখানে পদক জয়ের খুব কাছে গিয়েও পারেননি সীমান্ত। ৬৩ কেজি ওজনশ্রেণেিত লিডার বোর্ডে ষষ্ঠ স্থান থেকেই শেষ করতে হয়েছে। বড় আসরে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যদের পার্থক্যটা কেমন, সেটাও বোঝা গেল আরো একবার। ৬৩ কেজি ওজনশ্রেণিতে সীমান্ত স্ন্যাচে প্রথম ও তৃতীয়বার উত্তোলন করেন ৭৩ ও ৭৮ কেজিতে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ৭৭ কেজি তুলতে গিয়ে হোঁচট খান। ক্লিন ও জার্কে দুই দফায় তোলেন ৯৮ ও ১০২ কেজি। তবে শেষটায় ১০৩ কেজিও তুলতে পারেননি তিনি। মোট ১৮০ কেজি ভার তুলে ষষ্ঠ স্থানেই থাকতে হয়। মাবিয়ার ইভেন্টে ২২০ কেজি ওজনশ্রেণিতে স্বর্ণ জেতেন কানাডার মাউডি শ্যারন। যেখানে বক্সাররা নামই তুলতে পারেননি, সাঁতারেও বাদ পড়তে হয়েছে পুলে নামার আগেই, হিটেই অ্যাথলিটদের বিদায় নিতে হয়েছে সেখানে সীমান্তর এই পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের জন্য নিয়ামক হতে পারে।

‘ভারোত্তোলনই এখন আমার সবকিছু’
কমনওয়েলথ গেমস শেষে দেশে ফিরে এখন নতুনভাবে সবকিছু শুরু করেছেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। কমনওয়েলথ গেমসে তার খেলা ও নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে

আপনি নিজে যতটা আশা করেছিলেন, এবার কি সেটা পূরণ করতে পেরেছেন?
প্রত্যাশা সবসময় পূরণ করা সম্ভব হয় না। চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি, এটা আমার জন্য বেশ লজ্জার ঘটনাই বলতে পারেন। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে এসে শূন্য হাতে বারবার ফিরতে হয়েছে। তবে নিজেকে ব্যর্থ নয় সফলই মনে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা আমি ভারতের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলতে পেরেছি। এটাকে বড় সাফল্য হিসেবেই দেখছি।

যাদের সঙ্গে খেলেছেন, তারা তো অনেক দিক থেকেই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। বিশেষ করে সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে।
বারবার আমি সেই কথাই বলছি। আপনি যাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন বা দেখবেন তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতেই হবে। ট্রেনিং ও অন্যান্য দিক বিবেচনায় আমি সে রকম সাপোর্ট পাইনি। ভারত ও শ্রীলংকান ভারোত্তোলকরা আমার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পেয়ে থাকেন। তারা শুধু নিজের ট্রেনিং ও ক্যাম্প নিয়েই ভাবে। কারণ মাস শেষে ওদের নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আয় হয়। নিজেদের চাকরি আছে, ফেডারেশনের মাসিক ভাতা আছে তাদের। আর আমাদের লোহা টেনে ঘরে গিয়ে ভাতের ব্যবস্থা করতে হয়। এভাবে চললে পদক জেতা কঠিন। সরকারের তরফ থেকে ভালো পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কমনওয়েলথ লেভেলে আমার পক্ষে পদক জেতা সম্ভব।

ভারোত্তোলনে পৃষ্ঠপোষক সমস্যার পাশাপাশি মাঠের বাইরেও কিছু ঘটনা রয়েছে। পরিবেশটাও ভালো করার প্রয়োজন রয়েছে।
আপনার কথার সঙ্গে আমি একমত। যারা খেলাটিকে এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা রাখে, তাদের পেছন থেকে টেনে ধরা হয়। এখন শুধু পৃষ্ঠপোষকতা কেন, আমাদের বড় কোনো কিছু জেতার পরিকল্পনাও নেই। যদি ২০১৪ সালে পদক জয়ের পরিকল্পনা করা হতো, আমরা প্রত্যেকে পদক নিয়ে ফিরতে পারতাম। এখন ফিরতে হচ্ছে লজ্জা নিয়ে। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে হলেও পাল্টাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

স্বর্ণ জয়ের পর আপনাকে অনেক সুযোগ-সুবিধাই দেয়া হয়েছে। চাকুরি পেয়েছেন, ফ্ল্যাট দেয়া হয়েছে, এগুলো কি যথেষ্ট নয়?
আমি আসলে ওভাবে বলিনি। আমরা যারা খেলোয়াড় রয়েছি, তাদের তো সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের কর্তাব্যক্তিরা চাইলে অবস্থা বদলাবে। এখন থেকে ২০২২ সালের কমনওয়েলথ গেমসের লক্ষ্য নিয়ে ক্যাম্প শুরু করে দিলে অবশ্যই কিছু মিলবে। খেলোয়াড়দের চার বছরের জন্য বেঁধে ফেলতে হবে। একসময় শ্রীলংকা আমাদের সঙ্গে হারত। একটা সময় পাকিস্তানকে তো গণনাতেই ধরতাম না। এখন আমরা শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের সঙ্গেও পেরে উঠছি না। এ রকম চলতে থাকলে আগামী এসএ গেমস থেকে ভারোত্তোলকরা শূন্য হাতে ফিরবে। খেলোয়াড় তুলে আনার পাশাপাশি তাদের পরিচর্যা করতে হবে।

কখনও ভেবেছিলেন, ভারোত্তোলন আপনার জীবনটাই পাল্টে দেবে?
মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। ভারোত্তোলন আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। আমি কখনও ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখিনি। কারণ গরিব ঘরে জন্মেছি। তবে এখন ভাগ্য বদলে গেছে বলতে পারেন। এসএ গেমসে স্বর্ণ জয়ের পর সরকার অনেক সাহায্য করেছেন। ভারোত্তোলন ব্যয়বহুল খেলা, এর জন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়। আমার পরিবারের সেসব খাবার দেয়ার সামর্থ্য ছিল না। তখন উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন সাহেব আমাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন, আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। জানতাম দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করা কঠিন। তাই কিছু জয় করতে হলে খেলাধুলার মাধ্যমে করতে হবে, সেটাই করে যাচ্ছি।

আপনাকে শুরুতে অনেক কষ্টের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। মনে পড়ে সেই দিনের কথাগুলো?
সেসব তো ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। খিলগাঁওয়ের ঝিলপাড়ের বাসায় সাঁকো দিয়ে যেতে হতো। আমার খেলাধুলায় জড়িয়ে পড়া এলাকার অনেকেই মেনে নিতে পারত না। বাবাকে অনেক প্রশ্ন করত। সকালে বেরিয়ে রাতে বাসায় ফিরতাম। অনেকেই প্রশ্ন করত, সারাদিন আমি কী করি। আমাকে কেউ সরাসরি প্রশ্ন করলে বলতাম আমি স্পোর্টসে আছি। এভাবে লড়াই করতে হয়েছে। মা-বাবা আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। স্বর্ণপদক জেতার পর তারা বলেন, খেলাধুলার সঙ্গেই থাকো, দেশের মুখ উজ্জ্বল করো। মাদারীপুরের গ্রামের বাড়িতেও আমার এখন অনেক সুনাম। আমার বাবাকে একসময় আমাদের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছিল। এমনকি খেলার পোশাক নিয়েও কম কথা শুনতে হয়নি। এখন আর সে সমস্যা নেই। আসলে জীবনে ঝুঁকি না নিলে বড় হওয়া যায় না।

Disconnect