ফনেটিক ইউনিজয়
খেলাধুলা ও দেশপ্রেম
তারিক আল বান্না

দেশপ্রেম ছাড়া কোনো কিছুতেই সাফল্য লাভ করা যায় না। বিশেষ করে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা রয়েছে, সেখানে তো দেশপ্রেম বড় হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের সুনাম নির্ভর করে দেশপ্রেমের গভীরতার ওপর। খেলাধুলার প্রতিটা ক্ষেত্রেই সাফল্য আসে দেশের সম্মানকে উঁচিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞার ওপর।
বাংলাদেশ খেলাধুলায় সবচেয়ে এগিয়ে ক্রিকেটে। দেশের প্রতি ভালোবাসা গাঢ় ছিল বলেই বাংলাদেশ ক্রিকেটে বিশ্বসাফল্য পেয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশের মোটের ওপর যতটা আন্তর্জাতিক খ্যাতি এসেছে, তার বড় অংশই ক্রিকেট থেকে। একজন ক্রীড়াবিদ যখন অলিম্পিক গেমসে পদক গ্রহণ করেন, তখন জাতীয় সংগীত বাজার সময় তার চোখ বেয়ে খুশির অশ্রু ঝরে, সেটা আমরা সবাই লক্ষ করি।  বিদেশের মাটিতে কোনো ক্রীড়া ইভেন্টে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা যে কতটা গর্বের, তা বর্ণনা করার মতো নয়।
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়। এ দেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ফুটবল ও হকিতে বিশেষ মনোযোগী ছিল। সরকারও এ দুটি খেলার ব্যাপারে সুদৃষ্টি দিয়েছিলেন। আর তখন উপমহাদেশে হকি ও ফুটবল ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ক্রিকেট কিংবা শুটিং খেলার প্রতি সরকারি সুনজর ছিল না। থাকারও কথা নয়। কারণ বাংলাদেশ যে বিশ্বক্রিকেটে এত দূর এগিয়ে যাবে, বিশ্বকাপ শিরোপাধারী প্রত্যেক দলকে পরাজিত করতে পারবে, বিদেশে গিয়ে টেস্ট ম্যাচ জিতবে, তা তো কউ কল্পনাও করেনি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৬-৭৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম বিদেশী ক্রিকেট দল এসেছিল ইংল্যান্ড থেকে। আর সেটা হলো মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)। ওই দলে জাতীয় দলের কেউ ছিল না। অথচ বাংলাদেশ এমসিসির কাছে প্রতিটা ম্যাচেই লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়। এমসিসি চলে যাওয়ার পরই বাংলাদেশে আসে শ্রীলংকা জাতীয় দল। তখনও শ্রীলংকা টেস্ট স্ট্যাটাস পায়নি। ১৯৭৭-৭৮ সালে ওই সফরে এমসিসির মতোই শ্রীলংকা দল প্রায় সব ম্যাচে বাংলাদেশকে ইনিংস ব্যবধানে হারিয়ে দেয়, সেটা দুদিনের বা তিনদিনের ম্যাচ হোক। আসলে ওই দুই দলের বাংলাদেশ সফরের পর ক্রিকেট নিয়ে ক্রীড়ামোদীদের মনে হতাশা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিন্তু কয়েকজন ক্রিকেটার নানা প্রতিকূলতা, বিরূপ মনোভাবের মধ্যও খেলাটির চর্চা চালিয়ে যেতে থাকে। তখন ক্রিকেট থেকে এ সময়ের মতো টাকা আয় হতো না। বলা যায়, ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ অবস্থার মতো ক্রিকেটকে ধরে রাখেন রকিবুল হাসান, ইউসুফ বাবু, জালাল ইউনুস, দীপু রায় চৌধুরী, শফিকুল হক হীরা, সৈয়দ আশরাফুল হক, দৌলতুজ্জামান প্রমুখ। তাদের পথ ধরে রাখেন গাজী আশরাফ লিপু, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, নাইমুর রহমান দুর্জয়, হাবিবুল বাশার সুমন, আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, মোহাম্মদ রফিক, প্রিন্স, সাইফুল, পাইলট, বিদ্যুৎ প্রমুখ তারকারা। তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ টেস্ট, ওয়ানডে মর্যাদা লাভ করে, প্রবেশ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে। সেটা দারুণভাবে বিশে^র সামনে তুলে ধরছেন সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মর্তুজা, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মোস্তাফিজুর রহমান, মোহাম্মাদ আশরাফুল, সাব্বির রহমান, মুশফিকুর রহিম, রুবেল হোসেনরা। এভাবে স্বাধীনতার পর ধাপে ধাপে বাংলাদেশ আজ ক্রিকেটের বিশ্বকাতারে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। শুধু দেশপ্রেম ছিল বলেই বাংলাদেশ ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক এ অবস্থানে চলে আসতে পেরেছে। বাংলাদেশ অন্য খেলাতেও যদি গভীর দেশপ্রেম নিয়ে চর্চা করে যায়, তাহলে অবশ্যই সাফল্য আসবে। সারা বিশ্বে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে।
দেশপ্রেম ছিল বলেই খুব সাধারণ ঘরে জন্ম নিয়েও ব্রাজিলের পেলে, আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনারা বিশ্বসেরার খ্যাতি লাভ করেন, দেশকে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। আফ্রিকার দরিদ্র দেশ লাইবেরিয়ার জর্জ ওয়ে তার সময়ের বিশ্বসেরা ফুটবল খেলোয়াড়ের পুরস্কার লাভ করেন, দেশকে এনে দেন বিশেষ সম্মান। আজ তিনি নিজের দেশের প্রেসিডেন্ট। দেশপ্রেম তাকে আর তার দেশকে বিশেষ জায়গায় নিয়ে গেছে। সামনে বিশ্বকাপ ফুটবল আসর। বিশ্বকাপে নিজ নিজ দেশকে সম্মানিত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন নামি-দামি ফুটবলাররা। তাদের চোখে-মুখে শুধুই দেশের সম্মান।
বিশ্ব অলিম্পিক, বিশ্বকাপ ফুটবল, এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস,  বিশ্বকাপ ক্রিকেট, বিশ্ব অ্যাথলেটিকস ইত্যাদি বড় বড় ক্রীড়া আসর শুরুর আগে অংশগ্রহণকারী দেশের খেলোয়াড়দের মনে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে ওই সম্পর্কে বিশেষ ধারণা দেয়া হয় কোর্সের মাধ্যমে। দলের সবাইকে নিয়ে রীতিমতো ক্লাস হয়ে থাকে। যাতে খেলোয়াড়রা নৈপুণ্যতা প্রদর্শনসহ আসর চলাকালে দেশের সম্মানের দিকে নজর রাখে। তাতে খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চটুকু দেয়ার জন্য সচেষ্ট থাকে। ফলে খেলার মানও দারুণভাবে বেড়ে যায়। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে ইতালির শিরোপা আসে পাওলো রসির নৈপুণ্যে। কারাবন্দি রসিকে সাজা কমিয়ে বিশ্বকাপের আগে মুক্তি দেয়া হয়। এতে দেশের প্রতি রসির কৃতজ্ঞতা অনেক বেড়ে যায়। দেশপ্রেম এতটাই গাঢ় হয়ে পড়ে যে, তিনি সর্বোচ্চটা দিয়ে দেশকে বিশ্বকাপ এনে দেন। আর নিজে জেতেন গোল্ডেন বল। আমাদের ক্রীড়াবিদদের দেশপ্রেম আরো বাড়লে শুধু ক্রিকেটই নয় ফুটবল, হকি, শুটিং, সাতার, আর্চারি, ভলিবল, অ্যাথলেটিসহসহ নানা খেলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সুনাম লাভ করতে পারবে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বিভিন্ন খেলায় বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে। সদ্যসমাপ্ত কমনওয়েলথ গেমসে ২৬টি স্বর্ণসহ ৬৬টি পদক জিতেছে। এছাড়া, ক্রিকেট, টেনিস ও হকিতে তো ভারত অনেক এগিয়ে। দেশপ্রেম ভারতীয়দের খেলাধুলায় এগিয়ে নিচ্ছে। আমাদেরও সেই পথে যেতে হবে পুরোপুরিভাবে। ক্রিকেটে সর্বশেষ বাংলাদেশ টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে অষ্টম স্থানে চলে এসেছে। এটা একটি বিরাট ব্যাপার। বাংলাদেশের বিভিন্ন খেলায় অনেক প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু দেশপ্রেমের অভাব রয়েছে বলে আমরা ওইসব খেলা থেকে ভালো ফলাফল পাই না। সব ক্ষেত্রের মতোই ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশপ্রেম একটা বড় হাতিয়ার। এটা এনে দিতে পারে বিশাল সম্মান। খেলোয়াড়দের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কাজ করতে হবে ক্রীড়া কর্তৃপক্ষকেই, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করা হয়ে থাকে।

Disconnect