ফনেটিক ইউনিজয়
ব ড় গ ল্প
একান্ত ব্যক্তিগত আলো ও অন্ধকার
আকিমুন রহমান

এক.
সকালে রুমে ঢুকে দেখি, টেবিলে একটা মুখবন্ধ খাম খুব যতন করে রেখে দেওয়া আছে।
আমার হাউস কিপার ইউনুস হোসেন কোনো কিছু টিপটপ না রাখতে পারলে শান্তি পায় না।
প্রতিদিন বেরিয়ে যাওয়ার আগে, যতই তাকে বলে আসা যাক, জরুরি কাগজপত্রগুলা টেবিলেই থাকবে, সে সেটা মনে রাখতে পারবেই না।
যদিও কথাটা শোনার সময় সিরিয়াসলি মাথা ঝাঁকাতে থাকবে। যার অর্থ হচ্ছে, সে বুঝেছে।
কিন্তু পরদিন অফিসে এসে দেখা যাবে, টেবিলের সবটা ফাঁকা ফকফকা। কোনো কাগজপত্রই টেবিলে নেই। ইউনুস হোসেন সব কিছু পাতিপাতি করে সাজিয়ে ড্রয়ারে তুলে রেখেছে!
তবে এই গোছানোতেই সে মনটা বেশি দিয়ে রাখে বলে, কোন কাগজের নিচে যে কোনটা ঢোকায়-সেটার খেয়াল রাখতে পারে না। জিজ্ঞেস করেও কোনো ফায়দা নেই। সে কাঁচুমাচু মুখে জবাব দেবে, সব তো ড্রয়ারেই রাখছি। ঠিকমতনই রাখছি।
এই কারণে, রোজ রুমে ঢুকে, আমার প্রথম কাজ হচ্ছে ড্রয়ার ঘাঁটা।
দরকারি কাগজপত্র ঠিকঠাকমতো টেবিলে আবার তুলে আনা, প্রায়োরিটি মোতাবেক বিন্যস্ত করা! তারপর কাজ শুরু করা!
তবে আমার কেমন একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। কাগজপত্র গুছিয়ে নেওয়ার সাথে সাথেই আমি আবার কাজ শুরু করে দিতে পারি না। অন্তত দশটা মিনিট আমাকে একটু একা বসে থাকতে হয়।
একা বসে থাকা মানে একদম চুপচাপ বসে থাকা নয়। মানে তখন নিরিবিলি একা বসে চা খেতে হয় আমাকে। নয়তো পুরো দিনের পারফরম্যান্স আমার যাচ্ছেতাই হতে বাধ্য!
পারফরম্যান্স আর কী! ওই তো ক্লাস নেওয়া, টিউটরিয়ালে বসা! দিনে দুটা ক্লাস। তার বাইরে সারাটা দিনে বাধ্যতামূলকভাবে কম পক্ষে দুটা সেমিনার অ্যাটেন্ড করা। নিজের ডিপার্টমেন্ট আছে। অন্য অন্য গুচ্ছের ডিপার্টমেন্ট তো আছেই। প্রায় রোজই নানা রকম সেমিনার হয়েই যাচ্ছে, আমার ইউনিভার্সিটিতে। অন্তত দুটোতে নিজেকে জাহির করা চাইই। নিয়মই হচ্ছে এইই। তো, এই সব নিয়ে থাকতে হয় প্রতিটা দিন। পুরোটা সপ্তাহে পঁয়তাল্লিশ ঘণ্টা।
ওই সবের কোনো কিছুই মন দিয়ে করতে পারি না, যদি সকালের ওই দশ মিনিট চায়ের কাপ নিয়ে, একা, বসে থাকাটা না হয়! নো ওয়ে!
আজকেও দিনের শুরুটা অন্যদিনের মতোই হবে, এমনটাই ধরাধার্য বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু তকতকা টেবিলের ওপরে, গর্জিয়াস একটা শরীর নিয়ে পড়ে থাকা খামটা, একটু নাড়িয়ে দেয় আমার ভাবনাটা!
অন্য সব দিন যেখানে টেবিলটাকে সকালে পাওয়া যায় নিপাট ফাঁকাÑআজ সেখানে রাখা আছে একটা চিঠি! আশ্চর্যের কথা!
ইউনুস হোসেনের আজকে হয়েছে কী!  টেবিল ফকফকা খালি না করলে যার কি না ছটফট লাগে, সে চিঠিটাকে বরদাস্ত করেছে-এইভাবে রয়ে যেতে!
এটা যে অফিশিয়াল চিঠি, সেটা তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
কিসের চিঠি হতে পারে?
এই চিঠি ফিন্যান্স ও একাউন্টস থেকে আসবে না, সেটা ক্লিয়ার। এটা সেপ্টেম্বর মাস। ইনকাম ট্যাক্সের রিটার্ন দাখিল করার জন্য দরকারি কাগজপত্র পাঠানোর দায়-দায়িত্ব্ অনেক আগেই শেষ করেছে ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট। এখন ওদের কাছ থেকে এত মোটা কোনো খাম আসার কোনো কারণ নেই!
ডিপার্টমেন্টে গত কয়েক দিনে, দরকারি এমন কোনো মিটিংই হয়নি, যার মিনিটসগুলা পাঠানো হবে-এমন খামে ভরে!
তাহলে কোত্থেকে! এবং কী!
আন্দাজ করতে চেষ্টা করি। তবে তাতে বিশেষ সুবিধা হয় না।
ওদিকে মনের মধ্যে খুব লাজুক মুখে অন্য আরেকটা কথাও উঁকি যে দিচ্ছে না তা তো নয়! সেটা খুব হালকা করে উঁকি দিচ্ছে, আর আমিও মনে মনে ওটাকে জোর চোখ রাঙানি দিয়েই চলছি।
তাতে ফল হচ্ছে এই, হার্টবিট একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ধুকপুক ধুকপুক করছে তো করছেই ভেতরটা! কেমন রেস্টলেস লাগছে!
বসে বসে এই জ্বালা কাঁহাতক ভোগ করা যায়!
চিটিঠার দিকে শুধু এমন তাকিয়ে না থেকে, ওটা খুলে ফেললেই তো হয়! ঝামেলাটা তো সহজেই মেটানো যায়, তাই না?
তারপর ধুম করে হাতে নিয়ে নেই ওটা।
খুলে দেখি, খোদা! এটা তো আমার প্রমোশনের চিঠি!
এই কথাটা মনে করে করেই না আমার বুক ধুকপুক করছিল! একবার আশা জাগছিল, একবার নিরাশা!
যাক, অবশেষে কনফার্ম হওয়া গেল।
চাকরির শেষ মাথা তো এটা, এই প্রফেসরশিপ! পৌঁছে যাওয়া গেল তবে সেইখানে!
সত্যিই পৌঁছে গেলাম শেষে? পারা গেল? কীভাবে পারলাম!
চিটিঠা হাতে ধরে রেখে-এই কয়টা কথা শুধু মনে আনাগোনা করতে থাকে আমার। এবং কেমন একটু অবশ অবশ লাগতে থাকে।
চা-খাওয়ার ইচ্ছাটা হুট করে নিভে যায়।
শরীরটা শিথিল হয়ে আসে। বসার চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে উত্তরের দেয়ালের দিকে মুখ করে বসি! সমস্তটাই স্বচ্ছ কাচের দেয়াল!
বাইরে আকাশ। আজকে এখন এই সকালে, সবটা আকাশের রং একই রকম নয়! একটু ফ্যাকাসে নীলের আশপাশে ছিটকে ছিটকে আছে ঘন নীল। তার সাথে সাদা মেঘ। নড়াচড়াহীন মেঘ!
তাহলে পেরোনো হয়ে গেল সব কয়টা সিঁড়ি?
হয়ে গেল! এই তো সেই পেরিয়ে যাওয়ার অফিসিয়াল প্রমাণ।
তাহলে উল্লাস আসছে না কেন? কেন আস্তে আস্তে এমন অবসাদে নেতিয়ে যাচ্ছে শরীরটা?
সুখে?
আমি সুখী? সুখী আমি এখন? নিজেকে প্রশ্নটা করি। একবার। অনেকবার!
কোনো উত্তর আসে না মনে!
কিন্তু বোধ করতে থাকি, আমার চোখে মুখে কেমন শান্ত এক স্মিত হাসি জেগে উঠেছে! তারপর হাসিটা মুছে যাচ্ছেই না-যাচ্ছেই না!
সেই হাসিজাগা চোখ নিয়ে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে, ওই আকাশের দিকে।
আমি কিন্তু মোটের ওপর কখনোই ভাবি না যে, ইয়েস! আই অ্যাম হ্যাপি!
ইনফ্যাক্ট, এই কথাটা মনে করাও আমার জন্য একেবারে নিষেধ।
এই সুখী হওয়ার বিষয়টা মনে আনারও কোনো অধিকার আসলে নেই আমার। কড়া নিষেধ আছে! আমি যেন কখনো নিজেকে সুখী ইত্যাদি মনে করতে না যাই! তাহলেই বিপদ আসবে। অমন বিপদ এসেছেও অনেকবার। অনেকবার।
আর বুঝি সামলানো যাবে না যাবে না! এমন অবস্থায়ও পৌঁছে যেতে হয়েছে আমাকে।
তারপর কেমন করে রক্ষা পাওয়া গেছে, কেমন করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিÑআমি তার কিছুই বলতে পারি না। বলতে পারে আম্মা। বলতে পারত নানু!
কাজেই সুখী বোধ করার কোনো ওয়ে নেই আমার। অমনটা মনে হবে-আর অমনিই যেন আমাকে পাকড়ে নেওয়ার জন্য ধুড়মুড়িয়ে এসে হাজির হবে শনি!
কাজেই সাবধান! জীবনের অনেকটা সময় ধরে আম্মা আমাকে এই কথাটা পরিষ্কার রকমে, খুব ভেঙেভুঙে বলে গেছে।
নানু আর আম্মা থাকতে বরং ভুলভাল করে হলেও, দু-একবার মনে করা হয়ে গেছে-ওই নিজেকে সুখী ভাবার ব্যাপারটা! এখন সুখ শব্দটাসুদ্ধ মনে করার সাহস আসে না আমার!
সুখ কথাটাও মনে করতে ভয় লাগে এখন! একা একা আমি বিপদে পড়ে গেলে কেমন করে সামাল দেব! আম্মা নেই, নানু নেই! আমার কী হবে তাহলে! এই ভাবনাটা জোরালোভাবে মনে আসে। এবং ভয় ধরায়ে দিতে থাকে।

দুই.
তবে আমি বুঝতে পারি না, কেনো লোকে আমাকে হ্যাপি ভেবে আনন্দ পায়। কেন জানি, সব দিক থেকে আমাকে হ্যাপিই মনে করে লোকে!
কলিগরা, যাদের যাদের কাছে আমি প্রিয়-তারা কথায় কথায় আমাকে নিয়ে তাদের মুগ্ধতার কথা জানায়। কী স্মুথ আপনার জীবন, আপা! ওহ! জেলাস না হয়ে পারা যায় না! জেলাস অফ ইউ, আপা!
আর আমার কাজিনরা! আমার কাছাকাছি এসে এমন এক ভঙ্গী করে, দেখে মনে হয় যেন একেকজন অসুখে-পড়া!
কোনো কোনোজন হাসতে হাসতে বলে, ‘এই অসুখের কারণ তো তুই! এই যে তোকে দেখেই তো আমাদের অন্তর থেকে সুখের দীর্ঘশ্বাস ওঠাটা শুরু হয়, এইটা তো অনেক ঝামেলার বিষয়! আমাদের মনে তো তুইই সুখের দীর্ঘশ্বাস ফেলার অসুখ বান্ধায়ে দিছিস!’
‘এত ভালো থাকোস কেমনে? চিন্তা করেই তো পাই না! খুব খারাপ! নজর লাগবে নজর লাগবে!’ কাজিনরা দমে দমে এমনসব কথা বলে, আর হাসতে থাকে।
সব আমার মামাতো-খালাতো ভাইবোন। একসাথে বেড়ে ওঠার সঙ্গী সবাই। বেড়ে উঠতে উঠতে একজন অন্য জনের সুখে পুরোপুরি খুশি হতে পারাটা ভেতরে এসে গিয়েছিল। একটু গোপন বুক টনটনানি ঈর্ষা করার বিষয়টাও সেই সাথে এসে গিয়েছিল। সেটা আবার লুকিয়ে রাখতেও জানা হয়ে গিয়েছিল!
তবে বাইরের মানুষের এপ্রিশিয়েশন পেয়ে তেমন উছলে উঠি না কখনো। একসাইটেড হওয়ার আসলে কিছু নেই! ওটা ভদ্রতা মেশানো ভদ্র কথা। আসে যায়!
কিন্তু কাজিনদের কথা শুনে শুনে হাসি আটকানো বড্ড মুশকিল হয়ে যায়। কী সব ক্রেইজি কথা যে বলতে ভালোবাসে ওরা! ভালোও লাগে, আবার আনইজিও লাগে।
দুটা মিলিয়ে হাসি আর সামলাতে পারি না। হাসতেই থাকি।
তবে প্রতিবারই এমনটা যখন হতে থাকে, তখন অল অন অ্যা সাডেন-হঠাৎ একটা কালো সাপ আমাকে ছোবল দিয়ে দেয়।
সাপটাকেও ক্লিয়ার দেখতে পাই, আর ছোবলটাকেও তো টের পাইই!
ঝক্কাস! এমন একটা সাউন্ড করে দংশনটা পড়ে আমার ভেতরে! হোরিবল!
তখন আমার ভেতরটা আর বাহিরটা অন্ধকার হয়ে যেতে থাকে-যেতে থাকে। স্লোলি-ভেরি স্লোলি!
অ্যান্ড আই কুড নট বেআর ইট! আমি সহ্য করতে পারি না সেই অন্ধকারটা! অই সময় এমন হয়-আই ফিল লাইক ডায়িং! মরে যেতে ইচ্ছা হতে থাকে আমার।
নিজেকে সুখী শুনে আমার ভয় লাগতে থাকে। আমার ভয় করতে থাকে। একটা ভয়ের কাঁপুনি উঠে যায় সমস্তটা শরীরে!
আমি সুখী হতে চাই না। সুখ পেতে চাই না! কিছুতেই চাই না!
নো বডি নোজ-কেউ, কেউ জানে না-আমার একটা কেমন অসুখ আছে! কেমন একটা হিডেন ডিজিজ! খুব জটিল একটা অসুখ!
ওহ! আই ক্যানট এক্সপ্লেইন ইট ক্লিয়ারলি! বাট ইট ইজ হিয়ার! উইথ মি! অল দ্য টাইম!
আম্মা বলেছিল, ওই বিষয়টা কারও সাথে শেয়ার না করতে! একদম কারও সাথেই না! এমনকি শোয়েবের সাথেও না! বলেছে, কে জানে! বিষয়টা জানলে শোয়েব কীভাবে রি-অ্যাক্ট করবে! যদি ভালো চোখে না দেখে? যদি তখন আমাকে আর ওর এমন ভালো না লাগে? সেই পেইন আর সাফারিং কী সহ্য করতে পারব আমি! এমনিতেই তো ওই অসুখের পেইনটা ক্যারি করতে হচ্ছে আমাকে! আর কত!
আম্মার কথা উড়িয়ে কীভাবে দেব! আম্মার কথা ইগনোর করব কোন সাহসে? আম্মার চেয়ে আমার ভালোটা কে আর দেখবে? কেউই না! এক শুধু নানু দেখত! নানুও তো গত হয়ে গেছে-আজ প্রায় বছর কুড়ি হলো! আম্মাও নেই! পাঁচ বছর।
কিন্তু ওই যে নিষেধ দিয়ে গেছে, সেই নিষেধ কিছুতেই অমান্য করার সাহস এখনো পাই না!
আমি শোয়েবকে ওই অসুখটার কথা কখনো বলিনি। কোনো দিন আর বলা হবে, সেটাও মনে হয় না! যদিও শোয়েব দফায় দফায় আমার সেই ভীষণ অসুখটাকে দেখতে পেয়েছে। কিন্তু ওটার বিষয়ে জানে না কিছু।
এই তো আটাশ বছর হয়ে গেছে! আমাদের কনজুগল লাইফের আটাশ বছর! তারও আগে আরও চার বছর ধরে প্রেম! কত রকমেই না সেই প্রেম ছিল আমাদের দুজনের সেই জীবনে!
অনেক দিন! অনেক দিন ধরে দুজন দুজনের পাশেই আছি।
এত দিন ধরে কত রকম কত কী শেয়ার করে যাচ্ছি-সারাটা দিন ধরেই প্রায়। কিন্তু এই গোপন অসুখটাকে নিয়ে কোনো একটা কথা বলা হয়নি-ওর সাথে! এবং সেটা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না আর!
থাক, বলে কী হবে! হোয়াট ইজ দ্য ইউজ অফ শেয়ারিং ইট! কিচ্ছু না!
বললেও শোয়েব যে এমন অসুখের কথা বিশ্বাস করবে, তার তো গ্যারান্টি নেই! মোটেও গ্যারান্টি নেই! তাহলে কেন ওটার কথা বলতে যাওয়া? বলে-কেনই বা নিজেকে হাস্যকর করে তোলা? দরকার নেই তো! কোনো দরকার নেই!
আর, অসুখটাও তো যখন তখন হুড়মুড় করে এসে যায় না! আসে মাঝেমধ্যে। কখন কোন সময় যে ওটা এসে যাবে-তার কোনো মাথামুণ্ডু নেই! কিন্তু আসে।
একটা জ্বর আসে আমার। চল্লিশ দিন ধরে পোড়াতে থাকা এক জ্বর! শরীরের টেম্পারেচার তখন সব সময় এক শ তিন-এক শ চারের মধ্যে আসা-যাওয়া চালাতে থাকে। যত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাক, কিচ্ছু কোনো কাজ করে না! কিচ্ছু দিয়ে কিচ্ছু হয় না! জ্বর কমাকমি নেই। নো স্পেসিফিক রেমেডি! কোনো অষুধ কাজ করে না। মরা-বাঁচা একাকার হয়ে যায়।
তারপর কীভাবে বেঁচে উঠি আমি-গড নোজ! আমি কিচ্ছু বলতে পারি না!
অসুখের সেই গোড়ার কাল থেকেই এই রকম চলছে!
শোয়েবের সাথে জীবন শুরু করার সময় থেকে, সেই যে প্রেমের সময়টা-সেই সময় থেকে আমাদের কনজুগল লাইফের এই আটাশ বছরে তিনবার সেই অসুখটার ধাক্কা খেতে হয়েছে আমাকে! চরম ধাক্কা!
কেউ আশা করে নি আমি বেঁচে উঠব। কিন্তু কেমন করে করে যেন, বেঁচে গেছি আমি!
আম্মা আমাকে নিয়ে কেবলই ভয়ে কাঠ হয়ে থেকেছে। বারবার কি ভাগ্যের দয়া পাওয়া যায়? কতবার দয়া করবে ভাগ্য? যদি না করে আর? খোদা! এই তো আমি, আম্মার একমাত্র বাচ্চা। সেই বাচ্চার কিছু হলে, আম্মার থাকেটা কী! আম্মা কেন এবং কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? এসব কত উৎকণ্ঠা! কত আতঙ্ক! আমার জন্য!
আমাকে নিয়ে এমন আতঙ্ক-দিশেহারা ছিল নানুও!
তবে ব্যাপার হলো, এখন তাদের দুজনের কেউই পৃথিবীতে নেই! তাই বলা যায়, আমাকে নিয়ে উদ্বেগ করারও কেউ নেই!
প্রথম প্রথম আমাকে নিয়ে আমারও ঢিপঢিপ ভয়ের কোনো সীমা ছিল না। সেই কারণে নানু আর আম্মা গোপনে, আড়ালে আমাকে যতকিছু করতে মানা করত। আমি মান্য করতাম। যা যা নিষেধ দিত, সব মেনে চলতাম অক্ষরে অক্ষরে!
এখন এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে, ওই সব এখন অটোম্যাটিকলি পালন করা হয়ে যায়। আমাকে খেয়াল পর্যন্ত করতে হয় না! আপনা-আপনিই মেনে যেতে থাকি।
অসুখটা, মানে ওই জ্বরটা, কেন আসে!
কারণটা বললে, পৃথিবীর কেউ বিশ্বাস করবে না। শোয়েব তো না-ই।
শুধু বিশ্বাস করে গেছে আম্মা আর নানু আর বড় খালা। মামাও করেছে! কারণ তাদের চোখের ওপর দিয়েই তো অসুখটা এসেছে আমার জীবনে। সেই দূর ছোটকালে!
এসেছে, কিন্তু আর দূর হয়ে যায়নি। তাকে চিরকালের জন্য সারিয়ে তোলার কোনো অষুধপাতি কোনোখানে পাওয়া যায়নি!
এখন অবশ্য এই বাঁচা-মরার বিষয়টা নিয়ে একটু সামান্য ভয় আছে! কিন্তু সেই আগের মতো ভয়ে ভয়ংকর স্তব্ধ হয়ে থাকাটা নেই আর এখন আমার।
এখন, এই তো ফিফটি প্লাস আমি!
আম্মার মতো আমারও বাচ্চা বলতে একটাই। এক ছেলে। তিয়াস! সে পিওর ফিজিক্সে পিএইচডি করছে নিউইয়র্ক  ইউনিভার্সিটিতে। বড় হয়ে গেছে আমার বাচ্চাটা। একদম বাবার মতোই সেলফ-সাফিশিয়েন্ট। এবং একটু পাগলা! ওকে নিয়ে ভাবনা মোটেই নেই!
কাজেই এখন আমার মরণ এলে ক্ষতি তেমন নেই! আমি যেতে পারি ইজিলি!
শোয়েবের একটু সমস্যা হবে-সেটা ঠিক! তবে ও যে সেটা সামলেও নিতে পারবে, বিশ্বাসটা খুব আসে মনে। কিন্তু তা-ও নিজের জন্য মনটা টনটন করে ওঠে!
সত্যি বলতে কী, এখন যত বয়স বাড়ছে, তত অসুখটাকে নিয়ে ভয় পাওয়ার সাথে সাথে অন্য আরেকটা বিষয়ও মনের ভেতরে আসছে-যাচ্ছে আমার!
আজকাল দেখি কী, মাঝেমধ্যে যেন সেই অসুখটাকে পেতে মনের গহিনে কেমন একটা ডিজায়ারও অল্প একটু নড়ে ওঠে আমার! খুবই হালকা রকমে নড়ে ওঠে। আপনা থেকেই! আচমকাই! কোনো একটা অন্যমনস্ক থাকার সময়ে, এমন ডিজায়ার হুস করে ভেসে ওঠে মনের ভেতরে। অনেক দিন অসুখটার সাথে দেখা নেই কি না!
তারপর আবার সাথে সাথেই সেন্সটা যেন চলে আসে আমার মধ্যে! আমি মুহূর্তে অ্যালার্ট হয়ে নিজের মনে বলতে থাকি, তওবা তওবা! কী কুচিন্তা মনে আসে আমার! কেন সেই অসুখ হবে? কিছুতেই সেটা আর কোনো দিন দেখা দেবে না! কোনো দিন না!

তিন.
অসুখটার কারণটাকে কিন্তু আমার নিজের কাছেই খুব বিস্ময়কর লাগে।
তাহলে অন্যদের যদি বলি, তাদের কাছেও সেটা স্ট্রেঞ্জ শোনাবে কি না? ইট মাস্ট সাউন্ড ভেরি ভেরি স্ট্রেঞ্জ! কিন্তু আজগুবি শোনালে কী! সত্য তো সত্যই!
আমার যখন নিজেকে সুখী মনে হতে থাকে, যখন খুব সুখী মনে হতে থাকে, যখন মনে হতে থাকে-এত সুখ আমি কেমন করে কোনখানে ধরে রাখব-তখন, তখন এই জ্বরটা এসে ওঠে আমার শরীরে।
প্রথমে থাকে খুবই অল্প-হালকা একটুখানি টেম্পারেচার! ভেরি মাইল্ড!
মনে হতে থাকে, ও কিছু না। সেরে যাবে!
কিন্তু যায় না। গেড়ে বসে।
তারপর দিন যেতেই থাকে, কিন্তু আরোগ্য আর আসতে চায় না! একসময় মনে হতে থাকে-রোগী আর টিকল না! এই চলে যাবে-যেকোনো সময়ে! যাবেই!
তারপরও কেমন করে যেন বেঁচে উঠেছি আমি এত এতবার! জানি না!

চার.
বড় হয়ে খুব জোরেশোরে ওই অসুখটা আসে, ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে।
আমাদের সময়ে তো তিন বছরের অনার্স কোর্স। আমি তখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। পড়ছি স্যোশিওলজি। নিজের ডিপার্টমেন্ট ভালো লাগে। কিন্তু একটু বেশি যেন ভালো লাগে ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টটা!
তখন প্রতিটা দিন বন্ধুদের জুটিয়ে কাজে-অকাজে ওই বিভাগে ঘুরতে যাওয়ার খুব দরকার পড়ে যায় আমার। গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে থাকাও চাইই।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজনকে দেখার কাজটা শেষ করে, তার সাথে কয়েক দফা দৃষ্টি বিনিময় শেষ করে উঠতে পারি যখন; তখন মনে পড়ে নিজের বিভাগটা আছে। সেমিনার আছে। কিছু পড়াশোনাও করার আছে।
তবে কোনো কোনো দিন আমি যাই না। ইচ্ছা করেই যাই না!
তখন কখনো হঠাৎ-স্যোশিওলজি ডিপার্টমেন্টের কাছে নেমে আসে ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্ট অনেকখানি চাউনি বিনিময় শেষ করে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু আকুল চোখে আকাশ দেখে। তারপর ফিরে যায়।
আমার তখন কী অবস্থাটা হয়! চলে তো যায় সে! তারপর আমি কি করিডোরের সেখানটায় গিয়ে না দাঁড়িয়ে পারি? আকাশটার দিকে না তাকিয়ে পারি? পারি না। মনে হতে থাকে, আমাকে তার যা কিছু বলার ছিলÑবলতে না পেরে-সব বলে গেছে অই আকাশটাকে! কিন্তু তারপরেই মনের ভেতরে দ্বিধা মোচড় দিয়ে ওঠে!
আমাকে মনে করবে সে? আরও কত কতজন আছে না? তাদের রেখে আমাকে মনে করবে? বিশ্বাস হয় না যে!
ইকোনমিকসের শোয়েব হাসানকে চায় না কোন মেয়ে? বহুজন চায়। আমিও চাই।
তার মেধার খুব সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিভাগে। অন্য বিভাগেরও অজানা থাকেনি সেই কথা। সে সুদর্শন। ব্রিলিয়েন্ট। তার ওপর রবীন্দ্রনাথ ভাজা ভাজা মুখস্থ তার! সে যে ফার্স্টক্লাশ পাবেই-সেটা অতি জানা একটা কথা!
রূপবতী মেয়েরও তো অভাব নেই কোনো বিভাগে! কেউ কেউ আবার একটু বেশি চৌকষও। তারা নিজেরাই এগিয়ে গিয়ে তার সাথে কথা বলাটা সেরেও ফেলেছে, বহু আগেই!
সেই তুলনায় আমি তো একেবারে কেউ না গোছের একজন শুধু! একেবারে নবিশ কেউ একজন।
অন্য রূপবতীরা যখন হেসে হেসে কুশলাদি বিনিময় করার স্টেজে চলে গেছে, কেউ কেউ যখন পৌঁছে গেছে একসাথে চা খেতে যাওয়ার অবস্থায়; তখন আমি কি না আছি দূর থেকে একটু দেখতে পেয়েই ধন্য হওয়ার অবস্থায়!
আমি ভেবে পাই না, নিজে গিয়ে কীভাবে কথা বলা যায়! লজ্জা-কুণ্ঠার একটা ব্যাপার আছে না? আমি কেমনে সেই কুণ্ঠাটা ওভারকাম করব? পারব না!
আবার, তার ফার্স্টক্লাস পাওয়া নিয়ে যেমন গল্প ভাসছে বাতাসে বাতাসে; আমার পাওয়াটার বিষয়েও তো গল্প উড়ছে তখন-সেই হাওয়ায় হাওয়ায়ই!
সে ক্ষেত্রে আমি কেমন করে পারি উপযাচক হয়ে তার সাথে কথা বলতে যেতে? এটাও একটা বিশাল ব্যারিয়ার হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, দুজনের মাঝে।
দুজনের একটা কোনো কমন ফ্রেন্ড পর্যন্ত নেই! কে কথা বলিয়ে দেয় দুজনকে? কেউ না! সেসব মিলিয়ে, ব্যস! শুধু চলছিল একনজর দেখে ওঠার পালা।
দেখলে ভালো লাগে। না দেখলে বেদিশা লাগে। আর কিচ্ছু বুঝি না। শুধু বুঝি, আরও দেখতে মন চায়। নইলে মনটা টনটন করে।
সেই কথাটা যে কারও সাথে শেয়ার করি, এমন অন্তরঙ্গ একটা কাছের কেউও তো নেই। কিছু একটা বুদ্ধি দেয়, তেমনও কেউ নেই! বন্ধু আছে কত, কিন্তু কোনোজনকে ভরসা করতে সাহস হয় না!
এইভাবে কত যে দিন যায়! কিচ্ছু ঘটে না। আমিও একা একা দু-চার পশলা কেঁদে নিয়ে মন শক্ত করার উদ্যোগ নেই। নয়তো কী করব! আমার কোনো আশা যে নেই-সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারতে থাকি। দিনে দিনে তাকে ঘিরে রূপবতীদের ভিড় আরও বাড়ছে। বাড়ছেই। আমি ওদের পাশে দাঁড়াতেই পারি না! এমনই সাধারণ আমি!
এই ধারণাটা একেবারে পাকা হয়ে গেঁথে যায় আমার মনে!
এইভাবে এইভাবে থার্ডইয়ার এসে যায়। পড়ার জোর চাপ পড়ে যায় তখন।
সেদিন নোট করতে করতে আমার প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তবুও বিশেষ ভাবছিলাম না! কলাভবন থেকে কাঁঠালবাগান তেমন আর কোন দূরে! রিকশা পেতে যতক্ষণ। জলদি জলদি করে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে মসজিদের গেটের দিকে আগাতে থাকি আমি। শোয়েব হাসান আমার পথ আটকে দাঁড়ায়!
‘এভাবে হয় না কিরণ! আমি পুড়তে থাকব, আর আপনি দেখেও দেখবেন না, এটা ফেয়ার নাকি? এটা তো জুলুম!’
‘আমাকে কী বলছেন এসব? আমি বুঝতে পারছি না!’ আমি সব বুঝতে পারি। কিন্তু তাও অমন না বোঝার ভাবটা চলে আসে আমার মধ্যে।
‘বাসায় যাচ্ছেন তো? চলুন এগিয়ে দিয়ে আসি!’ শোয়েব হাসান রিকশা ডাকা শুরু করে!
এটা বিশ্বাস হয়? কেমন করে বিশ্বাস হতে পারে? আমার জন্য শোয়েব হাসান এইখানে, এইভাবে?
আমি বোধ করতে থাকি; বিস্ময়ে, আনন্দে আমার মাথাটা টলে টলে উঠছে! আহ! মনে হচ্ছে হার্টবিট বন্ধ হয়ে যাবে আচমকা!
আজকে এই তো প্রথম কথা বলা! সেও তো শুধু একটা দুটা মাত্র কথা! তার মধ্যেই এমন দাবি আর জোর নিয়ে কথা বলছে সে! আমার সাথে!
কে বলছে? না! বিখ্যাত শোয়েব হাসান! এতখানি কী আমার সহ্য হবে! কেমনে পারব আমি সহ্য করতে!
‘আপনি এগিয়ে দিয়ে আসবেন মানে কী?’ কোনোরকম আপত্তির গলায় আমি কী যেন সামাল দিতে চেষ্টা করি।
‘নইলে কথাগুলা বলব কীভাবে? যেতে যেতেই বলতে হবে!’ সে রিকশায় আমাকে ওঠার ইঙ্গিত করতে করতে বলে।
কী কা-! আমার বাসা কোনখানেÑআমি এখন কই যাব না যাব-তার কিছুই কি সে ঠিকঠাক জানে? এখন বলছে রিকশায় উঠতে! রিকশায় উঠব মানে কী!
‘আমি জানি আপনি কোথায় থাকেন। এর মধ্যে বার তিনেক গিয়ে দেখেও এসেছি আপনাদের বাসা। বোগানভিলিয়া গাছটাকে তো বলে এসেছি বারবার করে! আমার যাওয়ার কথাটা আপনাকে জানাতে বলে এসেছি! একবারও বলেনি আপনাকে?’
শুনে আমি বেদিশা হয়ে যাই।
যেতে যেতে একটুখানি পথ আমরা দুজন চুপ করে থাকি।
আমি চুপ থাকি, কারণ আমি কী করব বুঝে পাচ্ছিলাম না! কিছুর মধ্যে কিছু না, শোয়েব হাসান কিনা আমার পাশে বসা! এমনকি, কোনো দিন যার সাথে একটা কুশল জিজ্ঞাসারও সুযোগ হয়নি, সেখানে সে যাচ্ছে কি না আমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে! যা ঘটছে, যা দেখছি ও শুনছি-তার সব ভুল!
‘ভেবে দেখলাম আমি যা বলতে চাই কিরণ, সেটা আমার ভাষা দিয়ে কুলাবে না। রবীন্দ্রনাথকে লাগবে এখানে! শুনছেন?’ আমার দিকে হঠাৎই মুখটা ঘোরায় সে।
আমি মাথা নেড়ে বোঝাই, আমি বুঝেছি!
‘আপনি কিচ্ছু বোঝেননি। আমি বলতে চাইÑবলতে চাই-’ একটু যেন জড়তায় পেয়ে বসে তাকে। তবে সেকেন্ডের মধ্যে সে সামাল দিয়ে দেয় সেই অবস্থাটা। তারপর বলে, ‘বলতে চাই, অয়ি নিদ্রানিমগনা! আমার প্রাণ তোমারে সঁপিলাম!’
‘আমি নিদ্রানিমগনা?’ নিজের অন্তরের পুলক অন্তরে চাপা দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করি।
‘নও? তাই বলতে চাও? যদি জেগেই আছÑতাহলে আমি যে নিত্য মরছি-সেটা কেন দেখতে পাচ্ছ না? কই, দেখতে পাওনি তো!’
তারপর আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে সে আমার ডান হাতটাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে। তারপর বলে, ‘নিলাম! সমস্তটা জীবনের জন্য নিলাম!’
তখন আমার মনে হতে থাকে, যেন আমি মোম। তার দুহাতে আছে তেজি এক আগুন! আমি গলে যাচ্ছি আমি গলে যাচ্ছি! গলে গলে মিলিয়ে যাচ্ছি আমি তার দুই হাতের ভেতরে!
আমি বুঝতে পারছি, ভীষণ ভীষণ হ্যাপি হয়ে উঠছি আমি! এমন সুখ কখনো আসেনি জীবনে। এমন হ্যাপি যে হওয়া যায়, কখনো জানতামও না তো!
মনে হতে থাকে, আর কিছু পাওয়ারও নেই আমার! সব পাওয়া হয়ে গেছে। যেখানে যাওয়ার কথা ছিল জীবনে, সেখানেই যাওয়া হয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত! আহ!
ওইখানেই তো যেতে চেয়েছিলাম আমি, তাই না? এমন কথা মনে আসে। চোখ বন্ধ হয়ে যায় আমার!
আর আশ্চর্য! আমার বন্ধ চোখের সামনে কিন্তু শোয়েব হাসানের মুখটা ভেসে ওঠে না! ভেসে ওঠে অন্য কিছু!
তখন বন্ধ চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই ভাঙা ঘরটা! অনেক দূরের সেই ভাঙা ঘরটা! যার এককোণে একটা একমুখা চুলা। চুলায় জ্বাল নেই, কিন্তু গনগনা আংড়াগুলা ওই দেখা যায়! ওই দেখা যায় চুলার ভেতরে।
চুলার ওপরে লোহার কড়াইটা-ওই দেখা যায়! খুব কুচকুচে কালো হয়ে যাওয়া কড়াইটা ভরা দুধ। ভারী সর-পড়া হলদে হয়ে আসা দুধ।
আমার না ওখানে যাওয়ার কথা! সেই বুড়া নানিটা আমার ডান হাতটা ধরেছিল তো সেদিন? নিয়ে যাওয়ার জন্য হাত ধরে আমাকে টেনেছিল!
সেদিন এমনই সুখ লেগেছিল! এমনই সুখ! এখন কতদিন পরে আজকে আবার লাগছে! অনেক অনেক সুখ! সুখ পেতে পেতে আমি আচমকাই শোয়েব হাসানের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিই!
কীভাবে আমি ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলাম, কিচ্ছু মনে করতে পারি না। শুধু মনে করতে পারি, কোনোরকমে টলতে টলতে আম্মার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। বলতে পেরেছিলাম, আম্মা! আম্মা! আমার কেমন জানি লাগে! সেই ভাঙা ঘরটা আর চুলার ওপরের কড়াইটা আম্মাÑদেখা যাচ্ছে। ওই যে দেখা যাচ্ছে!
শোয়েব হাসান আমার জন্য গুনে গুনে চার দিন অপেক্ষা করে ভার্সিটিতে। তারপর বেপরোয়া পায়ে এসে দাঁড়ায় আম্মার সামনে। কীভাবে আম্মার পারমিশনটা নেয়, আমি তার কিছুই জানি না!
তারপরের সব কয়টা দিন যতক্ষণ পারে বসে থাকতে শুরু করে অচেতন আমার পাশে। দিনের পর দিন। মাথায় জলপট্টি দেয়। জাবড়ে ধরে বসায়, ওষুধ মুখে তুলে দেয়। আম্মাকে বিশ্রাম নিতে পাঠায়ে পাঠায়ে নিজে রোগী আলগায়।
কাউকে বলে দিতে হয় না কিছুই। সকলে বুঝে নিতে পারে, শোয়েব হাসানের সাথে কিরণের সম্পর্কটা কী।

পাঁচ.
এই অসুখটার সঙ্গে যে আমার সাত বছর বয়সে ঘটা ঘটনাটার একটা সম্পর্ক আছে; ইন ফ্যাক্ট, সেটা প্রথম ধরতে পারে নানু।
কারণ সাত বছর বয়সের ঘটনাটার পরেও এমনই জ্বর এসেছিল আমার। আসলে তখন আমার একার না! জ্বরটা এসেছিল আমাদের দুই বোনের। একই সময়ে একই দিনে! আমার আর আমার খালাতো বোনের।
নার্গিস বুজির তখন দশ বছর বয়স। আমার সাত। আমার চেয়ে তিন বছরের বড় ছিল নার্গিস বুজি! আমি কিরণ!
এখন তেমন ক্লিয়ার মনে আসে না ওর মুখটা। কেবল ঝাপসা মনে আসে একটা টিঙটিঙে শরীর, মাথায় যে কিনা সেই সাত-বছুরী কিরণের চেয়ে অনেক লম্বা! চুলগুলোও তার অনেক অনেক লম্বা! সব সময় এলোমেলো হয়ে থাকা লালচে লালচে চুল।
কিরণকে খুব খুব আগলে রাখতে চাওয়া সেই নার্গিস! কত দূরে ফেলে এসেছি তাকে! কত দূরে! অথচ এক দিন পাশে পাশে সব সময় দুজন। হাত ধরে ধরে চলতে থাকা দুজন! একসাথে চলতে চলতে জ্বরে-পড়া দুজন! চল্লিশ দিন ধরে জ্বরে পড়া!
সকলে নিশ্চিত হয়ে গেছিল, আর বাঁচার কোনো আশা নেই-দুজনেরই। ডাক্তার তো কিছুই ধরতে পারছে না! নিউমোনিয়া না। কালাজ্বর না। টাইফয়েডও তো না! কিন্তু জ্বর!
যেই জ্বরে দুজনেরই যাওয়ার কথা, সেখানে একজন রয়ে যায়। একজন আস্তে করে চলে যায়। নার্গিস চলে যায়। ও চলে যাওয়ার পরে সবার কেন জানি মনে হতে থাকে, নার্গিস আসলে কিরণের জানের আলাই-বালাই নিজের ওপর নিয়ে নিয়েছে বলেই কিরণ দুনিয়াতে থাকার নসিবটা পেল!
বড় মায়া-বাসনা-দরদের জুড়ি ছিল তো দুই বোনের!
সেই নার্গিস বুজিকে আমি স্মরণে আনি না আজকে কত বছর! কিছুমাত্র মনে করি না! এদিকে বছরের পর বছর চলে যায়, একটাবার- ওনলি ফর অ্যা ফিয়ু সেকেন্ডস-ওকে মনে করার ফুরসত আসে না আমার!
সারাক্ষণ নিজের জন্য উদ্বেগ। চাপা টেনশন। কখন-কখন না আবার সেই অসুখটা ঝাঁপ দিয়ে নেমে আসে আমার শরীরে! কখন না আবার!

ছয়.
আম্মা সবকিছু মিলিয়ে-টিলিয়ে দেখে, শেষে বলেছিল; ‘পারতে নিজেরে সুখী ভাববি না! যত সুখই আসুক, মন ঠান্ডা রাখবি। নিজেরে সবসোময় মনে মনে কবি, আমার জীবনে যা আসতেছে-এইটা এমুন কী আহামরি কারবার! কিচ্ছু না! এমনটা সব মাইনষেই পায়। কাজেই আহ্লাদ করবি না তুই, আমার মন!’
আমি সেই কথা মন্ত্রের মতো জপেছি মনে মনে, সর্বক্ষণ! কখনো জপতে ভুল করিনি, আমার বিয়ের দিনেও সর্বক্ষণ শুধু সেই কথা জপে গেছি। শোয়েবের মূর্খতাকেও একবার মনে আসতে দিইনি। শুধু জপ। জপতে জপতে, মনে মনে কাঁদতে কাঁদতে, বলেছি-কবুল! কবুল!
সেই কথাই জপতে জপতে ভেজা চোখে দেখতে পেয়েছি, আব্বা আম্মা আমার হাত তুলে দিচ্ছে শোয়েবের হাতে। ওর মা-বাবার হাতে।
বড় ভীষণ ঝটপটিয়ে উঠতে চেয়েছে তখন আমার ভেতরটা!
নানু বাড়িতে নানুর পোষা কবুতরগুলোর কোনো কোনোটা যেমন পরিতোষে আর সুখে ডানা ঝটপটাতে থাকত প্রায় প্রায় শোয়েবের হাতের ভেতরে, সামাজিকভাবে নিজের হাতকে এলিয়ে যেতে দেখে-তেমন ডানা ছড়ানোর জন্য আমার মনটা চিৎকার করে উঠতে চাইছিল বারে বারে, তখন! সুখী আমি! খুব সুখী! এইকথা নিজেকে শোনানোর জন্যই পাগল পাগল লাগছিল আমার ক্ষণে ক্ষণে!
কিন্তু আমি একটুও সেই সুখের চিৎকারকে পাত্তা দিইনি! না না! অমনটা করা যাবে না-যাবে না!
আমি জানি তো এখন কী করতে হবে! জপতে হবে, আম্মার শেখানো সেই কথাটা! আহ্লাদ করবি না তুই, আমার মন! এইগুলা কিচ্ছু না! সব মাইনষেরই জীবনে আছে এইসব! অতি তুচ্ছ জিনিস নিয়া লাফাইতে নাই, মন!
আম্মা আর নানু ভয়ে ভয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকে। বউভাতের দাওয়াতে যায়। জামাই-মেয়েকে নিয়ে ফিরা-উল্টির কাজকর্ম সারে। বিয়াইন-দাওয়াতের ফর্মালিটি শেষ করে। মুখে কেমন একটা বানানো হাসি ধরে রাখে দুজনে।
ওই হাসির নাম আসলে ভয়। ভয়! আমি না ভুল করে আমাকে সুখী ভেবে ফেলছি কোনো ফাঁকে! আমি না মনের ভুলে আবার সুখ-ঢলঢলো হয়ে গেছি! তাহলেই তো বিপদ।
জ্বর আসতে দেরি হবে না তাহলে!
আমার অজ্ঞান হয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না তাহলে আর! তারপর শুরু হবে সেই চল্লিশ দিনের যুদ্ধটা। যম-মানুষের যুদ্ধটা!
তারা দুজনে এয়ারপোর্টেও যায় আমাদের দুজনকে বিদায় দেওয়ার জন্য। আমি বুঝতে পারি, যাওয়াটা আসলে মোটেই সি-অফ করার জন্য নয়!
যায়, আমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, এইটা কোনো সুখ না! এমুন বিয়াশাদি কামলা-মজুরেরও হয়। ফকির-মিসকিনেরও হয়। হাউল্লা-চাষিরও হয়। এইটা দুনিয়ার একটা নিয়ম পালন করা হইছে মাত্র। সুখের কিছু নাই এইখানে!
এয়ারপোর্টে আমার কানের কাছে একটু পরপর এই কথা বলতে থাকে দুজনে। এবং নানাভাবে শোয়েব ও আমাকে হাসিমুখে বিদায় দেওয়ার ভাণ করতে থাকে!
কিন্তু আমি দেখতে পাই, তাদের পুরা মুখ কাতরের কাতর-কাহিলের কাহিল! চোখে হাসির কোনো নামচিহ্নও নেই! তাদের দেখতে দেখতে নিজের জন্য নিজের ভয়টা মনের ভেতরে ফিরে আসে।
আমি মুখে হাসি ধরে রাখার জোরটা পাই না মোটেই। তখন কেবল সেই কথাগুলা জপতে থাকি! সুখের কিছু হয় নাই এইটা! তুচ্ছ জিনিস নিয়া লাফাইতে নাই। আহ্লাদ করতে নাই রে, মন!
বিয়ের সব কাজকর্ম যেমন নির্বিঘেœ নিরাপদে শেষ হয়, তেমন নিরাপদেই কেটে যেতে থাকে দুজনের সংসার জীবন। বিপদ-বালা কিচ্ছু আসে না।
আবার একটা শঙ্কা দেখা দেয় বিয়ের দুই বছরের মাথায়, তিয়াস পেটে আসার পরে। দুজনের ভালোবাসার সংসারে, এই তো প্রথম বাচ্চাটা আসছে! এর চেয়ে সুখের দিন আহ্লাদের কাল কী আছে একটা মেয়ের জীবনে!
খবরটা শুনে আম্মা আনন্দ পেতে যায়, কিন্তু তখনই তার মনে আসে এটা মস্ত সুখের কথা হতে পারে ঠিক-কিন্তু সেই সুখ নিয়ে মাতামাতি করার কপাল তো আমাদের না!
আম্মা এইবার প্রচণ্ড বিচলিত হয়ে পড়ে। প্রথম বাচ্চাটা আসছে। কোন মুখে, কেমন করে এই প্রথম পোয়াতি হতে যাওয়া মেয়েটাকে তার মায়ে বলবে, এইটা বেহুদা ঝামেলার জিনিস! জিন্দিগির শান্তি নষ্ট করে দেওয়ার আপদ হচ্ছে এই পোলাপান! এই নিয়া মনে সুখ পাওয়া হইতাছে আহাম্মকি! বলা যায় এমন মিছা কথাটা!
কিন্তু না বলেও যে উপায় নাই! বেহুলার লোহার বাসর ঘরেও সুতানলি সাপ ঢুকছিল। দংশনও করছিল! এখন কিরণের মনে যত কিনা সুখ না থাকার মন্ত্র জপাজপি চলতে থাকুক, এমন আসল সুখের কালে যদি সুখের একটা ঝাপটাও গিয়ে লাগে তার অন্তরে, তবেই তো সর্বনাশ! তবেই তো অসুখটা আবার এসে দাঁড়াবে তার এই জীবনে!
বাচ্চা পেটে নিয়ে সেই অসুখে পড়লে, পেটের বাচ্চা তো পেটে মরবেই। কিরণেরও বাচ্চা হবে কি না-কে বলতে পারে! আগে একলা তার নিজের শরীরটাই ভুগত। এখন তো ভেতরেরটাও ভুগবে! কী হবে রাহমানুর রাহীম!
এইবার আমি আম্মাকে সামাল দিই। আমি বলি যে, খামাখাই ডর করেন আপনে আম্মা! আমার তো একটুও সুখ লাগতাছে না! এটা সত্য কথা আম্মা! কেমনে সুখ লাগবে-বলেন তো আপনে! সবদিকে সব হইতাছে। খালি আমার ক্যারিয়ারটা ছাড়া! শোয়েব হেসে খেলে সিভিল সার্ভিস পেয়েছে। অ্যাডমিনিসট্রেশনে।
আমার সিভিল সার্ভিস পছন্দ না। জবের জন্য ইউনিভার্সিটিকে আমার সবচেয়ে ডিজায়ারাবল প্লেস বলে মনে হয়েছে চিরকাল! আমার তো চারটা ফার্স্টক্লাসও!
কিন্তু কই, কোনো দিকেই তো আগাতে পারছি না! এই কথাগুলা মনে আসে, আর মনে মনে খুব তিতা লাগতে থাকে আম্মা! এখনো অনেক তিতা লাগছে!
কোনোদিকে কোনো সুখের নামনিশানাও তো দেখতে পাচ্ছি না! তাইলে ক্যান আপনে ভাবনা করেন? আমার কিচ্ছু হইব না। দেখবেন, কিচ্ছু না!
আমার কিচ্ছু হয় না।
তিয়াস জন্মায়, দিনে দিনে বড়ো হয়। আমার কোনো অসুখ করে না।
ও স্কুল পেরিয়ে কলেজে যায়, সেই অসুখটা আমার শরীরে দেখাই দেয় না।
লোকে তখন আমার জীবনে সুখের হুলুস্থুল দশা দেখতে পায়। কিন্তু আমার সেই মন্ত্র জপা মোটের ওপর থামেই না! এবং অসুখটাকেও আসতে দেখা যায় না।
তিয়াস বড় হতে হতে-দেশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রান করানোর একটা ফ্যাশন দেখা দেয়। লোকেরা ছেলেমেয়েদের সেখানে পড়তে পাঠানোর জন্য ভালো রকম উদ্গ্রীবও হয়ে ওঠে। আমিও খুঁজে পেতে নিজেকে ঢুকিয়ে নিই, মোটের ওপর নামডাক অলা একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। ঢুকে এক বছর একদম ঠিক থাকি। এক বছর পর এক দিন ঘুষঘুষা রকমে জ্বরটা দেখা দেয়।
ও! বলতে মনে ছিল না!
শোয়েব তখন কেবল গেছে গ্লাসগোতে। পিএইচডি প্রোগ্রামে। ও যাওয়ার পরে এক সপ্তাহও যায়নি, ইউনিভার্সিটি ফেরতা পথে আমার অনেক অবশ অবশ লাগতে থাকে। একটু পর পর যেন সেন্স হারাতে থাকে, আবার যেন ফিরে আসতে থাকে। সেন্স যখন লোপ পেতে থাকে, তখন সেই ভাঙাভোঙা বেড়ার ঘরটা দেখতে পেতে থাকি! সেই জ্বলজ্বলা আংড়াভরা চুলাটা দেখতে পেতে থাকি। ঘিয়া ঘিয়া সরপড়া দুধের কড়াইটার ডাক শুনতে পেতে থাকি, আইবা না? তোমার লেইগা বার চাইয়া রইছি তো? আহো!
আমি কোনোমতে তিয়াসকে বলি, আব্বু! নানুকে বলো আমি সিক হয়ে পড়েছি! আর্জেন্ট আব্বু!
এবার আমার মায়ের পাশে তিয়াস বসা থাকে। আর তো কেউ নেই!
মরে যেতে যেতে আবার ফিরে আসি আমি। আম্মা বলে, এবার তুই আমার কান্দনে ফিরা আহস নাই। যমে তরে থুইয়া গেছে, তর পুতের কান্দন দেইখ্যা! খোদায় একটা সোনার টুকরা পুত দিছে বংশে!
সেই সোনার টুকরা যেদিন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার জন্যে আমাদের এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পার হয়, তখন কিনা বাসায় ফেরার জন্য গাড়িতে উঠতে উঠতেই আমি বোধ করতে থাকি-আমার শরীরটা সুবিধার লাগছে না!
সেই পুরোনো রকমের অবশ অবশ লাগছে! সেন্স মুছে যাচ্ছে যেনো একটু পর পর, একটু পর পর যেন জেগে উঠছি আমি। কোন দূরে সেই ভাঙা ঘরটা যেন ওই দেখা যায়! আমার গাড়িটা যেন আমাকে সেইখানেই নিয়ে যাচ্ছে! যাচ্ছি আমি তাহলে এত দিন পরে!
আমি কোনোমতে শোয়েবকে বলি, আম্মাকে একটা খবর দিতে পারবে? আই-আই ডোন্ট ফিল গুড!
শোয়েব খুব রেগে উঠে বলতে থাকে, ‘বলেছিলাম না, তুমি পারবে না ওকে ছেড়ে থাকতে? বলেছিলাম না, তুমি যাও সাথে? কথা তো শুনবে না! গোঁয়ার্তুমি করা ছাড়া কিচ্ছু বোঝো না! এখন হলো তো?’
আমি শোয়েবের কথা শুনতে শুনতে অন্ধকারের একদম তলে চলে যাই!
সবাই বলে, উফ! তিয়াস যে মায়ের এমন নয়নমণি-বোঝা তো যায়নি এমন করে, এত দিন! এই অসুখটা সেটা ক্লিয়ার করে দিল! বাপরে বাপ! ছেলে তো প্লেনেও ওঠেনি তখনো, তার আগেই মা কিনা অসুখে পড়ে শেষ! মরে যে যায়নি-সেই রক্ষা!
চল্লিশ দিন পরে জ্ঞান ফিরে আসে আমার। সকলের কথা শুনতে শুনতে কাহিল লাগতে থাকে মন। কোনো উত্তর করতে পারি না।
আম্মা তার দিশাহারা মুখটা আমার কানের কাছে আনে। জিজ্ঞেস করে, তিয়াস গেছে গা দেইখ্যা তর সুখ লাগছে? সুখ পাইছস তুই? নিজেরে সুখী মনে করছস তুই কোনো কারণে? ক্যান অসুখ করল তর? সুখেরে তুই পাত্তা দিছস কোন কারণে, পাষাণী? জপ করতে যে ভুইল্লা গেছিলি, সেইটা তো বোঝাই যাইতাছে!
আমি আম্মার আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরে বলি, আম্মা! আমি বুঝতে পারতাছি না আম্মা! আমি জানি না-কী হইছে!
সেই আম্মাও তো এখন আমার পাশে আর নেই। আজকে পাঁচ বছর ধরে নেই! আজকে পাঁচ বছর ধরে আমিও আর সেই জপ মন্ত্রগুলা লাগাতার আউড়ে যাই না।
মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হলে জপি।
যখন হঠাৎ আম্মাকে স্পষ্ট রকমে মনে আসে, তখন আম্মার সেই কাতর হুকুমগুলাও কানে বেজে ওঠে; ‘যেমনে যেমনে কইছিলাম, সেমনে সেমনে করতাছস না কইলাম, কিরণ!’
আমি তখন হুড়াহুড়ি করে নিজেকে নিজে শোনাতে থাকি; ‘তুচ্ছ এই দুনিয়াদারি নিয়া আহ্লাদ করবি না তুই, আমার মন!’

সাত.
এই বিদ্ঘুটে রোগটা আমাকে ধরেছে আমার সাত বছর বয়স থেকে! এক বৈশাখ মাস থেকে এই অসুখটা শুরু হয় আমার।
সেটা ছিল বৈশাখ মাসের প্রথম দিন। একদিন, অনেক দিন আগে।
ভোরবেলার বাতাসে নিমফুলের গন্ধ ছিল। উঠানের গাছের আগায় আগায় ভোর সকালের নতুন রোদ ছিল।
একটা ঝাঁকড়া আমগাছের নিচে গুছিয়ে অনেকগুলা পিঁড়ি ও জলচৌকি পাতা ছিল। বাঁকা চাঁদের মতো বাঁকানো করে পাতা-সেই পিঁড়িগুলার সামনে-রাখা ছিল একটা বেতের মোড়া!
পিঁড়ি ও জলচৌকিগুলো গুঁড়াগাঁড়া পোলাপানদের জন্য। মোড়াটা মাতামহীর জন্য।
কাঁসার গেলাসে গেলাসে বেলের শরবত ছিল। সেই ভোর সকালবেলা!
‘আউজকা বচ্ছরকার পইল্লা দিন! একটা জনেরেও য্যান কোনো বেতালা কাম করতে না দেহি! আউজকা য্যান কোনোটায় বান্নির দিকে পাও বাড়াবি না!’ নানু আমাদের প্রতিজনের হাতে বেলের শরবতের গেলাস ধরিয়ে দিতে দিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে চলছিল, সেই ভোরে। ‘বিবি কুলসুম বিবি জয়নব-এই দুই বইনে কিন্তুক এই বংশেরই মাইয়া। বচ্ছরকার পইল্লা দিনে গেছিলনি দুই বইনে বান্নিত? আর কইলাম জ্যাতা ফিরা আহে নাই তারা!’
সেই কষ্টের গল্পটা শুনে শুনে আমাদের সবার একদম মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সেই কোন আগেকার কালে, বাড়ির ছোটো দুটা মেয়ে, একলা একলা মেলায় গিয়েছিল। বছরের প্রথম দিনেই গিয়েছিল।
ফেরার পথে বৃষ্টি দেখে দুই বোনে দাঁড়ায়েছিল একটা গাছের নিচে। বউন্না ফুলের গাছ। ফুলে ফুলে সাদা ফকফক করতে থাকা বউন্না গাছের নিচে সেই দুই বোনকে মরা পাওয়া যায়! সকলে বলে, আঁতকার মিদে হয়তো বাজ পড়ছিল ছেড়ী দুইটার উপরে! ধুম ঝড়-তুফান হইতাছিল না তহন?
সেই দুই বোন আমাদের দূরের কেউ না! আপন! নানাভাইয়ের ছোটো দুই বোন তারা। বেঁচে থাকলে হয়তো এত দিনে নানুর বয়সের হতো তারা!
ওই দুই বোনের কথা শুনতে শুনতে সেদিন সকালেও, আমাদের প্রতিটা জনের গা-ছমছম করতে থাকে!
ভোর সকালে সেইদিন আমরা বাধ্যতামূলকভাবে উঠানে বসা। উঠানের এক কিনারে। আমাদের দক্ষিণমুখী বড় ঘরখানা বাড়ির উত্তর সীমানায়। সেই ঘরের একটু সামনে খাড়া হয়ে আছে সিঁদুরে-আমগাছটা।
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুতে যখন এই গাছের আম পেকে উঠতে থাকে, তখন এর নিচের দিকের ডালে ডালে সবজে-রঙা বিচ্ছুরা নড়ানড়ি শুরু করে।
সেই অনেক দিন আগে, আমরা তাদের ছ্যাঙ্গা নামে চিনতাম। ডাকতামও।
ছ্যাঙ্গারা সেই জ্যৈষ্ঠ মাসের দিনে বিরাম বিশ্রাম ভুলে কেবল নড়তে থাকে নড়তে থাকে, তারপর ধপ্পাত করে করে নিচে পড়তে থাকে।
হাজারে বিজারে খুদে খুদে সবুজ বিচ্ছু! তাদের পুড়িয়ে মারার কাজ করতে করতে বাড়ির ছেলেগুলা জেরবার তখন।
তবে সেটা জ্যৈষ্ঠ মাসের দিনের সমস্যা। চৈত্র-বৈশাখে এই গাছ ডালে ডালে কচিকাঁচা আম নিয়ে নিয়ে লক্ষ্মী ও ঠায় ঠান্ডা একজন হয়েই থাকে।
সেই দুই মাসে বাড়ির দরকারি বিচার-সালিস ও হুমকি-ধমকির সকল কাজ সারা হতে থাকে এই গাছের ছায়ায়ই বসে বসে।
বিচার সালিস বা ধমকি হুমকির ঘটনা এই বাড়িতে নিত্যই ঘটে। পোলাপানের দঙ্গ লটা বিরাট, এই বাড়িতে। মামাতো ভাইবোন ছয়জন। আমি একা একজন। তার সাথে এসে প্রায় প্রায়ই যুক্ত হয় পাঁচ খালাতো ভাই ও বোন!
এদের মধ্যে কোনো কোনোটা আছে খুব নরম-সরম, খুব ভিতু। কোনো বেতালা কাজ করতে এরা যায় না। সেসব কিছু করার বুদ্ধি পর্যন্ত সেই কয়টার নেই। তাদের নিয়ে বড়দের ডর-ভয়-চিন্তা নেই। দু-তিনজন আছে মাথা-উঁচানো ডাঙর। বুঝবুদ্ধি করে চলতে পারে। তাদের নিয়েও ভাবনা করার কিছু দেখে না বড়রা। চিন্তা শুধু আধ-মাঝারি কয়টার জন্য।
সেগুলার মাথার মধ্যে কেবল শয়তানি বুদ্ধি-ফাড়াত ফাড়াত করে দৌড় দিতে থাকে। সেসব দুষ্ট বুদ্ধির পেছনে পেছনে এই আধ-মাঝারিগুলাও দিনভরে দৌড়ানি দিতে থাকে। খুবই অস্থির অবস্থা এইগুলার!
পয়লা বৈশাখে তাদের সেই অস্থির ফাল-লাফটা বেজায় বেড়ে যায় বলে, এত হুঁশিয়ারি দিয়ে যেতে হয় নানুকে।
নিজেদের বাড়িতে আমগাছের সীমাসংখ্যা নেই। তবুও বচ্ছরকার এই দিনেই পড়শীদের আমগাছে ঢিল মারতে খুব ভালো লাগে এই আধ-মাঝারিগুলার। বা কারও কারও গোয়ালের শান্ত-লক্ষ্মী গরুকে সামনে থেকে একজন কাঁঠালপাতা খাওয়াতে থাকে, পেছন থেকে অন্য জন দুধ দোওয়ায়ে মাটির ছোট লোটাটা ভরে ফেলতে থাকে। পুরাটা বছর সুন্দর রকমে এমন অস্থির যাতে যায়, সেই জন্যই বছরকার পয়লা দিনে এমন সব কাজ করা!
এটা ছাড়া আর কোনো কারণ নেই-অন্য মানুষদের জিনিসপাতি এইভাবে লুটতরাজ করে নেওয়ার! এদিকে, কোনো কিছুই তো বেশি করে নেয় না পোলাপানে! আম পাড়লে পাড়ে মাত্র দশ-বারোটা! দুধ দোহায়ে নিলে, নেয় মাত্র ছোট এক লোটা দুধ।
তাই নিয়ে পড়শীদের কত নালিশ দেওয়া-দেওয়ি। কত কুকথা বলাবলি! সবচেয়ে বেশি নালিস আসে নার্গিসের নামে। গ্রামের দশজনে তারে তার নানাবাড়িতে পা-টা রাখতে দেখলেই বলতে থাকে, এই! আইছে শনিয়ে! অখন কেউইর আর শান্তিতে থাকোন লাগব না!
সেই সকালে, নানু নার্গিস বুজির দিকে চোখ রাঙানি দিতে থাকে একের পর এক। ‘খবরদার কইলাম! আউজকা য্যান একটা নালিশ না আহে বাড়িত! বচ্ছরকার পইল্লা দিন কইলাম! আলিক্ষি আনিস না কিন্তুক!’
বুজি বেলের শরবতে ঘন ঘন চুমুক দিতে থাকে, আর বলতে থাকে; আইচ্ছা আইচ্ছা!
নানুর কথা শেষও হয় না, মামা এসে জনে জনে পয়সা বিলানো শুরু করে। এই পয়সা খরচ করার জন্য না! সব কয়জন পোলাপানের জন্য মাটির ব্যাংক কেনা আছে। বছরের পয়লা থেকে তাতে পয়সা জমানো শুরু করতে হয়।
মামা কোনো জনরে দশ পয়সা দেয়, কাউরে পাঁচ পয়সা, কাউরে আবার বিশ পয়সা। দিতে দিতে কিরণের কাছে এসে, ওর মাথায় ঠক্কাস করে একটা আদর দেয়। অন্য সবার অনেকগুলা করে ভাইবোন আছে, কিরণের কেউ নেই। কিরণ শুধু একলা। সেই কারণে ছোটরাসুদ্ধ যখন তখন কিরণের মাথায় ধুপধাপ আদর ফেলতে থাকে।
আহারে! উয়ে একলা! একলা ছোট মানুষ! কোনো আপনা ভাইবোন নাই এইটার! এই ভাবনাটা এই বাড়ির বড়ো-ছোট সকলের মনে সব সময় থাকে বলে, কিরণ সকলের চেয়ে বেশি আদর পায়। মামা তো আদর করবেই!
আদরটা সেরে মামা কিরণের হাতে পয়সা দেয়। ভাইবোনেরা দেখে, কিরণের হাতে একটা চকচকা সিকি! সব কয়জনের থেকে বেশি পয়সা, কিরণের হাতে! তারপর বড় খালা আসে। নার্গিস বুজির মা!
খালাও মামার মতো করেই অন্য সকলের হাতে বুঝমতো পয়সা রাখে। কিরণের জন্য সেই এক সিকি!
আম্মা চেঁচাতে থাকে, আর না! আর না! অরে বেশি দেওয়া হইয়া যাইতাছে! আর দিয়েন না কিরণরে!
কিন্তু কেউ শোনে না। সবার শেষে নানু

Disconnect