ফনেটিক ইউনিজয়
মধ্যরাতের ফাঁসির মঞ্চ
হরিপদ দত্ত

একটি হিংস্র নেকড়ে অন্য একটি নেকড়েকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। ক্ষুধা নয়, উদরপূর্তি নয়। জিঘাংসা, হত্যার স্পৃহা। কোথায় শিকার? প্রতিশোধের ঘৃণা রক্ত আর মগজে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। শিকার অদৃশ্য হলেই বাতাসে গন্ধ তালাস করে। সেই ঘ্রাণই চিনিয়ে নিয়ে যাবে শিকার ভূমিতে। না শিকার অদৃশ্য। ঘন অরণ্যের আড়ালে শিকার গা ঢাকা দিয়ে আছে। পশু নয়, মনুষ্য শিকার। খলিল মিয়া। নারী পাচারকারী। তিনবার জেলে গেছে। প্রতিবারই খালাস। প্রমাণ নেই অপরাধের। জেলা শহর থেকে বহু দূরের গ্রাম। ব্রহ্মপুত্র নদের চর। হতদরিদ্রের গ্রাম। একাত্তরের স্বাধীনতা আর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে এখানে কেউ তন্নতন্ন করেও খুঁজে পাবে না। বর্ষায় বানে ভাসে এ গ্রাম। লোকে বলে মজুরের গাঁ। বছরের সাত মাসই পুরুষেরা বেগার খাটতে পরবাসে যায়। পুরুষহীন পড়ে থাকে গ্রাম। ইদানীং বেওয়া বা বিধবারাও বাসা-বাড়ির কাজের তালাসে বিনা টিকিটে ট্রেনে চাপে। এ যেন সুখ সন্ধানীদের আনন্দযাত্রা।
পাশের গাঁয়ের কসাইখানার গরুর দালাল নামে খ্যাত খলিল মিয়া ওরফে খইল্যা দালালের পোয়া বারো। পুরুষশূন্য হতদরিদ্র এই গ্রাম বা তল্লাট। শহরে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় নারীদের পাচার করে সে। ঠিক তেমনি একটা স্বপ্ন আলতাফের বৌর সামনেও দুলে উঠেছিল একদিন। যৌতুকের শিকার হয়ে বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় আলতাফের মেয়ে নূরবানু বাপের ঘরে ফিরে আসে। স্বামীর ঘর ভাঙা মেয়ের নসিবে যে দ্বিতীয় বিয়ে সহজ নয়, মেয়ে যতটা জানে, বাপ-মা জানে তার শতগুণ। এটাও জানে বিয়ে ভাঙা ঘরে ফেরা মেয়ের বোঝা বহন করা কতটা কষ্টসাধ্য।
তাই তো এক দিন আলতাফের মেয়ে নূরবানু খলিলের হাত ধরে জিনের অদৃশ্য সুরতে হাওয়া হয়ে যায়। হ্যাঁ, জিনই বটে। এই আদিম বিশ্বাসের গাঁয়ের অনেকেই বিশ্বাস করে, খলিল জিনের তরিকা জানে। না হলে যে মেয়ের ওপর একবার তার নজর পড়ে, তাকে সে আজ হোক কাল হোক গ্রাম থেকে হাওয়া করে দেবেই। সেই হাওয়া হবার দিন খলিল যখন হাজার টাকার প্যাকেটটা আলতাফের বউয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল শহরের কাজে কোম্পানির অগ্রিম মায়না হিসেবে, মানুষটা বোবা বনে গিয়েছিল। টাকা তো নয় জিনের স্পর্শে সে বোধ ভাষা হারিয়ে ফেলে।
প্রাচীনদের মুখে রূপকথা সোনার মতোই। এই যে বলে-দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, পরির দেশ থেকে রাজকন্যা আর ফেরে না। ঠিক তেমনি টানা চার মাস মায়ের সঙ্গে নূরবানুর যোগাযোগ নেই। ওই যে শহরে যাবে বলে নদীর চরের বালির দিগন্তরেখায় হেঁটে গেল, তারপর জিনের মতোই অদৃশ্য হয়ে যায়। দূর জেলায় খাটতে গিয়ে একদিন ঘরে ফেরে আলতাফ। গাঁয়ে ঢুকেই জানতে পারে খলিলের হাত ধরে তার তালাক পাওয়া মেয়ে শহরে গেছে গার্মেন্টসের কাজ নিয়ে। এটাও জানতে পারে চার মাস তার কোনো সংবাদ নেই।
স্ত্রী সেতারাকে কেবল দোষারোপই করে না আলতাফ, হাত তোলে গায়েও। গালাগাল করতে গিয়ে প্রচলিত এমন অশ্রাব্য শব্দ প্রয়োগ করে যাদের আদি উৎস অনার্য ভাষা। অনার্য ভাষা লোপ পেলেও অনার্য রক্তবাহী বাঙালি তো কিছু শব্দ বংশপরম্পরায় হাজার বছর ধরে রক্ত ও জিনে বহন করছে।
কিন্তু তাতে কি কন্যা নূরবানুকে খুঁজে পেল? খলিল দালালের এক কথা। যে গার্মেন্টেসে কাজ নিয়েছিল নূরবানু, সেই কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য গার্মেন্টসে চলে গেছে। যাবেই তো! মায়না অধিক। কোন গার্মেন্টস? খলিল তা জানে না। থানায় গিয়েছিল আলতাফ। সামান্য একটা সাধারণ ডায়েরিও করতে পারেনি। দারোগা সাহেব বলে দিয়েছে তালাক পাওয়া মেয়েরা নাকি জিন হয়ে যায়। তারা অদৃশ্য হওয়ার তরিকা জানে। পাশে থাকলেও কেউ তাদের দেখতে পায় না।
আলতাফ বুঝতে পারে তার মেয়ে পাচার হয়ে গেছে। দেশের ভেতর নাকি সীমান্তের ওপারে? ভয়ে শরীর কেঁপে ওঠে। কান্না, হাহাকারে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তারপর একদিন তার রক্ত, মগজ আর হৃদপিণ্ডে জন্ম নেয় হিংস্র এক নরখাদক নেকড়ে। প্রতিশোধ চাই। হীনতা, দুর্বলতা নয়। আদম সুরত বদলে হয়ে যায় জন্তু। তার বিবেক-বুদ্ধি প্রতিহিংসার তরল রক্তে ডুবে যায়। সে একটি শিকার চায়। তার রক্ত দিয়ে গোসল করবে সে। এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছাতে নিজের বিরুদ্ধে নিজেই লড়াইয়ে নেমেছিল। মাঝেমধ্যে আতঙ্ক আর ভীরুতা তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। আকাশে হাত তুলে করুণাপ্রার্থী হয়েছে। বিচার চেয়েছে। বাঁচার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তাকে পরাজিত করেছে। একসময় চোখের সামনে গভীর অন্ধকার দেখতে দেখতে আচমকা সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে ক্রমবিবর্তনের ভেতর মানুষ থেকে জন্তুতে পরিণত হয়ে যায়। প্রবল রক্ততৃষ্ণা আর হিংস্র প্রতিহিংসার মনুষ্যত্বের বিলয় ঘটে। কিন্তু শিকার কোথায়?
এক ত্রিসন্ধ্যায় খলিলকে সে দেখতে পায় প্রায় পানিশূন্য কর্দমাক্ত একটি খাল পার হচ্ছে। ধারেকাছে কেউ নেই। কাদায় আটকে পড়া ফাঁকড়া আর ল্যাটা মাছ সন্ধানী নেউলেরা ছুটে বেড়ায়। অনতিদূরের কলা-বাগানে ঢুকে পাতা খাচ্ছে রশি ছেঁড়া একটি বলদ। ছাগলের ডাক শোনা যায়। সত্যি পেটে ক্ষুধা আলতাফের। দুদিন ধরে খেতে পারছিল না। ক্ষুধা অথচ পেটে ভাত ঢুকছে না। সে বুঝতে পারে ক্ষুধাটা পেটে নয়, মগজে। ক্ষুধাটা ভাতের নয়, তাজা রক্তের। একটা মানুষকে খুন করবে সে। পশু জবেহ হতে দেখেছে। দেখেনি কেবল মানুষ খুন। যে মানুষটা তার যুবতী কন্যাকে হাওয়া করে দিয়েছে, তার শক্তি সম্পর্কে তার ধারণা নেই সত্য। কিন্তু আচমকা আক্রমণে তাকে পরাজিত করা কঠিন কাজ নয়। যদি ব্যর্থ হয়, তবে খলিলের হাতে তাকে যে কতল হতে হবে এ বিশ্বাস তার আছে। কিন্তু কন্যা নূরবানুর জন্য পিতা হিসেবে প্রতিশোধ যে তার দায়।
খালের বেত ঝোপের আড়ালে বসে থাকে আলতাফ। হাতে খেজুরগাছ কাটার ছেনি দা। ধারালো। সাপের সাদা ছলমের মতো ঝকঝক করে। মাটির দুনিয়ার নয়, দা-টা যেন দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো আসমানে লটকে আছে। চারদিকে শূন্য আসমান। মাঝখানে ধারালো বাঁকা চাঁদ। খালের ঢালু পাড় বেয়ে শরীরের টাল সামলে যেই না ওপরে আসতে থাকে খলিল, বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গিয়ে আচমকা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আলতাফ। টানা আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে খলিল গড়িয়ে পড়তে থাকে খালের কাদায়। একটার পর একটা কোপ। সন্ধ্যার ছায়াচ্ছন্ন মরা আলো আর কাদা জলের কালো রঙে খলিলের রক্ত চুইয়ে খালের তলানীর দিকে গড়াতে থাকে। আলতাফ অস্ফুট দম ফেলে, ‘আমার তালাক পাওয়া মাইয়ায় যদি দ্যাখতো তবে তোরে কি মাফ করত বেইমান।’
সন্ধ্যার অন্ধকারে রক্ত ভেজা শরীর ঠেলে দা হাতে ধীরে ধীরে হাঁটছে আলতাফ। কোথায় যাবে সে? পালাবে কি? না, পালাবে না। সে যে খুনি। নর হত্যার অপরাধী। স্বেচ্ছায় শাস্তি পেতে চায় সে। কিন্তু এখন তার ভীষণ ক্ষুধা। দুদিন ঠিকঠাক খেতে পারেনি। ক্ষুধা শীতের সাপের মতো শীত ঘুমে ছিল। এখন সে জেগে উঠেছে। থানার যে দারোগা তার মেয়ের হারানো ডায়েরি লিখতে চায়নি তার কাছে ফিরে গিয়ে রক্তাক্ত ছেনি দায়ের বিনিময়ে এক মুঠো ভাত ভিক্ষা চাইবে সে। সন্ধ্যা পেরোনো এই কালো প্রহরে তাকে অন্তত আরও চার মাইল পথ হাঁটতে হবে। মনে হলো এই চার মাইল পথ ক্রমাগত হেঁটে চলা একটি হত্যাকা-ের চেয়েও কঠিন কাজ। হাতের রক্তভেজা দাটি কেন এত ভারী মনে হচ্ছে?
জনশূন্য নিস্তদ্ধ বালিময় পথ। পাশেই রাতের ব্রহ্মপুত্র নদ। ওখানে কালো জল স্থির হয়ে আছে। হঠাৎ পেছনে পায়ের আওয়াজ। কে? ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে কোন গাঁয়ের মানুষ। পেছনে ফিরে তাজ্জব বনে যায় আলতাফ। এ কে? যাকে এই কিছুক্ষণ পূর্বে কোপিয়ে খতম করে খালের কাদা জলে ফেলে এসেছে, সেই খলিল। কী করে সম্ভব? দায়ের কোপে ফালা ফালা, রক্তের বানে ভাসা মরা মানুষটা জিন্দা হলো কোন কুদরতে। অথচ কি না খলিল কল কল করে বলছে, ‘আলতাফরে তোর মাইয়ার খোঁজ লইয়াই থানায় যা, আমি তাকে বর্ডার পার কইরা দিছি, ইন্ডিয়ার গরুর বদলে বাংলাদেশের মাইয়া মানুষ। গরুর গোস্তে আর জোয়ান মাইয়ার গোস্তে তফাৎ কী?’
নিশ্চল হয়ে যায় আলতাফ। অন্ধকারে মানুষটা কী বলছে তার মগজে ঢুকছে না। বেমালুম ভুলে যায়, একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থানায় যাচ্ছে সে আত্মসমর্পণের জন্য। মনে হয় গ্রাম্য হাট থেকে তারা দুজন বাড়ি ফিরছে। বাড়ি ফিরে গেলেই সন্ধ্যাকালে ঘুমিয়ে পড়া শিশুরা জেগে উঠবে। বিসকিট-চকলেট-লেমনচুষ হাতে তুলে নেবে ঘুম ঘুম চোখে। কী আনন্দ তাদের। বউ-ঝিয়েরা সদাইপাতি তুলতে তুলতে স্বামীদের অনুযোগ দেবে, ‘বাড়ি ফিরতে এত দেরি ক্যান?’
একসময় আলতাফ নিজেকে আবিষ্কার করে থানার লকাপে। তার সামনে একটি মৃতদেহ। রক্তাক্ত কর্দমাক্তা দেহ থেকে একটি হাত বিচ্ছিন্ন। খলিলের লাশ। লাশের সামনে দাঁড় করিয়ে তার স্বীকারক্তি নেওয়া হচ্ছে। জবানবন্দি দিচ্ছে। কিছ–ই স্মরণে নেই তার। হত্যার মুহূর্তটি ছাড়া থানার উদ্দেশে ছেনি দা হাতে ধীরে অথবা দ্রুত হাঁটা কিংবা পথে খলিলের সাক্ষাৎ ঘটা। বার কয়েক এই হত্যার দায় সে অস্বীকারের চেষ্টা করে। কখনো আতঙ্কিত, কখনো মতিচ্ছন্নতায় ডুবে থাকে সে। পড়শিরা থানায় ভিড় করে। স্ত্রী সেতারা বেগম বিলাপ কাটতে কাটতে বারবার জ্ঞান হারায়। সে বিশ্বাসই করতে চায় না চির ভিতু একটা মানুষ কী করে খলিলের মতো ধড়িবাজ মানুষকে খুন করতে পারে।
দরিদ্র অসহায় অপরাধীর বিচারের সময় সত্য ও ন্যায় থেকে মহামান্য আদালত এক বিন্দুও বিচ্যুত হয় না। মানুষের তৈরি আদালত ক্ষমতাশূন্য দরিদ্র অপরাধীরা বিচারের সময় যে আইনের প্রয়োগ ঘটায়, এই সত্যটিকে আছে বলেই ঈশ্বরের ন্যায়দণ্ড নিয়ে গোমূর্খরা ছাড়া কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পায় না। এই ন্যায়াদালতই দরিদ্র ক্ষমতাশূন্য আলতাফের মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা করে। বিনে পয়সায় কোনো উকিলই আলতাফের পক্ষে দাঁড়ায় না। সরকার থেকে দেওয়া উকিল কোনো যুক্তি খুঁজে পায় না মানুষটির প্রাণ রক্ষার জন্য। প্রাণভিক্ষার আবেদন করার মতো কেউ এল না ফাঁসির আদেশ পাওয়া আলতাফের পাশে।
আলতাফ একা হয়ে যায়। আদালতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পলকে তাকে নিঃসঙ্গ করে দেয়। ফাঁসির আসামিদের জন্য তৈরি সুড়ঙ্গের মতো কক্ষে সে একা। কারারক্ষী কিংবা খাদ্য পরিবেশনকারীর ছায়াসৃষ্ট এক পলক দেখে সে। ওরা নিঃশব্দেই দেখা দেয় এবং হারিয়ে যায়। এই শব্দহীনের দুনিয়ায় আলতাফ কেবল ঘুমের ভেতর খোয়াবে মাঝেমধ্যে দূরে পড়ে থাকা স্ত্রী আর শিশু সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে। এভাবে কতদিন? সে তো বোবা বনে যাবে! মুখের ভাষাই হারিয়ে ফেলবে। কিসসার সেই আদিম মানব হয়ে যাবে। কিন্তু সে মনের ভেতর আশা জাগায়, মানুষ না হোক, জিনেরা তো অন্তত তার সঙ্গে কথা বলতে পারে। মাত্র একবারই স্ত্রী সেতারা এসেছিল শিশু সন্তানদের হাত ধরে।
‘নূরীর আম্মা কান্দিস না, দ্যাখিস একদিন না একদিন তোর মাইয়া ফিরা আসবই, খোদা জানে বাঁইচা আছে কিনা’ কথাটা বলেছিল আলতাফ বিচারের রায় দানের পূর্বে। ফাঁসির রায়ের পরে বউ আর আসেনি। কী আশ্চর্য! জেলখানা থেকে বিদায়ের সময় একটুও কাঁদল না মানুষটা। অদৃশ্য কারও প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষে চোখ দুটো বারবার ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। সেতারা স্বামীর চোখের সেই ভাষা বুঝতে পারেনি। বরং বোঝার চেষ্টা করেছিল জেলখানার বিশাল এই পাকা বাড়িতে, লোহার অসংখ্য বেষ্টনীর ভেতর যারা বাস করে, তারা কি জাদুর দুনিয়ায় ঘুমিয়ে পড়ে? অথচ তাদের গাঙের মানুষ আর পশু-পাখির ঘর সবই উলুখাগড়ার।  বৈশাখের ঝড় আর শ্রাবণের বানে সব ভেঙে যায়। তাজ্জব বনে গিয়ে জেলবন্দি স্বামীকে বলেই ফেলে, ‘তুমি দ্যাহি ফেরাউনের জাদুর বাড়িতে ঢুকলা, ক্যামন লাগে ঘুমাইতে, খোদা যদি এমুন একটা ঘর দিত আমারে?’
আলতাফের ইট-পাথরের ঘরের ভেতর নিশি ঘুমে হারিয়ে যাওয়া মেয়ে নূরবানু  ফিরে আসে। মেয়েকে জড়িয়ে পিতার কী আনন্দ। কী প্রশান্তি! দুজনের আনন্দে ভেসে যায় সারা জেলখানা। হাসি নয়তো উন্মাদ অট্টহাসি। এভাবেই মৃত্যুগৃহে বন্দি আলতাফ মৃত্যুর আতঙ্ক, গালায় ফাঁসির দম বন্ধ করা ফাঁসুড়ের আচমকা টান, শূন্যে ঝুলে থাকা শরীরের বিরামহীন কল্পনার ভেতর বিস্ময়করভাবে এক-একবার হেসে ওঠে। মৃত্যুর কষ্ট আর খুনের সাজাকে ভুলে যায় সে একেক সময়। নিজেই নিজের প্রাণশূন্য দেহটাকে ফাঁসির মঞ্চে আসমানের চাঁদের মতো ঝুলতে দেখে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়।
মৃত্যুর প্রতীক্ষা আলতাফকে ভিন্ন এক দুনিয়ায় উড়িয়ে নেয়। পরিণতি কী হচ্ছে, সেই বোধ তার নির্বাসনে চলে যায়। এই নতুন দুনিয়াটা অবাক হয়ে সে উপভোগ করে। মৃত্যুদূত আজরাইলকে দেখতে চায় সে। কথা বলতে চায় অজানা অন্য দুনিয়া নিয়ে। একাকী এই মৃত্যু প্রতীক্ষার সুড়ঙ্গে অতীত জীবন আলতাফের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ব্রহ্মপুত্র চরের ক্ষুধা-দারিদ্রের সেই লোকালয় এখন অদৃশ্য। অতীতের যাপিত জীবন, প্রিয়জন নিয়ে জীবনসংগ্রাম স্বপ্নের মতোই হাওয়া হয়ে যায়। সে ভুলে যায় পেছনে রয়েছে তার একটি জীবন। এক-একবার মনে হয় অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের যে দুনিয়া সে তাকে চেনে না, কোনো দিন দেখেওনি।
মাঝ রাতে তন্দ্রাচ্ছন্নতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল আচমকা নয়া এক দুনিয়া তার সামনে ঝলমল করে ওঠে। সে দেখতে পায় নয়া জামানার নয়া দুনিয়া। খাড়া পায়ের একটি দরিয়া। কি প্রবল স্রোত তার। গলিত সোনার রং পানির স্রোত সোনার উড়ূক্কু মাছ। পাখির মতো ডানা। অন্য দুনিয়ায় এই মাছেরা আসমানের পাখি হয়ে উড়ে যায়। ওরা যায় কোথায়? আলতাফ জানতে চায়। তার অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া দুনিয়ায় কি সেই উড়ূক্কু মাছেদের সঙ্গে উড়তে সাধ জাগে তার মনে। বড় সাধ!
অন্তিম রাত এই দুনিয়ার বেহেশত হয়ে দুলে ওঠে আলতাফের সামনে। এত ভালোবাসা, এত মমতা খোদার এই রাজ্যে এত দিন কোথায় ছিল? আজ যদি কাছে থাকত স্ত্রী সেতারা বেগম, অবাক হয়ে দেখত তার খুনি স্বামীকে কত ভালোবাসে এই দুনিয়া। স্বামীকে শেষ দেখার সংবাদ পেয়েও শিশু সন্তানদের হাত ধরে সেতারা এল না জেলখানায়। মানুষও এত নির্দয় হয়? নাকি সংবাদই পায়নি। শহর থেকে বহুদূরে প্রত্যন্ত বালুচরের গাঁয়ে কেউ কি যায়নি? নাকি ফাঁসিতে মৃত স্বামীর লাশের দাবিও ত্যাগ করেছে সেতারা? এত ঘৃণা, এতটা বিদ্বেষ তার প্রতি? হারিয়ে যাওয়া কন্যার স্মৃতি আর দুটো শিশু সন্তানের বোঝা সেতারার ওপর চাপিয়ে দিয়ে মউতের ভেতর পালিয়ে গেল বলে স্বামীর প্রতি এতটা ক্ষুব্ধ?
মধ্যরাত ঘনিয়ে আসার বহু আগেই সেন্ট্রি এসে আলতাফের কাছে জানতে চেয়েছিল শেষ ইচ্ছা কী তার? আলতাফ নিরুত্তর। শেষ খাদ্য? তা-ও নির্বিকার। অন্তিম গোসল তাকে করতেই হবে। এ যেন রূপকথার রাজপুত্রের গোসল। বেহেশতি সুগন্ধি সাবান, ঠান্ডা-গরম পানি, যেন পবিত্র যমযম কূপের অলৌকিক পানি। আর এই নতুন পোশাক? ঈদের নামাজ নাকি? এত সাদা কাপড়ও হয় দুনিয়ায়? আতর লোবানের ঘ্রাণ ম ম করছে পোশাকে।
আর খাদ্য? হায় আল্লাহ। একি বেহেশতিখানা? এ কি হুর-পরিদের হাতে রান্না? খাদ্যের গন্ধে এ যেন গোলকধাঁধা। মাংসের পোলাও, ফল, মিষ্টির পাহাড়। দুনিয়ার অন্তিম মুহূর্তে এ কি খেলা দিল দুনিয়ার মালিক। না। খাবে না আলতাফ। এ খাদ্য তার নয়। পাচার হয়ে যাওয়া কন্যা আর দূর গাঁয়ের স্ত্রী, সন্তানদের হক যেখানে নেই, সেখানে এ খাদ্য তার নয়।
অন্তিম নামাজ আদায় করবে না কি সে? এত অবাধ্যতা খোদা কি সহ্য করবেন? সিজদা দিয়ে মোনাজাতে মগ্ন হয় আলতাফ। অস্থির মন, স্থির হতে চায় না। তবু সে বিড় বিড় করে, ‘খোদা খুনি গোনাহগারে সাজা চাই আমি।’
মধ্য রাতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে সেন্ট্রিরা এগিয়ে নিয়ে চলে আলতাফকে। এই প্রথম তার চোখ পানিতে ঝপসা হয়ে আসে। পা থেমে যায় তার। স্পষ্ট দেখছে, তার হারিয়ে যাওয়া মেয়ে নূরবানু ছুটে আসছে। লাল পতাকার মতো আসমানে মুষ্টিবদ্ধ হাত, ‘মুক্তি চাই, নইলে তোদের রক্ত চাই।’

Disconnect