ফনেটিক ইউনিজয়
সংসার
মোস্তফা সোহেল

রিপোর্টগুলোর দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বললেন, ইরেকটাইল ডিসফাংশন। ইমপোটেন্সি। কোনো কারণে আপনি শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা ঢক করে ওঠে জামিলের। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে আসে। জিবটা বের করে আলগোছে ঠোঁট দুটো মুছতে মুছতে সে তাকায় ডাক্তারের দিকে। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে, কারণটা জানতে পারি?
ডাক্তার খুব নির্বিকার ভাবে বলেন, এ মুহূর্তে সঠিক কারণটা বলতে পারছি না। তবে অনেক কারণে এটা হতে পারে। যেমন ড্রাগস, ওষুধের রিঅ্যাকশন, মানসিক কারণ, নার্ভাস ব্রেকডাউন,  ইনডিসিপ্লিন লাইফস্টাইল ইত্যাদি।
জামিলের সারা শরীর কাঁপতে  থাকে। সে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। লজ্জায় ডাক্তার সাহেবের সামনে থেকে উঠে যেতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু পা দুটো শক্ত হয়ে আছে। তিন মাস মাত্র বিয়ে হয়েছে সারিকার সাথে। মা-বাবার পছন্দে বিয়ে। কিন্তু তার বউটা অসাধারণ। শান্ত। সোম্য। কোনো ঝুটঝামেলা নেই। বিংশ শতাব্দীতে এসেও এখনো হাজবেন্ডের বাসায় ফেরা পর্যন্ত না খেয়ে বসে থাকে। নিজের হাতে রান্নাবান্না করে। বিয়ের আগে একটা এনজিওতে চাকরি করত। নিজের ইচ্ছায় সেটা ছেড়ে দিয়েছে শুধু ঘরসংসার করবে বলে।
এখন এ রকম একটা খবর সে কীভাবে দেবে বউকে?
ডাক্তার সাহেব হাসেন। বলেন, ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই জামিল সাহেব। আমি একটা সমাধান দিতে পারি। জামিল চাতক পাখির মতো তাকায়। সম্ভাবনার কথা শুনে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে তার।
ডাক্তার সাহেব বললেন, মেডিকেল সায়েন্স এখন অনেক এগিয়ে গেছে। কোনো ভয় নেই। যদিও ট্রিটমেন্ট নির্ভর করে রোগের আসল কারণের ওপর। তবু বলতে পারি নিয়মিত এক্সারসাইজ করুন। এটলিস্ট তিরিশ মিনিট হাঁটুন। বেশি করে পানি খান। আর সপ্তাহে অন্তত দু-তিন বার ট্রাই করুন। যদি কোনো ইমপ্রুভ না হয়, তাহলে ওষুধ দেব। আপনি এক মাস পরে আসুন। আর একটা রিকোয়েস্ট।
জামিল তাকায় ডাক্তারের চোখের দিকে। ডাক্তার বলেন, আজ থেকে ‘নো স্মোকিং। নো অ্যালকোহল।’
জামিল মাথা নাড়ে। ডাক্তারের রুম থেকে বেরোতে বেরোতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। তা ছাড়া মনটাও ভীষণ খারাপ লাগছে। আজ আর অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না তার। একটা সিএনজি নিয়ে নিজের বাসার দিকে রওয়ানা হলো জামিল।

দুই
সারিকা আজ রান্না করেছে সর্ষে ইলিশ। মুগডাল দিয়ে রুই মাছের মাথা। চিংড়ির সাথে কাঁকরোল। জলপাই ডাল।
ভর্তা করেছে কয়েক রকম। সেগুলো টেবিলে সাজিয়ে বসে ছিল সে জামিলের জন্য। হাতমুখ ধুয়ে এসে টেবিলে এত আয়োজন দেখে মনটা ভীষণ ভালো হয়ে গেল জামিলের।
টেবিলে বসতে বসতে সে বলল, তুমি কি করে জানলে সে আমি অফিস থেকে আজ এত তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসব!
সারিকা মুখ টিপে হাসে। কোনো উওর দেয় না। জামিল গোগ্রাসে খেতে গিয়েও খেতে পারে না। খাবার তার গলায় আটকে যাচ্ছে।  
সারিকা চোখ তুলে বলল’
কোনো সমস্যা!
কই না তো! সব প্রিয় খাবারগুলো রান্না করেছ। অনেক থ্যাংকস! সারিকা হেসে বলল’
খাবার পছন্দ হয়েছে!
হ্যাঁ। খুব ভালো হয়েছে।
বলেই মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে খাবারগুলো গিলতে থাকে জামিল। সারিকা তৃপ্তির হাসি নিয়ে দেখতে থাকে  জামিলকে।
রাতে বিছানায় শোয়ার পর রীতিমতো কান্না পেল জামিলের। একবার ভাবে, সব খুলে বলবে সে সারিকাকে। কিন্তু বুকের ভেতর কী রকম দ্বিধা, ভয় আঁকড়ে ধরল তাকে।
সারিকা কাছে এসে বলল,
কোনো সমস্যা হয়েছে জামিল?
কী সমস্যা?
না মানে অফিসে বা অন্য কোনো!
না।
জামিল মুখ গুঁজে পড়ে থাকে বালিশে। ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় মাস তিনেক। এখন পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে স্বাভাবিক দৈহিক সম্পর্ক, সেটাই হয়নি ওদের। শুধু জামিল বলেছে, একটু সময় দাও। কেনো, কী কারণে এই সময় নেওয়া তা কখনো জানতে চায়নি সারিকা। এ নিয়ে মনের ভেতরে কষ্ট থাকলেও কখনো তা প্রকাশ করেনি সে। জামিলকে সে সত্যিই সময় দিতে চায়।
আজও জামিল বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে দেখে ছোট একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে সারিকা। ওপাশ ফিরে শুতেই জামিল ডাকে তাকে। ফিসফিস করে বলে, একটা কথা বলব? ওর কথা শুনে সারিকা অবাক হয়ে তাকায়। বলে, কী কথা!
জামিল উঠে বসে। তারপর ওর হাতটা দিয়ে সারিকার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলে।
একটা খারাপ খবর আছে।
কী?
আমি আজ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।
কেন? কী হয়েছে!
জামিল খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। কথাটা বলতে কী রকম দ্বিধা লাগে। সারিকা উঠে বসে, উৎকণ্ঠার সাথে বলে,
কী হয়েছে জামিল? আমাকে বলো।
জামিল বলে, ডাক্তার বলেছে আমি নাকি ইমপোটেন্ট। শারীরিকভাবে অক্ষম।
কথা শুনে সারিকা  হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। ভেতরে ভেতরে হার্টবিটটা বাড়তে থাকে ভীষণ। কী বলবে সে বুঝে উঠতে পারে না। তবু নিজেকে স্বাভাবিক রাখে সে। জামিলের দিকে তাকিয়ে বলে, কোনো চিন্তা কোরো না। দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। আমি তোমার সাথে আছি।
কথা শুনে জামিলের কী যে হয় সারিকাকে জড়িয়ে ধরে এই প্রথম সে প্রাণভরে চুমু খেতে থাকে।

তিন.
অফিসে ঠিক ঠিক মন বসাতে পারছে না জামিল। এমনিতে কাল থেকে সিগ্রেট বন্ধ। তার ওপর মহাখালী থেকে গুলশান পর্যন্ত হেঁটে এসেছে। বেশ টায়ার্ড লাগছে এখন। এরই মধ্যে দুবোতল পানিও সাবাড় করে ফেলেছে। দুপুরে খাবার পর মিনিট পনেরো সবাই মিলে ডাইনিং- এ জম্পেশ আড্ডা হয় তাদের। কিন্তু আজ আগেই জরুরি কাজের কথা বলে নিজের রুমে চলে এসেছে জামিল। বিয়ের এই তিন মাসে কখনোই অফিস থেকে সারিকাকে ফোন করার সময় পায়নি জামিল। সারিকা প্রথম প্রথম আগ্রহ দেখিয়ে নিজেই খোঁজখবর নিত জামিলের। কিন্তু জামিলের কোনো আগ্রহ নেই দেখে সারিকা আর কন্টিনিউ করেনি।
তবু আজ সারিকাকে ভীষণ ফোন করতে ইচ্ছে করল তার। নিজের মোবাইল থেকে ফোন করল জামিল-
হ্যালো সারিকা! কেমন আছ তুমি?
অনেক দিন পর জামিলের ফোন পেয়ে বেশ খুশি হলো সারিকা। সে হেসে বলল,
ভালো আছি। তুমি খেয়েছ?
হ্যাঁ খেয়েছি। কিন্তু মনটা ভালো নেই।
আরে বুদ্ধু। কোনো সমস্যা নেই। আমি তোমাকে হেল্প করব।
কীভাবে!
ওপাশ থেকে সারিকা হাসে। বলে,
এত সহজে হাল ছেড়ে দিলে কি চলে? তুমি কোনো চিন্তা করো না। আজরাতে আমরা ট্রাই করব!
জামিল ফিসফিস করে বলে, যদি না হয়? না পারি?
সারিকা হি হি করে হাসে। তারপর বলে, না হলেও কোনো অসুবিধা নেই। বারবার ট্রাই করব। কিন্তু তোমাকে পারতেই হবে। নো আদার অপশন মিস্টার জামিল!
জামিলের বুকের ভেতরটা টিপ টিপ করে। তবু হেসে ফোনটা ছেড়ে দেয় সে।
অফিস থেকে বেরিয়ে বাসায় যেতে ইচ্ছে করে না জামিলের। সারা দিন ইন্টারনেট ঘেঁটে অনেক তথ্য জোগাড় করেছে জামিল। কিন্তু সেগুলো খুব পজিটিভ কিছু না। মনে মনে নাফিসের কথা ভাবে সে। ডাক্তার নাফিস। তার ছেলেবেলার বন্ধু। উত্তরায় থাকে। মনে মনে ভাবে সে, একটা সেকেন্ড থট নেওয়া যেতে পারে। যেই ভাবনা সেই কাজ। রিপোর্টগুলো নিয়ে নাফিসের বাসায় হাজির হয়ে যায়।
অনেক দিন পর জামিলকে দেখে নাফিস আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। হেসে বলে,
দোস্ত। প্রায় পাঁচ বছর পর তোর সাথে দেখা। চল আজ সারা রাত গল্প করব। দুজনে একসাথে খাব। মজা করব। তুই বিয়ে করেছিস তাও শুনেছি। ক্যামন কাটছে দিনকাল?
জামিলের মন উসখুস করে। সে বলে,
দোস্ত একটু ঝামেলায় পড়েছি।
কী?
এই রিপোর্টগুলো দেখবি আগে?
রির্পোটগুলোর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে যায় নাফিস। বলে, কই দেখি, কার রিপোর্ট?
আমার।
রিপোর্টগুলো উল্টেপাল্টে দেখে নাফিস হাসে। বলে
অসুবিধা কী?
জামিল হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। নাফিস বলে, টেমপোরারি এ ধরনের সমস্যা হতেই পারে। নাথিং বিগ ডিল। শোন, কনসেনট্রেট কর। ভয় না পেয়ে ফোকাসড হ। আই ডোন্ট ফাইন্ড অ্যানি প্রোবলেম।
জামিল অবাক হয়ে তাকায়। বলে, কিন্তু অন্য একজন ডাক্তার যে বললেন...
নাফিস হো হো করে হাসে। বলে, ড্যাম ইওর ডক্টর। সিগ্রেটের প্যাকেটটা বের করে সামনে ধরে সে জামিলের। হাসতে হাসতে বলে, আরে খাঁ খাঁ! কোনো অসুবিধা নেই।

চার.
জামিল যখন বাড়ি ফিরল, তখন গভীর রাত। দরজা খুলেছে কাজের ছেলে আলাউদ্দিন। জামিল বলল, তোমার ভাবী কই? আলাউদ্দিন ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, ভাবি ঘুমাচ্ছে।
ঘরের ভেতর এসে একটা মিষ্টি গন্ধে মনটা ভরে যায় জামিলের। সারা ঘরে থোকা থোকা শিউলি ফুল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে তার বউ। আহা, কী যে মিষ্টি মেয়েটা!
জামিল মুখ টিপে হাসে। সারিকা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে, সরি জামিল। ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। দাঁড়াও উঠছি। জামিল বলল, কোনো অসুবিধা নেই। আমি খেয়ে এসেছি। একটু শাওয়ার নিয়ে আসি।
আজ ঠান্ডা পানি দিয়েই গোসল করল জামিল! বুকের ভেতর কোনো উৎকণ্ঠা নেই। ভয় নেই। কাছে এসে বিছানায় বসে সে। সারিকার গোলাপি নাইটির ভেতরের সব ভাঁজ পরিষ্কার হয়ে উঠছে ক্রমেই। ওর ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠছে তন্দ্রার ভেতর। জামিলের ভেতরটা তৃষ্ণার্ত। সে প্রথমবারের মতো বুনো ষাঁড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সারিকার ওপর।
সারিকা অবাক। ঘুম ছুটে গেল মুহূর্তের ভেতর। জামিলকে সামাল দেওয়ার মতো জোর তার নেই। কী রকম আবিষ্টতায় সে তখন নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে। জামিল বলল, আমার বেবি। আমার বেবি। তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।
অনেক নক্ষত্রের বিচিত্র খেলায় আকাশটা হয়ে উঠেছে আজ অসাধারণ। সেই আকাশের চাঁদ ক্রমাগত টুকরো টুকরো আলো বিলিয়ে যাচ্ছিল আকাশময়। আজ রাতে সেই আলোর এক টুকরো যেন এসে পড়ল ওদের সংসারে।

Disconnect