ফনেটিক ইউনিজয়
ভি ন দে শি গ ল্প
বাহাদুর আল্লাদিত্তা ইবনে ইনশা
ভাষান্তর : জাভেদ হুসেন

ইবনে ইনশা, কবি, ভ্রমনকথা লেখক, কলামিস্ট এবং উচু দরের রম্য লেখক। ১৯২৭ সালে অখন্ড ভারতের পাঞ্জাবে জন্ম। রেডিওতে কাজ করেছেন, জাতিসঙ্ঘেও বড় পদে নিযুক্ত ছিলেন। সেই সুত্রে পৃথিবীর বহু দেশে যাওয়া আর ভ্রমন কথা লেখা। উর্দু সাহিত্যে তার সরস রচনা ধ্রুপদি মানসম্পন্ন বলে সর্বজন স্বীকৃত। এই গল্পটি তাঁর ‘আপসে কেয়া পর্দা’ গ্রন্থ হতে অনূদিত হয়েছে।
একজন লেখক ভয়ে ভয়ে জাতীয় সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকের ঘরে ঢুকলেন।
লেখক :  জি, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?
সম্পাদক : হ্যাঁ, ভেতরে আসুন। কী নাম আপনার?
লেখক : আমার নাম আলাদিন। পরিবারে লেখালেখির চল আছে। আমার বাবাও কবিতা লিখতেন।
সম্পাদক : আচ্ছা, তো আপনি কী লেখেন?
লেখক : আমি মানে...আমি একটা ছোট গল্প নিয়ে এসেছি। আপনি যদি একটু...
সম্পাদক : ঠিক আছে রেখে যান। ফিরতি খামের ওপর ডাক টিকিটসহ রেখে যাবেন।  ছয় মাসের মধ্যে মতামত পেয়ে যাবেন।
লেখক লাজুকভাবে বললেন, যদি কিছু মনে না করেন, একদম ছোট্ট গল্প। আপনি যদি এখনই শুনে জানাতেন। এই দুই-তিন মিনিটের বেশি লাগবে না।
সম্পাদক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে  আচ্ছা ঠিক আছে। গল্পের নাম কী?
লেখক বললেন, নাম একদম অন্য রকম ‘সৎ কার্য’, অবশ্য ‘বাহাদুর আল্লাদিত্তা’ও রাখা যায়। কিন্তু আমি ভাবলাম নামটা পুরোনো ধরনের হয়ে যায় কি না!
সম্পাদক তাড়া দিলেন আচ্ছা আচ্ছা, পড়ুন।
লেখক পড়তে লাগলেন : রাত তখন তিনটে। সবাই অঘোরে ঘুমে মগ্ন। আশপাশে কোথাও আলো নেই। হঠাৎ একটা বড় বিল্ডিংয়ের চার তলায় আগুন দেখা গেল। কেউ চিৎকার করে উঠল, আগুন! আগুন! বাঁচাও! বাচাও! মনে হয় কোনো বেখেয়াল ভাড়াটে চুলা নেভাতে ভুলে গিয়েছিল। সেখান থেকেই আগুন লেগেছে। তখনই দমকলের সাইরেন শোনা গেল। ফায়ারম্যান আল্লাদিত্তা মাঝবয়স, শক্ত-সামর্থ্য গড়ন, ঝিলম অঞ্চলের লোক, বিশাল গোঁফ। সে আবার সাবেক ফৌজি। সে দরজার কাছে একটু থামল। কী যেন ভাবল। তারপর ঝাঁপ দিয়ে আগুন লাগা ঘরে ঢুকে ভয়ে আধমরা এক লোককে বের করে আনল। তারপর পানির ঝাপটা দিয়ে আগুন নেভাল। এই সময় দমকলের অফিসার আওলাদ বখশ তার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘সাবাশ! এই না বাহাদুরের মতো কাজ!’ তারপর হেসে যোগ করল, ‘দেখো! তোমার ডান দিকের গোঁফে আগুন লেগেছে।’ শুনে আল্লাদিত্তা আজলা ভরে গোঁফে পানি ছেটাল। দূরে, পূর্ব দিগন্তে তখন আলো ফুটে উঠছে।
সম্পাদক বললেন গল্প মন্দ না। নাম যেন কী বললেন, ‘সৎ কার্য’? তবে দুয়েক জায়গায় বোধ হয় আবার নজর দেয়া দরকার। একেবারে গোড়া থেকে পড়ুন তো, দেখি কী করা যায়।
লেখক পড়া শুরু করলেন, ‘রাত তখন তিনটে। সবাই অঘোরে ঘুমে মগ্ন।’
সম্পাদক মাথা নেড়ে বলে উঠলেন এই যে বললেন ‘সবাই’, এর মানে কি পুলিশও ঘুমাচ্ছিল ডিউটি ফেলে? না না, এভাবে না। মানুষ ভাববে যে আমাদের দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠিক নেই। এই জায়গা বদলে লিখুন: ‘রাত তখন তিনটে। সবাই অঘোরে ঘুমে মগ্ন ছিল না’।
লেখক থতমত খেয়ে বললেন এটা কীভাবে সম্ভব? গভীর রাত, সবাই তো ঘুমেই থাকবে।
সম্পাদক বললেন তাও তো ঠিক। তহলে এভাবে লিখুন : ‘শহরে সবাই অঘোরে ঘুমাচ্ছিল কিন্তু খুব সজাগও ছিল।’
লেখক একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললেন মানে, ঘুমাচ্ছিল আবার সজাগও ছিল?
সম্পাদক ভেবে বললেন হ্যাঁ, কথাটা কেমন হয়ে গেল। আচ্ছা! এভাবে লিখি বরং: ‘কিছু লোক অঘোরে ঘুমাচ্ছিল, কিছু সজাগ ছিল।’ আচ্ছা, এরপর পড়ুন।
লেখক গজগজ করে পড়তে লাগলেন, ‘আশপাশে কোথাও আলো নেই।’
সম্পাদক হাত তুলে বললেন থামুন, ‘থামুন, আপনি কি বলতে চান যে আমাদের দেশে যে বাল্ব বানাই, তাতে কোন আলো হয় না?’
লেখক সামলে নিয়ে বললেন, ‘না! না! মানে বাল্বগুলোর সুইচ অফ করা ছিল।’
সম্পাদক প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বললেন, ইয়াংম্যান, সবাই তো আপনার মতো বুদ্ধিমান না যে বিষয়টা বুঝে ফেলবে। অধিকাংশ লোকেই মনে করবে যে আমাদের দেশে তৈরি বাল্বের কোয়ালিটি ভালো না। আমার কথা মানলে এই জায়গাটা বাদ দিয়ে দিন। আর যদি নাই জ্বলে তো গল্পে বাল্বের কথা আনার দরকারই বা কী!
লেখক নার্ভাস হয়ে এরপর পড়তে লাগলেন, ‘হঠাৎ করে একটা বড় বিল্ডিংয়ের চারতলায় আগুন দেখা গেল। কেউ চিৎকার করে উঠল, আগুন! আগুন! বাঁচাও! বাঁচাও!’
সম্পাদক মাঝখানে বলে উঠলেন, তার মানে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল? মানে আপনি বলতে চান যে আমরা এই কথা ছাপব যে এ রকম একটা সামান্য ঘটনায় আমাদের জনগণের মাথা ঠিক থাকে না, তারা দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়? শোনেন ভাই, এইটা কোনো পত্রিকার অফিস মনে আছে তো।
লেখক মিনমিন করে বললেন, এটা তো একটা গল্প, মানে একটা কাল্পনিক ঘটনা...
সম্পাদক তেড়ে উঠে বললেন, কিন্তু আপনি তো কোনো বুঝদার মানুষদের নিয়ে গল্পটা লিখলেন না। আপনার লোকেরা তো আগুন লাগার মতো সামান্য ঘটনায় মাথা গরম করে ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। আপনার জায়গায় আমি হলে বরং গল্পের চরিত্রদের দিয়ে কোনো শিক্ষণীয় কথা বলাতাম।
লেখক জানতে চাইলেন কী রকম?
সম্পাদক একঠু মাথা চুলকে বললেন, যেমন ধরুন...‘আরে দূর! এ রকম আগুন অনেক দেখেছি। ব্যাপার না, এক মিনিটে নিভিয়ে ফেলব।’ অথবা এ-ও বলা যায় যে, ‘আরে আগুন-টাগুন কিচ্ছু না, সব বিরোধী দলের প্রোপাগান্ডা।’
লেখক এবার নির্জীব স্বরে বললেন কিন্তু আগুন তো আসলেও লেগেছিল। আচ্ছা, আপনি যখন বলছেন...
সম্পাদক এবার আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসে বললেন যাক, তুমি মুরব্বিদের সম্মান করতে জান। আজকালকের ছেলে-ছোকরারা তো...যাক, এরপর কী?
লেখক এর পরের অংশ পড়তে লাগলেন, ‘মনে হয় কোন বেখেয়াল ভাড়াটে চুলা নেভাতে ভুলে গিয়েছিল। সেখান থেকেই আগুন লেগেছে।’
সম্পাদক বলে উঠলেন, কী ভাড়াটে? লেখক জবাব দিলেন বেখেয়াল ভাড়াটে।
সম্পাদক ভ্রু কুচকে বললেন, ‘বেখেয়াল!’ তোমরা যে কী সব ভাষা ব্যবহার করো! যাক, কতজনকে আর  বলব? কিন্তু কথা হচ্ছে, তুমি এমন লোককে নিয়ে গল্প লিখলে, যে কিনা তার চুলা নেভাতে ভুলে যায়! এটা তো আমাদের পাঠকদের সামনে বাজে দৃষ্টান্ত তুলে ধরবে। পাঠকরাও পরে তাদের চুলা নেভাতে ভুলে যাবে।
লেখক লজ্জিত হয়ে বললেন, আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। কিন্তু চুলা যদি নেভানো থাকে তো আগুন লাগবে কোত্থেকে?
সম্পাদক চোখ বুজে বললেন, আচ্ছা, মানলাম তোমার কথায় যুক্তি আছে। ধরে নাও আগুন লাগল না, তাহলে কী ক্ষতি হতো?
লেখক একটু ভেবে বললেন, জি, আগুন না লাগলে তো ক্ষতিরও প্রশ্ন আসে না।
সম্পাদক ফাঁদে ফেলেছেন, এমন সুরে বললেন, এই তো লাইনে এসেছ। এভাবে এই জায়গাটা আবার লিখতে হবে। চুলার কথা বলারই দরকার নেই। তাহলে আগুন নিয়ে আর এত কেচ্ছা-কাহিনিও লিখতে হবে না। আচ্ছা, এরপর পড়ো। মাঝখানটা বাদ দিয়ে সরাসরি ফায়ারম্যানের অংশে চলে যাও।
লেখক পড়তে লাগলেন, ‘ফায়ারম্যান আল্লাদিত্তা মাঝবয়স, শক্ত-সামর্থ্য গড়ন, ঝিলম অঞ্চলের লোক, বিশাল গোঁফ। সে আবার সাবেক ফৌজি।’
সম্পাদক টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন, চমৎকার! এই না হলে গল্প! আরে আমার বাড়িও তো ওই অঞ্চলে। ওই জায়গার মানুষ আসলেও সাহসী হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, আমার দাদু তখন...
লেখক কোনো কথায় কান না দিয়ে পড়ে যেতে লাগলেন, ‘সে দরজার কাছে একটু থামল। কী যেন ভাবল।’
সম্পাদক ‘আরে! আরে!’ বলে থামিয়ে দিয়ে বললেন, কী লিখেছ? কী যেন ভাবল? শোন, ফায়ারম্যানের কাজ হচ্ছে আগুন নেভানো। তার আবার ভাবাভাবির কী আছে?
লেখক মরিয়া হয়ে বললেন, এতে গল্পের আকর্ষণ বাড়বে।
সম্পাদক ভেংচি কেটে বললেন আকর্ষণ বাড়ে! আর ফায়ারম্যানের চরিত্র যে এতে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে! আর তা ছাড়া, আমরা তো আগুনের ঘটনা বাদ দিয়ে এলাম না? তাহলে আর ফায়ারম্যানের কথা আসছে কেন?  
লেখক হাল ছেড়ে বললেন, কিন্তু তাহলে আল্লাদিত্তা আর অফিসার আওলাদ বখশের মধ্যে ডায়লগ হবে কী করে?
সম্পাদক সমাধান দিলেন এই কথাবার্তা তো ওদের অফিসেও হতে পারে।
লেখক পড়ে গেলেন, ‘এই সময় দমকলের অফিসার আওলাদ বখশ তার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘শাবাশ! এই না বাহাদুরের মতো কাজ!’ তারপর হেসে যোগ করল, ‘দেখ! তোমার ডানদিকের গোঁফে আগুন লেগেছে।’ শুনে আল্লাদিত্তা আঁজলা ভরে গোঁফে পানি ছেটাল। দূরে, পূর্ব দিগন্তে তখন আলো ফুটে উঠছে।’
সম্পাদক একটু চুপ থেকে বললেন, এই বর্ণনাটার প্রয়োজন আছে?  
লেখক সচকিত হয়ে জানতে চাইলেন, কোন বর্ণনা?
সম্পাদক বললেন, ওই যে গোঁফে আগুন লাগা।
লেখক ব্যাখ্যা দিলেন, এই রকম লিখলাম, যাতে গল্পে একটু কমিক ব্যাপার আসে। আবার এইটাও বোঝানো দরকার যে আল্লাদিত্তা এত নিবেদিত প্রাণ কর্মী যে গোঁফে আগুন লেগে গেলেও টের পায় না।
সম্পাদক বললেন, আমার কথা যদি শোনো তো বলি কী, এই পুরো অংশটাই গল্প থেকে বাদ দিয়ে দাও। আগুনের ঝামেলা তো আগেই বাদ দেওয়া হয়েছে। আর বিল্ডিংয়েই যখন আগুন লাগল না, শুধু শুধু আর বেচারার গোঁফে আগুন লাগিয়ে কী লাভ!  
লেখক বিষয়টা অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করে বললেন, ওই যে বললাম কমিক এফেক্ট।
সম্পাদক হেসে বললেন, সে তো এমনিও থাকছে। মানুষ হাসে কখন? যখন বিপদ কেটে যায়। আমরা তো আগুন লাগতেই দিলাম না। বিপদ তো কেটেই গেল! যাক, এবার পুরো গল্পটা প্রথম থেকে পড় তো একবার। দেখি কী দাঁড়িয়েছে।
লেখক গলা খাঁকারি দিয়ে এডিট করা গল্প পড়া শুরু করলেন, রাত তখন তিনটে। কেউ কেউ অঘোরে ঘুমে মগ্ন। কেউ আবার খুব সতর্ক। হঠাৎ করে কেউ চিৎকার করে উঠল, ‘আগুন-টাগুন কিচ্ছু না, সব  বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র! ফায়ারম্যান আল্লাদিত্তা মাঝ বয়স, শক্ত-সামর্থ্য গড়ন, ঝিলম অঞ্চলের লোক, বিশাল গোঁফ। সে আবার সাবেক ফৌজি। এই সময় দমকলের অফিসার আওলাদ বখশ তার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘শাবাশ! এই না বাহাদুরের মতো কাজ!’ শুনে আল্লাদিত্তা আঁজলা ভরে গোঁফে পানি ছেটাল। দূরে, পূর্ব দিগন্তে তখন আলো ফুটে উঠছে।  
সম্পাদক এবার আড়মোড়া ভেঙে বলে এই না হলে গল্প! একদম নিখুঁত। এখন আমাদের জাতীয় সাহিত্য পত্রিকা এটা ফলাও করে ছাপবে।

Disconnect