ফনেটিক ইউনিজয়
বাজ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আয়াজের বাবা যখন পা রাখেন আটিরচরে, যমুনা খুব দয়ালু ছিল বড় এ চরটার প্রতি। প্রতিবছর এর আয়তন বাড়ত; চরের মানুষ কিছু ধান, কলাই বাদাম ফলিয়ে গরু চড়িয়ে বেশ চালিয়ে দিত দিনকাল। রাজাপুর থেকে নৌকায় ঘণ্টাখানেক লাগত আটিরচরে পৌঁছতে। তার পরও ব্যবসায়ীরা দলবেঁধে আসত। আয়াজের বাবা বলতেন আয়াজকে, এই বছর সাতেক আগেও নদী আমাদের পায়ের নিচে মাটি দিয়েছে, আমাদের পেটের খাবার আর পরনের কাপড়ের ব্যবস্থা করেছে, শুধু আমাদের পড়াশোনাটা শেখাতে পারেনি। তখনও তার আশা, হয়তো সেদিকটাও দেখবে নদী। আয়াজের বাবার জমি ধরে হাঁটলে চরের এক পাশ থেকে আরেক পাশ পর্যন্ত চলে যাওয়া যেত। তিনি নিজের পরিচয় দিতেন খামারি হিসেবে। একসময় বেশ পয়সা ছিল তার হাতে, ছেলেকে বেলকুচি পাঠাতে পারতেন পড়াশোনা শিখতে। কিন্তু আটিরচর ছেড়ে ছেলে কোথাও যাবে, চার মেয়ের পর জন্মানো একমাত্র ছেলে, এরকম ভাবাটাও ছিল তার জন্য অসম্ভব। আয়াজের বাবা তাই বিকল্প কাজটিই করলেন, একটা স্কুল খুলে বসলেন আটিরচরে। বেলকুচি থেকে শেখ রমিজুদ্দিনকে নিয়ে এলেন স্কুলের হেডমাস্টার করে। রমিজুদ্দিনকে কিছু জমিও দেয়া হলো, চরের উত্তর দিকে, যেদিকে ভাঙনটা বেশি- যখন ভাঙন হয়। সেজন্য জমির জন্য তেমন কারও দৌড় নেই সেদিকে।
কিছুদিন স্কুলটা ভালোই চলল, কিন্তু একদিন রমিজুদ্দিনকে এক শরতের জ্যোৎস্না রাতে চাঁদে পেয়ে বসল। তিনি মাঝরাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েছিলেন। বাইরে ফকফকা সাদা জ্যোৎস্না। চরের বালিতে সে জ্যোৎস্না আছড়ে পড়ছে আর কুচি কুচি হয়ে উড়ছে, যেন এক অদৃশ্য ধুনুরি জ্যোৎস্নার তুলা ওড়াচ্ছে। রমিজুদ্দিন দেখলেন, যমুনার নীল-কালো বিস্তারের গাঘেঁষে কাশবনের ধারে ধারে চিকচিক বালি এক অদ্ভুত বিছানা পেতে রেখেছে, যে বিছানায় শুয়ে পড়লে এখন কোনো দলছুট পরী এসে মিলবে তার সঙ্গে। বালির বিছানায় শুয়ে তিনি চোখটা মেলে রাখলেন চাঁদের দিকে। চাঁদ থেকে পরী নামছে এবং রমিজুদ্দিন শরীরের নিচের অংশে শিহরণ অনুভব করছেন। রাতটা গভীর এবং হিম হিম, কিন্তু তার ভেতরে আগুন। সেই আগুনে তিনি পুড়লেন। অনেকক্ষণ।
পরদিন আয়াজের বাবা শুনলেন, রমিজুদ্দিন হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করেছেন। স্কুলে যাননি, শুধু চরের বালিতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আর আপনমনে হাসছেন, অথবা বিষণ্ন চোখে যমুনার দিকে তাকিয়ে থাকছেন। দুদিন পর তিনি আরও শুনলেন, রমিজুদ্দিন সারা রাত চরের বালিতে হাঁটেন। কেউ পিছু নিলে রেগে যান অথবা তাকে জিজ্ঞেস করেন, চাঁদটা কোথায়?
রমিজুদ্দিনের আগে থেকেই তিন ছেলেমেয়ে ছিল, আরও একটা মেয়ে হয়েছিল আটিরচরে। সেই মেয়েটির নাম তিনি বইটই ঘেঁটে রেখেছিলেন সামারা। সামারা থেকে সাত বছর বড় ভাইটার নাম ছিল জসীম। তাদের বড় যে দুজন, তাদের এ গল্পের জন্য প্রয়োজন নেই, যেহেতু তাদের তিনি চৌহালীতে নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আটিরচরে আসার আগে, সেখানে একটা স্কুলে অন্তত পড়তে পারবে, সে কথা ভেবে। আমাদের মনে হয়, তিনি যে একটা স্কুল চালাতে অপারগ হবেন, চাঁদের হাতে ধরা পড়বেন, বাস্তব-অবাস্তবের বিভ্রমে পড়ে ইহকালটাকে একটা তরমুজের মতো ফালি ফালি করে কেটে ফেলবেন, সে বিষয়টা তিনি আগেই জানতেন। তা না হলে নিজে যেখানে শিক্ষক দুই সন্তানের শিক্ষা নিয়ে এমনকি শঙ্কা থাকতে পারে যে, এক হাতে চোখ মুছতে মুছতে অন্য হাতে নানাবাড়ির দিকে তাদের ঠেলে দেবেন?
আয়াজ আলীর বাবা যে স্কুল দিয়েছিলেন, তার শুধু প্রধান শিক্ষক নন, একমাত্র শিক্ষকও ছিলেন রমিজুদ্দিন। তার ছেলে জসীম আর আয়াজ পড়ত সেই স্কুলে। কিন্তু একটা বছরও বেচারাদের পড়া হলো না, চাঁদের শিকার হলেন রমিজুদ্দিন, আর স্কুলটাও গেল বন্ধ হয়ে। তারপর আয়াজের বাবা চেষ্টা করেছেন শিক্ষক জোগাড় করতে। কিন্তু চেনা পৃথিবী থেকে এতটা দূরে এই হারানো চরে কে আসবে শিক্ষার বাতি হাতে নিয়ে?
সাত বছর আগেও আয়াজের বাবা ভাবতেন, যমুনা তো নদী নয়, যেন দাইমা অথবা দাইমা থেকেও বেশি। জন্ম দিচ্ছে, যত্ন দিচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে। যেদিন তার ছোট ভাইটি নৌকা নিয়ে শখের মাছ মারতে গিয়ে যমুনার চোরাস্রোতে হারিয়ে গেল, তখনও তিনি নদীর প্রতি রুষ্ট হতে পারেননি। তার বাবা কুচবিহার থেকে ভাগ্যের খোঁজে এসে নানান জায়গা হয়ে আটিরচরে পায়ের নিচে মাটি পেয়েছিলেন। তারপর সেই মাটি সোনাও ফলাল। ভাইটা তলিয়ে গেলে তিনি কিছুদিন অভিমান করে ছিলেন নদীটার ওপর, কিন্তু রাগ করতে পারেননি।
কিন্তু ভাইয়ের শোকটা এক বছরেও পুরনো হয়নি, যমুনার মেজাজ হঠাৎ বদলাতে থাকল। আয়াজের বাবা অবাক হয়ে অনেক ভাবলেন, কী হলো নদীটার হঠাৎ, কেন এমন আচরণ- কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। চরের যে উত্তরে ভাঙন হতো, সে উত্তরে নতুন জমি লাগল, কিন্তু অদ্ভুত এক মেজাজি আক্রমণ সে করে বসল চরের কোমর বরাবর। এক ভাদ্রে সারাদিন সারারাত তিনি শুধু হুসহাস করে মাটি মিশে যেতে শুনলেন যমুনার স্রোতে। ১১ দিন পর হঠাৎ থেমে গেল যমুনার রাগ। কী কারণে সে রেগেছিল, কে জানে। কিন্তু ফল হলো এই, কোমর বরাবর চরটা বেশ সরু হয়ে গেল। আয়াজের বাবার মনে পড়ল দুর্ধর্ষ মাছ শিকারি যতীনের যেরকম আজগুবি এক রোগে মোটা পেটটা শুকিয়ে যেতে যেতে কোমরটা একটা ছোট ছেলের কোমরের মতো হয়ে গিয়েছিল এবং যা বুকের পাঁজরের, ঘাড়ের, মাথার আর হাতের ভার সইতে না পেরে একদিন ভেতরের দিকে গুটিয়ে গিয়েছিল এবং যতীন পড়ে যেতে যেতে ভেবেছিল ‘এ কোন রাগি বাঘা মাছের সঙ্গে যুদ্ধ ঘটিয়ে আমিই শিকার হয়ে গেলাম?’- চরটাও সেরকম কোমর রোগা হয়ে ধুঁকতে থাকল।
যমুনা একসময় চোখ ফিরিয়ে নিল আটিরচর থেকে। অথবা যেন চরটার জন্মে দোষ ছিল, এখন বিষ খাইয়ে একে মেরে ফেলতে চাইছেন চরটির দাইমা। যে দক্ষিণে শেষ বড় ভাঙন কবে হয়েছে আয়জের বাবাকে একটু কষ্ট করে তা স্মরণ করতে হয়, সেই দক্ষিণের একটা পুরো অংশ তিন-চারদিনে হাওয়া হয়ে গেল। সেই সঙ্গে হাওয়া হয়ে গেল দুই পরিবারের প্রায় চার আনা মানুষ। আয়াজের বাবা জানতেন, যমুনা কোনো কারণে রেগেছে। যতীন বলত, দেবতারা রাগলে কী আচরণ করবেন, তা মানুষ কোনোদিন আন্দাজ করতে পারবে না। যমুনার রাগ দেখে আয়াজের বাবা ভাবলেন, এ নদীকে আমি কি চিনি না? এই কি সেই নদী, তার গান আমার মায়ের পেটের ভেতর পৌঁছে দিয়ে আমাকে কাঁপাত, যখন উজানে আরেকটা চরে থাকতেন আয়াজের বাবা, তার অসুখে ভোগা জনমদুঃখী মায়ের সঙ্গে। এরকম ভাবনা একটা শুরু হলে আরেকটাতে, তারপর আরেকটাতে পৌঁছতে সময় লাগে না। তার এরকম সুতোয় বাঁধা ভাবনার শেষটা ছিল, যমুনা কি চায় আমি সবাইকে নিয়ে আমার বাবার মতো বেরিয়ে পড়ি? পায়ের তলায় আরেকটা স্থিরমাটির আশায়? যমুনার ওপর তার অভিমান তীব্র হচ্ছিল, ক্ষোভও হচ্ছিল। সেই অভিমান ও ক্ষোভকে তীব্রতর করে যমুনা একদিন তার জমি ধরে টান দিল।
এক ভাদ্র থেকে আরেক শ্রাবণ, তারপর ভাদ্র। দেখা গেল আয়াজের খামারি বাবা যমুনার বুকে তলিয়ে যাওয়া এবং শূন্যতার একটা চাদরে জড়িয়ে থাকা অজমির দিকে তাকিয়ে বলছেন, আমার আর যতীনের মধ্যে এখন তফাত কী? তারপর তিনি বুকে হাত রাখলেন এবং যতীনের পা দুখানির মতো তার দুটি পাও আর জগতের ভার সইতে চাইল না।

Disconnect