ফনেটিক ইউনিজয়
একটি আত্মহত্যার পোস্টমর্টেম
রফিকুর রশীদ

এক.
আবারও আত্মহত্যা!
আকাশে তখন বিদ্যুৎ চমকে ওঠে কড়কড় শব্দে। চোখ ধাঁধাঁনো বিজুরিরেখা আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ফালা ফালা করে দেয়। সহসা সেই বিদ্যুৎ যেনবা চম্পা রানীর শরীরে প্রবল ঝাঁকুনি দেয়, রক্তপ্রবাহে উথাল-পাথাল ঢেউ তোলে, হাতের মুঠো থেকে খসে পড়ে মোবাইল ফোন। চায়না কোম্পানির তৈরি সস্তা মোবাইল সেট ভেঙেচুরে খান খান হয়ে যায়। চম্পা রানীর কপালের দুপাশের শিরা দাপায় সাংঘাতিক অস্থিরতায়, চৈতন্যে ফণা তোলে বেয়াড়া প্রশ্ন- আত্মহত্যা বললেই হলো! কাকে বলে আত্মহত্যা? না বোঝার মতো বয়স যখন ছিল, তখনই মানতে পারিনি, আবার এতদিন পরও মানতে হবে- মালা রানী দাসের কন্যা শেফালি রানী দাস ১০-১২ বছর পর মায়ের পদাঙ্কই অনুসরণ করেছে? নিজেকে হত্যা করা এতই সোজা! আর তাছাড়া শেফালি আত্মহত্যা করতে যাবে কোন দুঃখে? যত ছোটই হোক, সে এখন সরকারি চাকরি করে, সাধারণ মানুষ পদপদবি বিচারের আগে সরকারি পোশাকটাকে যুগপৎ ভীতি ও সমীহের চোখে দেখে বলেই সে পরিবারের সবার দুঃখ মোচনের জন্য কারও প্ররোচনা ছাড়া সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় কলেজে পড়তে পড়তেই একদিন পুলিশ লাইনে দাঁড়িয়ে খুব সহজে এ চাকরিটা পেয়ে যায়। সে বছর আইএ পরীক্ষা দিতে পারেনি কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার ট্রেনিংয়ের মধ্যে ছুটি পাওয়া সম্ভব হয়নি বলে। তবু তো সে হার মানেনি! দুবছর পর হলেও আইএ পাস করেছে, তার প্রবল বিশ্বাস- একদিন সে বিএ পাস করবে, চাকরিতেও প্রমোশন হবে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। এরই মাঝে ছোট বোন চম্পা রানীর শিক্ষালাভের পথ নির্বিঘ্ন করতে চায়, শুধু অর্থের অভাবে যেন স্বপ্নটা ছোট হয়ে না যায়, চম্পাকে অনেক উঁচু পদে দেখার সাধ তার; বলা নেই কওয়া নেই সেই মানুষ অকস্মাৎ এভাবে পায়ের তলের শেকড় কেটে দেবে আপন হাতে!
মোবাইল ফোনে খবরটা শোনার পর থেকে চম্পা রানীর ভাবনাসূত্র একই বৃত্তে ঘুরপাক খায়, তার দিদি কেন আত্মহত্যা করতে যাবে? নিজেকে সে প্রবল ভালোবাসে, চম্পা খুব ভালো জানে। বছর চারেকের ছোট বোনকে সে কতদিন বুঝিয়ে বলেছে, মানুষ হিসেবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শেখাটা সবচেয়ে জরুরি। এ মর্যাদা রক্ষার জন্য জেনেশুনে এ ছোট চাকরিতে সে ঢুকেছে। পথে নেমেই টের পেয়েছে, পথে পথে পাথর ছড়ানো, কৌশলে সব পাথর সরিয়ে সে সামনে এগিয়েছে, গত মাসে বাড়ি এসে এক বিছানায় শুয়ে ছোট বোনের গলা জড়িয়ে ধরে গভীর রাতে শুনিয়েছে সেসব পাথর সরানোর গল্প। কত সহজে চম্পাকে বুঝিয়ে বলেছে, পাথর সরানো কৌশল জানাটা মেয়েদের জন্য খুব জরুরি। পাথর সরাতে পারলেই দেখা যাবে, পাথরের পাশে কুলুকুলু বয়ে চলেছে স্ফটিকস্বচ্ছ ঝরনাধারা, অফুরন্ত আনন্দধারা। কখনও কোনো পাথরে আটকে যাসনে যেন, তাহলেই মাথার উপরে চেপে বসবে। হ্যাঁ।
শেফালি রানীর কথা বলার ধারা ওই রকম, সাধারণের চেয়ে একটু আলাদা, কেমন গল্পের মতো করে বলে যায় তরতরিয়ে, হাজার শুনেও তৃষ্ণা মেটে না। সেই ছোটবেলা থেকে এ অভ্যেস তার। হতদরিদ্র অতিসাধারণ অশিক্ষিত পরিবারে জন্ম, অথচ কী যে অসাধারণ মেধাবী! প্রাইমারি স্কুলের মণি আপা কী ভেবে খুবই আশকারা দেন একেবারে গোড়া থেকে, কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে সবাইকে শুনিয়ে বলেন, শেফালি আমার পদ্মফুল, গোবরে পদ্মফুল। শুধু মুখের বলা নয়, তিনি পূর্ণ অবয়বে ফুল ফুটিয়ে যথার্থই কাজে প্রমাণ করেন। নয়নপাতা গ্রামের প্রাইমারি থেকে শেফালি প্রথম বৃত্তি পেলে সবাই চিনতে পারে দাসপাড়ার এ মেয়েটি পদ্মফুলই বটে। তাই বলে হাইস্কুলেও পড়বে! দাসপাড়ায় এমন ঘটনা তো আগে কখনও ঘটেনি, মেয়ে তো দূরের কথা, এ পাড়ার কোনো ছেলে পর্যন্ত কখনও স্কুলের পর স্কুল ডিঙিয়ে যায়নি। শেফালি গেছে আনন্দে নাচতে নাচতে। আনন্দ হবে না কেন, মণি আপা নিজে এসে তাকে সঙ্গে করে হাইস্কুলে নিয়ে যান, ভর্তি করানোর পর স্কুলড্রেস পর্যন্ত কিনে দেন এবং বুকের মধ্যে অন্যরকম সাহসের বারুদ ঢুকিয়ে দেন- বড় হতে হবে, অনেক বড়। বড় মানুষ হতে হবে।
বছরে বছরে পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে অনেকেই প্রশংসা করেছে শেফালির, হেডস্যার বিশেষ পুরস্কার পর্যন্ত দিয়েছেন, কিন্তু তার বাড়ি থেকে হাইস্কুলে যাওয়ার পথটুকু বারবার কণ্টকিত করেছে এলাকার বখাটে যুবকেরা। বুদ্ধিমত্তা দিয়েই সেসব বাধা মোকাবেলা করেছে, কাঁটা সরিয়ে সামনে এগিয়েছে। ক্লাস নাইন থেকে টেনে ওঠার পর সেই স্কুলের মন্টু মাস্টার (বিজ্ঞানশিক্ষক বলে তিনি মন্টু বিএসসি নামে বিশেষ পরিচিত) এমন এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটিয়ে বসে যে, তা নিয়ে স্কুল কমিটিকে মিটিং-মজলিশে পর্যন্ত বসতে হয়। মন্টু মাস্টার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বসে, শেফালিকে ধর্মান্তরিত করিয়ে সে বিয়ে করতে চায়। এ ঘটনার পর স্কুলে যাওয়াই বন্ধ হয়ে যায় শেফালির। চম্পা তখন স্কুলে যায়। নানা রকম মন্তব্য কানে আসে, লজ্জায় চোখ-মুখ লাল করে বাড়ি ফেরে, দিদির সামনে সেসব কথা বলতে গিয়ে কেঁদে বুক ভাসায়। সবকিছু দেখে-শুনে ওদের বাবা অজিত দাস পড়ানোর চেয়ে মেয়ের বিয়ে দেয়াটাই জরুরি কাজ বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর টের পায় সগোত্রের মধ্যে দু-চার ক্লাস লেখাপড়া জানা পাত্র খুঁজে পাওয়া অসম্ভবপ্রায়। তখন তার পাথরে মাথা কোটার দশা। সে সময় আবারও আবির্ভাব ঘটে মণি আপার, আবার সাহস দেয়, শক্তি জোগায়। অজিত দাস হাতজোড় করে জানায়, ছোট জাতের মেয়েদের লেখাপড়ার আর দরকার নেই।
মণি আপা শক্ত হয়ে দাঁড়ান, জোর দিয়ে বলেন,
দরকার আছে।
ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকে অজিত দাস। বড় মেয়ের যেটুকু লেখাপড়া হয়েছে তার মন্দ ফলই সে দেখেছে, এরপর ছোট মেয়ের ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে হয়তোবা, বিয়ের বাজারেও অযথা সংকট বাড়বে সে প্রমাণ বেশ পাওয়া গেছে; কাজেই লেখাপড়ার কি এমন দরকার, সে আর বুঝতে পারে না। মণি আপা বুঝিয়ে বলেন, সমস্যাটা ছোট জাতের নয়, নারী জাতের। পায়ে পায়ে বাধা। তবু ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তার জন্য লেখাপড়াটাই বড় শক্তি।
এরপর শেফালি রানী দাস আর কখনও স্কুলে না গিয়েও এসএসসি পাস করেছে কৃতিত্বের সঙ্গে, জেলা শহরের কলেজে ভর্তি হয়েছে; কলেজ-জীবনের মুক্তো হাওয়ায় নতুন করে শ্বাস নিয়েছে; এমনকি ছোট বোন চম্পা রানীকে পর্যন্ত উদ্বুদ্ধ করেছেÑ স্কুলের গ-ি পেরিয়ে আয় দেখি, বাইরে অনেক আলো-বাতাস আছে, তোকে আমি অনেক দূর পড়াব।
সেই মানুষটা সহসা পুলিশের চাকরিতে ঢুকে গেল!
কলেজ থেকে মোটেই দূরে নয় পুরিশ লাইন। বেশ কদিন ধরে মাইকিং হচ্ছে, পুলিশে লোক নেবে। ঢাকা-খুলনা-যশোর যেতে হবে না, এ শহরের পুলিশ লাইনে গিয়ে বুক ঠুকে দাঁড়িয়ে গেলেই হবে। সেপাই পদের বিজ্ঞাপন। লোকের অভাব হবে নাকি! গাদা গাদা পুরুষ প্রার্থীর ভিড়ে মহিলা প্রার্থী মাত্র কয়েকজন। এর মধ্যে পেটানো শরীরের শেফালি রানী দাসকে একনজরে প্রথমেই বাছাই করে নেয় কর্তৃপক্ষ। কেবল একজন উঁচুপদের কর্মকর্তা কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
এই মেয়ে, পুলিশের চাকরি করতে পারবে?
শেফালি দ্বিধাহীনভাবে জানায়,
জি স্যার, পারব।
বাড়িতে কে আছে তোমার?
মা-বাবা আর একটা ছোট বোন।
তুমি যে চাকরি করতে চাও, বাবার অনুমতি আছে?
এ নিয়ে বাড়িতে কোনো আলোচনাই করেনি শেফালি, তবু অবলীলায় জানিয়ে দেয়, জি স্যার।
চাকরি হওয়ার পর দেখা গেল, শেফালির বাবা অজিত দাসের সত্যিই কোনো আপত্তি নেই। বরং তার চোখে-মুখে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। কী এক দুর্বোধ্য কারণে শেফালির মা মন ভার করে থাকে, মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ফ্যাঁচ করে কেঁদেও ওঠে। ভালো-মন্দের কিছুই না বুঝে চম্পা পরদিন প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে মণি আপাকে খবর জানিয়ে আসে। অজিত দাসের মেয়ে শেফালি রানী দাস পুলিশ হয়েছে, এ খবর সারা গ্রামে চাউর হতে খুব একটা সময় লাগে না। ব্যাপারটা নিয়ে গ্রামে বেশ হইহই পড়ে যায়। গ্রামের মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় কদাচিৎ মহিলা পুলিশের ছবি দেখলেও বাস্তবে কেউ দেখেনি বললেই চলে। দুর্লভ এ সুযোগ অতিসহজে হাতের মুঠোয় পাওয়া যাচ্ছে ভেবে অনেকেই দাসপাড়ায় ছুটে আসে অতিচেনা শেফালিকে নতুন করে দেখতে। শেফালির গায়ে পুলিশের পোশাক না দেখে কেউ কেউ হতাশ হয়। এসব আশাহত মানুষের মনের ভাব বুঝে অজিত দাস নিজ থেকে হাসিমুখে ব্যাখ্যা দেয়Ñ এই তো আর কডা দিন পরে ট্রেনিং হবে, পোশাক দেবে, রেশন দেবে...
মূর্খ গ্রামবাসীর অজ্ঞতারও শেষ নেই, আবার কৌতূহলেরও অন্ত নেই। অতিসাধারণ একজন জানতে চায়,
শেফালির আবার টেনিং কিসির? চাকরি হয়ি গিয়িচে শুনলাম যে!
অজিত দাস হাসে। হাত নেড়ে বুঝাতে চেষ্টা করে,
চাকরি হলিই তো টেনিং লাগে, অস্ত্রের টেনিং, হ্যাঁ!
অস্ত্র মানে! রাইফেল-বন্দুকের টেনিং?
হ্যাঁ। পুলিশের কাঁধে অস্ত্র দ্যাখোনি কুনুদিন?
তা দেখেছে বইকি! থানা থেকে অস্ত্র কাঁধে পুলিশ এসে গ্রামে গ্রামে দাবড়ে বেড়ায়। সরকারি দলের মেম্বর-চেয়ারম্যানের ইশারা-ইঙ্গিতে তারা একে ধরে ওকে ছাড়ে, আজকাল আবার গভীর রাতে ক্রসফায়ারের নাটক করে; অস্ত্রের ট্রেনিং না হলে চলে! গ্রামের মানুষ এতদূর পর্যন্ত মোটামুটি খবর রাখে, কিন্তু অজিত দাসের কন্যা শেফালি রানী দাসের কাঁধে রাইফেল ও পুলিশি পোশাক কেমন মানাবে, সেটাই তারা অনুমান করে উঠতে পারে না।
শেফালির চাকরিপ্রাপ্তিতে একটুও খুশি হতে পারেননি নয়নপাতা প্রাইমারি স্কুলের মণি আপা। চম্পার মুখে খবর শোনার পরও তিনদিন এ নিয়ে কোথাও কারও কাছে মুখ খোলেননি। শেফালি ও চম্পার প্রতি তার স্নেহের আধিক্যের কথা সবাই জানে, তাই সহকর্মীদের মধ্যে দু-একজন খুঁচিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চায়। তাতে কোনো কাজ হয় না। কারও কথায় কান না দিয়ে একদিন মণি আপা দাসপাড়ায় গিয়ে সোজাসুজি শেফালিকেই চেপে ধরেন,
এসব কী শুনছি? চাকরি করার খুব শখ হয়েছে?
গরিবের মেয়ে লেখাপড়া শিখছ চাকরি করার জন্য, যে ধরনেরই হোক চাকরি পেলে সানন্দে সেটা করবে এটাই তো স্বাভাবিক। শেফালি অস্বাভাবিক কিছু তো করেনি! তবু প্রিয় শিক্ষকের কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সে মুখ নিচু করে থাকে। কিন্তু মণি আপার এতে মন ভরলে তো! অজিত দাস ছুটে এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে দিদিমণিকে নমস্কার জানায়, হাতে বোনা বেতের মোড়া এনে সামনে ধরে; এসবের কিছুই ভ্রুক্ষেপ না করে শেফালির কাঁধে হাত রেখে তিনি বলেন,
পুলিশ হওয়ার সাধ হলো কেন বলো দেখি!
শেফালির মুখে কথা নেই, চোখের দীঘি উপচে ওঠে জলে। হঠাৎ চম্পা রানী এগিয়ে এসে মণি আপাকে আশ্বস্ত করতে চায়,
আমি কিন্তু আপনার মতো টিচার হব ম্যাডাম!
কেন, বোন পুলিশ হয়েছে, তুমি না হয় আর্মি হও। ভালো চাকরি!
ওরে বাবা! ভয় করে যে!
না না তোমাদের দেখলেই মানুষ ভয় পাবে। তোমাদের কিসের ভয়?
শেফালির মনের মধ্যে কী যে হয়, সে তার প্রিয় মণি আপাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে সশব্দে। তাই দেখে চম্পা রানীও ফ্যাঁচ করে কেঁদে ওঠে। অজিত দাস হাত কচলিয়ে নিতিবিতি করে জানায়, বংশের মধ্যে দু-একজন পুলিশ থাকা ভালো দিদিমণি! কখন যে কাজে লেগে যায়।
কী কাজে লাগার আশায় অজিত দাস বুক বেঁধেছে, তা সে-ই জানে! শেফালিকে বুকের মধ্যে নিয়ে মণি আপা চুলের বেনি নাড়তে নাড়তে বলেন, তোমার কাছে আমি একটু অন্যরকম কিছু আশা করেছিলাম শেফালি।
মণি আপার সঙ্গে আর কোনো কথা হয়নি শেফালির। কলেজ থেকে বেরিয়ে কেন সে পুলিশ লাইনে গিয়ে বুক টান করে দাঁড়িয়েছে, সে ব্যাখ্যা শোনানোর কোনো সুযোগও পায়নি। মণি আপা চলে যাওয়ার পর সারা দিন মনটা তার ভার হয়ে থেকেছে। আকাশ থমথমে। ঈশান কোণে কালো মেঘের দাপাদাপি। অবশেষে গভীর রাতে বর্ষণধারা। ছোট বোনের কাঁধে হাত রেখে নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাকে বলে, শোন চম্পা, আর্মি-পুলিশ কিছুই হতে হবে না তোকে। তুই অনেক বড় হ’, মানুষ হ’ এটাই আমি চাই।
চম্পা রানী আবারও তার পূর্বপ্রতিশ্রুতির কথা ঘোষণা করে,
আচ্ছা। আমি কিন্তু মাস্টারি করব দিদি।
তাই করিস। অনেক লেখাপড়া করলে অনেক বড় মাস্টার হতে পারবি। আমিও সেটাই দেখতে চাই।
তুমি কেন পুলিশ হতে গেলে দিদি?
শেফালির মুখে আর কথা নেই। চুপচাপ সে ভাবে, মণি আপা এ কোন উৎকট প্রশ্ন ছড়িয়ে দিয়ে গেলেন? এই যে এখন ছোট বোনও সেই একই প্রশ্ন করছে! কী জবাব দেবে ওকে! প্রকাশ্যে এ প্রশ্নের জবাব দিতে না পারলে যেন চাকরি পাওয়ার আনন্দই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। অথচ এ নিয়ে কারও কাছে মুখ খুলতেই ইচ্ছে করে না তার। বরং এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুকের ভেতরে উথলে ওঠে কান্নার ঢেউ। এত সব ভাবান্তর লক্ষ না করে চম্পা রানী অন্ধকারের মধ্যে আবারও সেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
অ দিদি, তুমি পুলিশ হলে কেন?
ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না শেফালি রানী। কেন সে পুলিশ হতে গেল! সিদ্ধান্তটি কি অনেক আগেই মস্তিষ্কের কোষে জমাট বেঁধেছিল? পাথর ছড়ানো পথ পাড়ি দিয়ে সে কলেজ পর্যন্ত পৌঁছেছে, কলেজের মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে শ্বাস নিতে গিয়ে অচিরেই টের পায়, অতি অদূরে চিতাবাঘ থাবা মেলে আছে, মাটিতে তার চরণচিহ্নের ছাপ পড়ে আছে; নিজেকে গুটিয়ে নেয়া ছাড়া তখন তার কী উপায়? তাই বলে পুলিশ লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে? সে কি নিভৃতে প্রতিশোধের ছুরিতে শান দিতে চেয়েছে! নাহ্, চম্পার কাছে সে খুলে বলতে পারে না কিছুই। কী এক অদৃশ্য শক্তি যেন তার গলায় চেপে বসে, কণ্ঠ ফেঁড়ে কেবল মৃদু গোঙানির ধ্বনি বেরোয়, অতপর কান্নার হ্রদে মিলিয়ে যায় সে ধ্বনি। তখন সে চম্পা রানীকে অবলম্বন ভেবে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে, অস্ফুট ফোঁপানিতে কেঁপে কেঁপে ওঠে তার শরীর। ছোট বোন চম্পা সহসা অনেক বুদ্ধিমতী আর অনেক বড় হয়ে যায়। দিদিকে আর কোনো প্রশ্ন না করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে, আদর করে, চোখ মুছিয়ে দেয়। রাতের প্রহর দুহাতে ঠেলে চলে নিশব্দে। অব্যক্ত কত কথা যেন সে নীরবেই বুঝে যায়।
শেফালি রানী পরদিন সকালে বাড়ি ছেড়ে রওনা হয়ে যায় নতুন চাকরির জন্য অত্যাবশ্যকীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশে।

দুই.
প্রশিক্ষণ শেষে দু-চারদিন বাড়িতে কাটিয়ে আসার ইচ্ছে হয় শেফালির। শুধু শরীরে নয়, মনেও ক্লান্তি জমেছে একরাশ; আর লেফট-রাইট নয়, মাটিতে পায়ের পাতা রেখে থিতু হয়ে দাঁড়ানোর সাধ হয় তার। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর কত যে সব কথা জমেছে বুকের মধ্যে, সেগুলো আলগা করে রোদে বাতাশে মেলে ধরতে না পারা পর্যন্ত স্বস্তি নেই অন্তরে। মাকে হয়তো সব কথা জানানো সম্ভব নয়, কিন্তু চম্পা তো ঠিকই কানখাড়া করে আছে, ওর গলা জড়িয়ে ধরে গভীর রাত অবধি সেসব শোনানো যায়। কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্যে যে প্রেম নিবেদন চলে, এমনকি দেহদানে বাধ্য করার মতো ঘটনাও ঘটে নীরবে নিঃশব্দে- এসব শুনলে নিশ্চয় ওর চোখ থেকে হারিয়ে যাবে ঘুমের পাখি, আবেগে-উৎকণ্ঠায় গায়ে কাঁটা দেবে, ধাক্কা দিয়ে জানতে চাইবে, তোর কিছু হয়নি তো দিদি?
অনেক দিন থেকেই প্রকাশ্যে তুই-তুকারি সে করে না, কিন্তু আবেগঘন মুহূর্তে ভুল হয়ে যায় নিয়মকানুন, ছোটবেলার মতোই খলখলিয়ে ওঠে,
সত্যিই কিছু হয়নি তো তোর?
আহা, সরকারি চাকরিতে এত সব আবেগের মূল্য আছে! আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদ্যনিযুক্ত সদস্য, তার কথা কে শুনবে মনোযোগ দিয়ে? সামান্য এক সেপাই শেফালি রানী দাস কাকে বলবে, মায়ের মুখ মনে পড়ছে, বাবার ছায়ার তলে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে, ছোট বোনের পাশে শুয়ে রাতভর গল্প করতে ইচ্ছে করছে? সামনে নির্বাচন। গোটা দেশ তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। এ সময় ইচ্ছে ইচ্ছে খেলা করলে চলে!
প্রশিক্ষণের পর প্রথম পোস্টিং নিয়ে রংপুরের এক থানায় যোগদান করে পরদিন সকালে তাকে যেতে হয় ইলেকশন ডিউটিতে প্রত্যন্ত গ্রামের এক ভোটকেন্দ্রে। বলতে গেলে সেটাই তার চাকরিজীবনের প্রথম দিন। সারা দিন কী যে টানটান উত্তেজনা আর কত যে চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা! নির্বাচন মানেই বাঙালির এক অনন্য উৎসব। হইচই, ধাক্কাধাক্কি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, এমনকি দু-এক পশলা মারামারি- সবকিছু মিলিয়েই উৎসবের আমেজ। এর মাঝে মহিলা পুলিশের ভূমিকাও কম নয়। কোথাকার এক সামান্য শেফালি রানী দাস, এই অচেনা জনপদে কে তাকে মান্য করতে যাবে! শেফালি রানী অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করে তার ক্ষমতা। সবাই না মানুক, অনেকেই শুনছে তার কথা, গুরুত্ব দিচ্ছে; কেউ কেউ যেনবা ভয়ও পাচ্ছে। ভয় পাওয়ার কথাই, নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে সে নিজেই হেসে ওঠে, অজিত দাসের মেয়ে শেফালি দাসের গায়ে পুলিশের পোশাক চড়ানোর কারণেই এত সব ঘটছে তাহলে! ভোটযুদ্ধের তাণ্ডব শেষে গভীর রাতে পুলিশ ব্যারাকে ফিরে পোশাক বদলানোর সময় আবারও তার হাসি পায়, সরকারি পোশাক চোখের সামনে এনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখার পর ছুড়ে দেয় দড়ির উপরে। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে এসে শরীর এলিয়ে দেয় বিছানায়। সারা দিনের উত্তেজনা ও ক্লান্তিতে শরীর-মন এতটাই অবসন্ন ছিল যে, চোখের পাতায় ঘুম নেমে আসে অতি সহজেই। ঘুমের সঙ্গে স্বপ্নও আসে অনেক দিন পর। স্বপ্নে তার মাকে দেখতে পায়। কোথায় কোন নদীপাড় থেকে মালা রানী দাস হাত ইশারায় মেয়েকে ডাকছে। শেফালি যেতে চাচ্ছে মায়ের কাছে, কিন্তু যাওয়া হচ্ছে না, মাটি থেকে পা উঠছে না, কণ্ঠে কোনো স্বর ফুটছে না; হঠাৎ আবিষ্কার করে, তার মায়ের সিঁথিতে লেশমাত্র সিঁদুরের চিহ্ন নেই। সিঁদুরশূণ্য চওড়া সিঁথি যেনবা চিতাপ্রান্তরের মতো দাউ দাউ করে জ্বলছে।
স্বপ্নের দাহ শেফালির ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। দুচোখের পাতা আর কিছুতেই এক হতে চায় না। খুব ভয় করে তার। কেঁপে কেঁপে ওঠে বুকের ভেতর। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ। পাশের চৌকিতে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে সহকর্মী নাসিমা। জামালপুরের মেয়ে। সহজ-সরল মানুষ। সহজেই আপন হতে জানে। তবু তার ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করে না। বিছানা থেকে নেমে এসে জানালার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়াতেই এক ঝলক ভোরের হাওয়া ঢুকে পড়ে ঘরে। সেই হাওয়া লেগে চোখ-মুখ বেশ জুড়িয়ে যায়, কিন্তু অন্তরের তড়পানি মোটেই শান্ত হয় না।
সকালের আলো ফুটতেই খবর এল থানায়, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা মালোপাড়ার পূজামণ্ডপে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, দেবী মূর্তি ভেঙেচুরে একশেষ, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ভয়-তড়াশে তটস্থ। পুলিশ হলে কী হবে, এ খবর শোনার পর শেফালি রানীও ভয়ানক চমকে ওঠে- মালোপাড়া তো তাদের এলাকায়ও আছে, সেখানে এসব হয়নি তো! বামুনপাড়া, দাসপাড়া, মালোপাড়া, কৈবর্তপাড়া- হিন্দুদের সাত পুরুষের বাস। নির্বাচন এলেই এসব শান্ত পল্লী অস্থির ও অশান্ত হয়ে ওঠে, লুটপাট, সম্ভ্রমহানি, এমনকি খুনোখুনি পর্যন্ত নতুন কিছু নয়। এ রকম বিপন্ন দৃশ্যের সঙ্গে আশৈশব পরিচয় আছে শেফালির, তবু বুকের ভেতরে ভয়ানক তোলপাড় হয়, মা-বাবা ও ছোট বোনের মুখ মনে পড়ে। কিন্তু সহজে কি তাদের খবর জানার উপায় আছে? পোশাক লাগিয়ে থানায় আসার পর কানে আসে সারা দেশের খবর। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী- দক্ষিণের জনপদজুড়ে জ্বলছে নির্বাচনোত্তর সহিংসার লেলিহান শিখা। টেলিভিশনের পর্দায় তারই সচিত্র প্রতিবেদন দেখে শেফালি একসময় ফুঁপিয়ে ওঠে। কিন্তু গায়ে সরকারি পোশাক চড়িয়ে ছিচকাঁদুনে বালিকার মতো চোখের জল মুছলে চলবে কেন! কে দেখবে তার চোখের জল? সরকারি দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বাহিনীর সঙ্গে তাকেও যেতে হয় মালোপাড়ার অগ্নিদগ্ধ পূজামণ্ডপে ডিউটি করতে। পুলিশের চাকরিতে আবেগের মূল্য কোথায়? সাব-ইন্সপেক্টর ইনসান আলী মালোপাড়ার পূজামণ্ডপের মধ্যে লুটিয়ে পড়ে থাকা দেবী মূর্তির ভগ্নাংশের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সহসা শেফালি রানীর কাঁধে থাবা দিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
এই মেয়ে, তোমার কি শরীর খারাপ?
না স্যার। শেফালি অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ঠিক আছে স্যার।
বুকে তো সেঁটে রেখেছ ‘শেফালি’র নেমপ্লেট, পুরো নাম কী তোমার?
শেফালি রানী দাস স্যার। শ্রী...
বাবার নাম শোনার প্রয়োজন বোধ করেন না ইনসান আলী। তিনি যা খুঁজছেন তার সন্ধান যেনবা পেয়ে গেছেন। তাই শেফালির মুখের উপরেই বলে ওঠেন,
অ। সেজন্য তোমার চেহারার মধ্যে দেবি মূর্তির ছায়া দেখতে পাচ্ছি। বুঝতে পারছি তোমার মন খারাপ কেন! কিন্তু মন খারাপ করলে তো চলবে না। এর নাম পুলিশের চাকরি, হ্যাঁ!
শেফালি বুক টান করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, জি স্যার। নিজেকে সে শক্ত রাখার চেষ্টা করে, তবু দুফোঁটা অবাধ্য অশ্রুদানা গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে। সেই অশ্রু গোপন করতে সে হুট করে বলে ওঠে,
মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ছে স্যার, আমাকে দুদিন ছুটি দেবেন?
ইনসান আলী হে হে করে হাসেন।
শেফালির পাশ থেকে অন্য একজন সেপাই বলে,
নতুন আইছে তো স্যার, বাড়ির লাইগা মন পোড়ে।
না না, এ রকম হোমসিকনেস থাকলে চাকরি করা যাবে! ইনসান আলী জানিয়ে দেন, পুলিশের চাকরি কড়া নিয়ম-শৃঙ্খলার চাকরি।
শেফালি রানী তবু অবুঝ বায়না ধরে,
মাত্র দুদিন ছুটি দেন না স্যার!
কী মুশকিল! ছুটি কি আমার হাতে?
থানার হর্তাকর্তা অফিসার ইনচার্জ, মানে ওসি সাহেব। তার সামনে ছুটির কথা বলতে যাওয়ার সাহস নেই শেফালির। তাই এসআই ইনসানের কাছেই সে জোর আবদার জানায়, আমার জন্য আপনি যদি একটু বলেন স্যার! মাত্র দুদিনের জন্য...
ইনসান আলী মোটরসাইকেল স্টার্ট দেন। সাইলেন্সার পাইপ দিয়ে গমগমিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে, ভটভট করে উৎকট শব্দ হয়, তারই মধ্যে তিনি জানিয়ে দেন, আচ্ছা সে পরে দেখা যাবে। এখন ডিউটি করো।
ডিউটি করা বলতে মালোপাড়ার এ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পালাক্রমে চতুর্দিকে টহল দেয়া। সর্বনাশ যা হবওয়ার তা এক রাতেই হয়ে গেছে। তবু টহল চলছে, নতুন কোনো হাঙ্গামা যেন না হয়। কদিন পরে দুর্গা পূজা। নতুন সরকার কিছুতেই পূজা বন্ধ হতে দেবে না, প্রয়োজনে সব রকম সহযোগিতা করবে। দেশে এ সংকটময় সন্ধিক্ষণে একজন কনস্টেবলের দায়িত্বও কম কিছু নয়। এ সময় শেফালি রানীর ছুটির কথায় কান দেবে কে! তবু সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ পরামর্শ দেয়, ওসি সাহেব পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই, ইনসান আলী স্যারকে ভালো করে চেপে ধরলেই হবে।
শেফালি রানীর ছুটির জন্য ইনসান আলী থানার ওসি সাহেবের কাছে আদৌ কোনো সুপারিম করেছিলেন কিনা সে কথা কারও জানা নেই, তবে বেশ কদিন পরে এক সকালে ওসি সাহেব নিজ মুখে দুঃসংবাদটি ঘোষণা করেন, থানার ওয়্যারলেসে খবর এসেছে শেফালির মা অসুস্থ; তাই তাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো।
মা অসুস্থ! শেফালি রানীর মাথা ঘুরে ওঠে, খুব চিন্তা হয়, বাবার নয়, অসুখ তাহলে মায়ের। হাঁপানির রোগী, বুকে কফের ঘড়ঘড়ানি, তবু বাবা অসুস্থ নয়, চিরকালের সুস্থ সবল মা হয়ে গেল অসুস্থ! কী যে অসুখ সে কথা কাকে শুধাবে! থানার ওয়্যারলেসে খবর দিতে হলো, নিশ্চয় বড় কোনো অঘটন কিছু ঘটেছে, শেফালি রানীর বুক কেঁপে ওঠে- তবে কি ভোরবেলার সেই স্বপ্নটাই সত্যি হলো!
হাতের মুঠোয় হৃৎপিণ্ড নিয়ে বহু পথ পাড়ি দিয়ে শেফালি যখন বাড়ি পৌঁছে, তখন সন্ধ্যা নামছে মন্দ মন্থরে এবং সব সংগীত ইঙ্গিতে গেছে থেমে। নয়নপাতা তার আজন্ম চেনা গ্রাম। তবু গা ছমছম করে গ্রামের মুখে ঢুকতেই। রিন্টুর চায়ের দোকানে হইহল্লা আর বেসুুমার আড্ডা চলছে, হঠাৎ পল্লীবিদ্যুতের ফকফকা বাতি জ্বলে ওঠে, তবু যেন শেফালির পা উঠতে চায় না। যেনবা অন্ধকার তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে, দুহাতে ঘন কুয়াশা সরিয়ে যেতে হচ্ছে সম্মুখে; দাসপাড়ায় এসে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে, কোথাও বুঝি প্রাণের স্পন্দন নেই। বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াতেই ছোট বোন চম্পা তাকে জাপটে ধরে ডুকরে ওটে- মা নেই।
নেই মানে! ভোটের পরদিন উন্মত্ত সহিংসতার মধ্যে মালা রানী দাস সবার অলক্ষে কখন নাকি আত্মহত্যা করেছেন। বিশ্বাস হয় না শেফালির। বাবার ভাবলেশহীন চোখের দিকে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করে, পোস্টমর্টেম করা হয়েছে? কোনো উত্তর নেই কারও মুখে। এমনকি চম্পা রানীর মতো ছোট মানুষও জবানে কবাট এঁটে বসে থাকে। দিদিকে কাছে পেয়ে দুহাতে জাপটে ধরে সে বিরামহীন কান্নাকাটি করে, কিন্তু ভেতরের কথা মোটেই খুলে বলে না। শেফালির কেবলই মনে হয়, চম্পা ও বাবা গভীর কোনো সত্যকে তার কাছ থেকে নিপুণভাবে আড়াল করছে। দুই বোন এক বিছানাতেই শুয়ে থাকে সারা রাত। এপাশ-ওপাশ করে। দীর্ঘশ্বাস আর ফোঁপানির শব্দ ছাড়া কারও বাগযন্ত্রের স্ফুট হওয়া ধ্বনি শোনা যায় না। একসময় রাত ফুরোয়, ভোরের পাখি মেতে ওঠে কলগুঞ্জনে, তখন শেফালি রানীর মনে হয়, নাহ্, দেশের এক প্রান্ত থেকে পড়ি কি মরি করে ছুটতে ছুটতে বাড়ি আসার কোনো মানেই হলো না!
বেলা বাড়তে বাড়তে একসময় মণি আপার মুখ মনে পড়ে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্কুলপাড়ায় গেলেই তার দেখা মিলতে পারে। আহা, এ সময়ে মায়ের মতো এ মানুষটির বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু তার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস খুঁজে পায় না। সামনে পেয়ে যদি প্রশ্ন করে বসেন- খুব তো পুলিশ হয়েছিস, কই তোর মাকে রক্ষা করতে পেরেছিস? আরও এগিয়ে এসে যদি জানতে চানÑ বিপন্ন মুহূর্তে নিজেকে রক্ষা করতে পারবি তো? বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে শেফালির, চম্পার মুখের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করে,
মণি আপা এসেছিলেন এ কদিনে?
চম্পা রানী ঘাড় নেড়ে জানায়, হ্যাঁ।
তোর সঙ্গে কথা হয়েছে?
না, আমাকে আদর করেছে। আর কথা হয়েছে বাবার সাথে।
কী কথা হয়েছে, তুই জানিস?
চম্পা প্রথমে ঘাড় দুলিয়ে জানায়, সে জানে না। আবার পরক্ষণেই মত পরিবর্তন করে সে গোপন তথ্য ফাঁস করার মতো করে বলে, বাবাকে বারবার থানায় যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল ম্যাডাম।
থানায় কেন! আমাকে খবর দেয়ার জন্য?
তা তো জানি না। বারবার মামলা করার কথা বলছিল।
কিসের মামলা! বাবা কি সে মামলা করেছে?
বাবাকেই শুধাও না!
তুই কী জানিস, বল!
বাবা থানায় যায়নি।
শেফালি রানী হিসাব মেলাতে পারে না। তাকে জানানোর জন্য স্থানীয় থানা পর্যন্ত কে দিয়েছিল মাতৃবিয়োগের এই সংবাদ! ওসি সাহেব তাকে মৃত্যুসংবাদ না দিয়ে মায়ের অসুস্থতার কথা বলেছেন, এসব ক্ষেত্রে এমনই হয়। আরও একটা প্রশ্ন তাকে খুব দগ্ধায়। মলি আপা কিসের মামলা করার কথা বলেছিলেন, আনন্যাচারাল ডেথ! এর বেশি কিছু নয়?
সরকারি চাকরিপ্রাপ্তির প্রাথমিক আবেগ ও মোহ কঠোর প্রশিক্ষণের সময়েই খানিকটা শ্লথ হয়ে এসেছিল, তারপর থানায় যোগ দিয়েও বিশেষ সুখকর অভিজ্ঞতা হয়নি শেফালির, তবু ছুটি ফুরিয়ে গেলে তাকে কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হতে হয়। বাড়ি থেকে বিদায় নেয়ার মুহূর্তে বাবার মুখের ওপর জানিয়ে দেয় শেফালি, মায়ের আত্মহত্যার কেচ্ছাটি তার বিশ্বাস হয়নি। কিছু না বলে চম্পা তখন ফুঁপিয়ে ওঠে।
 
তিন.
দীর্ঘ সাত বছর পর শেফালি রানীর আত্মহত্যার খবর এলে তার ছোট বোন চম্পা রানী মোটেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না; হাতের মুঠো থেকে শুধু যে মোবাইল সেট খসে পড়ে তাই নয়, ভেঙে পড়ে তার স্বপ্ন ও মনোবল। প্লাস্টিকের তৈরি মোবাইল সেট ভেঙে চৌচির হয়, কিন্তু দৃশ্যমানতার আড়ালে চম্পার মন ভেঙেচুরে যে কতভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, সে কথা কে বলবে!
না, চম্পা মোটেই বিশ্বাস করে না, তার বোন শেফালি আত্মহত্যা করতে পারে। কেন করবে আত্মহত্যা! চাকরিজীবনের এই সাত বছরে পদে পদে হোঁচট খেয়েছে আর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর অমোঘ পাঠ গ্রহণ করেছে। বলতে গেলে কোনো কিছুই তো লুকায়নি চম্পার কাছে। মায়ের মৃত্যুর সময় সে অনেক ছোট ছিল, এখন বড় হয়েছে, জেলা শহরের কলেজ থেকে বিএ পাস করেছে, চোখ-কান খোলা রাখতে শিখেছে। জীবনের গল্প শোনাতে শোনাতে শেফালি কখন অলক্ষে অন্য এক জগত রচনা করে দিয়েছে ছোট বোনের বুকের মধ্যে। কতদিন বুঝিয়ে বলেছে, নিজেকে রক্ষা করার কৌশল নিজেকেই শিখে নিতে হয় প্রতিটি ধাক্কা থেকে প্রতিটি আঘাত থেকে। তোমাকে রক্ষা করার জন্য আইন অছে, সমাজ আছে, রাষ্ট্র আছে; কিন্তু কেউ এগিয়ে আসবে না তোমার পাশে; তুমি নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াও, সবাই তখন স্যালুট করবে। আবার সামান্য অসাবধানতায় একটুখানি পা হড়কালেই মহাবিপদ, মাথার ওপর পাহাড় ভেঙে পড়বে।
দুচোখ বন্ধ করে চম্পা আপন মনে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে, বিড় বিড় করে প্রশ্ন করে, তোর কি পা হড়কেছিল দিদি, তুই টের পাসনি সামনে গর্ত? এসআই মতিন কি খুব বিরক্ত করছিল? তুই যে স্বেচ্ছায় বদলি হয়ে পাশের থানায় এলি, তবু রক্ষা হলো না! মাত্র মাস তিনেক আগে বিভাগীয় পদোন্নতির সঙ্গে বদলিও হয় শেফালি। নতুন পদে যোগদানের পর ছুটিতে বাড়ি এসে কত কথা যে খলবলিয়ে চম্পাকে বলে! ছোট বোন নয়, চম্পা তখন হয়ে ওঠে প্রিয় বান্ধবী। দিন-রাত কথা বলেও যেন তার কথা ফুরোয় না, প্রমোশন উপলক্ষে তাকে মোবাইল ফোন উপহার দেয়, সেই মোবাইলেও কত কথা হয় বোনে-বোনে, কত না আতালি-পাতালি কথা! বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস করে প্রমোশনের তালিকায় নাম উঠেছে তার, তবু এসপি সাহেবের কতরকম যে টালবাহানা! অ্যাডিশনাল এসপি পরিতোষ হালদার গায়ে পড়ে উপকার করতে চাইলে শেফালি রানীর গায়ে কাঁটা দেয়, ভয় ভয় লাগে। একদিন নিজের চেম্বারে ডেকে সেকি হুমকিধামকি- তোমাকে না বাসায় দেখা করতে বলেছি, শুনতে পাওনি? শেফালি কেবলই বিনম্র ভঙ্গিতে স্যার স্যার করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। পরিতোষ বাবু উপদেশ দেন, মাইনরিটি কমপ্লেক্সটা ঝেড়ে ফেলতে হবে বুঝেছ! পুলিশের মধ্যে ওসব কম্যুনাল ফিলিংস বলে কিছু নেই। শেফালি রানী কেতামাফিক বুট ঠুকে আনুগত্য জানায়, ইয়েস স্যার!
চম্পা রানীর খুব কৌতূহল হয়। সে রাতে দিদির গলা জড়িয়ে ধরে জানতে চায়, তারপর সেই পরিতোষ বাবুর বাসায় আর যাসনি দিদি?
শেফালি দীর্ঘশ্বাসের গা পেঁচিয়ে বলে,
অবাধ্য হওয়ার উপায় আছে? এর নাম পুলিশের চাকরি। পান থেকে চুন খসলেই পানিশমেন্ট।
অ্যাডিশনাল এসপি বলে কথা। বলতে গেলে চোটপাট ও দাপটে এসপি সাহেবের চেয়ে কম কিছু নয়। নিচের ধাপের সদস্যদের সার্ভিস ক্যারিয়ার তাদের হাতের মুঠোয়। এসব শুনে শুনে চম্পার সাহস হয় না শুধাতে, অ্যাডিশনালের বাসায় গিয়ে তার দিদিকে কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।
সাত বছরের চাকরিজীবনে শেফালির কমক্ষেত্র বদল ঘটেছে পাঁচবার। পাঁচটা স্টেশনে অন্তত ২৫ রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সব অভিজ্ঞতার মূলে তার নারীসত্তা। পুলিশ হলেও সর্বত্র তার প্রধান পরিচয় সে যুবতী নারী। পুরুষকে নয়, পদে পদে হোঁচট খেতে খেতে নারীকে বুঝিয়ে দেয়া হয়- নারীত্বই তোমার অভিশাপ ও বন্দিত্ব। পুলিশের পোশাক গায়ে চড়ানো থাকলেও নারী আপাদমস্তক নারী, শেষ পর্যন্ত কামনা মদির পানপাত্র, তার পূর্ণ ব্যবহার খেলুড়ে পুরুষের হাতেই। শেফালির অপরাধ দুটোÑ নারী তো বটেই, সেই সঙ্গে সে হিন্দু নারী; ছোবল তো তাকে সইতেই হবে। এ সমাজে ফণা উঁচিয়ে থাকা মানুষের কী অভাব!
পুলিশ কিংবা অপুলিশে কী তফাৎ! পুরুষ হলে তারা উভয়েই পুরুষ, নারীর প্রতি আচরণে তারা এক ও অভিন্ন। দিনাজপুরের ফুলপুর থানায় গিয়ে সে অভিজ্ঞতাও হয়েছে শেফালির। সরকারি দলের স্থানীয় এক যুবনেতা থানার সেকেন্ড অফিসারের সঙ্গে ঘোঁট পাকিয়ে শেফালিকে এমন এক ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকে ফেলে যে, তাদের থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো পথই খোলা ছিল না প্রায়। দৈবক্রমে সেদিন সেকেন্ড অফিসারের স্ট্যান্ডরিলিজের অর্ডার এসে পৌঁছলে শিকার ফেলে রেখেই বিদায় নিতে হয়। তার পরও সেই যুবনেতা বেশ কদিন থানার ভেতরে ঘুরঘুর করে, কৌশলে কুৎসিত প্রস্তাব দেয়, প্রলোভন এবং হুমকি একসঙ্গে প্রয়োগ করে, সব শেষে বিয়ের প্রস্তাব পর্যন্ত পাঠায়। উহ্, সে এক দুঃসহ দিন গেছে বটে।
চম্পা রানী এ সবই শুনেছে তার দিদির কাছে। শেফালি রানী নিজ জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়ে ছোট বোনকে সতর্ক করতে চেয়েছে, জাগিয়ে রাখতে চেয়েছে। এসআই মতিনের উন্মত্ত ও পাশবিক আচরণের কথাও অকপটে জানিয়েছে। ঘরের বউ একঘেয়ে পানসে হয়ে গেছে, সে চায় স্বাদ বদল করতে, তার জন্য অকাতরে খরচ করতেও প্রস্তুত। শেফালিকে কবজা করার জন্য কতরকম জঘন্য কৌশল যে খাটিয়েছে, তা কি বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যায়! চম্পাও আর শুনতে চায় না, দিদিকে সে পরামর্শ দেয়- তার চেয়ে তুই বিয়ে করে ফেল না দিদি!
দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে শেফালি, তোর বিএ পাস হলো, একটা চাকরিবাকরি হোক, তারপর দেখা যাবে...
ও বাবা, তখন তো আমারই বিয়ের সময় হয়ে যাবে।
বেশ তো, আগে না হয় তোরটাই হবে। এখন ঘুমো।
ঘুম আসে না চম্পার। সম্প্রতি সে প্রেমে পড়েছে। জেলা শহরে কলেজে পড়ার সময় বিভাষ উকিলের ছেলে বিমল খুব পিছু লাগে। সে পাত্তা দিতে চায়নি। কিন্তু বিমল বিস্তর জ্বালাতন করে। সে নাকি জাতপাতের ভেদ মানে না। চম্পাকে তার চাই-ই চাই। প্রয়োজন হলে বিমলই নাকি মুখ খুলবে দিদির কাছে। চম্পাও সুযোগ খোঁজে প্রসঙ্গ তোলার, হয়ে ওঠে না। প্রমোশন পাওয়ার পর যেন পুলিশি মেজাজ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে তার দিদির মধ্যে, এই ভালো এই মন্দ, কোন কথার কী যে মানে করে বসে! তবু সে কৌশলে মন বুঝতে চায় শেফালির, গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে জানতে চায়, আচ্ছা দিদি, এই যে এতটা বয়স হলো তোর, কোনো পুরুষের চোখে তুই বিশ্বাস খুঁজে পাসনি কখনো?
তোর কী হয়েছে বলতো শুনি!
না, বিশ্বাস ছাড়া ভালোবাসা যায়? সংসার করা যায়?
তুই কি প্রেমে পড়েছিস চম্পা?
পুলিশের এই তো দোষ- সবকিছুতেই সন্দেহ।
সন্দেহের গন্ধ পাচ্ছি যে!
বাবা যে তোর বিয়ে নিয়ে কতটা চিন্তিত, সে কি তুই টের পাস দিদি?
দুই মেয়ে সেয়ানা হয়েছে, তার তো চিন্তা হবেই। কিন্তু তোর কী হয়েছে বল দেখি!
চম্পা রানী অবশেষে পুলিশের কাছে ধরা দেয়। যতটুকু সম্ভব বিমলবৃত্তান্ত খুলে বলে নিজে মুখে। বিমলকে বেশ ভালোই চিনতে পারে শেফালি। কলেজে পড়ার সময় বিভাষ উকিলের বাড়িতে বসে বিমল আর বীণা দুই ভাইবোনকে প্রাইভেট পড়িয়েছে। ওই বাড়ির সবাই খুব ভালো মানুষ, এতে সন্দেহ নেই। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে শেফালিকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে, সহানুভূতি দেখিয়েছে। তাই বলে তার বোন চম্পা রানী দাসের সঙ্গে একমাত্র পুত্র বিমল মুখার্জীর বিয়ে দেয়া কি সম্ভব! বড্ড দুশ্চিন্তা হয় শেফালির। বুকের ভেতরে ভয়ানক তোলপাড় হয়। চম্পাকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে ওঠে- এ তুই কী করেছিস সর্বনাশী! অথই জলে ডুবে মরবি, সে হুঁশ আছে তোর?
কথা বলে না চম্পা, নিভৃতে শুধু ফুঁপিয়ে ওঠে। শেফালি আবারও বলে, বিমলের চোখে খুব বিশ্বাস দেখতে পেয়েছিস তাই তো! পুরুষ মানুষের চোখের জল শুকাতে কতক্ষণ। কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে বিশ্বাস। তখন কেউ তাকাবে না তোর দিকে, বুঝেছিস?
চম্পার মুখে কোনো কথা নেই। সে নির্বিবাদে শুয়ে থাকে চুপচাপ। অন্ধকারে তার চোখ খোলা কান খোলা। তখন কথা বলার নেশায় পেয়েছে শেফালিকে। ছোট বোনকে আতালি-পাতালি শতেক কথা বুঝাতে গিয়ে কখন অলক্ষে তার নিজের বুকের কবাট খুলে যায়। বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে পড়ে স্রোতের ধারা। সেই কবে সারদা পুলিশ একাডেমিতে পরিচয় সুরেশ বৈদ্যের সঙ্গে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কথা হয়নি বললেই চলে। চোখের ভাষা বলে যে একটা কথার চল আছে, সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে মানতেই হবে সুরেশের দুচোখের আকাশে সোনালি রোদ ছিল, কাকলিমুখর পাখিরা ছিল, আর ছিল মুঠোভর্তি বিশ্বাস। সুরেশ মুখে না বললেও শেফালি সব বুঝেছে, তবু না বোঝার ভান করে থেকেছে। পুলিশ একাডেমির কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসার পরও বহুদিন বিশ্বাসের পাথরে খোদাই করা সেই দুটি চোখ ভুলতে পারেনি শেফালি। কর্মজীবনের বাঁকে বাঁকে যেসব পুরুষ লোভাতুর হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে, তাদের চোখের পর্দায় সে ঝলসে উঠতে দেখেছে প্রতারণার ছুরি। কোথায় হারিয়ে গেছে সে বিশ্বাসের নিটোল ছায়া।
চম্পার চোখে ঘুম নেই। শেফালি তো শুধু তার বড় বোনই নয়, বন্ধুর মতো উদার তার মনের আকাশ, মায়ের মতো মমতামাখা তার বুকের উঠোন। এতদিন পর সেই মানুষটিকেই যেনবা সে নতুন করে চিনতে পারে। কত অবলীলায় সে জানিয়ে দিতে পারে- নিজের বিয়ের কথা নয়, সে ভাবছে চম্পার বিয়ের কথা। চাকরিবাকরি একটা কিছু হলে সে ছোট বোনের বিয়ে দিতে চায়, কিন্তু তার একটাই অনুযোগ- আকাশের চাঁদের দিকে তুই কেন হাত বাড়াতে গেলি হতভাগী! বিমল কি নেমে আসবে নিচে? মাত্র এটুকু কথাতেই চম্পার বুক ভেঙে কান্না আসে। মৃদু ফোঁপানি থেকে সে কান্না ধীরে ধীরে প্রলম্বিত হয়। শেফালি তখন ছোট বোনের কাঁধে হাত রেখে বলে, এখন উপায় আছে একটাই- নিজের পায়ে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো।
চম্পা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। শেফালি আবার উসকানি দেয়, পারবি না মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে?
চম্পা তবুও মুখ খোলে না। শেফালি তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে, বিমল তোকে কেমন ভালোবাসে? তোর মাথা উঁচু পরিচয় সে মেনে নেবে তো? বিয়ে তার সঙ্গেই হোক, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু চম্পা রানী দাসকে উপযুক্ত মর্যাদা দিতে হবে। আমার দাবি এইখানে।
শেফালির কণ্ঠের এসব কথা চম্পার কানের দরজায় খিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু শেফালিই নেই। নেই মানে কী? চম্পা কিছুতেই মানতে পারে না, তার দিদি আত্মহত্যা করেছে। মোবাইলে সংবাদটি আসতেই অজস্র স্মৃতি এসে ভিড় করে চৈতন্যজুড়ে, ওপার থেকে এ খবর যে দিল, তার পরিচয়টুকুও জানা হয় না। নাকি সে পরিচয় দিয়েছিল ঠিকই, এখন আর মনে পড়ছে না চম্পার! মোবাইল সেটও তো ভেঙেচুরে একাকার। তাহলে কী করবে চম্পা? বাবাকে ডেকে শোনাবে এ দুঃসংবাদ? হাঁপানির টানে শয্যাশায়ী মানুষটিকে নতুন করে কষ্ট দেয়ার কোনো মানে হয়?
চম্পা রানী এক টানে মেরুদ- সোজা করে উঠে দাঁড়ায়। প্রথমে সে স্থানীয় থানায় যাবে, দিদির থানার ওসির সঙ্গে ফোনে কথা বলে সঠিক খবর নিয়ে সেই থানার উদ্দেশে রওনা হবে। না, এটা কিছুতেই আত্মহত্যা নয়। সে বাদী হয়ে হত্যা মামলা করতে চায়। মায়ের মৃত্যুতে যে মামলাটি করা হয়নি, বোনের মৃত্যুর পর আর সে ভুল করবে না। হত্যা মামলার বাদী হওয়ার মতো বয়স ও যোগ্যতা এখন তার হয়েছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সে যাত্রাটা শুরু করতে চায় এখান থেকেই। কিন্তু এ সময় বিমল কি তার পাশে এসে দাঁড়াবে! এ দুঃসময়ে যদি তাকে পাশে না পাওয়া যায়, তবে আর সেই হাতে হাত রেখে জীবনের দুস্তর পথ পাড়ি দেবে কী করে? তাহলে সেটা ফাইনাল হয়ে যাক এখনই।
বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যায় চম্পা, বাবার আশীর্বাদ নিয়েই সে রওনা হতে চায়। চম্পাকে দেখে অসুস্থ বাবার চোখ ছলছল করে ওঠে। হাঁপানির ঘড়ঘড়ানির মধ্যেই বড় মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার ইচ্ছর কথা সে প্রকাশ করে। চম্পা হিসাব মেলাতে পারে না- বাবাকে সে কীভাবে জানাবে যে, দিদির দেয়া মোবাইল ফোনটি কেমন করে ভেঙে গেছে!

Disconnect