ফনেটিক ইউনিজয়
ফেসবুক গল্প
আনোয়ারা সৈয়দ হক

সবুকে আলাপ। তারপর সে আলাপ গড়াতে গড়াতে এতদূর যে, লোকটি এখন তাহমিনা সিকদারের বেডরুমে বসে আছে!
এ রকম হয়তোবা কখনও কখনও হয়। হঠাৎ করে কাউকে জীবনে খুঁজে পাওয়া যায়, যাকে মনে হতে পারে স্বপ্নপূরণের জাদুকর। রোমান্সের রাজপুত্র। ভালোবাসার রাজা। শমসেরকে দেখে, তার সাথে আলাপ করে তাহমিনার এ রকমই মনে হয়েছিল হয়তো। তাই সে প্রাথমিক অবস্থার নির্দোষ বন্ধুত্বের বেড়া ডিঙিয়ে বিশেষ একটি বন্ধুত্ব তৈরি করতে দ্বিধা করেনি।
এ বন্ধুত্ব এখন তিন মাসের পুরনো হতে চলেছে।
তাহমিনার স্বামী ঢাকার বাইরে একটা কাজে গিয়েছে, আগামী বুধবার বাড়ি ফিরবে। এর ভেতরে তিন-চারবার ফোন করা হয়ে গেছে তাহমিনাকে। সরকারি গাড়ি নিয়ে কাজে গেছে মুস্তাফিজ। গেছে সিলেট, সেখান থেকে আবার অন্য জায়গায়। সব মিলিয়ে সাতদিনের ধাক্কা। এই সাতদিন তাহমিনা একা থাকবে। এ রকম মাঝে মাঝেই থাকে সে। তখন ছুটা কাজের মেয়েটা তার সঙ্গে রাতের বেলা থেকে যায়। এবার সে দেশে গেছে। তার মায়ের নাকি অসুখ। তাই তাহমিনা একা আছে। তবে এতে ভয়ের কিছু নেই। যে মাল্টিস্টোরি ফ্ল্যাটে সে থাকে, সেটা খুব সংরক্ষিত। আগেও এ রকম মাঝে মধ্যে তাহমিনাকে একা থাকতে হয়েছে।
মাল্টিস্টোরি ফ্ল্যাটের এটা ২ নম্বর ব্লক। এ ব্লকের ৫৪টা ফ্ল্যাটের সাততলার একটি পূর্ব দিকের ফ্ল্যাটে তাহমিনা আর তার স্বামী থাকে। সকালবেলা সব ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা যখন কাজে যায়, সে একটা দেখার মতো অবস্থা। প্রায় সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এ বিশাল ব্লকটি গম গম করতে থাকে গাড়ি ঢোকা ও গাড়ি বেরোনোর শব্দে। সেই সাথে মানুষও। কোনো কোনো ফ্ল্যাটের মানুষ সবাই কাজে যায়। তাদের নিজস্ব গাড়ি থাকে। কোনো ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে চড়ে কাজে যায়। সেসব গাড়ি গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে। কেউ ব্লকের বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠে না। কারণ নিচের লাউঞ্জ থেকে গাড়িতে চড়ে বসাটাই হলো ভদ্রতা। হেঁটে গেটের বাইরে গিয়ে গাড়িতে ওঠা নাগরিক সভ্য জীবনে শোভা পায় না।
এসব হিসাব খুব চুলচেরা। কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। সবই উপলব্ধির ব্যাপার।
এতসব ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের খোঁজখবর রাখে ডেভেলপার কর্তৃক নিযুক্ত গার্ডরা। তাদের সুপারভাইজার সর্বক্ষণ সবকিছুর খোঁজখবর রাখছে। তবে খুব যে ভালো রাখছে, তা বলা যাবে না। কারণ তাহমিনা সিকদারের বয়ফ্রেন্ড বা ফিঁয়াসে যে গতকাল থেকে তাহমিনার ফ্ল্যাটে উঠে বসে আছে, তার নাম ভিজিটর বুকে নেই, তাহমিনাই নিচে নেমে কায়দা করে তাকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে গতকাল সকালের সেই ভিড়ভাড়াক্কার সময়। তারপর সে যে আর নিচে নামেনি, এ খবর নিচের তলার সিকিউরিটির কেউ রাখছে কিনা বোঝা মুশকিল।
না রাখলেই ভালো। তাহমিনা ভাবে।
গতকাল সকাল থেকে বাড়ির কাজের মেয়ে ছুটি নিয়ে চলে গেছে। ফ্রিজভর্তি খাবারদাবার। কিছু রান্না করা, কিছু কাঁচা। গ্যাস ওভেনে গতকাল মুরগির রোস্ট করেছিল তাহমিনা। শমসের মুরগির রোস্ট খেতে ভালোবাসে। শমসের লোকটি শিক্ষিত। তার বউ-বাচ্চা আছে। তবে বাচ্চাগুলো বড় হয়ে গেছে। তাদের একজন আমেরিকায় পড়তে গেছে। আরেকজন কানাডায়। শমসের ব্যবসায়ী মানুষ ও বেশ বুদ্ধিমান। তবে সব ক্ষেত্রে নয়, বিশেষ করে মেয়েদের ব্যাপারে সে একটু আনাড়ি বটে। তার পরও তাহমিনার সাথে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে। যেমন তার ছোট ছেলেটি কানাডায় পড়তে যাওয়ার পরের বছরই সে তার নামে কানাডায় একটি বাড়ি কিনে ফেলেছে। ছোটটি বেশ চালাক-চতুর। সেই বাড়ির একাংশ ভাড়া দিয়ে বাড়ির মর্টগেজ দিব্যি উঠিয়ে নিচ্ছে। বড় ছেলেটি একটু সোজা-সরল। সে কানেকটিকাটে নিউ হ্যাভেন ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। লেখাপড়ায় ভালো। ভালো গ্রেড পাচ্ছে।
এদিক থেকে শমসেরকে সুখী বলা যায়। শমসেরের স্ত্রী একটি সরকারি কলেজের প্রভাষক। শিগগিরই সহকারী অধ্যাপক হয়ে যাবে। সেদিক থেকে তার স্ত্রী বেশ করিৎকর্মা। একহাতে সংসার, আরেক হাতে চাকরি, সব সেই মহিলা গুছিয়ে রেখেছে এত বছর। ছেলে দুটো বাইরে থাকায় একটু মন খারাপ বটে, শমসের তাকে এটাও বলে রেখেছে, ভবিষ্যতে তারা সবাই বিদেশেই সেটেল হবে। কারণ এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
তাহমিনা সেদিক থেকে হয়তো একটু পিছিয়ে। কারণ সে বাইরে কোনো চাকরি করে না। বিএ পাস করার পর মুস্তাফিজ যখন বলল, আর লেখাপড়ার দরকার নেই, তো সেও চুপ করে গেল। তখন সে সুষমকে পেটে ধরেছে। শরীরটরিরও ভালো যেত না সবসময়, মনটনও খারাপ থাকত। তাই আর লেখাপড়াটা শেষ করতে পারেনি। এখন অবশ্য তার মনে আফসোস হয়। মনে হয়, যদি সে লেখাপড়াটা শেষ করতে পারত আর বাইরে গিয়ে চাকরি করতে পারত, তাহলে হয়তো এসব ফেসবুক ভূত তার ঘাড়ে চাপতে পারত না। এখন তো ফেসবুকই তার সময় কাটানোর প্রধান একটি উপায়। অবশ্য আরও একটি জিনিস আছে। সেটা হলো হিন্দি সিরিয়াল। সেই সিরিয়াল দেখেও দিনের কিছুটা সময় সে ব্যয় করতে পারে। না, সুষমকে তার দেখতে হয় না। সুষম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়ে। সেই কত বছর হয়ে গেল। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় সুষম মা-বাবা ছেড়েছে। এখন সে কৈশোর ছাড়িয়ে যাওয়া একজন তরুণ।
সুষম তাহমিনার মতোই দেখতে সুন্দর হয়েছে। খুব ভালো একজন ফুটবল খেলোয়াড়। খুব সম্ভব বাংলাদেশ আর্মিতে সে ঢোকার চান্স পেয়ে যাবে। ঢুকলে মুস্তাফিজ খুব খুশি হবে। কারণ এককালে তার নিজেরই আর্মিতে ঢোকার সখ ছিল। ছেলেকে কাছে না পাওয়ার জন্য তাহমিনার বুক মাঝে মধ্যে খাঁখাঁ করে বটে, কিন্তু সে অন্য ধরনের খাঁখাঁ। মুস্তাফিজের ব্যাপারে তাহমিনার অনেক অভিযোগ। সেসব অভিযোগ জড়ো করলে পাহাড়ের মতো উঁচু হবে। তাহমিনা সেসব কারও সাথে আলোচনা করতে চায় না। তার অহংবোধ প্রবল। সেটা সবসময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। সে কম কথা বলে। কিন্তু তার ভেতরটা পাহাড়ি এলাকার দুর্গম অঞ্চলের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ফল্গুধারার মতো। সেখানে সর্বক্ষণই একটি গুরুগম্ভীর উথালপাথাল শব্দ। কিন্তু বড় চতুরতার সাথে তাহমিনা মনের এ ভাবধারাকে দমিয়ে রাখে। নানা আজেবাজে কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখতে চায়।
মুস্তাফিজের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় একটি যা অভিযোগ তা হলো, মুস্তাফিজ লোকটি চিতল মাছের মতো শীতল হয়ে গেছে সেই কত বছর হলো। তার ছেলে সুষমের জন্ম নেয়ার বছর তিনেকের ভেতরেই। উদ্বিগ্ন তাহমিনা আগে এ ব্যাপারে কিছু বলতে গেলেই মুস্তাফিজ রেগে উঠত। ভাব দেখাত, বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেছে, সেই বাচ্চা তিন বছরের বড় হয়ে গেছে, এখন আবার শরীরের উত্তাপ হারানো নিয়ে এত বকবকানি কিসের? কোনো ভালো বংশের মেয়েরা এসব নিয়ে কি চিন্তা করে?
তাহমিনা জানে না কোনো ভালো বংশের মেয়েরা এসব নিয়ে চিন্তা করে কিনা। তবে খুব ভালো বংশের অনেক মেয়েকেই সে আজকাল ফেস বুকে দেখে, তাদের অনেক কা-কারখানা জানে। অনেক মেয়ে ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে ঢুঁ মেরে বিনা পয়সায় দেহ বিক্রি করে আসে, শুধু দেহের একাকীত্ব মেটানোর জন্য। ফলে এসব নিয়ে এখন আর এত হাউকাউ করা সাজে না। তাহমিনা জানে, তার স্বামী মুস্তাফিজ নিজের শরীরের দুর্বলতা ঢাকার জন্য যত বড় বড় কথাই বলুক না কেন, শেষমেশ এই দাঁড়ায় যে, মেয়েরা তাদের শরীরের চাহিদা যেভাবে হোক মেটাবেই!
তাহমিনাও এসব মেয়ের দলের মধ্যে পড়ে। অনেকে ধর্ম নিয়ে মেতে থাকে নিজের দেহের উত্তাপ ঢেকে রাখার জন্য, কিন্তু তা আর কতদূর? পির সাহেবের আস্তানায় গিয়ে মেয়েরা যেসব খারাপ খারাপ কথা বলে, তার কিছু কিছু তাহমিনা জানে। নিজের কানে শুনেছে। এসব কিসের জন্য? সেই দেহের জ্বালাপোড়া নিবারণের জন্য!
মাঝে মধ্যে তাহমিনার মনে হয়, প্রতিটি মেয়ের শরীরে একটি করে জ্বলন্ত ফার্নেস আছে, সেই ফার্নেস ক্রমাগত ঘৃতাহুতি চায়, যে বা যারা মনে করে, মেয়েরা একটি নিরেট বস্তু, কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলেই তারা শান্ত থাকবে, তাদের মতো মূর্খ এ দুনিয়ায় আর কে?
হ্যাঁ, শমসের গতকাল সকাল থেকে তাহমিনার ফ্ল্যাটে। আশ্চর্যের বিষয়, এই ২৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটটি মুস্তাফিজ তাহমিনার নামেই কিনেছে। ইচ্ছে করলে সে নিজের নামে কিনতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। কেন করেনি সেটা জানে না তাহমিনা। তাহমিনার কেন জানি মনে হয়, এটা এক ধরনের ঘুষ। তার যৌবনের অধিকাংশ সময় যে সে বিফলে চলে যেতে দিয়েছে, যেখানে মুস্তাফিজের কোনো প্রকারের সাহায্য বা সহযোগিতা পায়নি, সেই হেতু মুস্তাফিজ স্ত্রীকে সান্ত¡না দেয়ার জন্য ফ্ল্যাটটি তার নামে কিনেছে। মানুষের মনের জটিলতা অনুধাবন করা খুব মুশকিল। তবু তাহমিনা নিজের বুদ্ধি দিয়ে ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করতে পারে। এখন এ ফ্ল্যাটের দাম অনেক। প্রায় আকাশছোঁয়া দাম। কিন্তু হায়! শরীরের উত্তাপ কি ফ্ল্যাট কিনে দিলেই প্রশমিত হয়?
শমসের এ বাসায় আসা অবধি ফ্ল্যাটটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। দুটো সিটিং রুম, চারটে বড় সাইজের বেড রুম। প্রতিটি শোয়ার ঘরের সাথে লাগোয়া টয়লেট। প্রতিটি ঘরের সাথে একটি করে বারান্দা। সত্যি, যতদূর সুন্দর হতে পারে ফ্ল্যাটটা। আবার পূর্ব দিকের বারান্দায় দাঁড়ালে বিস্তীর্ণ আকাশ দেখা যায়। এ বারান্দাটি তাহমিনার শোয়ার ঘরের সাথে লাগানো।
শমসেরের নিজের বাড়ি আছে মগবাজারে। তার বাবার রেখে যাওয়া বাড়ি। সেই বাড়ি এখনও মাল্টিস্টোরি করা হয়নি, কারণ ভাইদের অনেকেই বিদেশে আছে। সবাই মিলে বসে একসময় এসব ফয়সালা করতে হবে।
তাহমিনার ফ্ল্যাটের প্রতিটি শোয়ার ঘরে সুন্দর করে বিছানা করা আছে। শুধু একটি শোয়ার ঘর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করা আছে। তাহমিনার বসার ঘরে বড় বড় ফুলদানি। দেয়ালে দেশি শিল্পীদের চিত্রকলা। এ বাড়ির গৃহকর্ত্রী রুচিশীল। মনে মনে ভাবল শমসের। ভেবে মন আপ্লুত হলো।
তারপর ছোট্ট করে তাহমিনাকে ডাক দিল, ডারলিং?
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে তাহমিনা সকালের নাশতা তৈরি করছিল। সে সেখান থেকেই উত্তর দিল, কী?
তুমি কোথায়? বলতে বলতে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল সে। তারপর পেছন থেকে তাহমিনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার জন্য এত নাশতা করতে হবে না, আমি সকাল বেলা এত কিছু খাই না।
সত্যি? তার কথা শুনে একটু যেন অবাক হলো তাহমিনা। অথচ মুস্তাফিজ সকালে উঠেই নাশতা খাওয়ার জন্য ঝুল ধরে। পরোটা, মাংস, ডিম কত কিছু লাগে তার নাশতার সময়। মুস্তাফিজ বলে, সকালে ভর পেট নাশতা করে তারপর সারাদিন হালকা করে খাবার খেতে হয়, বুঝলে তানি।
তানি তাহমিনার ডাকনাম।
শমসের বলল, আমি বেলা ১১টার দিকে নাশতা করি। আমার যেখানে অফিস, তার নিচেই ভালো একটা ক্যান্টিন আছে। ক্যান্টিনটা খুব ভালো নাশতা তৈরি করে। সকালে আমার বাড়িতে খুব তাড়াহুড়ো তো। বৌ কাজে যায়, আমার বোনের ছেলেটি কলেজে যায়। আমি অফিসে যাই। অনেক ঝামেলা।
তার কথা শুনে হেসে উঠল তাহমিনা। কিন্তু হাসলেও খেয়াল করল বৌ শব্দটা উচ্চারণের সময় শমসেরের গলার স্বর কেমন যেন মোলায়েম হয়ে উঠল! কিন্তু এটা গা করলে চলবে না। এসব গা ঝাড়া দিয়ে ফেলতে হবে। তাহমিনার সঙ্গে প্রেম হয়েছে বলে শমসেরের অতীত মুছে যায়নি। বরং বেশ জলজ্যান্তভাবেই বেঁচে আছে। যেমন আছে তাহমিনা। শুধু রাতের বিছানায় এসব কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেলেই হলো!
যা তারা সত্যিকার অর্থেই গিয়েছিল।
মানুষের জীবন কী? মাঝে মাঝে ভাবে তাহমিনা। শুধু ক্ষণিকের টানাপড়েন, শুধু ক্ষণিকের অস্থিরতা, ক্ষণিকের হিসাব-নিকাশ। সেই হিসাব-নিকাশে কেউ জেতে কেউ হারে। যারা হারে তারাও কিন্তু সত্যিকারে হারে না। এ পৃথিবীতে সত্যিকারের হার বলে কিছু নেই। কারণ সবার শেষ গতিই এক করে রেখেছেন ঈশ্বর!
তাহমিনা আপন মনে নীরবে হাসছে দেখে যেন ভোরের শিউলির কথা মনে পড়ল শমসেরের। ছেলেবেলায় চোখে দেখা সেই শিউলি ফুল। সত্যি সে খুব ভাগ্যবান যে, এ রকম একটি মহিলার সাথে তার পরিচয় হয়েছে। এই ফেসবুক সত্যি আকাশ-পাতাল থেকে খুঁড়ে তুলে আনছে অজানা সব মানুষদের, ঘরের কোণে পড়ে থাকা গৃহবধূ, বিধবা, অনূঢ়া, মাঝবয়সী, শিক্ষিকা অথবা জাঁদরেল কোনো মহিলাকে। তাদের অজানা সব তথ্য। ফেসবুক না হলে কীভাবে সে তাহমিনার সাথে আলাপিত হতো? অথচ বছরের পর বছর ধরে তারা একই শহরে বাস করছে। কেউ কাউকে না চিনেই। গতকাল তাহমিনার বেডরুমে তারা দুজনে একসঙ্গে ঘুমিয়েছে। তবে গতকালই তাদের প্রথম রাত নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার সে আর তাহমিনা এক বন্ধুর খালি ফ্ল্যাটে দিনের অনেকখানি সময় ব্যয় করেছে। খুব ঘনিষ্ঠ সময়। বন্ধুটি ফ্রান্সে থাকে। সেখানে চাকরি করে। শমসেরের হাতে চাবির একটা গোছা রেখে গেছে মাঝে মাঝে ফ্ল্যাটটা ঝেড়েমুছে রাখতে। বন্ধুর নিজের কাজের একটি লোক আছে। তাকে মোবাইল করলে সে এসে ঘরদোর পরিষ্কার করে রেখে যায়। শুধু চাবিটা থাকে শমসেরের হাতে।
এ রকম একটি ব্যবস্থা শমসেরের বেশ পছন্দ। পুরো একটি ফ্ল্যাট নিজের আওতার মধ্যে। যখন ইচ্ছে তালা-চাবি খুলে ঢুকলেই হয়। এ ফ্ল্যাটটা হাতের কাছে ছিল বলেই তাহমিনার সঙ্গে অতি দ্রুত গভীর বন্ধুত্ব হতে পেরেছ। তাহমিনা মহিলাটিকে শমসের যত দেখছে, তত অবাক হচ্ছে মনে মনে। কথা বলে কম, কিন্তু বিছানায় তার ভাষা অনেক বেশি আবেগময় ও প্রাণবন্ত। এ রকম একজন নারীকে না ভালোবেসে পারা যায় না, এ কথা মাঝে মাঝে মনে হয় শমসেরের।
তাহমিনা নাশতা করতে করতে ভাবতে লাগল, সে তার নতুন চেনা এ প্রেমিককে বাসায় ডেকে এনে ভুল কাজ করল কিনা। তবে মানুষটি ভালো। ভালো বংশের। ভালো মনের। অনেক উদার। একটু আত্মম্ভরী মনে হয় মাঝে মাঝে। তবে সেটা তাহমিনার কাছে বাহাদুরি দেখানোর জন্যও হতে পারে। হাজার হোক নতুন প্রেমিক তো! তবে এটা ঠিক, লোকটি মুস্তাফিজের মতো এত কূপম-ূক মনের নয়। মুস্তাফিজ তো তাহমিনাকে তার লেখাপড়াই ঠিকমতো শেষ করতে দেয়নি। অথচ শমসের যখন বিয়ে করেছিল, তার স্ত্রী ছিল মোটে আইএ পাস, বিয়ের পর নিজের খরচে স্ত্রীকে বিএ পড়িয়েছে, এমএ পড়িয়েছে, তারপর অনেক দরখাস্ত করে তাকে সরকারি চাকরিতে ঢুকিয়েছে। স্ত্রীকে স্বাবলম্বী করে তুলতে সে কোনো দ্বিধা করেনি। এখন যদি তার স্ত্রী শমসেরের চরিত্র দোষ টের পেয়ে তাকে বাতিলও করে দেয়, তবু নিজে সে না খেয়ে মরবে না! কারণ তার একটি নিজস্ব আইডেনটিটি আছে।
কিন্তু তাহমিনার কী আছে? এমনকি বাপের বাড়ি থেকে কিছু সম্পত্তি পাওয়ার যে কথা ছিল, সেটা পর্যন্ত ভাইয়েরা দেয়নি। শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে ভুলিয়ে রেখেছে।
তবে মুস্তাফিজ তাকে স্ত্রী হিসেবে যে সম্পত্তিটি দিয়েছে, সে রকমই বা এ দেশের কজন স্বামী দেয়? এজন্য তাহমিনার মনে একটি কৃতজ্ঞতা বোধ আছে। আছে কিছু গর্বও। এমনকি তাহমিনার যে বোন চুয়াডাঙ্গায় থাকে এবং একটি চাকরি করে, তার স্বামীও কোনোদিন তার স্ত্রীর নামে কোনো সম্পত্তি কেনেনি। অথচ সংসারের দৈনন্দিন খরচ এ বোনই সারাজীবন বহন করে যাচ্ছে।
না, এসব কথা এখন তাহমিনার ভাবা উচিত নয়। বরং এ সময়টুকু উপভোগ করা উচিত। না, শমসেরকে জীবনে জড়িয়ে ফেলার জন্য তাহমিনার মনে কোনো দুঃখ বা অনুশোচনা নেই। কেন থাকবে? বরং যেটা হওয়ার ছিল সেটা হয়েছে। আজ কতদিন ধরে তাহমিনা আলাদা ঘরে তার নিজের ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছে। কারণ অতীতে বহুবার ঘুমের ভেতরে তাহমিনা যখন তার স্বামীর দিকে কামনার হাত বাড়িয়েছে, তখন সে হাত আস্তে করে সরিয়ে দিয়েছে মুস্তাফিজ। এ রকম অনেকবার। একদিন এ নিয়ে যখন তুমুল ঝগড়া হয়েছে, তখন তাহমিনা রাগ করে বলে উঠেছে, তাহলে আমরা এক বিছানায় ঘুমাই কেন? আলাদা ঘুমালেই তো হয়।
আলাদাই তো ঘুমানো উচিতÑ উত্তরে বলেছিল মুস্তাফিজ। তারপর সরল মুখে বলেছিল, আর আলাদা ঘুমালে কোনো দোষ তো নেই। কারণ বহু সমাজ আছে, যেখানে প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর বিছানা আলাদা হয়ে যায়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বহু বাঙালি ভদ্রলোক স্ত্রীর বাচ্চা হলে পর বিছানা আলাদা করে ফেলে। তাতে কি তাদের দাম্পত্য জীবন ব্যাহত হয়? না। ভালোবাসা কি কমে যায়? না। বরং আরও বৃদ্ধি পায়! দৈহিক ভালোবাসাই কি সব? মনের ভালোবাসার কি কোনো দাম নেই?
তাহমিনা স্বামীর এসব বড় বড় কথার পরও জানত, আসলে নিজের অক্ষমতাকে ঢেকে রাখার জন্যই মুস্তাফিজের এতসব বাগাড়ম্বর!
স্বামীর কথা শুনে সেদিন গুম হয়ে গিয়েছিল তাহমিনা। বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। তখন তারা ছিল ভাড়া বাসায়। তো সেই থেকে শুরু হলো। তাহমিনা আলাদা বিছানায় ঘুমাতে শুরু করল। কিছু কিছু আত্মীয়স্বজন ব্যাপারটা টের পেয়ে একটু কানাঘুষা করল। কিন্তু তা আর কতদিন।
প্রথম প্রথম একা বিছানায় ঘুমাতে খুব খারাপ লাগত তাহমিনার। ঘুম আসত না। একটি শরীরের নৈকট্যের জন্য চোখের ঘুম হারাম হয়ে যেত। কিন্তু তারপর থেকে ভালো লাগতে শুরু করল। দেখল, সে রাতের বেলা অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় শুয়ে নিজের ঘরের টিভি অন করে তার পছন্দের সিরিয়ালগুলো দেখতে পারে। হিন্দি সিরিয়াল মুস্তাফিজের চোখের বিষ। তার সামনে বেশিক্ষণ এসব দেখা সম্ভব ছিল না আগে। সিরিয়াল শেষ হলে সে গল্পের বই পড়তে শুরু করল। প্রথমে হুমায়ূন আহমেদ, তারপর আরও গুরুগম্ভীর বই। আস্তে আস্তে যেন সিরিয়াল দেখার ঝোঁক কমে গেল। শুরু হলো ফেসবুকে মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করা। কত সব অজানা, অচেনা মানুষ। তারা ছড়িয়ে আছে দেশে-বিদেশে। জীবনের নতুন মানে যেন উন্মোচিত হলো তাহমিনার সামনে।
আসল কথা হলো মানুষকে বেঁচে থাকতে হবে এবং সুখের সাথে বেঁচে থাকতে হবে। একদিকে সুখ না হলে আরেকদিকে যেতে হবে। সেখানে সুখ না হলে আরেক দিকে। ছোট্ট এ জীবনের চত্বর তো দুঃখের কাঁথা সারাজীবন চাতালে মেলে রেখে কাটাতে পারে না। একমাত্র অসহায় মানুষই দুঃখে থাকে। তাহমিনা তো অত অসহায় নয়।
তাহমিনার এ পরিবর্তনে মুস্তাফিজ নিশ্চিন্ত হলো। তার বউ খুশি থাকলে সেও খুশি। হাজার হোক, বিয়ের আগে তাহমিনাকে চোখে দেখে, তার রূপ সৌন্দর্য দেখে তাকে পছন্দ করে ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছিল। সেই ভালোবাসা কি নিঃশ্বেষ হয়ে গেছে? না। শুধু তার রূপ পাল্টে গেছে। মুস্তাফিজ তো গোপনে কোনো নারীর সাথে নতুন সম্পর্ক করতে চায় না। কোনোদিন চায়নি।
মুস্তাফিজের এতসব গোপন কথা তাহমিনার জানার কথা নয়। কজন স্বামী-স্ত্রী তাদের মনের কথা পরস্পরকে খুলে বলে? কেউ কি বলে? তাহমিনা ভাবে।
একটু বাদে নাশতা খেতে বসল দুজনে। সুন্দর করে পরোটা ভেজেছে তাহমিনা। শমসের খেতে বসে আগে পরোটা ছিঁড়ে তাহমিনার মুখে তুলে দিল। দেয়ার আগে মুখ সরিয়ে বিস্মিত হয়ে তাহমিনা বলল, ও কি?
তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি ! হাসতে হাসতে বলল শমসের।
আমি কি ছেলেমানুষ? ঢঙ করে বলল তাহমিনা। এখন তার পরনে ঢোলা একটা ম্যাক্সি। চুল ঝুঁটি করে মাথার ওপরে বাঁধা। মুখে হালকা প্রসাধন। কিন্তু তাতেই তাকে অপূর্ব লাগছে শমসেরের চোখে।
খেতে খেতে শমসের হঠাৎ তাহমিনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, জানো, তোমার বাসায় আমি এই প্রথম, কিন্তু আমার একটুও অপরিচিত মনে হচ্ছে না, কেন বলো তো?
সেটা আবার কী? কৌতুক করে বলল তাহমিনা।
শমসের বলল, এই যে তোমার সাথে আমি গতকাল রাত কাটালাম, তার আগে তোমার সাথে বসে খেলাম, গল্প করলাম, মনে হলো যেন কত বছরের পরিচয় তোমার সাথে আমার। মাত্র তিন মাস হলো আমরা পরস্পরকে চিনেছি, এটা যেন মনেই হয় না। যেন আমার অজান্তে সারাটা জীবন আমি তোমকেই খুঁজছিলাম!
তার কথা শুনে হাসল তাহমিনা। তারও মনে কি বিস্ময় কম? কিন্তু সে চুপ থাকল। ৩৮ বছরের তাহমিনা জীবনে অনেক কিছু দেখেছে। অনেক হতাশার বিনিদ্র রাত কাটিয়েছে। কিন্তু সব কথা একজন এই হঠাৎ চেনা ৪২ বছরের মানুষের কাছে খুলে বলা যায় না। সেজন্য আরও সময়ের প্রয়োজন।
খেতে খেতে হঠাৎ মুখ তুলে শমসের বলল, আমি কিন্তু খুব আগ্রাসী।
কী রকম? তাহমিনা বলল।
কিছুদিন বাদে আমি কিন্তু তোমাকে সর্বক্ষণের জন্য চাইব। এখন তুমি রাজি হলেই হয়।
কী রকম?
আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই মিনা। আমার পক্ষে তোমাকে এভাবে ছেড়ে বেশি দিন থাকা সম্ভব নয়। আমি পারব না মিনা!
শমসের গোড়া থেকে তাহমিনাকে মিনা বলে ডাকে।
খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল তাহমিনার। পরোটা অর্ধেক মাত্র খাওয়া হয়েছে।
শমসের বলল, প্রতিটি পুরুষের মনের ভেতরে একজন নারীর ছবি আঁকা থাকে। আমার মনের ভেতরে যে ছবি এতদিন আঁকা ছিল, তা তোমাকে কাছে পেয়ে পূর্ণতা পেয়েছে। ডারলিং, শমসের হঠাৎ খাওয়া বন্ধ করে বাঁ হাতে তাহমিনার সুডৌল বাহু ধরে নিয়ে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি, গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি চাই, তুমি এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেবে।
তার মানে?
তুমি মুস্তাফিজকে তালাক দিয়ে দাও। চলো আমরা দুজনে বিয়ে করি। দরকার হলে রুবিকেও আমি তালাক দেব। তবে তাকে সম্পত্তি থেকে ঠকাব না। আমি হৃদয়হীন মানুষ নই!
আর আমি কি হৃদয়হীন? কথাটা মনে মনে ভাবল তাহমিনা।
খাওয়া শেষে গল্প। ঠিক এ সময় দরজার বেল বেজে উঠল। শব্দ শুনে বুক কেঁপে গেল তাহমিনার। তাহলে কি মুস্তাফিজ আগেই বাড়ি ফিরে এল? খাবার জায়গা ছেড়ে দৌড়ে সে দরজার ফুটোয় চোখ রেখে দেখল, না, নিচের তলার সিকিউরিটি।
ফুটোয় চোখ রেখে তামমিনা নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে জিজ্ঞেস করল, কী চান?
আপনার একটা চিঠি এসেছে ম্যাডাম। আর্জেন্ট।
কথা শুনে দরজা খুলল তাহমিনা। চিঠি হাতে নিল। তারপর দরজা বন্ধ করে চিঠির চেহারা দেখল। মিউনিসিপ্যালিটির চিঠি। সাধারণত ফোন করে নিচ থেকে প্রথমে কথা বলে চিঠি আসার সংবাদ দেয়। সিকিউরিটির এ লোকটা বোধ করি নতুন। নিয়ম-কানুন অতটা জানে না।
চিঠি হাতে নিয়ে আবার খাবার জায়গায় ফিরে এল তাহমিনা। বেলা এখন ১০টা বাজে। শমসের আয়েশ করে কফিতে চুমুক দিচ্ছে। দরজার বেল বাজলে তাহমিনা যতটা উদ্বিগ্ন হয়েছিল, শমসের ততটা হয়নি। কারণ এসব ঝামেলা মেয়েরাই মেটাতে পারে। তাহমিনার দেশের কোনো ভাই বা বন্ধুর কোনো স্বামী অনায়াসে হয়ে যেতে পারে শমসের। তাহমিনা দরজা ডাবল লক করে কাছে এলে সে কোমর জড়িয়ে ধরে তার। পেটের কাছে মুখ রেখে বলে, তুমি কিন্তু এখনও কোনো জবাব দাওনি।
কী?
তুমি মুস্তাফিজকে তালাক দেবে কিনা?
এখনও ভেবে দেখিনি কথাটা।
তাহলে ভেবে দেখো। আজ হোক কাল হোক কথাটা ভেবে দেখতে হবে তো মণি!
শমসেরের মুখে মণি ডাক শুনে চমকে গেল তাহমিনা। তাকে কোনোদিন মুস্তাফিজ মণি বলে ডাকেনি। তাহলে কি মুস্তাফিজের মনের ভেতরে অন্য কোনো মেয়ের ছবি আঁকা আছে? যাকে সে মনে মনে এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে! মুস্তাফিজের ফেসবুক নেই, সে এসবে বিশ্বাসও করে না, যদি করত তাহলে হয়তো কোনো না কোনো মেয়েকে তার ভালো লেগে যেতে পারত। কী সর্বনাশ!
নাশতা খাওয়া শেষ হলে তারা আবার বিছানায় শুয়ে গল্প করতে লাগল। শমসের বিছানার বালিশে হাত রেখে বলল, আশা করি এ বালিশে মাথা দিয়ে তোমার স্বামী ঘুমান না?
তাহমিনা তার কথা শুনে কৌতুক করে বলল, ঘুমালে কী ক্ষতি?
শমসের বলল, না তার কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষতি আমার! হিংসায় বুক জ্বলে যাবে!
কথা বলে তাহমিনার চুল নিয়ে খেলা করতে লাগল শমসের।
তাহমিনা হাসিমুখে তাকিয়ে দেখতে লাগল তাকে। আজ সারাদিন তারা দুজনে এ বাসায় থাকবে। কাজের মেয়েকে ছুটি দেয়া হয়েছে। সাতদিনের আগে তার আসার কোনো সম্ভাবনা আর নেই। মুস্তাফিজ আসবে সেই বুধবারে। আজ মাত্র শনিবার। ইচ্ছে হলে শমসের এই কদিন তার সাথে দিন-রাতই থাকতে পারে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। শমসেরের অফিস আছে। ব্যবসা করলেও নিয়মিত নিজের অফিসে বসতে হয়।
তুমি মুস্তাফিজ বেচারাকে হিংসা করতে শুরু করেছ, তাই না? কিন্তু তুমি তো তাকে চোখেই দেখোনি।
হাসতে হাসতে বলে উঠল তাহমিনা।
না, না, হিংসা নয় ডারলিং, অমি তোমাকে ভালোবাসি! সেই প্রথম দিন দেখার পর থেকেই। আমার ভালোবাসা বড় আগ্রাসী। আমার কষ্ট হয় তোমাকে কারও সাথে এক বিছানায় কল্পনা করলে। আমার বুক ভেঙে যায়!
কথা বলা শেষ করে শমসের করুণ মুখে তাহমিনার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তার চেহারা দেখে করুণায় বিগলিত হলো তাহমিনার মন। এভাবে কে তাকে ভালোবেসেছে? তাও এই বয়সে?
তবে ভালোবাসা কি বেশি বয়সে মানুষের হয় না? অষ্টম এডওয়ার্ড কি একজন পূর্ণবয়স্ক বিবাহিত নারীর প্রেমে পড়ে তার সিংহাসন ত্যাগ করেননি? ভাবল তাহমিনা।
তারপর শমসেরের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, তাহলে শোনো, আমরা কোনোদিন এক বিছানায় ঘুমাই না। সেই বহুকাল থেকেই।
সত্যি? তার কথা শুনে অবাক হলো শমসের। মনে মনে ভাবল, এটা কীভাবে সম্ভব?
মুখে বলল, যাঃ, এসব কী বলছ?
সত্যি বলছি, শমু। আমরা এক বিছানায় ঘুমাই না বহু বছর। তার ঘর আলাদা, আমার ঘর আলাদা।
সত্যি?
হ্যাঁ।
সে কি তাহলে নপুংসক? শুনেছি নপুংসক স্বামীর কছে হাজার সুন্দরী স্ত্রীও কল্কে পায় না!
কথাটা বলার সময় একচিলতে বাঁকা হাসি শমসেরের মুখে খেলে গেল। দৃশ্যটা চোখ এড়াল না তাহমিনার।
প্রশ্নটা শুনে মনে মনে চমকে গেল তাহমিনা। তার স্বামী মুস্তাফিজ নপুংসক? হায়, হায়, সমাজের চোখে তার স্বামী নপুংসক? কী সর্বনাশ! শমসের তো তাহলে ভাবতে পারে, আসলে প্রেম-ভালোবাসা বলে কোনো কথা নয়, মুস্তাফিজ নপুংসক বলেই তাহমিনা তার শরীরী দাবি মেটানোর জন্য তাকে খুঁজে বের করেছে!
কথাটা ভাবতে গিয়ে মাথা ঘুরে উঠল তাহমিনার। মুস্তাফিজ আলাদা ঘরে ঘুমালে কী হয়, সেই ঘরের সবকিছু ঝেড়ে মুছে তকতকে করে রাখে তাহমিনা। তার বিছানা, বিছানার চাদর, আড়ং থেকে কিনে আনা বালিশের কভার, তার ঘরের ফুলদানিতে যতœ করে সাজিয়ে রাখা সবুজ মানিপ্লান্টের ঝোপড়া, তার লেখার টেবিল-চেয়ার, অ্যাকাউন্টের ওপর লেখা কতকগুলো বই, তার ঘরের জায়নামাজ ও তসবি, সব তাহমিনার হাতে প্রতিদিন যেন নতুন হয়ে ওঠে। কাজের মেয়ে চলে গেলেও তাহমিনা নিজের হাতে মুস্তাফিজের ঘর পরিষ্কার করে রাখে।
শুধু তা-ই না, শমসের আজ তার ফ্ল্যাটে আসবে বলে সে বন্ধ করে রেখেছে মুস্তাফিজের বেডরুম। ওই রুমের আলমারির মাথায় মুস্তাফিজের যুবক বয়সের একটি ফটো আছে। ফটোটা খুব জীবন্ত। বিশেষ করে চোখ দুটো। ঘরে ঢুকলেই চোখ দুটো যেন তাহমিনার দিকে তাকিয়ে থাকে! এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যে, তাহমিনার মনে হয়, যেন মুস্তাফিজ তাহমিনার সবকিছু চোখে দেখছে। সবকিছু বুঝতে পারছে।
ঠিক এ কারণে শমসের ফ্ল্যাটে ঢোকার আগে তাহমিনা মুস্তাফিজের ঘর ভেজিয়ে রেখেছে। যেন ভেতর থেকে বাইরের কিছু দেখা না যায়!
মুস্তাফিজ নপুংসক? তার নারীদেহ নিয়ে খেলা করার ক্ষমতা নেই? তাহমিনার মতো একজন সুন্দরী মহিলাও তাকে আর জাগাতে পারে না? হায়, হায়। কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে নপুংসক দেখতে চায়? এর চেয়ে দশটা বাইরের মেয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করলেও তো মানুষ জানে তাহমিনার স্বামীর মেয়েদের উজ্জীবিত করার ক্ষমতা আছে?
মুহূর্তের ভেতরে তাহমিনার গালে রঙের ছোপ পড়ল। ভেতরটা কে যেন মুচড়ে ধরল তার। যেন কান্না কান্না হয়ে গেল সবকিছু। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না, সে নপুংসক নয়! তার যদি মন চায়, তাহলে পৃথিবীর বহু পুরুষ প্রতিযোগিতায় তার সাথে এঁটে উঠতে পারবে না, শমসের! আমি তার সাক্ষী! আমিই ইচ্ছে করে বিছানা আলাদা করে নিয়েছি। আমি অনেক রাত অবধি টিভি সিরিয়াল দেখি। গল্পের বই পড়ি। কিন্তু তাকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হয়। কারণ সে চাকরি করে।
কথাটা বলেই ‘আমি এখন গোসলে যাই’ বলে সে পাশের বেডরুমের টয়লেটে ঢুকে পড়ল।
এরপর শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে খুব খানিকটা কাঁদল সে। ঝরনার পানি আর চোখের পানি এক হয়ে বয়ে গেল দামি বাথরুমের নালা দিয়ে। মুস্তাফিজ যেন শুধু তার স্বামী মাত্র নয়, মুস্তাফিজ যেন তার সুষমেরই একটি বড় সংস্করণ! মুস্তাফিজের অপমান মানে যেন তারই অপমান। একদিন টিএসসির মোড় থেকে গরম বেগুনি কিনে এনেছিল মুস্তাফিজ। তাহমিনার হাতে দিয়ে বলেছিল, তাড়াতাড়ি খাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
তাহমিনা তার হাত থেকে বেগুনিগুলো নিয়ে খেতে খেতে বলল, আনতে আনতে ঠাণ্ডা তো হয়েই গেছে, তুমি খাবে না?
হ্যাঁ, খাব তো, দাও! হাত বাড়িয়ে বলেছিল মুস্তাফিজ।
তাহমিনা তখন বলেছিল, তুমি এত বোকা কেন বলো তো, যেখান থেকে বেগুনিগুলো কিনলে, সেখানে বসেই তো গরম গরম খেয়ে আসতে পারতে। তারপর না হয় আমার জন্য নিয়ে আসতে।
তোমাকে রেখে একা একা খাব, তোমার কি মাথা খারাপ? বলেছিল মুস্তাফিজ।
কোনো কারণ নেই, তবু গোসল সারতে সারতে কথাটা মনে এল তাহমিনার।
গোসল সেরে যখন বাথরুম থেকে বেরোল, তখন সে একেবারে ফিটফাট। প্রসাধনও সেরে নিয়েছে। চোখে আইব্রো পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়েছে, ঠোঁটে ম্যাজেন্টা লিপিস্টিক, কপালে ছোট্ট কালো টিপ। তাহমিনার প্রতিটি বাথরুমে প্রসাধনদ্রব্য সাজানো থাকে। বরং অন্য আর দশটা ফ্ল্যাটের চেয়ে বেশি সাজানো থাকে।
বাইরে বেরিয়ে শমসেরকে চোখে দেখল না সে। তাহমিনার বেডরুমে সে নেই। বসার ঘরে বা ডাইনিং স্পেসেও নেই। বুকের ভেতরে ধক করে উঠল তাহমিনার। তাহলে কি লোকটা চলে গেল? আশ্চর্য।
তখন তার চোখ পড়ল মুস্তাফিজের শোয়ার ঘরের দিকে। ঘরের দরজা হাট করে খোলা। সবচেয়ে আগে চোখ পড়ল মুস্তফিজের ফটোর দিকে। খুব বেশি ঝকঝকে চোখে যেন তাকিয়ে আছে সে তাহমিনার দিকে আজ!
প্রাণ কেঁপে উঠল তাহমিনার। কী সর্বনাশ। আমার তো কোনো অপরাধবোধ নেই। কোনো অনুশোচনা নেই। কোনো পিছুটান নেই। ওসবে আমি বিশ্বাস করি না। তবু? তবু এসব কী হচ্ছে? ভাবল সে। ভাবতে ভাবতে শমসেরের নাম ধরে ডাকল। ডাকতে ডাকতে স্বামীর শোয়ার ঘরে ঢুকল।
সেখানে ঢুকে অবাক হয়ে গেল সে। দেখল শমসের তার স্বামীর বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে একটা অ্যাকাউন্টিংয়ের বই নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছে। এমন তার আয়েশি ভাব যেন এ ঘর, এ বিছানা, এ টেবিল-চেয়ার-ফুলদানি সব তারই। দেখে হঠাৎ করে যেন তাহমিনার মাথায় কিছু গোলমাল হয়ে গেল। শমসের, তার প্রেমিক তার স্বামীর বিছানায়! তার স্বামীর বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে! এ বইগুলো মুস্তাফিজের স্টুডেন্ট লাইফের বই।
তাহমিনাকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে ঘরে ঢুকতে দেখে শমসের বিছানায় উঠে বসে বলল, মুস্তাফিজ সাহেব এসব পুরনো মান্ধাতা আমলের বই পড়েন নাকি? অ্যাকাউন্টিংয়ের জগতে যে বিস্ফোরণ ঘটে গেছে, সে খবর কি তিনি এখনও জানেন না? আমি তো দেখে অবাক হয়ে গেলাম!
তার কথা শুনে তাহমিনার মাথার ভেতরে যেন বিস্ফোরণ ঘটে গেল। চিৎকার করে উঠল সে। তর্জনী তুলে বলল,
আউট! গেট আউট!
মানে? হতবাক হয়ে বলে উঠল শমসের। একটু তোতলামিও এসে গেল।
আই সে, গেট আউট। সিনেমায় দেখা এবং শোনা বহুবারের উচ্চারিত ডায়ালগ এবার উঠে এল তাহমিনার কণ্ঠে।

Disconnect