দুই মূর্তি

হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে গেল রিন্টুর। অন্ধকারে হাতড়ে বিছানার পাশ থেকে মোবাইল ফোনটা জোগাড় করল। ওটার ঘড়িতে দেখল রাত বাজে ২টা। তারপর আবারও পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করল। অনেকটা সময় কেটে গেল অস্বস্তির সাথে। ঘুম কিছুতেই আসছে না। মনে হলো বাকি রাতটা জেগেই কাটাতে হবে। তাই বিছানা থেকে উঠে আলো জ্বেলে ঘরের ভেতরে পায়চারি শুরু করল। ভাবল, হেঁটে হেঁটে হয়রান হয়ে গেলে হয়তো ঘুম আসবে।

মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই হঠাৎ কান খাড়া হয়ে গেল ওর। পেছনের বারান্দায় কেমন একটা খসখস শব্দ হলো। প্রায় সাথে সাথে ও দৌড়ে গেল শব্দের উৎস সন্ধানে। ওদের পাঁচতলার ফ্ল্যাটের পেছনের বারান্দাটা রান্নাঘরের সাথে লাগানো। বারান্দায় আলো জ্বালতেই দেখল, একটা সাদা বেড়াল গ্রিলের ভেতর দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে গেল। মনে মনে হাসল ও। দিনমান বেড়ালের কত আনাগোনা, আর শেষ পর্যন্ত বেড়ালের আওয়াজেই কিনা ওর চমকে ওঠার উপক্রম হয়েছে।

বাকি রাতটা আর সত্যি সত্যিই ঘুম এল না ওর। রাত জাগার ফলাফল হিসেবে পরের দিনটা খুব অস্বস্তিতে কাটল। বারবার জলের ঝাপটা দিয়েও চোখের জ্বালা কমল না। দিনশেষে সন্ধ্যার একটু পরপরই খেয়েদেয়ে ঘুম দিল সে। কিন্তু এ রাতেও গত রাতের মতোই হঠাৎ করে ভেঙে গেল ঘুম। ঘড়িতে দেখল, ঠিক রাত ২টা। ভেবেই পেল না সে, ঘড়ি ধরে ঠিক ঠিক রাত ২টায়ই কেন তার ঘুম ভাঙছে।

ও ভাবল, তাড়াতাড়ি শুয়েছে বলে রাত পোহানোর আগেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। তবে গত রাতের অভিজ্ঞতায় ওর ধারণা হয়েছে যে, আজও বাকি রাতটায় ঘুম আর আসবে না। তাই পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে আলো জ্বালতেই চমকে উঠল। টেবিলের কোনায় বসে আছে ওই সাদা বেড়ালটা। আজ সন্ধ্যায় ঝড়-বাদল থাকায় দরজা-জানালা সব বন্ধ করেই শুয়েছিল। এর মধ্যে বেড়াল এল কীভাবে, তা ভেবেই পেল না ও। পরে ভাবল, হয়তো দরজা-জানালা বন্ধ করার আগে চুপি চুপি এসে কোথাও লুকিয়ে ছিল। কিন্তু যেভাবেই এসে থাকুক, টেবিলে বেড়াল বসিয়ে তো আর পড়ালেখা করা যাবে না। তাই বেড়ালটাকে তাড়াতে হবে।

আর বেড়াল তাড়ানোর কথা মনে হতেই ছোট মামার দেয়া যন্ত্রটার কথা মনে হলো। উনি ওকে সেটা উপহার দিয়েছিলেন। স্বভাবের দিক দিয়ে এই মামা আবার ইবনে বতুতা টাইপের। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবাদে আয়-রোজগার খুব ভালো। পয়সাকড়ির অভাব বলতে কিছু নেই। দুনিয়া ঘোরার বাতিক থাকায় সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন দূরদেশের উদ্দেশ্যে। শেষ সফরটায় ওর জন্য এনেছেন ওই যন্ত্রটা। দূর থেকে ওটার বোতাম টিপলেই তড়িৎগতিতে ছুটে পালায় বেড়াল। ও শুনেছে, তড়িৎ চৌম্বকীয় কী একটা নাকি ব্যাপার ঘটায় ওই যন্ত্র, তাতেই বেড়াল পালিয়ে বাঁচে।

দৌড়ে পাশের ঘর থেকে যন্ত্রটা হাতে নিয়ে ছুটে এসে ও দেখল, বেড়ালটা তেমনি ঠায় বসে আছে। এবার যন্ত্রের বোতামটা টিপতেই থমকে গেল ও। বেড়ালটা ভ্রুক্ষেপহীন। যেমন ছিল তেমনি বসে আছে। কিন্তু কালও তো এ যন্ত্র দিয়ে পথের পাশের বেড়াল তাড়িয়েছে। তাছাড়া ও তো শুনেছে, পৃথিবীতে এমন কোনো বেড়াল নেই, যে এ যন্ত্রে জব্দ না হয়। তাহলে এটা আবার কী জিনিস! এবার বেড়ালের একেবারে মুখের কাছে যন্ত্রটা ধরে বোতাম টিপল। এতে বেড়ালটা চোখ কটমট করে ওর দিকে তাকাল, তারপর টেবিল থেকে লাফ দিল মেঝের দিকে। কিন্তু টেবিল আর মেঝের মাঝপথেই অদৃশ্য হয়ে গেল নাদুসনুদুস আস্ত একটা বেড়াল। ভয়ে গায়ে কাঁটা দিল ওর। কিন্তু বিস্ময়ের আরও খানিকটা বাকি ছিল।

সেটাই ঘটল এর পরে। ও যে ঘরে থাকে, তার পাশের ঘরটা এমনিতে ফাঁকাই থাকে। শুধু অতিথি এলে সেখানে কেউ থাকে। ওখান থেকেই চাপা গলায় ওর নাম ধরে ডাক ভেসে এল। প্রথমে একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেও পরে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ওই ঘরের দিকে। ঘরের দরজায় পা রাখতেই যা দেখল, তাতে নিজের চোখকেই অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ছোট মামা, যিনি আজ বিকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছে সেখান থেকে ওকে ফোন করেছেন। তার হাতে ধরা আছে বেড়াল তাড়ানোর ওই যন্ত্রটা। আর কাঁধে বসে আছে অলক্ষুণে ওই বেড়ালটা। আচম্বিতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ওই রহস্যময় বেড়ালটা এক লহমায় এ ঘরে যে কী করে এল, তা ওর মাথায় এল না।

আবার ছোট মামা একই সাথে পৃথিবীর দুই প্রান্তে অবস্থিত দুটি দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশে কী করে উপস্থিত থাকতে পারেন, তাও মাথায় ঢুকল না ওর। এসব ভাবতে ভাবতেই ও লক্ষ করল, ঘরের মেঝের মানুষ ও বেড়াল দুটোই প্রাণহীন অচঞ্চল প্রতিমার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওদের চোখের তারা স্থির হয়ে রয়েছে ওর দিকে। এমন সময় ওই দুই মূর্তি অতর্কিতে হামলে পড়ল ওর ওপর। আর সাথে সাথে ওর মরণ চিৎকারে কেঁপে উঠল পুরো বাড়ি।

অচেতন রিন্টুর জ্ঞান ফিরেছিল পরদিন দুপুরে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh