ফনেটিক ইউনিজয়
টি এন সেশানের খোঁজে : উদ্দেশ্য শক্তিশালী কমিশন

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ প্রায় শেষ। সামনেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন ক্ষমতার মাঠের খেলায় গুরুত্বপূর্ণ রেফারি। তাই নির্বাচন কমিশনে কারা থাকবেন, সেটা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। একাধিক নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত হইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাহার সভাপতিরূপে কার্য করিবেন।’
প্রতিষ্ঠানের মুখ্য ব্যক্তি যেহেতু প্রধান নির্বাচন কমিশনার, তাই এ পদে কে আসছেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা একটু বেশি। নির্বাচনে তিনিই মূলত গাড়িচালকের আসনে বসেন। অন্যরা সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সব সময়ের মতো এবারও দ্বিতীয় প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির উৎকণ্ঠা সবচেয়ে বেশি। দেখা করা না-করার ফাঁদে তাদের আটকে দিয়ে নির্বাচনী মোগল যদি মঞ্চে অবির্ভূত হয়ে যান, তবে তাঁদের ইচ্ছাপূরণের বারোটা বেজে যেতে পারে। আবার সরকারি দল যারা নিজেদের সুসংহত অবস্থান অব্যাহত রাখতে চান, তারাও তৎপর। এটাই নির্বাচনের খেলা। ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তা দেখতে চায়, ক্ষমতায় যেতে চায়। সরকারি দল আরও এক মেয়াদ দেশ শাসন করতে চায়।
এই বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে অনেক চিন্তক মনে করেন, ‘একজন টি এন সেশানকে নিয়ে আসতে পারলেই ল্যাঠা চুকে যায়।’ টি এন সেশান ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সেখানকার নির্বাচনী কার্যক্রমের ‘আমূল সংস্কার’ করেছিলেন, যার ধারাবাহিকতা এখনো অক্ষুণ্ন আছে।
তিরুনেল্লাই নারায়ণ সেশান ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ভারতের নির্বাচনী সংস্কারের অগ্রদূত। সাবেক আইএএস এই অফিসারকে প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে তাঁর ভিজিটিং প্রফেসর সুব্রামনিয়ার স্বামী আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগদানের ব্যবস্থা করেন।
সুব্রামনিয়ার স্বামীর ছাত্র টি এন সেশান পরবর্তীকালে ভারতীয় নির্বাচন কার্যক্রম তথা আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসেন। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রার্থীদের জমা দেওয়া চল্লিশ হাজার নির্বাচনী রিটার্ন পরীক্ষা করেন এবং আইনসম্মত রিটার্ন দাখিল না করায় চৌদ্দ হাজার গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেন। ভারতের মতো বড় দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা রীতিমতো বড়সড় ঝক্কির বিষয়। এর চেয়ে বড় কথা হলো, নির্বাচনে কারচুপি, দলবাজি, জালভোট, সহিংসতা ইত্যাদি নিয়ে নির্বাচনী কর্তাদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ভোটারদের ছিল এন্তার অভিযোগ।
এমন এক উত্তরাধিকার নিয়ে টি এন সেশান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। সেশান স্বীকার করেছেন যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হওয়ার আগে তিনি কোনো নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেননি। এই অভিজ্ঞতাহীন মানুষটি অপরিমেয় দক্ষতার সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন নির্বাচন শুধু পালন করেই দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং নির্বাচনী কর্মকা-কে দৃঢ় ও আইনানুগভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা অনুকরণীয় রোডম্যাপ তৈরি করে গেছেন। নির্বাচনে কী কী অনিয়ম হয় এবং কেন হয়, এটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেশান দেখলেন নির্বাচনের বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাঁদের বেশির ভাগই সরকারি কর্মচারী অথবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তাঁরা নির্বাচনী দায়িত্ব সাময়িক বিষয় মনে করে এই দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতেন না। ফলে রাজনীতিবিদ আর আমলাদের প্রভাব বিস্তার করে তাঁদের আজ্ঞাবহ করে তোলা তেমন বেগ পাওয়ার মতো বিষয় ছিল না। সেশান সরকার ও কর্মচারীদের বোঝাতে চাইলেন, নির্বাচনের সময় যেহেতু তাঁদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে পদায়ন করা হয়েছে, অতএব তাঁদের নির্বাচন কমিশনের আদেশ, নির্দেশই অনুসরণ করতে হবে। তাতে লাভ হলো না। কিছু রাজনীতিবিদ আর আমলা ঠিকই বাগড়া দিলেন। তাঁরা উল্টো বললেন, বাপু, সরকারি কর্মচারীরা হলেন সরকারের বাঁধা মনিষ বা কামলা। নির্বাচন কমিশনের অধীনে কদিনের জন্য ‘খেপ’ মারতে যান তাঁরা মালিকের অনুমতি নিয়ে। অতএব, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র তাঁদের পিতৃ প্রতিষ্ঠানের। নির্বাচন কমিশন অভিযোগটা অগ্রহণ করতে পারে, বিচার নয়। টি এন সেশান দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে নির্বাচনী কর্মচারীদের ওপর তাঁর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন।
১৯৯৩ সাল। তামিলনাড়ূর নির্বাচন। সেশান নির্দেশ দিলেন সেনা মোতায়েনের জন্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজ্যকে নির্বাচনের জন্য সেনা সদস্যদের মোতায়েনে আমরা বাধ্য করতে পারি না। তামিলনাড়ূতে সেনা পাঠানো হলো না। সেশান দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি বলেন, সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনকালীন কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দেবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত ভারতে আর একটি নির্বাচনও হবে না। বিষয়টি আদালতে গড়াল।
একই বছরে সংবিধান সংশোধন করে দুজন অতিরিক্ত নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন কমিশনে যোগ করা হলো, যাতে তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ক্ষমতা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারেন। উদ্দেশ্য ছিল সেশানের ক্ষমতার দাপট ছেঁটে ফেলা। সেশানের গন্তব্য আবারও সুপ্রিম কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়ে বলেন, অতিরিক্ত নির্বাচন কমিশনাররা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সমকক্ষ হতে পারেন না। তিনি তাঁদের দেওয়া পরামর্শ বিবেচনা করতে পারেন কিন্তু গ্রহণ করতে বাধ্য নন।
টি এন সেশানের বড় কৃতিত্ব ছিল ভোটারের ক্ষমতায়ন। তিনি জাতীয় ভোটার সচেতনতা প্রচারাভিযান শুরু করেন এবং এই প্রচারাভিযানের মাধ্যমে ভোটারদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি সরকারের কাছে সব ভোটারকে ফটো আইডি কার্ড দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। সরকার খরচের দোহাই দিয়ে ধীরে চলতে চাইলে তিনি যেসব জায়গায় ভোটাররা আইডি কার্ড পাননি, সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, ভোট দেওয়া ভোটারের অধিকার। আইডি কার্ড সরবরাহ না করে তা বন্ধ করা যাবে না।
তিনি প্রার্থীদের নির্বাচন ব্যয় দৈনিক ভিত্তিতে যাচাই করার জন্য আয়কর বিভাগের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেন। অবশ্য সরকারি ও ব্যক্তিগত ভবনে চিকামারা, পোস্টার লাগানো ও লাউড স্পিকার বন্ধে তাঁর সিদ্ধান্ত সমালোচনার ঝড় ওঠে।
স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। সেটি নিশ্চিত করতে তিনি একেকটি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ভাগ করে বা নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক দফায় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেন। তিনি প্রকাশ্যে বলতেন, ভোটাররা প্রভাবমুক্ত নির্বাচনে ভোট দিতে পারলে সঠিক জননেতৃত্ব নির্বাচিত হবেন। এই জননেতৃত্ব প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করবে। তিনি তাঁর কথা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন বিশৃঙ্খল নির্বাচন থেকে সুশৃঙ্খল নির্বাচনের পথ। নির্বাচনের ইতিহাসে তাই তিনি এখন রোল মডেল।
সেশানের মতে, তিনি দুটো নীতি অনুসরণ করতেন zero delay I zero deficiency। তাঁর বিরুদ্ধে ম্যালা সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। তিনি ভয় না পেয়ে বলতেন, ‘আমি একটা বল। আমাকে যত জোরে পেটাবেন, আমি তত জোরে বাউন্স ব্যাক করে ফিরে আসব। কারণ দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হবে। আর তা হবে আইন মাফিক। বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রেক্ষাপট একজন টি এন সেশানের খোঁজ করা দরকার, যিনি নির্বাচনী গ্লানি পাল্টে ফেলার কান্ডারি হতে পারেন।

আরো খবর

Disconnect