ফনেটিক ইউনিজয়
নগরেও যেন উৎসবে মাতি
প্রণব চক্রবর্তী

মানুষ আয় রোজগারের কারণে শহরে থাকলেও ঈদ বা যেকোনো উৎসবে ছোটেন গ্রামের বাড়িতে। বছরে একটা সময় সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, আনন্দ ভাগাভাগি করা  যায়, এসব যুক্তি সত্য। কিন্তু কুড়ি বছর আগের প্রেক্ষাপটে যখন মোবাইল ফোন ছিল না, ‘বিকাশ’ ‘রকেট’-এর মতো মোবাইল ব্যাংকিং ছিল না, তখন মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলা, টাকা দেওয়া ইত্যাদি অনেক ব্যাপারেই শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেদিন অতীত হয়ে গেছে। এখন ২৪ ঘণ্টাই আমরা সবার সঙ্গে সংযুক্ত। টাকা দেওয়া-নেওয়া সেও ২৪ ঘণ্টাই করা যায়। কিন্তু এখনো যেকোনো উৎসব এলেই বসবাস করা নগর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ছোটা ততটাই জরুরি কি? এর মাধ্যমে নগরের উৎসবগুলো ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে না কি?
আমার একজন পরিচিত রিকশাওয়ালা আছেন। যাঁর স্ত্রী গৃহকর্মী ও ছেলে লেপ-তোষক দোকানের কর্মী। তাঁর মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। তাঁকেও প্রতি ঈদে বাসের ছাদে চড়ে, ট্রাকের মালামালের সঙ্গে উঠে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি যেতে হয়। অনেক কষ্ট ও খরচ। কেন যান? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘এটারই চল আছে (প্রচলন আছে)।’ মানুষ তার নিজের ভিটেতে যাবে না, গ্রামবিমুখ হবে, মা-বাবা বা আত্মীয়স্বজনের সংস্পর্শ বর্জন করবেনÑএটা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু অপ্রয়োজনে বা লোক দেখানো সংস্কৃতির কারণে করা হলে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য বৈকি।
কেন ভিড় ঠেলে, দুর্ঘটনার শঙ্কা মাথায় নিয়ে ঈদ, পূজা, বড়দিন বা জাতীয় উৎসবের সময়গুলোতে বাড়ি যাচ্ছে? একজন বললেন, ‘এটা আউটিং। শহরের কোলাহল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম।’ আমরা প্রায় প্রতিবছরই এ সময়গুলোতে দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে শিউরে উঠি। যাত্রীদের কষ্ট আন্দাজ করে আফসোস করি। নিশ্চয়ই যারা এই কষ্টকর ভ্রমণের ঝুঁকি নেন, তাঁদের বেদনা আরও বেশি। বিষয়টা হুজুগ কি না, পরখ করে দেখা যেতে পারে। এক পুরোনো সহকর্মী জানালেন মা-বাবা তাঁর সঙ্গেই ঢাকায় থাকেন। বার্ধক্য বিবেচনায় তাঁদের ঢাকার বাসায় রেখে তিনি সপরিবার বাড়ি ঘুরে আসেন। কারণ নইলে আত্মীয়স্বজন খারাপ বলবে। এটিকে আমরা কোন সংস্কৃতির প্রভাব বলব? এই দেখানো সংস্কৃতির প্রয়োজন আসলে কতটুকু, তা আমাদেরই খুঁজে দেখা দরকার।
নগর জীবনে সবাই ব্যস্ত। সকাল সন্ধ্যা ব্যস্ততার কারণে কারও সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা নেই, এমনকি তা পাশের দরজার প্রতিবেশীর ক্ষেত্রেও সত্য। এই বন্ধনহীনতা নগরে আমাদের পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কেউ কাউকে চিনি না। দৈব-দুর্বিপাক, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা-এসব সমস্যায় আমরা কাউকে কাছে পাই না। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য উৎসবগুলোতে মাঝে মাঝে আমরা নগর প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঘরোয়া সময় কাটানোর কথা কি চিন্তা করতে পারি না? তাঁদের সঙ্গে সামাজিক সম্মিলনীর কি আয়োজন করা যায় না?
ইদানীং পুরোনো দিনের আমাদের সহাবস্থান একটি স্লোগানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ তারই চর্চা নগর জীবনের পরিচিত মুখদের নিয়ে কি আয়োজন করা যায় না? প্রতিবেশীও আমাদের আপনজন। এই ধারণা সন্তানদের মধ্যে দিতে পারলে তা ইভ টিজিং, মুরব্বি/গুরুজনদের মান্য করা, সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, এগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারত নিঃসন্দেহে। বড় শহরগুলোতে ফ্ল্যাট মালিক বা কল্যাণ সমিতি উদ্যোগ নিতে পারেন এ ধরনের আয়োজনের। যাতে যুক্ত করতে পারেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতার। এমনকি সবাই মিলে ঘুরে আসা যায় কাছের কোনো দর্শনীয় স্থানে। আর এভাবে প্রতিবেশীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ যত বেশি বাড়বে, তত বেশি সবার মধ্যে একধরনের আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি হবে। বিচ্ছিন্নতার বদলে জন্ম নেবে একাত্মতার। আর এর সুফল, সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা সবাই ভোগ করব সন্দেহ নেই।
বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বের হয়। সেগুলো দেখার একটু সময়তো চাই। নগরের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে চায়ের আড্ডাও আমরা দিতে পারি ঘটা করে। রিকশায় করে সাঁই সাঁই করে ঘোরা যায় শহরময়। দেখা যায় সিনেমা হলে নতুন মুক্তি পাওয়া ছবি। আর বিনোদন কেন্দ্রে ঘোরার বিষয়টি তো খোলাই থাকল। ব্যক্তিগতভাবে আমার ইচ্ছে রাস্তায় বয়স নির্বিশেষে নারী-পুরুষের উচ্ছল ‘ফ্লাশমব’ দেখতে। তাঁদের গানের সঙ্গে আমরাও তাল মেলাতে চাই। আনন্দ ভাগাভাগির আয়োজন সবাইকে অংশগ্রহণে প্রলুব্ধ করবে।
হিন্দুধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজায় উপস্থিত সবাইকে পঙ্ক্তিভোজে আপ্যায়নের একটি প্রথা প্রচলিত আছে। শুনেছি পশ্চিমবঙ্গে কোন একটি শহরে পঙ্ক্তিভোজের লাইনটি প্রায় দুই মাইল লম্বা হয়েছিল। ৫/১০ মাইল দূর থেকে শিশু, বৃদ্ধ/বৃদ্ধা সবাই এসেছেন লাইনে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে সবাই খাবেন। খাবার গ্রহণ শুরু হবে একটা নির্দিষ্ট সময়ে। খাবারে থাকে খিচুড়ি, ভাজা, লাবরা, অম্বল (টক), পাপরভাজা ইত্যাদি। কী মজার অনুষ্ঠান। উদ্যোক্তারা পূজা অনুষ্ঠানের খরচ বাঁচিয়ে এই পঙ্ক্তিভোজের আয়োজন করে থাকেন।
ঈদের দিন বা পরের দিন এমন কত সৃজনশীল ধারণার বাস্তবায়ন করতে পারি আমরা। এতে নাগরিক ঐক্য, সামাজিক সাম্য ও লোকসংহতির বীজ উপ্ত হবে। এ ধরনের অনুষ্ঠান, আয়োজন আমাদের সংস্কৃতি ও লোকাচারকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আর প্রকৃতপক্ষে ‘যেকোনো উৎসব সবার জন্য সমান আনন্দময়’-এই আপ্তবাক্যও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ঘরমুখী প্রবণতা থাকবে, এর প্রয়োজনও আছে। কিন্তু বিপদ, দুর্ঘটনা, কষ্ট-এগুলো এড়াতে আমরা মাঝে মাঝে নগর বা শহরজীবনকেও আনন্দঘন করে তুলতে পারি। শুধু গ্রাম নয়, নগরেও আমরা সবাইকে নিয়ে উৎসবে আনন্দে মেতে উঠতে পারি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরো খবর

Disconnect