ফনেটিক ইউনিজয়
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলো কেন?

পূর্ব প্রকাশের পর
শ্রেণিদ্বন্দ্বের অনুপস্থিতি ধরে নিলে অব্যাহত মতাদর্শিক সংগ্রাম এবং জনগণকে এর মধ্যে আরও বেশি করে সংযুক্ত করার গুরুত্ব থাকে না। সোভিয়েত ইউনিয়নেও তা হয়নি। এ অবস্থা আরও শক্তি লাভ করে পরিকল্পিত অর্থনীতির বিপুল সাফল্য এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার জন্য বলশেভিক পার্টির মধ্যে সাধারণভাবে অতি আত্মবিশ্বাসের উপস্থিতি থেকে। এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আলবেনিয়ান পার্টি পত্রিকার একটি পর্যবেক্ষণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। তাঁরা বলেছেন, ‘বলশেভিক পার্টির সদস্যরা তাঁদের শ্রেণিচেতনা ও বিপ্লবী দৃঢ়চিত্ততা নিয়ে লেনিন ও স্ট্যালিনের নেতৃত্বে বিপ্লবে, সংগ্রামে ও সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে অংশগ্রহণ করেছেন; সংগ্রাম করেছেন ট্রটস্কিবাদ, সংশোধনবাদ ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে। আদর্শগত ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা দৃঢ়চিত্ত ছিলেন এবং বলশেভিক পার্টি, লেনিন ও স্ট্যালিনের নেতৃত্বে, পার্টির সঠিক লাইন এবং নিজেদের আচরণপদ্ধতি সম্পর্কে তাঁদের দৃঢ় আস্থা ছিল। তাঁদের কাছে পার্টিই ছিল সবকিছু, এটি ছিল তাদের হৃদয়, মস্তিষ্ক ও চক্ষু। যে জন্য সব সময় পার্টিকে তাঁরা রক্ষা করতেন এবং পার্টি ও নেতৃত্ব থেকে তাঁরা শিক্ষা লাভ করতেন। কিন্তু পার্টি ও স্ট্যালিনের সঠিক লাইন অনুসরণ করতে গিয়েও তাঁদের সবাই না হলেও অনেকেই, ধীরে ধীরে আত্মমুখী প্রবণতায় আক্রান্ত হন। ফলে এই ক্যাডাররা সর্বহারা শ্রেণিগত সরলতা থেকে বিচ্যুত হন; নিজেদের জন্য অবৈধ বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলতে থাকেন, যা তাঁরা মনে করতেন বৈধÑকেননা তাঁরা যুদ্ধ করেছেন। এসব থেকে ক্রমেই তাঁদের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক মনোভাব বিকশিত হতে থাকে; আগের মতো জনগণের নিকটবর্তী না থাকায় তাঁদের কথা শোনার ধৈর্য আর তাঁদের ছিল না। তাঁদের ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে তাঁরা সবকিছুই জানেন, তাঁরা প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, তাঁরা জনগণ থেকেও ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন, রাজনৈতিকভাবে তাঁরা শ্রমিকশ্রেণির চেয়ে উচ্চতর ও আদর্শগতভাবে শ্রেষ্ঠতর। এসব সর্বহারা বিরোধী চেতনা পার্টির বিপ্লবী চেতনা এবং বৈশিষ্ট্যকে ক্ষুণœ করে। এগুলো পার্টির মূল উদ্দেশ্য সাধন এবং তার বাস্তবায়নকেও ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।’
এখানে আর একটি বিষয় যোগ করা দরকার যে বিপ্লবের পর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনকাজ পর্যন্ত পার্টি ছিল নির্মাতা হিসেবে বিপুল গতিশীল। জনগণের সঙ্গে অব্যাহত ও উদ্দীপ্ত সম্পর্কও ছিল তখন বাস্তব। সে কারণে সমস্যাগুলো কীভাবে বিকাশ লাভ করছে, তা লক্ষ্য করার মতো অবস্থাও তখন দেখা দেয়নি।
১৯৫২ সালে যদিও স্ট্যালিন বলেছেন, ‘সঠিক কর্মনীতি অনুসৃত না হলে সোভিয়েত সমাজেও উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব শত্রুতামূলক হয়ে পড়তে পারে এবং উৎপাদিকা শক্তির অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে।’ কিন্তু স্ট্যালিন এর বাস্তব রূপের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছেন বলে মনে হয় না। নেতৃত্ব ও পার্টির এই উপলব্ধির অভাব জনগণের মধ্যে মতাদর্শিক সংগ্রাম নিয়ে যেতে এবং সর্বক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কর্মসূচি গ্রহণের তাগিদ সৃষ্টি করেনি। এবং একই কারণে স্ট্যালিন ও পার্টির বিভিন্ন নীতির বিরোধী অবস্থানে থেকেও শুধু চাটুকারিতার মাধ্যমে বহু ব্যক্তি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। ক্রুশ্চেভসহ যাঁরা পরবর্তীকালে স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে জিহাদে নেমেছিলেন এবং স্ট্যালিন আমলের অনেক অর্জনকে খর্ব করেছিলেন, তাঁরা স্ট্যালিন আমলেই বেড়ে উঠেছেন একটি মতাদর্শিক ধারার প্রতিনিধি হিসেবে।
জনগণের দিক থেকে কোনো রকম প্রতিরোধ না থাকায় একদিকে যেমন আমলাতান্ত্রিকতা বিকশিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি এর মধ্য দিয়েই উদ্বৃত্ত ভোগী নব্য বুর্জোয়া শ্রেণিও ক্রমে বিকশিত হয়েছে। তাকে উন্মোচন করা বা প্রতিরোধ করার প্রক্রিয়া পার্টিতে কার্যকরভাবে ছিল না, সমাজেও না। এরপরও ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় সহজে স্থিত হতে পারেননি। অনেক রকম চক্রান্তের মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর সহায়তায়, পার্টির আন্তরিক অভিজ্ঞ ও ত্যাগী কর্মীদের ক্রমান্বয়ে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তার সমর্থক গোষ্ঠীর শক্তির ভিত্তিতে ক্রুশ্চেভ গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসীন হয়। বিভিন্ন স্থানে কিছু বিক্ষোভ হলেও তার কোনো সংগঠিত রূপ ছিল না। স্ট্যালিন বিরোধিতার কুখ্যাত বক্তৃতা বস্তুত স্ট্যালিন আমলে চুপ থাকা-ক্ষমতা ও সুবিধাকামী আমলা ও সহযোগীদের প্রতি ছিল সবুজসংকেত।
এরপর ক্রমান্বয়ে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির নামে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। গর্বাচেভের মতো সেদিন ক্রুশ্চেভও বলেছিলেন, ‘পৃথিবী এখন বদলে গেছে।’ বদলে যাওয়া পৃথিবীর জন্য তিনি শান্তির বাণী শোনালেন : সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা আর শোষিত-নিপীড়িত জাতির জন্য শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব দিলেন তিনি। যৌথ খামারব্যবস্থাকে দুর্বল করলেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মেশিন ট্রাস্টের মেশিন, যা যৌথ খামারগুলোকে প্রযুক্তিগত সমর্থন দিত, তা বাতিল করলেন। ব্যক্তিগত জমি, ব্যক্তিগত মালিকানায় গবাদিপশু হাঁস-মুরগি পালনের সীমা, ন্যূনতম কাজের বাধ্যবাধকতা শিথিল করলেন। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বাতিল করে তার জায়গায় ততোধিক বিচ্ছিন্ন ও অধিকতর আমলাতান্ত্রিক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিষদ স্থাপন করলেন। পার্টিতে সদস্য অন্তর্ভুক্তি উদার করা হলো। বিশেষজ্ঞ আমলাদের পার্টি সদস্যপদ দেওয়ার ব্যাপারে উদারতা আনা হলো বেশি। ১৯৬৫ সালে ব্রেজনেভ অনেক রকম সংস্কারের নামে বিভিন্ন উৎপাদনী প্রতিষ্ঠানকে ভিন্ন কাঠামোয় প্রতিষ্ঠা করলেন। আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হলো। লেনিনের কাছে ফিরে যাওয়ার নামে ক্রুশ্চেভ ও ব্রেজনেভ আমলে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে মুনাফাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমলাদের আধিপত্য স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়।
মুনাফা, ব্যক্তিগত বৈষয়িক সুবিধাকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করায় উদ্বৃত্ত আহরণ এবং তার ভাগবণ্টনে ব্যক্তিগত স্বার্থের বিকাশ ঘটল দ্রুত। এই প্রবণতা থেকে পরে জন্ম নিল ‘কালো’ অর্থনীতি। আমলারা ক্রমান্বয়ে আরও শক্তি অর্জন করলেন এবং দক্ষতা বৃদ্ধি ও মুক্ত ব্যবস্থাপনার নামে আমলাদের হাতে বিস্তর ক্ষমতা দেওয়া হলো, যা তাঁদের ক্রমান্বয়ে উদ্বৃত্তভোগী গোষ্ঠী হিসেবে পরিণত করতে থাকল। পার্টির কর্মকর্তারাও এর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। দুর্নীতির গোপন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটতে থাকল তাঁদের মাধ্যমেই।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ রকম প্রবণতা সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়। কেননা হাজার বছরের শোষণ ও বৈষম্য ভিত্তিক সমাজের ছাপ, চিন্তা-চেতনা আশা-আকাঙ্খা আচরণ ইত্যাদির প্রভাব কয়েক দশকে একেবারে দূর হয় না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর বিরুদ্ধে মতাদর্শিক ও সাংগঠনিক সংগ্রাম পরিচালনার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করা। সে কাজ সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার জন্য যে জায়গাটিতে ক্রুশ্চেভ আঘাত করলেন, সেটি হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির রাজনৈতিক আধিপত্যের জায়গায়, তাদের রাজনৈতিক শক্তির জায়গায়। সর্বহারার একনায়কত্ব বাতিল করা হলো। সর্বহারার একনায়কত্ব বাতিল করা হলো এই যুক্তিতে যে সমাজে আর শ্রেণিদ্বন্দ্বের অস্তিত্ব নেই সুতরাং একনায়কত্বের প্রয়োজন নেই।
পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে উত্তরণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সর্বহারার একনায়কত্বের গুরুত্ব মার্ক্স, লেনিন, স্ট্যালিনÑসবাই বারবার বলেছেন। এর গুরুত্ব নিছক একটি সাংবিধানিক ধারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সর্বহারার একনায়কত্ব সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় অব্যাহতভাবে সর্বহারা শ্রেণির সতর্ক ও সজাগ ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে, সমাজকে দিকনির্দেশনা দেয়। তা সর্বহারা শ্রেণিকে যেকোনো সংশোধনবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রামের হাতিয়ার দান করে এবং সর্বোপরি বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লবের সংগ্রামে দৃঢ় মিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালনের ভিত্তি বজায় রাখে। একদলীয় ব্যবস্থায় পার্টি যদি সর্বহারার একনায়কত্ব বাতিল করে, জনগণের হাত থেকে মতাদর্শিক সংগ্রামের হাতিয়ার কেড়ে নেয়, জনগণের অংশগ্রহণ সংকুচিত করে, সে ক্ষেত্রে পার্টি নিছক একটি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, পার্টি কর্মকর্তারা সেখানে পরিণত হন আমলায়। নব্যধনিক শ্রেণি সৃষ্টির পথ সুগম হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রমান্বয়ে সে ঘটনাই ঘটেছে। গর্বাচেভ আমলে তারাই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিশ্চিত করে মাফিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বৈষম্য, নিপীড়ন, শ্রেণিস্বার্থভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে মুক্তির লড়াই মানুষের দীর্ঘকালের। বিভিন্ন পর্বে এর সুদূরপ্রসারী সাফল্যও আছে। আবার আছে পশ্চাদপসরণও। এই যাত্রা সরলরৈখিক নয়, এর অনেক আঁকাবাঁকা পথ আছে। মানুষের ইতিহাসে কোনো নতুন ব্যবস্থা এমনকি সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণেও বারবার পশ্চাদপসরণ দেখা গেছে। কয়েক শ বছরের ওঠা-নামার পরই কেবল প্রাক্-পুঁজিবাদী নানা ব্যবস্থার ওপর পুঁজিবাদ নিজের বিজয় নিশ্চিত করতে পেরেছে। দুনিয়ার অতীত ও বর্তমানের গর্বাচেভ গোষ্ঠী পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু বিশ্বের কোটি কোটি নির্যাতিত শোষিত মানুষ তার জীবনের প্রতি মুহূর্তের শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করবেন কেন? তাই দুনিয়ায় লড়াই থেমে নেই। এই লড়াই মানবসমাজকে রক্ষার লড়াই, মানুষকে মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনার লড়াই, এই লড়াই মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। এই লড়াইয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্জন ও ব্যর্থতা দুটোই আমাদের বড় শিক্ষা।

আরো খবর

Disconnect