ফনেটিক ইউনিজয়
বাংলাদেশে শিক্ষার হালচাল

কথায় বলে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তবে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলব, সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আমি ‘সু’ শব্দটি ব্যবহার করলাম। কারণ আজকাল দাবি করা হচ্ছে দেশে শিক্ষিতের হার বাড়ছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, সে শিক্ষা জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে পারছে না। এর কারণ বহুবিধ হলেও তার জন্য সুশিক্ষা চাই। আমি যেহেতু একজন শিক্ষক তাই শিক্ষকের ভূমিকার কথাই আগে বলি।
আমার শিক্ষকতুল্য ঢাকা কলেজের সহকর্মী আবদুল্লাহ আবু সাঈদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আজকাল শিক্ষকদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে তারা ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, নাকি অন্য কিছু।’ তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে বলেছিলেন, ‘আজকাল শিক্ষা আর ক্লাসরুমে নেই। তা চলে গেছে শিক্ষকদের কুটিরে কুটিরে।’ (কথাগুলো আমি স্মৃতি থেকে বললাম, হয়তো তাঁর উক্তির সঙ্গে হুবহু মিলবে না, তবে কথাগুলো এ রকমই।) শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও আজকাল প্রাইভেট পড়ান।
আমাদের সময়ে (১৯৪৮-১৯৬৭) ‘কুটিরে কুটিরে শিক্ষা’র তেমন চল ছিল না। তবে কেউ কেউ বাড়িতে গৃহশিক্ষক ডেকে পড়তেন। আবদুল্লাহ আবু সাঈদ তাঁর নিষ্ফলা মাঠের কৃষক গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি ও তাঁর ছোট ভাই গৃহশিক্ষকের কাছে পড়েছেন। আমিও প্রাইমারি লেভেলে তা-ই করেছি। তবে শিক্ষকতা জীবনে আমি এর ঘোর বিরোধী ছিলাম। এমন নয় যে আমার বিষয়-আশয় প্রচুর ছিল। পুরো শিক্ষকতা জীবন বেশ অভাব-অনটনের মধ্যে কাটিয়েছি। তবু সে পথে আমার রুচি হয়নি।
১৯৯০-এর দশকে একবার স্টাফ কক্ষে বসে কতিপয় সহকর্মীর সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন ও ‘কুটিরে’ শিক্ষকতা নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। আমার যুক্তি-নীতি-নৈতিকতার কথা শুনে এক তরুণ সহকর্মী হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আপনি কি চান শিক্ষকেরা মলিন পাজামা পাঞ্জাবি আর রংচটা ছাতা বগলে করে ক্লাসে আসুন?’ উত্তরে আমি শান্তভাবে বললাম, ‘যিনি মলিন পাজামা-পাঞ্জাবি আর রংচটা ছাতা বগলে করে ক্লাসে আসতে পারেন, তিনিই যেন শিক্ষকতা পেশায় আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গণিতের শিক্ষক আবদুর রহমান খলিফা তা-ই করতেন।’ আমি বুঝি আমার উত্তর যথেষ্ট রূঢ় এবং সে দিনে যাঁরা সমতুল্য পেশায় ছিলেন, তাঁদের জীবনমান বিচেনা করলে যথেষ্ট বেমানান হয়েছিল। তবে শিক্ষকতা একটি ব্রত, কোনো পেশা নয়।
আজকাল ‘কুটিরে কুটিরে’ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং বাণিজ্য। যে কারণে ক্লাসে আর ছ্ত্রা খুঁজে পাওয়া যায় না। শিক্ষকেরাও ক্লাসের বদলে ‘কুটিরে’ কিংবা কোচিং সেন্টারে পড়াতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, যদিও তাঁদের বেতন আজ বহুগুণ বেড়েছে। ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকেরাও এটা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন। কারণ শিক্ষকের মন জুগিয়ে চললে লাভ আছে। তা ছাড়া বৈধ-অবৈধ উপায়ে লোকের হাতে আজ অঢেল পয়সাও এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ তাই ইংরেজ কবি টিএস এলিয়টের ভাষায় ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ আর আবদুল্লাহ আবু সাঈদের ভাষায় ‘নিষ্ফলা মাঠ’।
আজকাল ছাত্রছাত্রীরা পাস করে ঠিকই, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ হয়ে বেরোয় না। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর সরকারপ্রধানও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন, ‘নিজেদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’ আজকাল ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে ভাবে না যে দায়িত্ব বাড়ল। এ সাফল্য ধরে রেখে জীবনে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কিছু একটা করে দেখাতে হবে। উল্টো তারা ঢোল পিটিয়ে হাতে ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষর দেখিয়ে অশিষ্ট নাচানাচি করে। দেখে মনে হয় মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয় করে ফেলেছে, যা থেকে প্রচুর গণিমতের মাল পাওয়া যাবে। আসলে উদ্দেশ্যটাও তা-ই। লেখাপড়া শিখে জীবনে বিল গেটসের মতো প্রচুর অর্থ উপার্জন করা। যদি কিছু ব্যতিক্রম থেকে থাকে, তবে তা আজকের নিয়মটাকেই প্রতিষ্ঠিত করে।
ত্যাগের শিক্ষা আজকাল ছেলেমেয়েরা তেমন একটা পায় না। সেই ১৯৬০-এর দশকে তদানীন্তন জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ, প্রখ্যাত দার্শনিক সাইদুর রহমান বলতেন, ‘আমাদের একমাত্র ত্যাগ, মলমূত্র ত্যাগ।’ অবশ্য পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে বাঙালির ত্যাগের বিনিময়েই দেশ স্বাধীন হয়েছে। তবে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর এ উক্তি বহুলাংশেই যথার্থ। তিনি আরও একটি মজার কথা বলতেন। সেকালে ঢাকা শহরে জগন্নাথ কলেজ ছিল সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ। দুর্মুখরা এ কলেজকে বলত ‘জগবাবুর পাঠশালা’। শুনেছি তাঁর জনৈক বন্ধু তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি এটা চালাও কী করে।’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘এটাত আমি চালাই না। এমনি চলে। যখন কোনো গোলযোগ দেখা দেয়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি কেবিন ভাড়া করা আছে, আমি তাতে গিয়ে শুয়ে থাকি। আবার যখন সব ঠিকঠাক হয়ে যায়, তখন কলেজের লোকেরা আমাকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আসে।’ আজ মনে হয় দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ‘জগবাবুর পাঠশালা’।
১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে আমি ঢাকা কলেজে কর্মরত ছিলাম। সে সময়ে ঢাকা কলেজের সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ মো. নোমান বললেন, কাউকে না জানিয়ে, কলেজের ছাত্র সংসদ কক্ষের দখল নিয়ে রক্তারক্তি ঠেকাতে তাঁকে মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রসংসদ নেতাদের দাবির মুখে রাতের অন্ধকারে এক আত্মগোপনকারী এ কলেজের ছাত্র নয় ‘এমন এক গুন্ডার’ কাছে ছাত্রসংসদের চাবির জন্য ধরনা দিতে হয়েছে। আমি যখন ১৯৯০-এর দশকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে, তখন কলেজের ছাত্রনেতারা অধ্যক্ষকে নিজ কক্ষ থেকে বের করে তালা লাগিয়ে দিলে তাঁকে ক্ষমতাসীন দলের জেলার শীর্ষ নেতার কাছে চাবির জন্য ধরনা দিতে দেখেছি। একই দশকে একই কলেজে ছাত্রসংদের বন্ধ কক্ষের চাবির জন্য অন্য এক অধ্যক্ষকে তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রসংসদ নেতাদের দাবির মুখে একই কলেজের ক্ষমতাসীন দলের এক প্রাক্তন ছাত্রনেতার কাছে টেলিফোন করতে হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়াল, ছাত্রদের একটি প্রভাবশালী অংশ আজ আর শিক্ষক বা কলেজ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ রাজনীতিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তাই শিক্ষারও রাজনীতিকীকরণ হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী অবশ্যই জ্ঞানী লোক। আমার পুস্তকের প্রকাশক টেলিফোনে আলাপকালে অপ্রাসঙ্গিকভাবে নিজেই বিষয়ান্তরে গিয়ে একবার তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, তাঁর টাকার লোভ নেই। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোলে তিনি যত কথা বলেন, আমার অভিজ্ঞতায় আমি আর কোনো শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে এত কথা বলতে দেখিনি। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে কি বেহাল দশা, সে ব্যাপারে শিক্ষা প্রশাসন তেমন মাথা ঘামায় বলে মনে হয় না। বিজ্ঞানে ছেলেমেয়েরা পড়তে অনাগ্রহী। বিজ্ঞান, অঙ্ক ও ইংরেজির মতো বিষয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী ফেল করে। কারণ বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান গবেষণাগার নেই, সেটা তো সবারই জানা।
প্রায়ই দেখা যায় পরীক্ষার হলে ছাত্রছাত্রীদের মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে শিক্ষামন্ত্রী আলাপ করেন। পরীক্ষাকেন্দ্রে তাঁর যাওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে? এ-ও বুঝি এটা তাঁর সদিচ্ছার প্রকাশ। এই সদিচ্ছা নিয়ে স্বাধীন দেশের সরকারপ্রধান ও শিক্ষামন্ত্রী যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক উন্নয়নে ও সমস্যা সমাধানে একনিষ্ঠ হন, তবে ছাত্রছাত্রী তথা জাতি উপকৃত হবে। পরাধীন ভারতে যুক্তবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী এ কে ফজলুল হক তা-ই করেছিলেন। অধিকন্তু, আমার মনে হয় স্কুল ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার ভার এত উচ্চপর্যায়ে না নিয়ে সরাসরি বোর্ডগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
আজকাল গ্রামগুলো শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে। একটা সময় ছিল যখন তারা শহরের ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় ভালো করত। আমরা মতলবের অলিউল্লাহ্ পাটোয়ারীর কথা স্মরণ করতে পারি। তিনি গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে ভালো ছাত্র সংগ্রহ করে তাঁর স্কুলে ভর্তি করতেন। তিনি সে স্কুলের সার্থক হেডমাস্টার ছিলেন। আমরা যারা সেকালে (১৯৫৬-১৯৬০) ঢাকার সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করতাম, আমাদের শিক্ষকদের শ্রদ্ধাভরে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে দেখেছি। তাঁর স্কুল থেকে একাধিক ছাত্র প্রায় প্রতিবছর ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম থেকে দশম স্থানের মধ্যে স্থান পেত। গ্রামে এমন আরও অনেক স্কুল ছিল। শ্মশ্রুধারী এই বরেণ্য হেডমাস্টার পাকিস্তান আমলে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। ঢাকা শহরের বেসরকারি স্কুল নবকুমার ইনস্টিটিউশনের হেডমাস্টার আব্দুল মন্নান যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। আজকাল ঢাকা শহরের বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলো ভালো করছে। তবে মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলো তেমন ভালো করছে না। কারণ এগুলো প্রায় উপেক্ষিত। শুধু ঢাকার স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশের দিকেই তাকাতে হবে। সারা দেশ অন্ধকারে রেখে শুধু ঢাকায় বাতি জ্বালালে, ঢাকাও একদিন অন্ধকারে ছেয়ে যাবে।
মফস্বল শহর ও গ্রামের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো প্রকার বৈষম্যের শিকার না হয়ে একসঙ্গে একতালে এগিয়ে যেতে পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তবেই দেশের সুষম উন্নয়নের পথ উন্মোচিত হবে। নতুবা উন্নত শিক্ষার লোভে ছেলেমেয়েরা এখন যেমন যাচ্ছে, ভবিষ্যতেও বিদেশে যাবেই, উপরন্তু ঢাকামুখী হয়ে ঢাকাকে গিলে খাবে। এহেন পরিস্থিতি স্বাধীন দেশে কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকেরই কাম্য নয়। এ প্রবণতা দূর করতে হবে।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার

আরো খবর

Disconnect