ফনেটিক ইউনিজয়
তিমিরগ্রস্তা রাত্রি কোথায়! এ যে দিব্যি প্রভাত!

এক.
বহু বহু দিন হয়, রোকেয়াকে আমার গভীর রকমে মনে পড়ে না!
একদিন, তাঁকে খুব নিবিড় রকমে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিল আমার মন, আমার কিশোরবেলায়! বাংলা বইয়ে তাঁর বিদ্যাস্পৃহার গল্পটা পড়ে উঠেছিলাম তখন। সেই গল্পের সঙ্গে এঁকে দেওয়া ছবিটা দেখেছিলাম। বালিকাটি ঝুঁঁকে আছে বইয়ের দিকে, মোমের আলো জ্বলছে, আর মুখোমুখি বসে আছে একটি তরুণ! তাঁর ভাই!
সেই ছবিটা, সেই নিশুথি রাতের সাধনার কথাগুলো, সেই আকুল বালিকাটি, সেই দরদি ভাইটির মমতা-বহু বহু দিন আমার সঙ্গী হয়ে ছিল। মন আকুল করে চলছিল! তারপর রোকেয়ার তীব্র নিকট হওয়ার একটা কালও এসেছিল আমার জন্য। তাঁর জীবনকে আর তাঁর লেখাদের তন্নতন্ন করে পাঠ করার দায়বোধ করার সময় এসেছিল। তাঁকে নিয়ে লিখে ওঠার তাগাদা পেয়েছিলাম খুব। রোকেয়া ও তাঁর সমকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজের হাল-হকিকতের ওপর বিশদ আলোকপাত করার বাসনা জন্মেছিল। তাগিদ বোধ করেছিলাম রোকেয়া এবং ওই সময়ের সমাজ-পরিস্থিতির ব্যাখ্যা ও ভাষ্য রচনার।
লিখে উঠেছিলাম বিবি থেকে বেগম।
তারপর তুমুল আক্রান্ত হওয়ার একটা সময়ও এসেছিল আমার জন্য। প্রধানত, তাঁকে নিয়ে এবং অপ্রধানত অন্য অনেককে নিয়ে লিখে ওঠার জন্য প্রগতিশীলতা দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ও দণ্ড ভোগ করার সময় এসেছিল, আমার জন্য!
রোকেয়া যখন তাঁর সমাজের সত্য-অবস্থাটিকে মোহশূন্যভাবে তুলে ধরেছিলেন, সেটা কিনা ছিল পামর বিদেশিদের রাজত্বকাল! সেই কারণেই তাঁর কালের দেশপ্রেমিকেরা নবচিন্তাপথের একাকী পথিক অই রোকেয়াকে বিশেষ শায়েস্তা করার সুযোগটা পেয়ে ওঠেনি। তবে বিবি থেকে বেগম যখন লেখা হয়েছে, দেশ তখন অতি স্বাধীন। স্বাধীন দেশে অমন নতুন চিন্তা ও ভাষ্যরচনা। ভুল সুখে সুখী হয়ে থাকার আরামকে নষ্ট করে দিতে চায় যে চিন্তা, তাকে কীভাবে বরদাশত করা যায়? কিছুতেই বরদাশত করা যায় না। কাজেই প্রগতিশীল সমাজপতিরা সাব্যস্ত করেন যে, নবচিন্তাকে দণ্ড ভোগ করতেই হবে!
দণ্ড পান বিবি থেকে বেগম ও তার রচয়িতা। সেই দণ্ড ভোগ করা এখনো চলছে!
দণ্ড ভোগ করে যেতে যেতে রোকেয়াকে নিয়ে স্ত্রীবাদীগণের মাতামাতি দেখে যেতে যেতে, রাষ্ট্রীয় রোকেয়া উদ্যাপন সংবাদ পড়ে উঠতে উঠতে, আমি খুব বোধ করতে থাকি, রোকেয়াকে আমার এখন তেমন একটা গভীর রকমে মনে পড়ে না। কানে আসে তাঁর নাম। কিন্তু তাঁকে যেন আর মনে পড়ে না! কেন মনে পড়ে না? দণ্ড ভোগ করে যেতে যেতে একসময় এমনই অসাড় দশা দেখা দেয় নাকি? বুঝতে পারি না। এমন অবস্থা চলছে আজ বহুদিন হয়! তেমন দশা চলতে চলতে কি না শেষে অমন অবিশ্বাস্য এক ঘটনা ঘটে! কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
ঘটনাটা গতকালের।
দুই.
রোজ সকালে আটটা ত্রিশের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে যাই আমি। গতকালও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। রাতে অতিমাত্রায় কম ঘুম পাওয়ার কারণে, সেই সকালে, কেমন এক যাতনায় তড়পাচ্ছিল আমার চোখেরা! তাদের একটু বন্ধ করে রেখে, কাজ চালানোর উপযুক্ত করে তোলার কাজে আমি তখন ব্যতিব্যস্ত ছিলাম। অমন জটিল সময়ে, অমন সকালে, হঠাৎ শুনি আমার কক্ষের দরজায় শব্দ উঠছে-ঠুক ঠুক ঠুক!
আমার ক্লাস দশটা দশে। কোনো দিনই নয়টার আগে আশপাশে কখনো পাই না কাউকেই! তাহলে আজকে আটটা ত্রিশে কে এল?
‘এসো!’ বিস্মিত গলায় ডাকি।
দরজাটা খুব সন্তর্পণে একটুখানি খুলে যেতে দেখি সেই আধখোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অচেনা এক ভদ্রমহিলা। একা। তাঁর চোখে পুরোনো আমলের গোল চশমা। পরনে কচি সবুজ ও সাদায় মেশানো পাড়হীন তাঁতের শাড়ি। ধরে নিই ইনি কোনো এক হতবিহ্বল অভিভাবকই হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন সেমিস্টারে ভর্তির সময় প্রায় এসে যাচ্ছে! এমন সময়ে এসব পথ-হারানো অভিভাবক, সঠিক অফিসের খোঁজ করতে করতে, এমন নানা ভুল দরজায় টোকা দেয় বৈকি। ‘বলুন!’ আমি জিজ্ঞেস করি।
তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে আমার টেবিলের সামনে এগিয়ে আসেন। তারপর চেয়ারটা আলগোছে টেনে নিয়ে বসতে বসতে বলেন; ‘তোমার কাছেই আসতে হলো বাছা! কয়েকটা বিষয় নিয়ে খুব ধন্দে পড়ে গেছি। একটু খোলাসা করে দাও দেখি জলদি করে।’
বাছা! আমাকে বলে বাছা! কী আজব এই মহিলা!
তো, কত রকমের অদ্ভুত মানুষে দুনিয়া বোঝাই না? জানি আমি সেটা। সেই কথা মনে আসে বলে আমি আমার হতভম্ভ হয়ে যাওয়াটাকে একদম গিলে নিই। তারপর বলি, ‘আপনার ধন্দের মীমাংসা আমি দিতে পারব, এমন কথা কেন মনে এল আপনার? আপনি কে? আমার কাছে কিসের ধন্দের সমাধান চান?’
তিন.
‘পরমেশ্বরের দোহাই! আমাকে শোনো! তুমি কথা বোলো না!’
আমি একেবারে চুপ হয়ে যাই। সম্ভবত পাগল ধরনের কেউ হবে এই মহিলা! এখন মানে মানে নয়টা বাজুক। আমার টি এ এসে গেলেই আর ভয় নেই!
‘এই তো দেখো বাংলার সমাজে মেয়েদের কী দিব্যি বিকাশ হয়েছে। আমি যেমনটার স্বপ্ন দেখতাম, ঠিক যেন তেমনটাই। নানা বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ার কোনো শেষ নেই আজ। অন্তঃপুরের অবরোধ তো নেইই কোনোখানে, বিদ্যাশিক্ষার পথেও নিষেধ যেন নেইই।’
‘আমি অই মধ্যবিত্তের কথাই কিন্তু বলছি। এদের জন্যই তো আমার যত উদ্বেগটা ছিল। এখনকার সমাজের মধ্যবিত্ত কন্যাদের বিদ্যাশিক্ষার দুনিয়ায় বা জীবনের কোনো এলাকায়ই তো কোনো রকম দুরবস্থার অন্ধকার নজরে আসেনি আমার। দূর থেকে সেটা দেখে আনন্দে অন্তরাত্মা উথলে উঠছিল। ক্ষণে ক্ষণে কেবলই মনে হচ্ছিল, অহো! কী সৌভাগ্য! যে জাগর স্বপ্ন বুকে নিয়ে দেহ ধারণ করেছিলাম, সেই স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়ে থাকেনি! সত্য হয়ে উঠেছে! এই তো দিব্যি প্রভাতকাল! মুক্তির আলো সবখানে থইথই করছে! কেবল থইথই করছে!’
‘আমি আমার সেই স্বপ্ন সফল হয়ে ওঠার দেশে এক বেলা হেঁটে বেড়ানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়ি! এই যে আমি এইখানে, সেই কারণে। এই আমি আমার হেঁটে বেড়ানো শেষ করেছি।’
‘কিন্তু এ আমি কী দেখলাম! আমি কেন নিজ চোখে দেখার এই বাঞ্ছা পূরণের জন্য এমন মরিয়া হলাম! কেন এলাম!’
‘প্রথমে ইচ্ছা হলো একেবারে নবীনাগণের কাছে যাই! এরাই তো আগামীকাল! সুশিক্ষিতা হয়ে উঠছে তারা প্রতিজন। এমন সব আধুনিক বিদ্যা আয়ত্ত করতে যাচ্ছে তারা, যেই বিদ্যার কথা আমার সময়ে অচিন্ত্য ছিল। তাদের দু-একজনের কাছে যাই আমি।’ ‘বিধি! বিধি! তাদের দেখে স্পষ্টই জানলাম, আদতেই বহু কিছু দেখা বাকি ছিল এই পোড়া চোখদের!’
‘বিদ্যা গ্রহণ করছে তারা। কিন্তু এ কী তাদের ব্যবহার! একজনের নাম নাবিলা। বড় রূপবতী সেই কন্যা! যে আমি, পোড়া চোখ যার সহজে মুগ্ধ হয় না, সেই চোখও কিনা বলে, বড় স্নিগ্ধ এই বালিকা। সেই কন্যার এ কী মতিভ্রম! তার কাছে নিজেকে সঁপতে আসছে একের পর এক তরুণ। সেসব প্রেমিক হৃদয় নেড়েচেড়ে দেখছে সে। একটু আশকারা দিচ্ছে, একটু আশায় দোলাচ্ছে কিছুক্ষণ, কিন্তু কাউকে চূড়ান্ত কথা দিচ্ছে না। তারপর যেই আরেকটু সম্পদশালী কেউ এসে যাচ্ছে, আগের জন বিতাড়িত হয়ে যাচ্ছে অবলীলায়! কোনো গ্লানি নেই, কিছুমাত্র কুণ্ঠা নেই, অমন নির্বিচার রাখা ও ফেলে দেওয়ায়!’
‘ভাবলাম, এই কন্যা বুঝি একলাই এমন স্বেচ্ছাচারী! আমার যে অন্তঃকরণ পাঠের শক্তি আছে, সেই শক্তি দিয়ে জানলাম, এই বালিকা একা একজন মাত্র নয়। সে হচ্ছে কোটিজনের এক প্রতিনিধি। হায়! এখানেই শেষ নয়! অন্য আরেক জাতের প্রতিনিধির সাক্ষাৎও মিলল কিছুক্ষণের মধ্যেই। সেই জাতের প্রতিনিধির নাম ধরো বৃষ্টি।’
‘বৃষ্টিরা এমন নেওয়া ও ছুড়ে ফেলার খেলা খেলে না। তাদের অন্তর এমত খেলায় আনন্দ পায় না। তারা স্তরে স্তরে নানা প্রণয়ী সংগ্রহ করে, রাখে ও বিদায় নেয়। এবং জয়ের আনন্দ লাভ করে। একটি স্থায়ী প্রণয়ী পাওয়ার ক্ষুদ্র সুখে যেন কিছুতেই তুষ্ট হতে পারছে না আর তাদের লেলিহান সুখ-ক্ষুধা!’
‘তারপর গেলাম আরেকটু বড় হয়ে ওঠাদের তল্লাটে। তারা কেউ কেউ সদ্য পাস করা। চাকরিজীবী। কারও কারও চাকরির বয়স হয়ে এসেছে পাঁচ বা আট বা দশ। তাদের কেউ কেউ স্বামীর সংসারে হেনস্তা হয়ে চলছে সেই চিরকালেরই মতো। এ আর নতুন কী!’
‘এমনই কি চলছে নাকি এদের সবার জীবনে? নতুন কিছু কি আসে নাই?’
‘ওমা! ওমা! আসে নাই মানে কী? এসেছে! তাদের দেখে চোখে পলক ফেলা যায় না! আহা! এরাও যে কালে, সংসারে, জনম নিতে পারবে; তেমন কথা আমার কল্পনাতেও আসেনি! অহো! আমার চিন্তার দীনতা নিয়ে আমি লাজে খানখান হয়ে যাচ্ছি! তারা পরোয়াহীনা, উচ্চকণ্ঠা! এরা অন্যকালের মেয়ে বলে এমন শব্দ আসছে আমার মুখে। আমার কালের হলে বলতাম, নির্দয়া বেশরম! না না। বিপন্ন মানুষের দুঃখ-যাতনা লাঘবের কাজে আছে বলে তারা অমনটা হয়ে ওঠেনি! তারা মস্ত এক দুশমনের গুষ্টির সন্ধান পেয়ে গেছে! সেই গুষ্টির নাম স্বামীর পিতৃকুল! এই উচ্চপদারা সেই কুলের কাউকে বরদাশত করতে রাজি নয়। বিবাহকালে তাদের হাতে গহনা ও বস্ত্র ক্রয়ের অর্থ প্রদান করাই বিধি। তবে অর্থ দিতে হয় কন্যার হুকুম মাফিক! পাত্রের সামর্থ্য এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়!’
‘না, বিবাহের অই সকল সামগ্রী ক্রয় করে দেবার কোনো হক শ্বশুরকুলের কারও কদাপি নেই। অই কুলের লোকসকল যত বিদ্যাবুদ্ধিসম্পন্নই হোক, কন্যার চোখে তারা চির নিম্নরুচির লোক। ক্ষেত। সেই নিকৃষ্ট গোষ্ঠীর সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রেখে এই কন্যারা নিজেদের সর্বনাশ করে না এবং কী বিস্ময়! এই উচ্চপদাগণ কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ আর্কিটেক্ট, কেউ অধ্যাপনায় আছে, কেউ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার!’
‘আরও আছে! আরও অনেক জাতের অনেক অসাধুতা, হিংস্রতা, নির্দয়তা আছে। আমি সেই সব আর স্মরণেও আনতে চাই না। হায় আমার স্বপ্নকন্যাগণ! কোন পাপে তোমাদের এমন দশা! হায়! পুরুষজাতি তো স্বভাবতই অসাধু ও দুষ্কর্মশীল! তাদের কুসঙ্গের কারণে কী কোমলা সরলা নারী জাতির এমত পতন! কথায় না বলে যে, সঙ্গদোষে লোহা ভাসে? হায়!’
‘নাকি সুযোগ পাওয়া মাত্র নারী আজ প্রকাশ করছে তার আদত রূপ, আসল স্বভাবখানা? আসলে সে উন্নত নৈতিকতায় ভরা, কোমলা, সাধুজন নয়? সেও অই পুরুষ গোত্রেরই মতো জন্মগত অসাধু? শুধু এত দিন সুযোগ আসেনি বলে, স্বরূপে দেখা দিতে পারেনি? হায়! তাহলে শুধু বিদ্যা আয়ত্তকরণেই মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়? ওটাই তবে পথ নয়? হায় বিধি! কেন আমি শুধু বিদ্যা গ্রহণের ওপর অমন জোর দিয়ে গেছি! এমন মূঢ় কেন আমি! এতটা মূঢ়! এমন মস্ত কালিমায় মোড়ানো আলোর স্বপ্ন দেখেছি নাকি আমি? হায়!’
চার.
এমন বিলাপ করতে থাকা একজনকে আমি কি বলে সান্ত¡না দেব? কি বলব? বলব যে, আমার কিন্তু বিষয়টা নিয়ে মনে কোনো আফসোস জাগছে না? বরং বেশ নির্ভার, বেশ ফুরফুরেই লাগছে! মনে হচ্ছে, এবারই বরং ভালো হয়েছে। শঠে শাঠ্যং বলে কেমন একটা কথা আছে না?
থাকুক না পাষণ্ডরা পাষণ্ডদের সাথে। তাদের পাশে কি প্রাকৃতিক নিয়মে আসবে না গুটিকয় সত্য মানুষ? নারী ও পুরুষ? তাহলেই চলবে!
কিন্তু এই কথা কয়টা আমি সেই অচেনা নারীটিকে বলে ওঠার ফুরসত পাই না। যেমন আচমকা তিনি এসেছিলেন, তেমন হঠাৎই তিনি আলগোছে চেয়ার ঠেলে উঠে হাঁটা শুরু করেন। আমি তাঁকে বিদায় জানানোর সুযোগ পাই না। পেছন থেকে তাঁর ভঙ্গি দেখে মনে হতে থাকে যে, বিদায় জানিয়ে চলে যাওয়ার রীতিটা যেন তার জানাও নেই। তবে তাঁর অপস্রিয়মাণ দেহকাঠামোর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে, আমার মন হঠাৎই কেঁপে ওঠে!
ওটি কে ছিল? কে!

আরো খবর

Disconnect