ফনেটিক ইউনিজয়
নকলের ভরা মৌসুমে নকল ধরার দু টুকরো স্মৃতি

আমি তখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে সবে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছি। অল্প কদিনের মধ্যেই ১৯৭৫-এর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। আজ প্রথম পরীক্ষা। কলেজের পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা বিরাট অডিটরিয়ামটি পরীক্ষায় ব্যবহারের জন্য দুভাগ করা হয়েছে। পুবে এক ভাগ। পশ্চিমে এক ভাগ। পুবের অংশে আমার ডিউটি। যাঁরা ডিউটি দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে আমিই নতুন ও কনিষ্ঠতম। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আমরা পরীক্ষার্থীদের সামনে পশ্চিমমুখী দাঁড়ানো। পরীক্ষার্থীরা পুবমুখী বসেছে। আমার হাতের বাঁ দিকে কোনায় সামনের টেবিলে এক পরীক্ষার্থী সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছে। মে-জুন মাসের গরমের মধ্যে সে গায়ে চাদর জড়িয়ে কেন পরীক্ষা দিতে এল, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, ‘আমার গায়ে জ্বর।’ আমি তার কপালে হাত রাখলাম। শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক। আমি বললাম, তোমার গায়ে তো জ্বর নেই। সে বলল, ‘এখন নেই, তবে শীত করছে।’ আমি বললাম, আমি তোমাকে বিশ্বাস করলাম।
এই বলে আমি আমার জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। আমি তার দিকে লক্ষ রাখছি। আমার এক সহকর্মী আমাকে আস্তে বললেন, এই ছেলে দুজনকে জবাই করে তৃপ্তি নিলয়ের গেটের দুই পিলারের দুই মাথায় তাদের মাথা খাড়া করে রেখেছিল। (তৃপ্তি নিলয় তখন পাবনার একমাত্র অভিজাত আবাসিক হোটেল।) এ কথা শুনে আমার সন্দেহ হলো তার চাদরের নিচে নিশ্চয়ই কিছু আছে। একপর্যায়ে আমি লক্ষ করলাম সে উসখুস করছে। একটু পরে একটি কাগজ বের করল। আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে বললাম, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু তুমি সে বিশ্বাস রাখলে না। কাগজটি দিয়ে দাও আর চাদরটা খোলো। সে কাগজটা দিয়ে দিল কিন্তু চাদরটা খুলল না। বলল, ‘আর নাই।’ আমি বললাম, ‘এবারও বিশ্বাস করলাম যে তোমার কাছে আর কাগজ নাই।’
আমি সরে এসে আমার আগের জায়গায় দাঁড়ালাম। সে আবার কাগজ বের করল। আমি তার সামনে গিয়ে বললাম, কাগজটি দাও আর দাঁড়াও। সে কাগজটি দিয়ে দাঁড়াল। আমি বললাম, তুমি আবার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছ। এবার চাদরটি খোলো। সে কাগজটি দিল কিন্তু চাদর খুলতে রাজি হলো না। এবার যে প্রশ্ন আমি জীবনে নিজেকেও করিনি, তাকে সেই প্রশ্ন করলাম, তুমি জীবনে কী হতে চাও? সে বলল, ‘আমি মন্ত্রী হব।’ আমি বললাম, ভালো কথা। আমি দোয়া করি তুমি মন্ত্রী হও। আচ্ছা, মনে করো তুমি শিক্ষামন্ত্রী হলে। তুমি যেভাবে পরীক্ষা দিতে চাও, তাতে তোমার মন্ত্রিত্বের অধীনে শিক্ষার কী হাল হবে তুমিই বলো। সে মাথা নুইয়ে চুপ করে রইল। আমি বললাম, চাদরটি খুলে আমার হাতে দাও।
সে চাদরটি খুলল। চাদরের নিচে একটা বই ও আরও কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেল। চাদরটা আর বইসহ কাগজগুলো নিয়ে এলাম। সে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে এসেছে। পরীক্ষা শুরু হয়েছে এক ঘণ্টাও হয়নি। সে চুপ করে কলম তুলে বসে রইল। পরীক্ষার নিয়মমতো পরীক্ষা শুরুর পর প্রথম ঘণ্টা বাজলে সে খাতা দিয়ে আমার কাছ থেকে চাদরটি নিয়ে বেরিয়ে গেল। পরদিন অডিটরিয়ামের পশ্চিম পাশে ডিউটি পেলাম। আমি কৌতূহলী হয়ে ছেলেটিকে দেখতে গেলাম। সে আজ আসেনি। পরেও খোঁজ নিয়েছি। সে পরীক্ষা দিচ্ছে না।
এ পরীক্ষা কদিন চলার পর একদিন অডিটরিয়ামে নকল প্রতিরোধের প্রতিবাদে পরীক্ষার্থীরা তুমুল হট্টগোল শুরু করে দিল। অদূরে স্টাফ রুমে বসে সেই হট্টগোল শোনা গেল। অধ্যক্ষ দৌড়ে গেলেন। হল নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত পাবনার ডিসি এলেন। তাঁর কড়া বক্তব্যের পর হল নিয়ন্ত্রণে এল। ছাত্ররা অধ্যক্ষকে মান্য করল না। আমার কাছে ব্যাপারটা বেখাপ্পা ও খারাপ লাগল। এই পরীক্ষার এক নকলবাজ ছাত্র এক বিকেলে দীনেশ চন্দ্র মণ্ডল নামে বাংলার এক তরুণ শিক্ষককে নকল ধরার অভিযোগে রাস্তায় লোহার রড দিয়ে বাড়ি মেরে মাথা ফাটিয়ে দিল। দীনেশকে রাস্তার লোকেরা হাসপাতালে ভর্তি করে কলেজে খবর দিলেন। আমরা ছোটাছুটি করে তাঁকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। দীনেশ আমাদের দেখে হাসছেন। মাথায় কটি স্টিচ লেগেছে। দীনেশ হাসিমুখে এ নির্যাতন সহ্য করলেন।
পাবনায় একটি মিষ্টি পাওয়া যায়। রসকদম। ঢাকায় এটি দেখিনি। রসগোল্লার মতো গোল ওপরে সাগুদানা বসানো। সফেদ। খেতে বেশ লাগে। প্রায়ই ঢাকা রোডের ওপর দক্ষিণ দিকে উত্তরমুখী একটি দোকানে এসে তা খাই। আজ সন্ধ্যার আগখান দিয়ে প্রায় খালি দোকানের পেছনের একটি সিটে রাস্তার দিকে মুখ করে বসে রসকদম খাচ্ছি। আমার খাওয়া প্রায় শেষ। উঠব। এমন সময় সেই পরীক্ষার্থী ছেলেটি এসে দোকানের দরজায় দাঁড়াল। পরে একটু ইতস্তত করে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। সে বলল, ‘স্যার, বসতে পারি?’ আমি বললাম, ‘বসো।’
সে বসলে পরে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এবার পরীক্ষা দিলে না কেন? সে বলল, ‘ভালো প্রিপারেশন নেই। ভালো করে পড়ে আগামীবার পরীক্ষা দেব।’ এরপর বলল, ‘স্যার, আপনাকে প্রায়ই দেখি এখানে মিষ্টি খান। আপনি মিষ্টি পছন্দ করেন?’ আমি হেসে বললাম, মিষ্টি আমি কমই খাই। তবে তোমাদের এখানের রসকদমটা খেতে ভালো লাগে। তাই এটা খেতে মাঝে মাঝে এখানে আসি। সে বলল, ‘স্যার, আর দুটা খান। আমি খাওয়াব।’ আমি বললাম, দুটা খেয়েছি। আর না। তোমাকে ধন্যবাদ। বলে আমি উঠলাম। সেও আমার সাথে বেরিয়ে ভিন্ন পথে চলে গেল। তাকে আমি আর কোনো দিন দেখিনি। অবশ্য পাবনা আমি অল্প কদিন ছিলাম। আমার মনে হলো পরীক্ষার হলে আমি তার দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছি। যে কারণে তাকে অনুতপ্ত মনে হলো। শুনেছি বলতে জানলে কথায় নাকি পাথরও গলে। বার্ট্রান্ড রাসেলের অন এডিউকেশন গ্রন্থের প্রকাশকের মতে রাসেল মনে করতেন, ‘নলেজ উয়িল্ডেড বাই লাভ ক্যান ট্রান্সফরম দ্য ওয়ার্ল্ড’। আমার বিশ্বাস, ভালোবেসে পৃথিবী জয় করা যায়।
১৯৮০-এর দশকের ঘটনা। ঢাকা থেকে আমি টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজে। চারদিকে নকলের ধুম। আমি আজকাল খুব কমই বোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ডিউটি করি। তবে পরীক্ষা কমিটি সম্পূর্ণ রেহাই দেয় না। দু-একটা করতেই হয়। একদিন বোর্ডের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় দোতলার একটি কক্ষে দায়িত্ব পালন করছি। কাউকে নকল করতে দিচ্ছি না। ঘণ্টা দুয়েকের মাথায় কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি এসে আমার রুমে দাঁড়াল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইল। এ সময় সামনের বেঞ্চের একটি ছেলের খাতার নিচে একটি ইনক্রিমিনেটিং পেপার দেখলাম। আমি এগিয়ে গিয়ে তার অবৈধ কাগজটি নিয়ে এলাম। ভিপি বিরক্তির সঙ্গে বলল, ‘সে কি আপনেরে দেখাইয়া নকল করছে?’ আমি বললাম, না দেখলে ধরলাম কী করে? সে রেগে হল থেকে বেরিয়ে গেল। অল্প পরে কলেজের উপাধ্যক্ষ এসে আমকে বললেন, ‘একটা সুন্দর মতো ছেলে আমাকে বলেছে আপনাকে সে মারবে।’ আমি তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম কিন্তু দমলাম না। কাউকে নকল করতে দিচ্ছি না। একটু পর অধ্যক্ষের বেয়ারার এসে আমাকে বলল, ‘স্যারে আফনেরে অহনই দেহা করতে কইছে।’
আমার পরবর্তী সিনিয়র শিক্ষকের ওপর হলের দায়িত্ব দিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষে যাচ্ছি। অধ্যক্ষের কক্ষের সামনের বরান্দায দেখলাম গৌর বর্ণের এক সুদর্শন ছেলে আমাকে দেখে নিজ মাথার লম্বা চুলে দুহাতের আঙুল ঢুকিয়ে পেছন দিকে আঁচড়াচ্ছে। অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করলে তিনি আমাকে বসতে বললেন। তিনি গল্প জুড়ে দিলেন। কোথায় কোথায় নকল ধরতে গিয়ে কী কী প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। এক নকলবাজ ছেলে তাঁকে বাসেও অনুসরণ করেছে। এ-জাতীয় তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা। বুঝলাম তিনি আমাকে পরীক্ষার হল থেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছেন। বাকি সময়টা আমার সঙ্গে গল্প করে কাটাতে চান। আমি যাতে পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে আর হলে যেতে না পারি। দু-একবার উঠতে চাইলাম। তিনি বলেন, ‘বসেন।’
বোঝা গেল আমাকে নিয়ে তিনি বড় দুশ্চিন্তায় আছেন। এডওয়ার্ড কলেজের দীনেশ চন্দ্র ম-লকে যখন নকলবাজ ছাত্র মাথা ফাটিয়ে দেয়, তখন তিনি সে কলেজের উপাধ্যক্ষ ছিলেন। পরীক্ষা শেষের পাঁচ মিনেটের ঘণ্টা পড়লে আমি বললাম, স্যার, খাতা তুলতে হবে। এবার যাই। তিনি বললেন, ‘যান।’ ফিরে দেখলাম সহকর্মীরা কক্ষের সামনের দরজায় বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। যাঁর ওপর হলের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম, তিনি বললেন, ‘আমরা তো চিন্তায় পড়ে গেছি। খালেদ সাহেব আসে না কেন?’ আমি বললাম, স্যার গল্প জুড়ে দিলেন। আসি কী করে? ছাড়লেন না। কাজ যা করার পরীক্ষার্থীরা এতক্ষণে তা করে নিয়েছে। যে কাজ সবাই মিলে যৌথভাবে না করলে হয় না, তা কখনো একা করা যায় না।
এক সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল শহরের আকুরটাকুরপাড়ার আমার বাসার পশ্চিমে বড় রাস্তার দোকানে ডিম কিনতে এলাম। কলেজ ছাত্র সংসদের সদ্য নির্বাচিত ভিপি মোটরসাইকেল চালিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে মোটরসাইকেল থামিয়ে সিটে বসেই বলল, ‘স্যার, আপনে আমার একটা বছর নষ্ট করছেন।’ আমি বললাম, কী রকম! সে বলল, ‘এইচএসসি পরীক্ষার সময় আমার হলে একদিন আপনের ডিউটি পড়ছিল। সেই দিনের বিষয়ে আমি ফেল করছি। আর বাকিগুলোতে আমি পাস করছিলাম।’ সে এখন এমএ ক্লাসে পড়ে। আমি বললাম, পরে পাস করলা কেমনে? তোমার হলে আমার আর ডিউটি পড়ে নাই? সে বলল, ‘পড়েছে। তবে পরেরবার পড়ালেখা শিখ্যা পরীক্ষা দিছি।’ আমি বললাম, এতে তোমার লাভ হলো না ক্ষতি  হলো? সে বলল, ‘স্যার, আমার একটা বছর ক্ষতি অইল।’ আমি বললাম, এখন তো সন্ধ্যা। রাস্তায় লোকজন নাই। আমারে মারো। আমার কথার পিঠে কোনো কথা না বলে সে মোটরসাইকেলটি চালিয়ে চলে গেল। ভাবলাম, ভালো সে আদু ভাই হয়নি।
আজকাল পরীক্ষাকক্ষে নকলের কাজটা সরকারই পরীক্ষকদের লিবারেলি খাতা দেখার নির্দেশ দিয়ে সম্পন্ন করে দিচ্ছে। এতে শিক্ষার মান কমছে এবং তা উপেক্ষিতও হচ্ছে। এতে পরীক্ষার্থীরা চিন্তিত নয় বরং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার  করে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আরও সুবিধা হাসিল করতে চায়। এ রোধে সরকার যা করছে, তা দেখে রবি ঠাকুরের ‘জুতা-আবিষ্কার’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। সহজ উপায় হলো, কোচিং সেন্টারসহ শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করে দেওয়া। সরকার সে পথে হাঁটছে না। ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। তাতে সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কাডার

আরো খবর

Disconnect