ফনেটিক ইউনিজয়
‘ইতিহাসে আছে কত চতুর দালান’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থকে বেরিয়ে ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস (পিআইডিই) করাচিতে স্টাফ ইকোনমিস্ট হিসেবে আমার জীবনের প্রথম চাকরিতে যোগ দিই। ১৯৬৯-এর পূর্ব পাকিস্তানে গণআন্দোলনের অনুকূলে ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমার কিছু অনানুষ্ঠানিক বিরূপ মন্তব্যের কারণে সেখান থেকে চাকরিচ্যুত হয়ে ১৯৭০ সালের ২৩ অক্টোবর রিক্ত হাতে ঢাকায় ফিরে আসি। তখন আমার বেকার জীবন। মনে হলো, সময়টা বৃথা ব্যয় না করে একটি বই লিখি। আমার ধারণা, ইতিহাসে মুসলমানদের বিজয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়গুলো পরীক্ষা করে দেখলে এ কথা প্রমাণ করা যাবে যে, সে সময়ে মুসলমানদের অটুট ঈমানের সঙ্গে সেকালে এঁদের বিশ্বের উন্নত মানের সমরাস্ত্র ও সমর কৌশলও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। সে সময় ঢাকা প্রেস ক্লাবের সামনের দিকে রাস্তার উত্তর পাশে ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসের দোতলায় ছোট আকারের একটি সমৃদ্ধ সরকারি লাইব্রেরি ছিল। আমি এ লাইব্রেরিতে নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করি। বইটি ইংরেজিতে লেখার ইচ্ছে- নাম ‘The Call’. লাইব্রেরিতে বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ ও প্রাসঙ্গিক বইপত্র থেকে নোট করে বাসায় এসে বিস্তৃত করি। কাজ বেশ এগোচ্ছে।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন ও ১৭ ডিসেম্বরের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ পাল্টে দিল। আমি আরও কিছুদিন আমার কাজ চালিয়ে গেলাম। এরপর এ কাজ পরে করব ভেবে দেশের চলমান রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রতি মনোযোগ দেয়ায় মনস্থ করি। আমি রাজনৈতিক ভাবাদর্শে কোনােদিনই তাড়িত হইনি। দেশের নাগরিক হিসেবে বর্তমান জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাবলি উপেক্ষা করা যায় না। আমার আরদ্ধ কাজ আমি পরেও করতে পারব (বইটি শেষ পর্যন্ত লেখা হয়নি। আগস্ট ১৯৭১-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএসআরটির একটি প্রজেক্টে যোগদান করি, যা স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়)। এখন নিয়মিত পত্রিকা পড়া ও প্রায় প্রত্যেক রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে জাতীয় নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি ও মতামত শোনা একটি কাজে পরিণত করলাম। প্রত্যেকের বক্তব্য শোনা আমি জরুরি মনে করি। তবে এটা সত্য যে, কোনো রাজনৈতিক দলমতের সঙ্গে আমার কোনোরূপ সংযুক্তি না থাকলেও পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি বিশ্বাস আমি করাচি থাকতেই হারিয়েছি। পিআইডিইর ফোর্ড ফাউন্ডেশনের দু-দুবার পিএইচডি স্কলারশিপ বাতিল ও আমার চাকরিচ্যুতির কারণ; পিআইডিই কর্তৃপক্ষ আমাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে সন্দেহ করেছিল।
এ সময়টায় আমাদের পরীবাগের বাসায় থাকি। বিকালের দিকে বাসার কাছেই ইস্কাটন অফিসার্স কোয়ার্টারে জিন্নাহ কলেজের (বর্তমান তিতুমীর কলেজ) ইতিহাসের প্রভাষক এবং একই ব্যাচের এসএম হলের হলমেট একেএম আজিজুল হকের কক্ষে গিয়ে গল্প করে সময় কাটাই বা দুজনে বেড়াতে বের হই। তার সিএসপি ভাই একেএম শামসুল হকের (যিনি পরে কুমিল্লার ডিসি অবস্থায় পাক বাহিনীর হাতে নিহত হন এবং কুমিল্লার ডিসি অফিস চত্বরে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি টাঙ্গাইলের লোক) সরকারি বাসা এটা। ইডেন বিল্ডিংসে (বর্তমান সচিবালয়) তার ভাইয়ের পোস্টিং। আজিজ তার ভাইয়ের স্বাক্ষর হুবহু নকল করতে পারত। তার একটা অভ্যাস ছিল যে, সে নানাজনকে তার ভাইয়ের স্বাক্ষর জাল করে ইডেন বিল্ডিংসে প্রবেশের পাস বানিয়ে দিত। আমি এটা পছন্দ করতাম না। তাকে কতদিন বলেছি, ‘এ কাজ করিস না। তোর ভাই বিপদে পড়তে পারেন। তোর এবং যাকে দিস, তারও বিপদ হতে পারে।’ সে শুনত না। এ কারণে তার ভাই বিপদে পড়েছিলেন কিনা, তা আমি জানি না। তবে বহুদিন সে তার ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ গোপন রেখেছিল।
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আওয়ামী লীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কার্যকরী কমিটির সদস্যদের এক যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, খন্দকার মোস্তাক আহমেদ ও কামরুজ্জামান বক্তব্য রাখেন। সব শেষে বক্তৃতা দিতে ওঠেন শেখ সাহেব। আমি উপরে দোতলার ব্যালকনিতে বসে শুনছিলাম। খন্দকার মোস্তাক আহমেদের কণ্ঠস্বর শুনে আমি অবাক হলাম। লোকটি ছোটখাটো অথচ তাঁর কণ্ঠস্বর কেমন ভরাট ও পরিপুষ্ট। শেখ সাহেবের দীর্ঘ বক্তৃতাকালে কে একজন তাঁর সামনে থেকে ক্যামেরাম্যানদের সরাতে চাইলে শেখ সাহেব তাঁকে বললেন, ‘লেট দেম ডু দেয়ার ডিউটি।’ লোকটি সরে গেল। ক্যামেরাম্যানদের আর কেউ বাধা দিল না। ক্যামেরাম্যানরা কাজ সেরে এমনিতেই সরে গেল।
শেখ সাহেবের সেদিনের অনেক কথার মধ্যে একটি কথা মনে পড়ছে। বক্তৃতার একপর্যায়ে তিনি বললেন, ‘আমি যদি বলি উঠেন। উঠবেন। আর আমি যদি বলি বসেন। বসবেন।’ বক্তৃতা শেষে তিনি প্রশ্ন আহ্বান করলেন। পেছনের সারি থেকে একজন জানতে চাইলেন, ‘উত্তরবঙ্গকে প্রদেশ করা হবে কিনা?’ শেখ সাহেব জবাবে বললেন, ‘আপনে শুইয়া পড়েন। আপনে ঘুমাইয়া যান।’ সে ভদ্রলোক আর একটি কথাও বলেননি। শেখ সাহেব অতিশয় নম্রতার সঙ্গে শান্তভাবে সবার অনুমতি নিয়ে বক্তৃতা শেষ করলেন। সভা শেষে তরুণ সংগীতশিল্পী আবদুল জব্বার একটি গান পরিবেশন করেন- ‘পূর্ব দিগন্তে/ সূর্য উঠেছে।/ রক্ত লাল/ রক্ত লাল।’ এ সভায় শেখ সাহেবকে জনগণের আশা-আকাঙ্খা ও অধিকার আদায়ের জন্য যেকোনো পন্থা গ্রহণের পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়।
১ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চ ১৯৭১-এর অধিবেশন স্থগিত হয়ে গেল। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে শেখ সাহেব রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভা আহ্বান করেন। আমি সকালে আজিজের কক্ষে এলাম। বললাম, ‘চল যাই।’ সে বলল, ‘চল।’ রাস্তায় বেরিয়ে সে বলল, ‘কিছু শুনছস?’  আমি বলি, ‘কী?’  সে বলল, ‘আইজ নাকি জনসভায় প্লেন থেকে বোমা ফেলব।’ আমি বললাম, ‘ধুর। এটা কখনো হয়?’ সে বলল, ‘লোকে বলে।’ মনে হয়, সভায় যাতে লোক সমাগম কম হয়, সেজন্য হয়তো এ-জাতীয় প্রচারণা হয়ে থাকতেও পারে। দুজনে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার লাইব্রেরি (এখনো তাই) বরাবর মাঠের ভেতর পশ্চিম ধারে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালাম।
রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন। রমনা রেসকোর্স লোকে কানায় কানায় পূর্ণ। একটি কথা এখানে উল্লেখ করতে হয়- মাঠের মাঝে অল্প দূরে দূরে বাঁশের খুঁটিতে টিনের গোলাকৃতির চ্যাপ্টা অসংখ্য কৌটা বাঁধা ছিল। শেখ সাহেব তাঁর বক্তৃতার এক ফাঁকে বললেন, ‘আপনাদের সামনে টিনের বাক্স দেয়া আছে। এতে যে যা পারেন দেবেন। আপনাদের টাকায় পার্টি চলবে।‘ কথাটি এ কারণে উল্লেখ করলাম যে, করাচি থেকে আসার প্রাক্কালে পাঞ্জাবের লয়ালপুরের আমার এক সহকর্মী আনোয়ার চৌধুরী (বর্তমানে ড. আনোয়ার শাহ্) আমাকে বলেছিলেন, ‘ইন্ডিয়া উইল গিভ শেখ মুজিব টেন হেলিকপ্টার টু কভার হিজ ইলেকশন ক্যাম্পেইন।’ কথাটা সম্ভবত ঢাকায়ও চাউর হয়েছিল। কেউ বাক্সে টাকাকড়ি ফেলেছে কিনা জানি না। তবে সমবেত জনতার মুহুর্মুহু সেøাগান ও গর্জন সেদিনের রমনা রেসকোসের্র আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সভা শেষে জনগণ চলে গেলে মনে হলো, অগস্ত মুনি গর্জমান সমুদ্রের তরঙ্গায়িত পানিরাশি শুষে নিল। বুঝলাম, দেশ এক ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে।
৯ মার্চ ১৯৭১ সালে পল্টনের এক জনসভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের মধ্যে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার জন্য ইয়াহিয়া খানকে আহ্বান জানান। সেদিন তাঁর বক্তৃতা শুনে আমার ধারণা জন্মাল, মওলানা পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মর্যাদায় উন্নীত করতে চান, যেটা পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব। ছয় দফায়ও তা-ই ছিল। আমার এ ধারণা যে ভুল নয়, তা জানতে পারি ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগরে দেয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের শপথগ্রহণের পর দেয়া বিবৃতি পড়ে। দেশের নাগরিক হিসেবে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলকে স্বাধীন দেখার স্বপ্ন আমারও ছিল। তবে ভারতের হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে।
১৫ মার্চ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে রমনা পার্কের পূর্বে প্রেসিডেন্ট ভবনে উঠে পরদিন থেকে শেখ সাহেবের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। প্রায় প্রতিদিনই রমনা পার্কের পূর্বের দেয়ালের ভেতর থেকে প্রেসিডেন্ট হাউজের গেট বরাবর দাঁড়িয়ে গেটের দিকে তাকিয়ে থাকি। প্রেসিডেন্ট হাউজের সামনে প্রতিদিনই প্রেসম্যানদের জটলা। আলোচনা শেষে বেরোলে শেখ সাহেবকে তাঁরা জেঁকে ধরেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরা গেটের ওপর দুই ধার থেকে সামনে রাস্তার দিকে মেশিনগান তাক করে আছে। একদিন এমন হলো যে, গেটের দক্ষিণ পাশের মেশিনগানটি সোজা আমার দিকে তাক করা দেখলাম। চকিত হলাম। আমি দাঁড়িয়েই রইলাম। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর মেশিনগানটির নল অন্যদিকে ঘোরানো হলো। এখানে একদিন আমার পেছনে পিঠে হাত রেখে সাদা পাজামা-পাঞ্জবি পরা ঢাকা কলেজের ব্যাচম্যাট রাজু (পুরো নাম মনে নেই) আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ১৯৬৩ সালে ঢাকা কলেজে আমাদের এইচএসসি দ্বিতীয় পর্বের টেস্ট পরীক্ষায় বাধা দেয়ার অভিযোগে অধ্যক্ষ জালাল আহমেদ (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সাহেবের শ্বশুর) তাকে আজীবন রাসটিকেট করেছিলেন। সে বলল, ‘আমি এখন এমএনএ।’ এরপর আর কোনোদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি।   
এক রোদেলা দুপুরে আলোচনা শেষে শেখ সাহেব বাড়ি ফিরছেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশের জনবিরল ফুটপাতে আমি দাঁড়ানো; পাশে কে একজন শেখ সাহেবের সাদা রঙের গাড়িটি সামনে দেখামাত্র বলল, ‘জয় বাংলা।’ শেখ সাহেবও চলন্ত গাড়ির ভেতর থেকে উচ্চারণ করলেন, ‘জয় বাংলা।’ আমি পাশের লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখি বাংলার এক অতি সাধারণ লোক। আসলেও ‘জয় বাংলা’ সেøাগান তখন অতি জনপ্রিয় স্লোগানে পরিণত হয়েছিল। এ সময় ঢাকার লোকসংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার জন্য গ্রামের অনেক লোকও ঢাকায় চলে এসেছে। আলোচনা ও অসহযোগ আন্দোলন যুগপৎ চলছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে সাকুরার পশ্চিম দিকে ডেইলি পিপলস অফিস। পত্রিকাটি প্রতিদিনই জাতির প্রতি শেখ সাহেবের নির্দেশাবলি ছাপছে।
এ আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। আলোচনার পরিসমাপ্তি এমনভাবে ঘটল যে, ইংরেজ কবি টিএস এলিয়টের ভায়ায় বলা যায়, ‘ইতিহাসে আছে কত চতুর দালান, কত সুড়ঙ্গ নিপুণ/ কত নিষ্কাশন; ইতিহাস প্রবঞ্চক উচ্চাশার চক্রান্ত গুঞ্জনে,/ দম্ভের ছলায় করে নিয়ন্ত্রণ আমাদের’ (জরায়ণ, বিষ্ণু দে অনূদিত)। রমনার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদটিতেও তা-ই ঘটল। পরবর্তীতে সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি মুসলমান এ ‘চক্রান্ত’র সশস্ত্র জবাব দিল। যথেষ্ট পোড় খাওয়া বাঙালি বুঝল এ কবিতারই কথায়- ‘এ প্রজ্ঞার পরে কিবা ক্ষমা?’ তাই ঢাকায় বাঙালি মুসলমানের নবজন্মের সূচনা হলো। ঢাকায় বাঙালি মুসলমানের নতুন ইতিহাসের বীজ বপিত হলো, যা পত্রপল্লবে বিকশিত হয়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার

আরো খবর

Disconnect