ফনেটিক ইউনিজয়
পহেলা বৈশাখের হিসাব-নিকাশ

এবারের বৈশাখ চুপিসারে আসেনি। এসেছে মধ্যচৈত্রের রুদ্ররূপ নিয়ে রংপুর, দিনাজপুর ও যশোরে বজ্রাঘাতে ছয়জনকে নিহত করার পাশাপাশি সারা দেশে ২৫০ জনেরও অধিক লোককে শিলাবৃষ্টির আঘাতে আহত করে। সাতজনকে নিহত করার পাশাপাশি কালবৈশাখীর ভারি ঝড়ো বৃষ্টিতে দিনাজপুর, জামালপুর নিলফামারী, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ দেশের অন্যান্য জেলায় কাঁচা ঘরবাড়ি ও বৃক্ষ-লতাদির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। অনেক জেলায় বৈদ্যুতিক খাম্বা ও ট্রান্সফরমারের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চৈত্রের গরমে জনগণকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রেখে ভুগিয়েছে। আমের গুঁটি ও লিচুর গুঁটি অকালে ঝরিয়ে বাগানের মালিকদের অপূরণীয় ক্ষতি ছাড়াও ভারি বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষেতের ফসল মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে অনেক জেলায়। এসব উপেক্ষা করেই মানুষ গ্রামীণ মেলা, নদী-বিলে নৌকা বাইচ, শহুরে মেলা ও বিচিত্র পথশোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে ১৪২৫ সালের নববর্ষের প্রথম দিনটি উদ্যাপন করবে।    
কালবৈশাখীর এ তাণ্ডবলীলা সত্ত্বেও মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে একে অন্যের কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও শুভেচ্ছা কামনা করে নব আশায় উজ্জীবিত হয়ে নানা উৎসব-আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষকে ঐতিহ্যগতভাবে স্বাগত জানায়, ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ। ...বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’ (রবি ঠাকুর)। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের জন্য সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট হারে ভাতা পান। সামর্থ্যানুযায়ী প্রত্যেকে ঘরে ঘরে উন্নত মানের খাবারের আয়োজন করে, নতুন জামাকাপড় পরে। বৈশাখের প্রথম দিনটি আনন্দ উৎসব ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের ভেতর দিয়ে কেটে যায়। ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে দেখা যায়, স্মরণাতীতকাল থেকে এ কৃষিপ্রধান বাংলায় কৃষক, ব্যবসায়ী ও জমিদাররা যথাযথ উৎসব-আনন্দের মধ্য দিয়েই পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে বকেয়া পাওনা আদায়ের মধ্য দিয়ে পুরনো হিসাবের খাতা ছুড়ে ফেলে হালখাতা খুলেছেন। আবহমান বাংলায় এ এক মহাখুশি ও উপভোগের দিন।
১৫৫৬ সালে মোগল সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা হয়। তবে পণ্ডিতদের মধ্যে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে নানা মতভেদ আছে। এ উপমহাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পূজা উৎসব ও চান্দ্রমাসের মধ্যে নানাবিধ সামঞ্জস্য আছে। অন্যদিকে নানা কারণে সৌরমাসকে এ অঞ্চলের লোকদের মৌসুমভিত্তিক কৃষিকাজের জন্য উপযোগী বিবেচনা করা হয়। সার্বিক সুবিধা বিবেচনায় এসব মতভেদ দূর করার জন্য প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা ১৯৫২ সালে সমগ্র ভারতবর্ষের উপযোগী করে বাংলা পঞ্জিকার সংস্কার প্রস্তাব করেন। ১৯৬৩ সালে পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তার নামানুসারে ‘শহীদুল্লাহ্ কমিটি’ নামের একটি কমিটির নেতৃত্ব দেন এবং চান্দ্রমাসের পরিবর্তে সৌরমাসের ভিত্তিতে ড. মেঘনাদ সাহার বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের মতামতকে মান্য করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা পঞ্জিকার সংস্কার প্রস্তাব দেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার ‘শহীদুল্লাহ্ কমিটি’র প্রস্তাবকে গ্রহণ করে এবং বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে। অবশেষে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে ‘শহীদুল্লাহ্ কমিটি’র প্রস্তাব মোতাবেক বাংলা পঞ্জিকা পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ দেয়া হয়। এর পরও কতিপয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু জটিলতা ও অস্পষ্টতা এবং ‘লিপ ইয়ার’সংক্রান্ত বিষয়ে সমস্যা রয়ে যায়।        
ফলে ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমির ‘বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি’, ঢাকা, গ্রেগরীয় পঞ্জিকার ১৪ এপ্রিলকে ‘শহীদুল্লাহ্ কমিটির’ প্রস্তাবের সাথে মিল রেখে পহেলা বৈশাখের প্রথম দিন নির্ধারণ করে। নতুন পঞ্জিকায় বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বাংলা মাসের সাথে গ্রামীণ জনগণের সংশ্লেষ ও মৌসুমি পরিবর্তনগুলো বিবেচনায় নেয়া হয়। এভাবে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৫ সালের মধ্যরাত থেকে বাংলা তারিখের হিসাব গণনা করে বাংলা পঞ্জিকাকে সর্বজনীন রূপ দিয়েছে। তথাপি বিজ্ঞানসম্মত এ বাংলা পঞ্জিকা বাংলাদেশের অমুসলিম তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য করা যায়নি।        
বর্তমান অফিশিয়াল বাংলা বর্ষ পঞ্জিকাকে সবাই বিজ্ঞানসম্মত বলে গ্রহণ করেছে। ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মতানুসারে সম্রাট আকবর খ্রিস্টীয় ১৫৫৬ ও হিজরি ৯৬৩ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এ হিজরি  ৯৬৩ সালকে বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার প্রথম বছর হিসেবে গ্রহণ করা হয়। গ্রেগরীয় পঞ্জিকানুসারে বর্তমানে ২০১৮ সাল চলছে। আমরা ২০১৮ সাল থেকে সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের ১৫৫৬ সাল বিয়োগ করলে পাই ৪৬২ বছর। এবার সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের গ্রেগরীয় ১৫৫৬ সালের সময়ের হিজরি ৯৬৩ সালের সাথে ৪৫২ বছর যোগ করলে সহজেই (৯৬৩+৪৬২) ১৪২৫ সাল পাওয়া যায়। গাণিতিক নিয়মে ব্যাপারটি দাঁড়ায় {(২০১৮-১৫৫৬) = ৪৬২ বছর + ৯৬৩ হিজরি বছর = ১৪২৫ বাংলা সাল}। এ পদ্ধতিতে প্রতিটি বাংলা সনের হিসাব করা যায়। উল্লেখ্য, গ্রেগরীয় সালের সাথে বাংলা সালের ব্যবধান ৫৯৩ বছর ৩ মাস ১৩ দিন। সে যা-ই হোক, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রথমবারের মতো ১৯৫৪ সালের ১৪ এপ্রিলকে বৈশাখের প্রথম দিন ধরে দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেটি ছিল বাংলা ১৩৬১ সন। সে ধারা বাংলাদেশে অদ্যাবধি চালু আছে।  
ভারতের পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা তাদের হিসাবে পহেলা বৈশাখ যদি ১৪ এপ্রিলে না পড়ে, তবে তারা ১৫ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ পালন করে। ফলে যদিও বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার লোকদের মাতৃভাষা অভিন্ন, তবু তারা পৃথক দিবসে নিজেদের একই নববর্ষ এবং অন্যান্য প্রাত্যহিক ও মৌসুমি অনুষ্ঠানগুলো উদ্যাপন করে। সে কারণে বিজ্ঞানের এ আধুনিক যুগেও অতীব শুদ্ধ বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা ও পহেলা বৈশাখের দিনটি অদ্যাবধি সর্বজনীন স্বীকৃতি পায়নি। যেহেতু ড. মেঘনাদ সাহার বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব অনুসারেই বর্তমান বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা সংস্কার করা হয়েছে, তাই এ ব্যত্যয়ের জন্য পশ্চিম বাংলার প-িতদেরই দায়ী করা যায়। পরবর্তীতে ড. মেঘনাদ সাহার কতিপয় প্রস্তাব কিছুটা পরিবর্তন করে ড. এসপি পাণ্ডে কমিটিকৃত সুপারিশ অনুযায়ী গ্রেগরীয় পঞ্জিকার ১৪ এপ্রিলকে ভারত সরকার বৈশাখের প্রথম দিন হিসেবে নির্ধারিত করে। এতৎসত্ত্বেও পশ্চিম বাংলায় গ্রেগরীয় পঞ্জিকার ১৪ এপ্রিলের বিজ্ঞানভিত্তিক তারিখটি সবসময়ের জন্য এখনও বৈশাখের প্রথম দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। এ ব্যাপারটি পশ্চিম বাংলার সরকার ও পণ্ডিতদের মতের অমিল বলেই প্রতিভাত হয়। এছাড়া পশ্চিম বাংলায় পঞ্জিকা মুদ্রণের একটি বিশাল ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট আত্মপ্রকাশ করেছে। এ শিল্পে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থলগ্নি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। এরা এতটাই প্রভাবশালী যে, পশ্চিম বাংলা সরকারও এদের সাথে এঁটে উঠতে পারে না। অধিকন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কতিপয় সদস্য তাদের দৈনন্দিন ও মৌসুমি আচার-অনুষ্ঠানের সাথে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের দিনটিও পশ্চিম বাংলায় মুদ্রিত পঞ্জিকা অনুসারে পালন করে। এ প্রবণতা বাংলাদেশের জাতীয় সংহতির অন্তরায় এবং এ অভ্যাস পরিহার জরুরি।     
নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার সাধারণ জাতীয় ঐতিহ্যকে স্মরণ করে। এ লক্ষ্যে সবাই মিলেমিশে গ্রেগরীয় পঞ্জিকার ১৪ এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনই বিধেয়। যেহেতু বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি ও বাংলা আমাদের মতৃভাষা, সে কারণে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির দিকে নজর রেখে আমাদের সবারই একসাথে গ্রেগরীয় পঞ্জিকার ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করা উচিত। এর ব্যত্যয় হওয়া এবং এতে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ সমীচীন ও শোভন নয়। বাংলাদেশে ও পৃথিবীর সর্বত্র বসবাসরত প্রত্যেক বাঙালির জন্য রইল নববর্ষের শুভকামনা।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সমাধারণ শিক্ষা ক্যাডার

আরো খবর

Disconnect