ফনেটিক ইউনিজয়
যানজট আর জলজটে নাকাল নগরবাসী

ঢাকার গোড়াপত্তন নিয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো সঠিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও মীর জুমলার শাসনকালে শহর কোতোয়াল মীর মুকিমের উদ্যোগে ১৬৬২ সালে চকবাজারের মুকিম কাটারা তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে জানা যায়। কালের সাক্ষী হয়ে মুকিম কাটারা আজও পুরাতন নগরীর ঐতিহ্য বহন করছে। মোগল       শাসনামলে ঢাকার আদি নবাব বা নায়েবে নিজামরা নিমতলীতেই বসবাস করতেন এবং মূলত তারা শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। সফদার জং বাহাদুরকে ঢাকার আদি নবাবি প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইতিহাসে পাওয়া যায়। ১৬০০ শতকে ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন হয় বলে গবেষকদের দাবি এবং সেই মোতাবেক ঢাকার বয়স ৫০০ বছরেরও অধিক। অপরিকল্পিত নগর হিসেবে ঘোড়ার গাড়ি আর পরে রিকশা চলাচল উপযোগী সড়কের ব্যবস্থা থাকায় অপ্রশস্ত সড়ক নিয়ে ১৯ শতক পর্যন্ত পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক ঢাকা শহর নগর হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। আর ব্রিটিশ শাসনামলে ইরানি বংশোদ্ভূত আহসান মঞ্জিলখ্যাত খাজা পরিবার উপহার হিসেবে ঢাকার নবাবি লাভ করার পর এখানে বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ হলেও সড়ক প্রশস্ত করার প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেনি। ফলে কেঁচো আর সাপের মতো অলিগলি সড়ক নিয়েই ঢাকা বর্ধিষ্ণু হতে থাকে এবং কালের বিবর্তনে প্রাদেশিক রাজধানী হতে স্বাধীন দেশের রাজধানীতে পরিণত হয়। বেড়েছে মানুষ আর নগরীর পরিধি। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতির এ নগরীতে লোকসংখ্যা কমবেশি দেড় কোটি। তবে আদমশুমারী হলে জনসংখ্যা বাড়বে বৈ কমবে না। আদর্শ নগরের অনুপাতে রাজধানী ঢাকায় প্রয়োজনীয় সড়কের ব্যবস্থা ন্যূনতম ১৭ শতাংশের স্থলে রয়েছে মাত্র ৬-৮ শতাংশ, যা প্রচুরসংখ্যক যানবাহন ধারণক্ষমতার অতি সামান্যই। মানুষের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিল্পের প্রসারে এবং মানুষের প্রয়োজনে গণপরিবহনসহ ব্যক্তিগত পরিবহনের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু নগরীর সড়কের সংখ্যা তো বাড়েইনি, বরং ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো আর অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। পৃথিবীর বড় কোনো নগরীতে ধীরগতিসহ তিন-চার ধরনের বাহন প্রধান সড়কে চলাচল করে না বলেই ঢাকার সড়কের চেহারাটা ভিন্ন প্রকৃতির। বিভিন্ন গতির রিকশা, সিএনজি, বাইক, ভ্যান, পিক-আপসহ মিনি বাস একসাথে সড়কে চলাচল করে, যেখানে উন্নত নগরগুলোয় মিনিবাস নিষিদ্ধ। উপরন্তু যেখানে সেখানে বাস দাঁড়ানো, সড়ক মোড়েই বাসস্টপ, স্বয়ংক্রিয় আর আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা ব্যবহার না করা, ট্রাফিককর্মীদের অমনোযোগিতা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে না চলার মানসিকতা, সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি না করা ও ডাইভার্শন (একমুখী চলাচল) ব্যবস্থা গ্রহণ না করে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরিবর্তে ব্যয়বহুল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রতি আগ্রহের কারণে যানজট বেড়েই চলেছে। চলছে অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণ, যা পরবর্তীতে হয়তো ভেঙেও ফেলতে হতে পারে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শহরজুড়ে তিনতলা ফ্লাইওভারে উপরের তলায় মেট্রো ট্রেন চলায় শহরটিতে যানজট সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা আমাদের নগরীতে অত্যন্ত জরুরি। ডাইভার্শন বা একমুখী সড়কের ব্যবস্থাও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। বিমানবন্দর ও মিরপুর হতে গুলিস্তান বা মতিঝিলমুখী যানবাহনগুলোকে আসা-যাওয়ার জন্য দুটি পৃথক সড়কের ব্যবহার অনায়াসে করার মতো সড়ক রয়েছে। বিশেষ কিছু বাণিজ্যিক এলাকায় প্রবেশ ও নির্গমনের জন্য সময় সময় ডাইভার্শন ব্যবস্থাও কার্যকর হতে পারে। আগরতলার বাংলাদেশ মিশনে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে বাইক নগরী এ শহরের সড়কে ডাইভার্শন ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেছি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা থাকলে অনিয়মগুলোকে নিয়মের মধ্যে এনে যানজটের অসহনীয় কষ্ট থেকে নগরবাসীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেয়া যেতে পারে।
যানজটের সাথেই জলজটে নাকাল ঢাকার নাগরিক জীবন। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জল জমে পথচারীসহ যানবাহনগুলোকে অবর্ণনীয় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যা গত দু-তিন বছরে ভয়াবহ হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন স্ব-উদ্যোগে নালা-নর্দমা সংস্কারকাজে হাত দিলেও কাক্সিক্ষত ফল এখনও পাওয়া যায়নি। জলাবদ্ধতা নিষ্কাশনে সিটি করপোরেশন সাধারণভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত বলেই ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা অন্য। জল নিষ্কাশনে পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় নর্দমা না থাকায় সিটি করপোরেশন দায় এড়াতে পারে না বটে, কিন্তু জল নিষ্কাশনের মাধ্যমগুলো ওয়াসা, জেলা পরিষদ ও রাজউকের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে, যার অধিকাংশই বেহাত হয়ে গেছে। অধিকন্তু ইউনিয়ন হতে সদ্য সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত ডিএনডি বাঁধের অভ্যন্তরের পাড়া-মহল্লাগুলো সুদীর্ঘ সময় ধরেই জলমগ্ন। কাগজ-কলম আর নকশায় ঢাকা নগরীতে ৪৩টি খালের অস্তিত্ব থাকলেও ২৬টি মাত্র ঢাকা ওয়াসার নিয়ন্ত্রণে, যার অধিকাংশই দখলদারদের জন্য খাল হতে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। তাছাড়া সরকারিভাবেও কিছু খাল ভরাট করে সড়ক বা স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৬০ সালে আইয়ূব খানের শাসনামলে সবচেয়ে পুরনো ও দীর্ঘ ধোলাই খালে স্টর্ম সুয়ারেজ বানিয়ে পানি নিষ্কাশনের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়। এখন এর ওপর দিয়েই নির্মিত হয়েছে সড়ক, যে খালে পুরান ঢাকার মানুষ নৌকা বাইচেরও আনন্দ উপভোগ করত। হাতিরঝিলের সাথে ধানমন্ডি লেকের সংযোগে বসুন্ধরা সিটি সুপার মলের সামনে পান্থপথ নির্মিত হয়েছে। সরকারি হাউজিং, রাজউকের প্লট আর আবাসন ব্যবসায়ীরা স্থানীয়দের সহায়তায় ঢাকার প্রায় সব জলাধার এরই মধ্যে দখল করে নিয়েছে। বৃষ্টির জল ওইসব জলাধারে তথা রিটেনশন সেন্টারে জমা হয়ে খালের মাধ্যমেই নদীতে গিয়ে পড়ার পথ রুদ্ধ হওয়ায় নগরীর নর্দমার পানি সরতে না পেরেই সৃষ্টি হচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত জলাবদ্ধতা। অধিকন্তু নগরীর নর্দমার আকার-প্রকৃতি দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিকল্পিত ছিল না বিধায় পুনরায় ড্রেন তৈরির কাজ চলছে। ঢাকায় ২৪৮ জন ভূমিদস্যু কর্তৃক অবৈধভাবে জলাধার ও খাল দখল করা হয়েছে বলে জনশ্রুতিও রয়েছে। বিশেষ করে মিরপুর, বেরাইদ-নন্দীপাড়া আর মহাখালীতে দখলকৃত খালের সংখ্যাই অধিক। পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, সল্ট লেক সিটি ও বিমানবন্দরের সন্নিকটে নিউ টাউনেও অতিবর্ষণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কিন্তু পৌরসভার মোবাইল পাম্পিং ভ্যান ওই স্থানে পৌঁছে ডিজেলচালিত পাম্প মোটর দিয়ে পাইপে পানি টেনে নিকটস্থ জলাধারে ফেলে ২-১ ঘণ্টার মধ্যেই জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ওয়াসার ম্যানহোল খুলে দিয়ে জল বের করার চেষ্টা করে এবং আবর্জনা ও পলিথিনের কারণে ওয়াসার স্যুয়ারেজও বন্ধ থাকায় পানি সরাতে পারে না। অধিকন্তু জলাধার না থাকায় নগরীর জমে থাকা জলও নিমিষে বের করা যায় না। মিরপুরের কালশি আর ডেমরার মুক্ত জলাশয়গুলো আবাসন এলাকায় পরিণত হওয়ায় নগরীর রিটেনশন সেন্টার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথচ গাছপালা জল শোষণ করে পাতার মাধ্যমে আকাশে ছেড়ে দেয় বিধায় নগরীর গাছপালার অভাবও জল শোষণ বন্ধের কারণ। এসব বহুমাত্রিক কারণে জলাবদ্ধতা দূর করতে সিটি করপোরেশন চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে মোবাইল পাম্পিং স্টেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলজট নিরসনের এ-যাবৎ কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। আর জলাবদ্ধতায় সড়কের অবস্থাও বেহাল হয়ে গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে বা দ্রুত সড়কের খানাখন্দক মেরামতের জন্য সড়ক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের জরুরি টিম থাকলেও কথিত কমিশন বাণিজ্যের জন্য দ্রুত মেরামত না করে কালক্ষেপণ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে আশার কথা হলো,  হাইকোর্টের নির্দেশে দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধারে এরই মধ্যে উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে।
যানজটে প্রতিটি নগরবাসীর দৈনিক ৩-৪ কর্মঘণ্টা ব্যয় হয়, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে জলজট আর যানজট নিরসনে সরকারের ব্যয়বহুল পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন। আমরা নগরবাসী আশাবাদী হয়ে কাক্সিক্ষত সব ধরনের জটমুক্ত সুন্দর দিনের প্রতীক্ষা করছি।

আরো খবর

Disconnect