ফনেটিক ইউনিজয়
জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী কয়লা ও আণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়

প্রথম পর্ব
সারা বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে CO2 উদগীরণের ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার জন্য দায়ী মূলত শিল্পোন্নত ও ধনী দেশসমূহ। ফলে আকাশে জলীয় বাষ্প বৃদ্ধির কারণে বৃষ্টি বাড়ছে, পাশাপাশি বৃদ্ধি পাচ্ছে আবহাওয়ার উষ্ণতাও। এ থেকে প্রতিকার পেতে CO2 কমানোর জন্য আমরা প্রচুর গাছ লাগাতে পারি, যা CO2 শুষে নিয়ে বায়ুম-লে অক্সিজেন ছাড়বে। কিন্তু শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে গাছও কমে যাচ্ছে। গাছের অভাবে পলিমাটি আলগা হচ্ছে, নদী-খাল-বিলে মাটি জমছে। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি নদীর বাঁকে বাঁকে মাটি জমা হওয়ার ফলে যখন পানি বেড়ে যায়, পাড়গুলো ভেঙে তার মাটি নদীর ভরাটকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাগুলো পৃথিবীকে প্রায় ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত পদ্ধতিতে কয়লা, তেল ও আণবিক কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো এর অন্যতম কয়েকটি অনুঘটক। সুতরাং আমাদের কয়লা কিংবা আণবিক কেন্দ্র দিয়ে নয়, বরং সম্ভাব্য অন্য বিকল্প পন্থা বা পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।

গণমানুষ ও বিদ্যুৎ  
কয়লা থেকে ২৭ শতাংশ ও আণবিক বিদ্যুৎ থেকে  ৫ শতাংশ অর্থাৎ বিশ্বের মোট বিদ্যুতের শতকরা ৩২-৩৩ ভাগই আসছে এ দুটো ভয়ানক বিষাক্ত জ্বালানি উৎস থেকে। এ অবস্থায় কয়লা আর আণবিক কেন্দ্র বন্ধ করা হলে বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে আর্থসামাজিক উন্নয়নের পথ স্তব্ধ হবে না কি? লেনিন সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পর পরই বলেছিলেন, ‘জ্বালানি হচ্ছে একটি দেশের চালিকাশক্তি। একটি রাষ্ট্রের শিল্পায়নের সূচক ওই রাষ্ট্রের বিদ্যুতায়নের পরিমাপ দিয়ে নির্ধারণ করা যায়। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জনগণের উন্নত জীবনযাপনের মান নির্ধারণ করার জন্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের সূচকই হলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিমাপক।’ সুতরাং এটা নিশ্চিত, জ্বালানি হচ্ছে একটি দেশের চালিকাশক্তি। একটি রাষ্ট্রের শুধু শিল্পায়ন নয়, সার্বিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক ওই রাষ্ট্রের বিদ্যুতায়নের পরিমাপ দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ যে সমাজ ও মানুষের জন্য উৎপাদন করব, তা করতে গিয়ে যদি মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যায়, মানুষের শারীরিক অক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে আয়ুষ্কাল হ্রাস পায়, পরিবেশ ধ্বংস হয়ে মনুষ্যজীবন হুমকির মধ্যে পড়ে, সে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তো মানুষের কাম্য হতে পারে না।
আমরা ইতিহাসের পর্দা উন্মোচন করলে দেখতে পাই, মানবসভ্যতার তথাকথিত ‘যান্ত্রিক’ সভ্যতার সূচনা হয় শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে। আর এ ‘যান্ত্রিক’ সভ্যতা কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমেই এক প্রচণ্ড গতি পায়। শিল্পোৎপাদন বাড়িয়ে আরও মুনাফা অর্জনই হলো পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদীদের চূড়ান্ত ও মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে এদের চাই সীমাহীন উৎপাদন। আর এ  সীমাহীন উৎপাদনে চাই বিদ্যুৎ, যার অন্যতম মৌলিক জ্বালানি হিসেবে প্রথমে কয়লা ব্যবহার হয়। কিন্তু কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর  সাথে সাথেই সারা বিশ্বে প্রচণ্ড বায়ূদূষণ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও আবহাওয়ার বিপর্যয় মানবজীবনের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবেও আবির্ভূত হলো। তার প্রতিক্রিয়া তো আমরা দেখছি নিয়তই। একদিকে মুনাফা, আরেক দিকে মানুষের জীবন। একটিকে রাখলে আরেকটিকে হারাতে হয়। সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে মুনাফাই কাম্য। তাই কয়লা, বিদ্যুৎ ও যন্ত্র হয়ে উঠল তাদের কাছে অনেক প্রিয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কয়লাভিত্তিক সভ্যতার দ্রুত বিবর্তনে মানুষের জীবন শুধু বিপন্নই হয়নি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া শুরু হয়েছে, মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমছে, আয়ু কমতে শুরু করেছে, সর্বোপরি পরিবেশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে পৃথিবীকে মনুষ্যবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। ফলে জীবন ও জীববৈচিত্র্য এক ভয়ানক হুমকির সম্মুখীন।

সব ধরনের বিদ্যুৎই কি আর্থিক উন্নয়নের  সূচক?
আর্থসামাজিক উন্নয়নে সামগ্রিক অর্থে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান। কাজেই বিশ্বব্যাপী আজ আর্থিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প বিপ্লবের পর পরই পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের যে ধারা বিস্তৃত হয়েছে, তাতে পুঁজিবাদী অর্র্থনীতি বিকাশের স্বার্থেই বিদ্যুৎ এক আবশ্যকীয় মৌলিক উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  
পুঁজিবাদী চরিত্রের অর্থনীতি বিকাশের এ গতিকে ঠিক রাখতে পুঁজিবাদী ও ধনীক রাষ্ট্রগুলো তাদের মুনাফাকে আরও স্ফীত করার লক্ষে আরও বিদ্যুৎ তৈরি করতে আগ্রাসী হয়ে উঠল। কিন্তু বিদ্যুতের জন্য চাই অনেক জ্বালানি। এর পর পরই সামনে এল খনিজ তেল।
এসব জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়ে অপরিকল্পিত  উপায়ে প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো অর্থনীতির চাকাকে এগিয়ে নিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু ধরিত্রী তার সৈান্দর্যমণ্ডিত সমস্ত গুণাবলি হারাতে শুরু করল। পৃথিবী হয়ে উঠল বিষময়। বিশ্বধরিত্রী শুধু মনুষ্যবসবাসের অনুপযোগী হয়েই উঠল না, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর অনৈতিক আর্থিক উন্নয়ন ও আগ্রাসী চরিত্রের কারণে রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে, মানুষে-মানুষে আয়বৈষম্য এক অসহনীয় পর্যায়ে উত্থিত হলো। মুনাফার চাকা সচল রাখতে চাই মিলিয়ন মিলিয়ন টন কয়লা, তেল। এসব জ্বালানি একে তো নবায়নযোগ্য নয়, পরিমাণও সীমিত এবং এলাকানির্ভর। জ্বালানির জন্য ভিনদেশের ওপর নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝখানে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে ভাগ বসাতে চাইল। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো তা হতে দেবে কেন? তার পুঁজির লুণ্ঠন তো অব্যাহত রাখতেই হবে। এ পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো আরও নিরাপদ আরও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষে জ্বালানির সন্ধানে হন্যে হয়ে উঠল, ফলে তারা হাতে পেল আরও ভয়ানক, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশনাশী নতুন জ্বালানি ইউরেনিয়াম, যা দিয়ে বানানো হয় আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ ইউরেনিয়াম দিয়ে শুধু যে বিদ্যুৎই উৎপাদন করা হয় তা নয়, এর আণবিক রিঅ্যাক্টর দিয়ে বিশ্ব ও মানবসভ্যতা ধ্বংসকারী আণবিক বোমাও বানানো যায়। এ জ্বালানি প্রাপ্তিতে অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যে ইউরেনিয়াম তথা আণবিক রিঅ্যাক্টরের মালিক দেশ এখন ‘ইচ্ছেমতো অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগ করার শক্তিধর রাষ্ট্র’ হিসেবে আবির্ভূত হলো। আণবিক বোমার ক্ষমতা সম্পর্কে আমরা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির বিষয়ে অবগত। সুতরাং মুনাফা লুণ্ঠনের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গেলে বিকল্প জ্বালানি বের করতেই হবে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো বিজ্ঞানকে মুনাফা লুণ্ঠনের কাজে ব্যবহার  করতে  কখনও দ্বিধা করে না। তাই বিকল্প আরও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হিসেবেই এসব লুটেরা রাষ্ট্র আবিষ্কার করল সবচেয়ে ভয়ানক এ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশল, আণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, যা উপরে বলা হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক তেজস্ক্রিয় জ্বালানি ইউরেনিয়াম ভেঙে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি করে আণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে আজ অবধি আবিষ্কৃত সবধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে অনিরাপদ, বায়ুদূষণকারী, ভয়ানক জীববৈচিত্র্যবিনাশী, পরিবেশ ধ্বংসকারী। আর আমাদের দেশের মতো ভূগঠনবিশিষ্ট, পলিমাটির দেশ, যা এক অঞ্চলের সাথে আরেক অঞ্চল জল দিয়ে যুক্ত, সে দেশের বেলায় তো কথাই নেই, এর ধ্বংস অনিবার্য । (চলবে)

আরো খবর

Disconnect