ফনেটিক ইউনিজয়
প্রকৃতিবিরোধী অনৈতিক অবৈধ কাজকে বৈধতা প্রদান করলেন বিশেষজ্ঞরা?

শ্রদ্ধেয় পাঠক, আপনাদের বিশেষ সতর্ক করে দিয়ে বলছি, ভেজাল মাছ-মাংস, শাক-সবজি ও ভেজাল ফল-মূলের বিরুদ্ধে ভুলেও এখন আর কেউ কোনও কথা বলতে যাবেন না। কথা বললে ভেজালকারীদের হাতে দিনদুপুরে, প্রকাশ্যে রাস্তাঘাটে আপনাদের হেনস্তা হওয়ার আশঙ্কা আছে। এতদিন আপনাদের মুখে ভেজাল খাদ্য ও ভেজাল ফল-মূলের বিরুদ্ধে কথাবর্তা, বক্তৃতা শুনে মাছ-মাংসে, সবজি ও ফল-মূলে ভেজাল তথা ‘বিষ’ প্রয়োগকারী দুর্বৃত্তরা খানিকটা হলেও ভয়ে দূরে পালাত, অথবা লুকিয়ে চুকিয়ে থাকত। কিন্তু এখন তারা লুকাবে না, ভয়ে পালাবেও না, বরং ভেজাল ও ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কথাবার্তা বলার ‘অপরাধে’ তারা বুক উঁচিয়ে আপনার দিকে তেড়ে এসে কড়া কথা শুনিয়ে দেবে, এমনকি খোদা না করুন আপনাকে পুলিশের হাতেও সোপর্দ করতে পারে।  
এর কারণ দেশের একদল বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানী-পণ্ডিত সম্প্রতি ফরমালিন ও কারবাইড মেশানো মাছ-মাংসকে এবং এসব ক্ষতিকর কেমিক্যাল দিয়ে অপরিপক্ব অবস্থায় আর্টিফিশিয়ালি পাকানো ফল-মূলকে ‘খাঁটি’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং এর পক্ষে তারা শক্তিশালী ক্যাম্পেইনেও নেমেছেন। অর্থাৎ ১৫ বছর ধরে পণ্ডিত-বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞদের  সরেজমিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রচার প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে জেনে-শুনে আমরা যেসব ফল-মূল ও খাদ্যবস্তুকে ভেজাল, বিষাক্ত ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর মনে করতাম, এখন সেগুলোকে ‘খাঁটি’ বলে বিশ্বাস করে অবাধে নিশ্চিন্তে ভক্ষণ করার সার্টিফিকেট পেয়েছি আমরা নতুন আরেক দল বিজ্ঞানী-পণ্ডিত-বিশেষজ্ঞ দ্বারা।
বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের জন্য বলতে হয় এ এক ভয়াবহ অবস্থা। সত্যি কথা বলতে কি দেশের ১৭ কোটি মানুষকে এখন বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ও ফল-মূলসহ তাবৎ ভোগ্যপণ্য ব্যবহারে নিরাপদ-অনিরাপদ বা ভেজাল-খাঁটির যে শাঁখের করাতের মধ্যে ঠেলে দেয়া  হয়েছে, সেখানে মনে হয় কবি সুকান্তের কবিতার কয়টি চরণ মুখস্থ করে দিন-রাত আওড়ানোই এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে ‘নিরাপদ’। বন্ধুরা, মাছ-মাংস, শাক-সবজি ও ফল-মূলে ভেজাল প্রয়োগকারী দুর্বৃত্তদের হাতে হেনস্তা হওয়া থেকে নিরাপদে থাকা নিশ্চিত করার জন্য সুকান্তের সেই কবিতার চরণ কয়খানি মুখস্থ করার সুবিধার জন্য এখানে তুলে ধরলাম-
‘খাটি জিনিস’ এই কথাটা
      রেখো না আর চিত্তে,
‘ভেজাল’ নামটা খাঁটি কেবল
আর সকলই মিথ্যে।
দুই.
বর্তমান যুগ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগ এবং সেই সাথে দুনিয়াব্যাপী ট্রাম্পের বিশ্বস্ত ‘ভক্ত সাগরেদদে’র যুগ। বলতে দ্বিধা নেই, বর্তমান দুনিয়ায় অধিকাংশ অঞ্চলেই ট্রাম্পের সোজাসাপ্টা  (স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড) পথ ধরেই ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘নীতিবান’ শাসকরা দেশ চালান, রাষ্ট্র চালান। তাদের বদৌলতেই দেশে দেশে আজ দুর্নীতিকে ‘সুনীতি, স্বৈরতন্ত্রকে ‘গণতন্ত্র’, দুর্বৃত্তায়নকে ‘মহানুভবতা’, নকলকে ‘আসল’ এবং ভেজালকে ‘খাঁটি’ বলার অভিনব সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে।
এখানে কারোরই ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। বাস্তব কথায় এখন আসি। অতিসম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, দেশের দায়িত্বশীল বিশেষজ্ঞ প-িত, সমাজের একশ্রেণীর অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের দ্বারা খাদ্যে ও ফল-মূলে কারবাইড ও ফরমালিনের মতো বিতর্কিত এবং মানবদেহের জন্য অবশ্যই কম-বেশি ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের পক্ষে ‘ওকালতি’ করে প্রকাশ্যে বক্তব্য প্রদান করেছেন। এমনকি বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনেকটা অবিশ্বাস্যভাবে আরও জানা যায়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞগরাণ রাজধানী নগরীতে কর্মশালা করে ঘোষণা দিয়েছেন যে, কার্বাইড ও ফরমালিন মেশানো মাছ-মাংস ও ফল মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। তারা আরও বলেন, এসব কেমিক্যাল সম্পর্কে এতদিন যে প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে, সেগুলো ভুল ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমরা সাধারণ মানুষ যেহেতু বিশেষজ্ঞ নই, তাই বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের উপরোক্ত ঘোষণার প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, এ রকম একটি গুরুতর ও স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা, গবেষণা ও বিতর্কে সর্বস্তরের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ঘোষণা দেয়ার আগে সেটি করা হয়েছে কিনা আমরা জানি না। তবে আমরা নিশ্চিত যে, দেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রত্যেকের জীবনের প্রতি হুমকিস্বরূপ বিষাক্ত খাদ্য ও ফল-মূল নিয়ে দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ-পণ্ডিতদের এতদিনকার মতামত ও সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণভাবে উল্টে দিয়ে নতুন করে আজ যে বিতর্কের অবতারণা করা হচ্ছে, তার ওপর নিশ্চয়ই অনেক পণ্ডিত বিশেষজ্ঞজন কথা বলবেন ও লেখালেখি করবেন।
তাই বিষয়টি নিয়ে সার্বিক আলাপ-আলোচনা ও লেখালেখির দায়িত্ব বিদগ্ধ বিশেষজ্ঞজনের হাতে সমর্পণ করে আমরা এখানে শুধু আমসহ বিভিন্ন ফল আগাম পাকানো ও কৃত্রিমভাবে সংরক্ষণের জন্য কারবাইড ও ফরমালিন ব্যবহার সম্পর্কে আজকের বিশেষজ্ঞরা যেসব ইতিবাচক (সম্মতিসূচক) বক্তব্য দিচ্ছেন, সে সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু মন্তব্য ও প্রশ্ন তুলে রেখে বর্তমান আলোচনার ইতি টানব।
পাঠক লক্ষ্য করুন, পত্রিকার খবর অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা নিজেরাই বলছেন যে, ফল ব্যবসায়ীরা আমসহ বিভিন্ন ফলে কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকেন অপরিপক্ব ফল কৃত্রিমভাবে আগাম পাকানোর জন্য। তারা (বিশেষজ্ঞরা) আরও বলেন যে, কেমিক্যাল দিয়ে কৃত্রিমভাবে আগাম পাকানো ফল খেলে নাকি মানুষের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে তারা আবার এ কথাও বলেন যে, অপরিপক্ব ফলে ক্যালরি কম থাকার কারণে সেই ফল খেয়ে ভোক্তারা ক্যালরি কম পায়। এক্ষেত্রে প্রথম কথা হচ্ছে, অপরিপক্ব ফল কেমিক্যাল দিয়ে কৃত্রিমভাবে আগাম পাকানোর কাজটি একটি অনৈতিক ও বেআইনি কাজ। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের অনৈতিক, প্রকৃতিবিরোধী ও বেআইনি কাজের কোনো বিরোধিতা তো করছেনই না, বরং তারা এ অবৈধ কাজকে বৈধতা প্রদান করছেন এবং যারা এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন, উল্টো তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছেন।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, অপরিপক্ব আমে বা যেকোনো ফলে ক্যালরি কম থাকার কারণে সেই ফল খেয়ে ভোক্তারা যদি ক্যালরি কম পান তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ভোক্তারা এ কৃত্রিমভাবে পাকানো ফল খেয়ে যে পরিমাণ ক্যালরির ঘাটতিতে পড়েন সেটি কার স্বার্থে? নিশ্চয়ই অতি মুনাফালোভী দুর্বৃত্ত ফল ব্যবসায়ীদের (এবং কে জানে হয়তো আরও অনেকের) স্বার্থে? যা হোক, মাছ-মাংসে ও ফল-মূলে কেমিক্যাল দেয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারাভিযান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে এরই মধ্যে খাদ্যদ্রব্য ও ফলে কারবাইড ও ফরমালিনের ব্যবহার অনেকটা কমে গিয়েছিল। আমরা মনে করি, বিশেষজ্ঞদের এ ধরনের ভয়ঙ্কর প্রশ্নবোধক ভূমিকার কারণে খাদ্য ও ফল-মূলে অবৈধ ও বেআইনিভাবে ভেজাল প্রয়োগকারী দুর্বৃত্তরা এখন আবার বেশি করে উৎসাহিত হবে এবং তার ফলে তারা খাদ্যে ও ফলে ক্ষতিকর কেমিক্যালের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করার মওকা পাবে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এখন বাংলাদেশের মানুষের করণীয়  কী?

আরো খবর

Disconnect