ফনেটিক ইউনিজয়
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়

বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো বহু দলের, বহু মতের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জাতীয় স্বার্থে ও জাতীর বৃহত্তর কল্যাণেই এটা প্রয়োজন। কারণ জাতীয় কল্যাণ সাধনই গণতন্ত্রচর্চার মূলমন্ত্র। আরেকটি কারণে এ প্রতিযোগিতা দরকার যা হলো, জাতীয় কল্যাণ সাধনে ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে কোনো দল কোনো দলকে অতিক্রম করে যেতে পারে, সেটাও দেশের জনগণের বিচার্য বিষয়। তাই জাতীয় জীবনে ও রাজনীতিতে এ কর্মে বিশুদ্ধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে দল এগিয়ে যায়, সে দলই জনগণের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। গণতন্ত্রে একটি রাজনৈক দলের জনকল্যাাণে জনগণের আস্থা অর্জনই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কোনো দেশের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে যদি সে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে বা সে প্রতিযোগিতার ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, তবে যে শুধু জনকল্যাাণই ব্যাহত হয় তা-ই নয়, জনগণ তাদের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে বলেও ধরে নেয়। তাই জনকল্যাণের চেয়ে জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অভিপ্রায়ই জনগণের মুখ্য উদ্দেশ্য ও শাসক দলের কাছে মুখ্য দাবি হয়ে ওঠে। অন্যথায় মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিত না। জেলে ফ্রি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তাই বলে কারাবাস কারও কাম্য নয়। মুক্ত আকাশ-বাতাসে স্বাধীন অধিকার নিয়ে মানুষ বাঁচতে চায়। কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,/ কে বাঁচিতে চায়,/ দাসত্বের শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,/ কে পরিবে পায়’। এছাড়া সোনার খাঁচার বাবুই পাখি ও বনের বাবুই পাখির কথোপকথনের গল্পও অনেকেরই জানা। কাজেই যে গণতন্ত্র মানুষের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় না, সে গণতন্ত্র কোনো দেশের মানুষ গ্রহণ করে না, হাজার বৈষয়িক কল্যাণ সাধন করলেও না। জনগণের কাছে ভাতের পর স্বাধীনতা ও অধিকারটাই অগ্রগণ্য।
জনগণের অধিকার হনন করে দেশের ব্যাপক কল্যাণ সাধন করেও কোনো রাজনৈতিক দল দাবি করতে পারে না যে, ‘আমরা যেহেতু দেশের অনেক বৈষয়িক কল্যাণ সাধন করেছি, সুতরাং আমরা ছাড়া আর কারও ক্ষমতায় আসার প্রয়োজন বা অধিকার নেই।’ কারণ এ বিচারের ভার জনগণের ওপরই বর্তায়। তাই কায়দা-কানুন করে জনগণের এ স্বাধীন বিচারের অধিকারকে কেউ খর্ব করতে পারে না। একই দল যদি বারবার ক্ষমতায় আসে, তাতে কারও আপত্তি থাকে না, যদি তা জনগণের স্বাধীন বিচারের ভিত্তিতে ঘটে। তাই গণতন্ত্রে জনগণের এ স্বাধীন বিচারের পথটি উন্মুক্ত রাখার রেওয়াজ প্রতিষ্ঠা করাও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ও অন্যান্য দলের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। যে পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতায় আরোহণের পথ সদা উন্মুক্ত থাকে, চূড়ান্ত বিচারে তাই জনহিতকর গণতন্ত্র। জনগণ চাইলে কোনো দলকে বারবার ক্ষমতায় বসাতে পারে বা ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে পারে। তখন আর কারও কোনো অভিযোগ থাকে না বা কোনো অবিমৃষ্যকারী পক্ষ অভিযোগ করলেও তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। সে অভিযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দমাতে অহেতুক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ডেকে এনে তাদের শায়েস্তা করতে হয় না, বরং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপেক্ষায় তা মিইয়ে যায়। এরই নাম গণতন্ত্র।
এর মানে এই নয় যে, পরিশুদ্ধভাবে ক্ষমতায় আসা কোনো ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন হবে না। শাসক দল যতই চৌকস হোক না কেন, তার ভুলভ্রান্তি হতেই পারে এবং হয়েও থাকে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাবহির্ভূত দলগুলোর দায়িত্ব হলো আলোচনা-সমালোচনা ও প্রয়োজনবোধে জাতীয় ও জনগণের স্বার্থে আন্দোলন করে ক্ষমতাসীন দলকে বুঝিয়ে দেয়া যে, তারা ভুল করছে। তখন দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের জনগণের ওপর উৎপীড়ন-নিপীড়ন থাকলে সে আন্দোলনের সঙ্গে জনগণও শামিল হয় এবং ক্ষমতাসীন দল সংশোধিত হতে বাধ্য হয় বা তা হতে হয়। ভুল করেও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার কৌশল গ্রহণ করা গণতন্ত্রের রীতি নয়। উদাহরণস্বরূপ অনেকের মধ্যে নিকট অতীতে ব্রিটেনের টনি ব্লেয়ার ও দূর অতীতে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর কথা উল্লেখ করা যায়। আরও দূরে গেলে এমনকি ব্রিটেনের পক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধজয়ী উইন্সটন চার্চিলের কথাও উল্লেখ করা যায়। যদি তারা গণরায়ে সাড়া না দিতেন, তবে বিপর্যয় ঘটে যেত। তাই এ কথা উল্লেখ করতে হয় যে, বিরোধী পক্ষরা দেশের রাজনীতিতে জনগণের পক্ষে ওয়াচ-ডগ হিসেবে কাজ করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাই বিরোধীদের কোনো প্রকারেই শত্রু ভাবা যায় না। এ না হলে গণতন্ত্র আর গণতন্ত্র থাকে না। দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রয়োজনে শাসক দলের বিরুদ্ধে বিরোধিতার প্রয়োজন আছে। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে, ‘আল্লাহ্তাআলা যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে এ ভূখ- ফাতনা-ফ্যাসাদে ভরে যেত। কিন্তু আল্লাহ্তাআলা সৃষ্টিকুলের ওপর বড়ই অনুগ্রহশীল।’ (সূরা বাকারা ২, আয়াত ২৫১)। এ ঐশী বাণীকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূল নিয়ামক বা চালিকাশক্তি বলে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এ উদ্দেশ্য, আদর্শ ও রীতি চালু আছে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশের বিদ্যমান গণতন্ত্রের স্বরূপটা একটা উদাহরণের মাধ্যমে বিবৃত করতে চাই। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে ‘চেঙ্গিস খান’ নামক একটি ইংরেজি ছায়াচিত্র দেখেছিলাম। এর একটি দৃশ্যে দেখানো হলো, চেঙ্গিস খানের গলায় গরুর গাড়ির চাকার মতো গোলাকৃতির একটি অতিকায় বেড়ি পরিয়ে তাকে একটি পুকুরে নামিয়ে দিয়ে বলা হলো, ‘এবার সাঁতরাও।’ বেচারা চেঙ্গিস খান বহু কষ্টে পুকুরের পাড়ে উঠে এসে বসে পড়ল। সাঁতরাতে পারল না। এ অবস্থায় কেউ সাঁতরাতে পারে? বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর অবস্থাও তাই। সরকারি দল নিজেদের ইচ্ছামাফিক সংবিধান সংশোধন করে চেঙ্গিস খানের বেড়ির মতো বিরোধীদের গলায় লটকে দিয়ে বলছে, ‘পবিত্র সংবিধান অনুসারে নির্বাচন হবে, যাদের ইচ্ছে আসেন। না আসলে আমাদের কিছু করার নেই।’ জনগণ ও বিরোধী দল কি এতই বোকা যে, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের এ প্রতিবন্ধক বেড়িটি দেখবে না। নিজেদের বিজয়ের সমূহ ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, সরকারি দলের বিরোধী দলের প্রতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের এ ডাক বা আহ্বান যা-ই বলি, তা যে গণতান্ত্রিক নয়, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক দুধের শিশু শিক্ষার্থীও ঠাওর করতে পারে। বহু পোড় খাওয়া সাধারণ জনগণ তো পারেই।
বিরোধী দলকে নিবাচনী বেড়িমুক্ত করে দিয়ে সরকারি দল যদি আবারও ক্ষমতায় আসে, তবে কারও কিছু বলার নেই বা থাকার কথা নয়। কারণ এটাই গণতন্ত্র। সরকারি দল তাদের ভাষায় এত উন্নয়নমূলক কাজ করার পরও সে ঝুঁকি নিতে সাহস করছে না। এতেই বোঝা যায়, বাস্তবতা কত কঠিন এবং সরকারি দলের সততা ও তাদের কৃত উন্নয়নের দাবির সারবত্তা কতটা প্রচারসর্বস্ব। অভিজ্ঞতা বলে, জনসেবা নয়, ক্ষমতার লোভ ও লুটপাটই আমাদের দেশের রাজনীতিকদের কাছে বড় কথা। তাই কেউ ক্ষমতা হারাতে চায় না। সবাই ক্ষমতায় যেতে ও তা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। স্বাধীনতার পর বিগত বছরগুলোয় আমরা তা-ই দেখেছি। এ দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে এসে সরকারি দলের উচিত নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া। তাহলেই কেবল গণতন্ত্রের পথে দেশ আরও একধাপ এগিয়ে যেতে পারে।     
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার     

আরো খবর

Disconnect