ফনেটিক ইউনিজয়
আমরা যদি না জাগি মা, ক্যামনে সকাল হবে?

দেশের স্কুল-কলেজের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা সপ্তাহ ধরে দেশব্যাপী আন্দোলন করছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে। নগরীতে বেপরোয়া বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে দুই কলেজ ছাত্র-ছাত্রীর নির্মম মৃত্যু ও তার বিরুদ্ধে জনগণের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের জবাবে সরকারের এক মন্ত্রীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তার প্রতিক্রিয়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আকস্মিকভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রথমে রাজধানী নগরী ও পরে সারা দেশে তারা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে।  বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি বহুমাত্রিক ব্যতিক্রমী আন্দোলন। আন্দোলনটি ব্যতিক্রমী প্রথমত এ কারণে যে, দেশের কোনো রাজনৈতিক দল বা অঙ্গসংগঠন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-যুবারা নয়, প্রথম এ আন্দোলনে নেমেছে স্কুল-কলেজের কিশোর শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের দ্বিতীয় ব্যতিক্রম হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন মাত্র ছাত্র-ছাত্রী নিহত হওয়ার বিচারের দাবির মধ্যেই এ আন্দোলন সীমাবদ্ধ নয়। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসী আজ বিস্ময়ের সাথে জানতে পারছে, বর্তমান সরকারের একনাগাড়ে সাড়ে নয় বছরের শাসনামলের সর্বশেষ (২০১৫ থেকে  ২০১৮ সালের মধ্যে)  মাত্র  সাড়ে তিন বছরেই সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ হাজার ১২০ জন নিহত ও ৬২ হাজার ৪৮২ জন আহত হয়েছে (তথ্যসূত্র : প্রথম আলো, ৪ আগস্ট ২০১৮)। অর্থাৎ খুদে ছাত্র-ছাত্রীদের আজকের আন্দোলন দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে।  
এ ব্যতিক্রমী আন্দোলনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কলেজছাত্রদের পাশাপাশি স্কুলের শুধু ওপরের ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরাই নয়, নিচের ক্লাসের কোমলমতি শিশু-কিশোরেরাও এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এ আন্দোলন কোনো অন্ধ আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়ে শুরু ও অগ্রসর হয়নি অথবা কোনো উসকানিতেও নয়। ছাত্র-ছাত্রীরা বিস্ময়করভাবে তাদের সচেতনতা দিয়ে এ আন্দোলন শুরু ও পরিচালনা করেছে। এর আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হয়ে বরং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার পথে যেসব সংকট ও বাধাবিপত্তি রয়েছে, সেসব দূর করার জন্য সরাসরি রাস্তায় নেমে গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দেশের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও বিশৃঙ্খলাগুলো রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
দুই.
এদিকে আন্দোলন চলাকালে রাজধানী নগরীসহ বিভিন্ন শহর-নগর-বন্দরে যানবাহন চলাচল যে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তার কারণ কিন্তু আন্দোলনকারীদের উচ্ছৃঙ্খলায় যানবাহন ভাংচুর বা অগ্নিসংযোগের ভয়ে নয়। অধিকাংশ যানবাহন রাস্তায় নামেনি কারণ সেসব যানবাহনের হয় কোনো ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই অথবা চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এমনকি স্বল্পসংখ্যক যেসব যানবাহন রাস্তায় বের হয়, দেখা গেছে সেগুলোরও প্রায় অর্ধেকের ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই, গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ সার্টিফিকেট ইত্যাদি। এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে বোঝা যায়, দেশের আরও অনেক সেক্টরের মতো সড়ক ও পরিবহন সেক্টরেও কীরকম নৈরাজ্য বিরাজ করছে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে এবার দেখা গেছে, কচি বয়সের শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রকের মতো রাস্তায় একটি একটি করে গাড়ি থামাচ্ছে আর তাদের সহযোগিতায় পুলিশ একের পর এক মামলা করছে। এ অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে অনেককেই বলতে শোনা গেছে, ‘তাহলে পুলিশ এতদিন কী করেছে?’ বলা বাহুল্য, পুলিশ ও প্রশাসন এতদিন যা করেছে, তা তো সবারই জানা।  
তিন.
সবআর চোখের সামনে আরও অনেক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে এবারের আন্দোলনে। পানিসম্পদমন্ত্রীর গাড়িচালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় মন্ত্রীর গাড়িও আটকে দেয় কিশোর আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় নৌ-পুলিশের উপমহাপরিদর্শকের  (ডিআইজি) গাড়িও কিশোরেরা আটকে দেয়। অনেক পথচারীকেই বলতে শোনা গেছে, ‘গাড়ির কাগজের ঠিক নেই, চালকের লাইসেন্স নেই;  আর দেখেন দেশের নাবালক ছেলেমেয়েরা কী সুন্দরভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে।’
এই যে এতদিন ধরে দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা ও সড়ক পরিবহনে এ ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য চলছে, রাস্তাঘাটে হাজার হাজার ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল করছে, তা কোন কায়েমি স্বার্থবাদীদের স্বার্থে, তা দেশের সাধারণ মানুষ জেনেও ভয়ে নিশ্চুপ থেকেছে। সেখানে স্কুল-কলেজের কিশোর শিক্ষার্থীরা সাহস করে রাস্তায় নেমে সেøাগান দিয়েছে, ‘যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ।’ দেশপ্রেম ও চেতনায় কী দুর্লভ আবেদন এ সেøাগানে! শুনে গর্বে বুক ভরে ওঠে। বলতে হয়, এ ছেলেমেয়েরা আজ এক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। এটি নীরব বিপ্লব নয়, সরব বিপ্লব। কোনো অরাজকতা নয়, হঠকারিতা নয়, সত্যিকার অর্থেই এক শান্তিপূর্ণ বিপ্লব।
দেশের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সেক্টর দুর্নীতিপরায়ণ ও কায়েমি স্বার্থবাদীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সর্বত্রই কীভাবে অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়; বেআইনি  কাজ কীভাবে আইনসম্মত হয়ে যায়, তা তো মোটাদাগে সবারই জানা। আজ স্কুল-কলেজের কিশোর শিক্ষার্থীরা সড়ক পরিবহনের চরম অনিয়ম, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা সবার সামনে সরেজমিনে তুলে ধরল এবং সমস্যা সমাধানের বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
কিশোর শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আজকের নানা রকমের হতাশার মধ্যে এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। খুদে শিশু-কিশোরদের এ আন্দোলন এতই তাৎপর্যপূর্ণ যে, দেশের বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তি ও জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এ আন্দোলনকে ‘একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে সাধারণজনের শক্তির উদ্বোধন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি পত্রিকার পাতায় এসব কথা লিখিতভাবে প্রকাশ করেছেন। আরও লিখেছেন, ‘এ আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তিকে আমি শুধু সবিস্ময়ে অবলোকন করিনি, সন্তুষ্টচিত্তে প্রণতি জানিয়েছি (দেখুন : প্রথম আলো, ৪ আগস্ট ২০১৮)। একই পত্রিকায় খুদে শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের ঘটনায় বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম তার লেখা এক কলামে ‘স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা একটি বিপ্লব ঘটিয়ে দিল’ বলে মন্তব্য করেছেন। এভাবে সব বিবেকবান ও সচেতন ব্যক্তি, পণ্ডিত-বুদ্ধিজীবী-লেখক-শিল্পী-রাজনীতিক-শিক্ষক-চাকরিজীবীসহ দেশের সব সচেতন মহল অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন ও অভিনন্দন জানিয়েছেন কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের এ ন্যায্য আন্দোলনকে।  
অথচ পত্রপত্রিকার সর্বশেষ খবর অনুযায়ী আন্দোলনরত এ মাসুম শিশু-কিশোরদের ওপর যখন শক্তিমান বীরপুরুষদের বর্বরোচিত হামলা পরিচালিত হয় এবং শিশু-কিশোরদের বুক থেকে রক্ত ঝরানো হয় তখন বোঝা যায়, আমরা কেউ ইতিহাস থেকে এখনও কোনো শিক্ষাগ্রহণ করতে পারিনি। ধিক্ আমাদের বীরত্বের, আমাদের চরিত্রের!
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের মিছিলের প্ল্যাকার্ডে কবিতার দুটি পঙ্‌ক্তিও আন্দোলনের স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছে। পঙ্‌ক্তি দুটি হলো, ‘আমরা যদি না জাগি মা/ ক্যামনে সকাল হবে?’ কবিতার এ পঙ্‌ক্তি দুটো শিশু-কিশোররা এতদিন মায়ের বুকে মুখ গুঁজে অথবা পড়ার টেবিলে বসে আউড়েছে কল্পনার ফানুস উড়িয়ে। সেটাই আজ তারা বাস্তব জীবনের সংগ্রামে ব্যবহার করছে রাজপথের আন্দোলনের সেøাগান হিসেবে। দেশের শিশু-কিশোরেরা বুঝে ফেলেছে, স্বদেশের আকাশে আজ রাতের অন্ধকার, দেশ ও জাতির জন্য একটি সকাল আজ খুব জরুরি। ওরা সব জেগে উঠলে তো সকাল হবেই।

আরো খবর

Disconnect