ফনেটিক ইউনিজয়
ভোটের রাজনীতিতে মাঠ দখল

রাজনীতিতে ‘মাঠ  দখল’ বলে একটা বহুল প্রচলিত কথা আছে। এ মাঠ দখলের অর্থ বহুমাত্রিক। এলাকা দখল, জমি দখল, ঘরবাড়ি দখল, উন্নয়নের সেক্টর দখল, টেন্ডার দখল, চাকরিবাকরি ও ব্যবসা দখল- এগুলো এখন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু রাজনীতিতে মাঠ দখলের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বা পুনঃক্ষমতা পাওয়ার জন্য নির্বাচনী মাঠ দখলের ঘটনা। এটা প্রধান এ কারণে যে, এ মাঠ দখলের মাধ্যমেই ভোটে জিতে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হয়।  আর এ ক্ষমতা হচ্ছে সম্পদ দখল, ঘরবাড়ি দখল, উন্নয়ন সেক্টর দখল, বিশ্ববিদ্যালয় দখল তথা সব ধরনের দখলদারিত্বের মূল শক্তি।
আমাদের দেশে রাজনীতিতে মাঠ দখলের, বিশেষত নির্বাচনের সময় ভোটের মাঠ দখলের রেওয়াজ বহু বছর ধরেই আছে। তবে ‘মাঠ দখলে’র চেহারা এখন আর আগের মতো নেই। অতীতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের মাঠ দখলের বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচার-প্রোপাগান্ডা, সভা-মিছিল, নির্বাচনী ইশতেহার প্রচার, ব্যাপক জনসংযোগ ইত্যাদি নির্দোষ গণতান্ত্রিক পন্থা। কিন্তু ভোটের মাঠ দখলের রাজনীতির মধ্যে এখন যোগ হয়েছে নতুন নতুন কলাকৌশল। ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি এখন হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত ক্ষমতা পাওয়ার রাজনৈতিক দর্শনে পরিণত হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক চিন্তা। বলতে হয়, ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি এখন এক কিম্ভূত সৃজনশীল প্রকল্পে উন্নীত হয়েছে।
এরকম ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হয়ে ওঠে তখনই, যখন এই সৃজনশীলতা প্রয়োগ হয় কায়েমি ক্ষমতা অগণতান্ত্রিকভাবে কুক্ষিগত করার জন্য। ক্ষমতা লাভ করা বা ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার এসব প্রকল্প অনেক সময় কেবল অগণতান্ত্রিকই হয় না, ফ্যাসিবাদেও রূপ নেয়। এটি সাধারণত ঘটে, একচেটিয়াভাবে যখন কেউ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে তখন। কারণ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকে তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। বলা বহুল্য, আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের নামে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাষ্ট্রের বাহিনী মনে না করে মনে করেন নিজ দলের, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তির বাহিনী।
দুই.
বাংলাদেশে ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ডিসেম্বরে। হাতে সময় আছে মাত্র তিন মাস। পত্রপত্রিকার খবর পড়লেই বোঝা যায়, এরই মধ্যে নির্বাচনী রাজনীতিতে ভোটের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এ লড়াই শুরু হয়েছে রাজনীতির মাঠের পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, আদালত, সংসদ প্রভৃতি অঙ্গনকে ঘিরে। এখন দেশের যেখানেই যেকোনো কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড, তা সরাসরি রাজনৈতিক না হয়ে যদি শুধু অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা কারও জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও হয়, তার মধ্যে ভোটের রাজনীতি ঢুকে পড়ে।
সাম্প্রতিককালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী যে নিরীহ অরাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলে, সেখানেও রাজনীতি ঢুকে পড়েছিল, আমরা দেখেছি। বিরোধী দলগুলো ও ক্ষমতাসীন দল উভয়ই এ কর্মসূচিকে সম্ভবত ইতিবাচকভাবেই নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল। অবশ্য সেটি সম্ভবত গণতন্ত্রবিরোধী নয়, বরং স্বাভাবিক। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা এটাকে স্বাভাবিক বলে মনে করে না। এর মধ্যে তারা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায় এবং ক্ষমতা পুনর্দখলের প্রশ্নে নিজেদের অনিরাপদ মনে করে। সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা মনে করে, গণতান্ত্রিক অধিকার শুধু তারাই ভোগ করবে, অন্যরা নয়। যেকোনো দলের এ ধরনের চিন্তা একনায়কতান্ত্রিক হতে বাধ্য।
কিন্তু এক্ষেত্রে আরও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে তখন, যখন রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক অধিকারকে, বিশেষত বিরোধীদলীয়দের গণতান্ত্রিক অধিকারকে তুচ্ছ করে ক্ষমতাসীন দল বিশ্বাস করতে থাকে, দেশের স্বার্থে, জাতি ও জনগণের স্বার্থে ও উন্নয়নকে অব্যাহত রাখার স্বার্থে তাদেরই ‘চিরকাল’ অথবা অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকতেই হবে। বলা বাহুল্য, ক্ষমতাসীনদের মধ্যে এ ‘আত্মবিশ্বাস’ যত বাড়ে, রাজনৈতিক সংকট তত প্রকট হয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিকৃতি জন্ম নেয়।
নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের মাঠ দখলের রাজনীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তা খুব উদ্বেগজনক বলে মনে হয়। আর সেই খবর হলো, নির্বাচনী প্রচারণা ও অন্যান্য ইস্যু নিয়ে প্রধান বিরোধী দল মাঠে নামলে তাদের ব্যাপকভাবে ‘ধরপাকড়ের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি’ চলছে। এ ধরনের খবরাখবর শুনে দেশবাসী ঘরপোড়া গরুর মতো খুবই আতঙ্কের  মধ্যে পতিত হয়। জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয় যতটা না সরকারি বাহিনীর হাতে বিরোধীদলীয়দের বেধড়ক পিটুনি খাওয়ার ভয়ে, তার চেয়েও বেশি আতঙ্কগ্রস্ত হয় ২০১৪ সালের মতো বিরাধীদলীয়রা আবারও নির্বাচন ‘বয়কট’ করতে পারে এ ভয়ে। সেরকমটি হলে ক্ষমতাসীন দলের লাভ-ক্ষতি কী হবে, তা বোঝার সাধ্য কারও নেই। তবে বহির্বিশ্বের কাছে জাতি হিসেবে বাংলাদেশী  নাগরিকদের ও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে তলানিতে গিয়ে ঠেকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিঃসন্দেহে এটা কারোরই কাম্য হতে পারে না।

আরো খবর

Disconnect