ফনেটিক ইউনিজয়
ভারত-বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি

বর্তমান সময়ে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল ও উন্নয়নগামী দেশগুলোতে দমন-পীড়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনার ঘটনা শুধুমাত্র স্বাভাবিক ঘটনাই নয়, রীতিমতো ‘আবশ্যিক’ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সেটা গণতান্ত্রিক, সামরিক-আধাসামরিক সকল সরকারের জন্যই প্রযোজ্য। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়।  যেমন সাম্প্রতিককালে চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীরাও সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও নানা অজুহাত দেখিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারের অনাকাক্সিক্ষত পুলিশি দমন-পীড়নের অনেক ঘটনাই ঘটেছে। এমনকি সেই       দমন-পীড়ন এসব কিশোর আন্দোলনকারীদের শরীর থেকে রক্তও ঝরিয়েছে।
ওদিকে প্রতিবেশী ভারতেও আমরা দেখি, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের হাতেও সমস্ত ভারতে যত্র তত্র পুলিশি দমন-পীড়ন ইতিমধ্যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিজেপি সরকারের এই ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন সকল স্তরের নাগরিকরা। সমাজের উঁচু মাপের বুদ্ধিজীবী, বড় কবি, লেখক, গবেষক, সাহিত্যিক, শিক্ষক কেউই সরকারের এই দমন-পীড়ন থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

দুই.
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, যে কোনো দেশে এই ধরনের দমন-পীড়নের শেষ পরিণতি হয় নির্বাচন অথবা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাচ্যুতির মধ্য দিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা মনে হয় ব্যতিক্রম। কারণ বাংলাদেশে এখন আর নির্বাচন অথবা আন্দোলন-অভ্যুত্থান কোনোটির মাধ্যমেই কায়েমি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে না।  
এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সরকারি দমন-পীড়ন ও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিণতির তুলনামূলক বিচার যদি করা যায় তাহলে স্পষ্টতই বোঝা যায়, বাংলাদেশের অবস্থা ভারতের তুলনায় অনেক কঠিন ও বিপজ্জনক।
ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের দমন-পীড়ন সস্পর্কে  কথা বলতে গিয়ে সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি পি বি সাওয়ান্ত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়  এক নাতিদীর্ঘ প্রতিবেদনে লিখেছেন- “প্রকৃতপক্ষে সরকারের এসব স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক আচরণ জনগণের জীবনকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে। যদিও বর্তমান সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছে না, তবু তাদের সংবিধান মানতে হবে। সংবিধানের পরিবর্তন ছাড়া নিজেদের আদর্শকে প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার দেশকে গণতান্ত্রিক থেকে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে না। (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে বাংলা অনুবাদ:  দৈনিক প্রথম আলো, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮)”।
তাহলে ভারতের অবস্থা হলো, সে দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার জনগণের ওপর যে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে তা রাষ্ট্রের সংবিধানবিরোধী। ক্ষমতাসীনরাও হয়তো বোঝেন, তারা যে দমন-পীড়ন চালান তা বে-আইনি। সরকারের এই সব দমনমূলক পদক্ষেপকে আইনসঙ্গত করতে হলে সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু ভারতীয় সংবিধান এমনই এক শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় দলিল যে, কেউ ক্ষমতায় গিয়ে ইচ্ছামতো তা পরিবর্তন করতে পারে না। সে কারণে সে-দেশে সরকার যত বেশি দমন-পীড়ন চালায়, ততই তারা শুধু জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নই হয় না, নৈতিকভাবে দুর্বলও হয়। যার পরিণতিতে পরবর্তী নির্বাচনে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়। এটাই হচ্ছে বিগত কয়েক দশকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমাদের প্রতিবেশী এই দেশটির ইতিহাস।
আর এদিকে বাংলাদেশের অবস্থা একেবারেই আলাদা। বলা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ক্ষমতাসীনরা তাদের নিজস্ব আদর্শ ও কর্মসূচি ‘ফ্রিস্টাইলে’ বাস্তবায়িত করেন এবং তা করতে গিয়ে যে-সব দমন-নিপীড়নমূলক কাজ করেন, তা সবই করেন সংবিধান মোতাবেক। সংবিধান বিরোধী কোনো কাজ তাদের করার প্রয়োজন হয় না। কারণ, এদেশে সংবিধান অনেকটা হাস্যকরভাবে এমন এক নাজুক বস্তু যে- যখন যারা ক্ষমতায় আসেন তারা নিজেদের ‘আদর্শ’ বাস্তবায়নের জন্য কথিত সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন করে নিতে পারেন। প্রতিবেশী ভারতে সংবিধানের একটি ধারা সংশোধন বা পরিবর্তন করতে বড় বড় সংবিধান বিশেষজ্ঞদের যেখানে বুক কাঁপে, সেখানে বাংলাদেশে সংবিধানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারার পরিবর্তনকে, যারা যখন ক্ষমতায় থাকেন তারা পানির মতো সহজ কাজ মনে করেন। এর জন্য একটিমাত্র উদাহরণই যথেষ্ট। দেশের সকল দল, গোষ্ঠী ও মহলের সম্মতিক্রমে নির্বাচনকালীন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ যে ধারা সংবিধানে যুক্ত হওয়ার পর বাস্তবে কার্যকর ও পরীক্ষিত হয়ে স্থিতিলাভ করেছিল, সেই ধারা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে দেয়া হয়। ফলে এক দশক ধরে জাতীয় রাজনীতিতে কী রকম ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা শুধু বাংলাদেশেরই নয়, দেশ-বিদেশের সকলেরই জানা।
কিন্তু ক্ষমতায় থেকে যারা সংবিধান পরিবর্তন করেছেন এবং পুনরায় ক্ষমতাসীন হয়েছেন তাদের জন্য এটা কোনো সংকট নয়, আশীর্বাদ। সংবিধানের এই পরিবর্তন ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় নিশ্চিতভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার সোপান নয়, সংবিধানের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কারণও। কারণ এতে ক্ষমতায় থাকা-না থাকার ব্যাপারটি ঘটে নিজের ইচ্ছামতো। আফসোস এখানেই যে, এটা ভারতের মতো দেশে কখনো সম্ভব নয়, এমনকি পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রেও নয়- কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব !

আরো খবর

Disconnect