ফনেটিক ইউনিজয়
মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়া: ভোটার যেখানে নিয়ামক

গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মালদ্বীপের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন বিরোধীদলীয় নেতা ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ-এর কাছে প্রেসিডেন্ট পদ খুইয়েছেন। নির্বাচন কমিশন প্রধান আহমেদ শরীফ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলে সলিহ’কে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। আহমেদ শরীফ বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি মর্মে কিছু অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনারদের কায়িক হুমকিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন ১৬ সেপ্টেম্বর, রোববার অর্থাৎ নির্বাচনের ১ সপ্তাহ আগে মালদ্বীপ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে এক নির্বাচনী সওয়াল-জবাবে অংশ নেন। সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল, উচ্ছৃঙ্খল দলবাজদের হিংস্রতা অব্যাহত থাকলে কীভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে? প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন বলেন, এটি ৩৫ শতাংশ কমেছে। আর দলবাজদের চাকু মেরে ত্রাস স্থাপনের এই তথ্য গবেষণাভিত্তিক কি-না সে নিয়ে তাঁর সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন, তিনি মালদ্বীপের তরুণদের একাংশকে ঢালাওভাবে ‘গ্যাং’ বা জোটবদ্ধ সন্ত্রাসী বলতে নারাজ। কারণ বড় কাজগুলো এই তরুণরাই করে থাকে।
মালদ্বীপের রাজনীতিতে এই ‘ক্রিমিনিাল গ্যাং’-দের উত্থান নিয়ে সানফ্রান্সিসকো ভিত্তিক এশিয়া ফাউন্ডেশন ২০১২ সালে একটি জরিপ করে। জরিপে উঠে আসে- রাজনীতিবিদরা সরাসরি বা উপকারভোগী ব্যাবসায়ীদের মাধ্যমে এসব ক্রিমিনাল গ্যাং-এর পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। টাকা, মদ ইত্যাদি দিয়ে গ্যাংদের বশ করা হয়। রাজনৈতিক মিছিল, সংঘর্ষ, সম্পদের ক্ষতি সাধনসহ যে কোনো নাটকীয় ঘটনার নায়ক হিসেবে এরা কাজ করে। মালদ্বীপে প্রিভেনশন অভ গ্যাং ক্রাইমস অ্যাক্ট নামে একটি আইন থাকলেও মাত্র দু’বছর আগে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যাংদের হুমকির শিকার হন।
তারপরও ইয়ামিন বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার ফলাফল জানতে চেয়েছেন গ্যাংদের বিষয়ে মতামত দিতে। ইয়ামিন একই মতামত ব্যক্ত করেন ম্যানগ্রোভ পতিত ভূমির অর্ধাংশ ভরাটের বিষয়ে। যেখানে প্রায় ১২০০ গাছ কাটার প্রশ্ন আসায় পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজ এর বিপক্ষে উচ্চকণ্ঠ হন।
প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন বড় জারিজুরি খাটান জিডিপি-এর তথ্য প্রকাশে। তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের সময় মালদ্বীপের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৪,০০০ বা ৫,০০০ মার্কিন ডলার। ইয়ামিন ২০১৭ সালে দাবি করেন মাথাপিছু জিডিপি ১০,০০০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তাঁর ক্ষমতায় অবস্থান নিশ্চিত হলে এটি ২০,০০০ ডলারে লাফ দেবে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক জনিয়েছে ইয়ামিনের দাবি সত্য নয়। ২০১৭ সালে মালদ্বীপের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৮,৯৮০ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ তাঁর দাবি ছিল চমক দেখিয়ে ভোটারদের প্রতারিত করার কৌশল।
এটি সত্য যে, মালদ্বীপের ভোটারদের একাংশ তাঁদের অধিকার নিয়ে সচেতন নন। টাকার বিনিময়ে, পণ্যের বিনিময়ে ভোট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গরিষ্ঠ সংখ্যক ভোটার তাঁদের ভোট প্রয়োগে বিচার-বুদ্ধি নির্ভরতাকে বাদ দেননি। কারণ তা যদি না হবে তবে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন তাঁর সাজানো-গোছানো নির্বাচনে এমনভাবে হারতে যাবেন কেন? গদি নিশ্চিত করতে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকদের মালদ্বীপ আসতে দেননি। তাতে কি  শেষ রক্ষা হয়েছে? চীন বর্তমানে মালদ্বীপে বড় বিনিয়োগকারী। হয়তো ভরসা ছিল এক্ষেত্রে চীনা প্রভাব কাজ দেবে। তবে বিপক্ষে থাকা ভারত আর তার পাশ্চাত্য মিত্র মার্কিন মুল্লুক নিয়েও নিশ্চয়ই কম অস্বস্তি তাঁর মধ্যে কাজ করেনি।
কিন্তু তারপরও ফলাফল তাঁর বিপক্ষে গেছে। তিনি এই ফলাফল মেনে নিতেও বাধ্য হয়েছেন। বাধ্য হয়েছেন কারারুদ্ধ সৎ ভাই সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুম-কে জেলখানা থেকে ছেড়ে দিতে। পাঠক অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন কিন্তু ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিচারপতি বরখাস্ত, অডিটর জেনারেলকে পদত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি ঘটনার নায়ক। তবে নির্বাচনে হেরে তিনি এখন খলনায়কে পরিণত হয়েছেন। আস্থাভাজন সরকারি যন্ত্রের বিদ্যমান সদস্যরাই দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে তাঁরই বিরুদ্ধে। এসব কিছু সম্ভব হয়েছে ভোটারের সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে। কবিতার লাইনের অনুকরণে তাই লেখা যায়, ‘সবাই বাজে ভোটার নয়, কেউ কেউ হয়তো: বাজে ভোটার।’
লেখাটা এখানে শেষ না করে মালয়েশিয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরা সমীচীন হবে। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী দাতোশ্রী হাজী মোহাম্মদ নাজিব বিন তুন হাজী আবদুল রাজাক প্রায় ১০ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী থেকে এ বছর হেরে গেলেন। গত ৬০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় ক্ষমতায় থাকা ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের তিনি ছিলেন সভাপতি। নাজিবের বাবা মালয়েশিয়ার ২য় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বাবার মৃত্যুতে মাত্র ২৩ বছর বয়সে নাজিব মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সনে নাজিব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এর আগে ১৯৮৬ সনে তিনি সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রীও ছিলেন।
১৯৯৫ সালে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ অবসর গ্রহণ করলে নাজিব উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। এসময় তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন। ২০০৯ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১৮ এর মে মাসে দলগত পরাজয়ের কারণে নাজিবকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। এ যাত্রায় তিনি মাহাথির মোহাম্মদের প্রতিপক্ষ আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন।
সাধারণ নির্বাচনে হারার মাত্র ৩ দিন পর খবর আসে যে, তিনি ও তাঁর স্ত্রী একটি প্রাইভেট জেট বিমানে বিদেশ যাবার পরিকল্পনা করছেন। মাহাথির মোহাম্মদের নির্দেশে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাঁদের আটকে দেয়। নাজিবের বিরুদ্ধে ওয়ান মালেশিয়ান ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ (১ এমডিবি) এর কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যক্তিগত হিসেবে সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। মালয়েশীয় পুলিশ তাঁদের বাড়িতে ২৮৪ বাক্স কারুকার্যময় হ্যান্ডব্যাগ ও ৭২ টি লাগেজ ব্যাগে বিভিন্ন দেশের মুদ্রাসহ যথাক্রমে ২২৩ ও ২৭৩ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন।
৩ জুলাই ২০১৮, নাজিবকে মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি জামিন পান। পরবর্তীতে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে পুনরায় গ্রেপ্তার হন এবং জামিন লাভ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাজিবকে ‘‘প্রিয় প্রধানমন্ত্রী’’ হিসেবে উল্লেখ করতেন। মালয়েশিয়ার উন্নয়নে বিভন্নমুখী অবদান রাখাকালীন ২০০২ সালে ক্রয় করা স্করপেন সাবমেরিন দুর্নীতির তদন্ত এখন চলছে ফ্রান্সে।
নাজিব রাজাকের ২য় স্ত্রী রোসমা মানসোর। এটি রোসমারও ২য় বিয়ে। বিলাসীনী রোসমারের অলংকারের সংখ্যা ১২,০০০। যাতে আছে নেকলেস, ব্রেসলেট, আংটি, টিয়ারা ইত্যাদি। ৪২৩টি হাতঘড়ি, ২৩৪টি সানগ্লাস, ৫৬৭টি মূল্যবান হ্যান্ডব্যাগসহ ২৬টি দেশে ১৬ মিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিংগিট রয়েছে তার নামে।
রোসমা জুয়েলারি অর্ডার দিয়ে তার দাম পরিশোধ করেননি বা জুয়েলারি ফেরত দেননি এমন দু’টি অভিযোগ দায়ের করেছে দুবাই ও লেবাননের দু’টি জুয়েলারি কোম্পানি। দুই ঘরে চার সন্তানের মা দাতিন পাদুকা শেরি হাজ্জা রোসমা বিনতি মানসোর (বয়স ৬৭) অর্থাৎ রোসমা মানসোর এ পর্যন্ত তিনবার গ্রেপ্তার হয়ে জামিন পেয়েছেন। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন গত ৩ অক্টোবর ২০১৮।
নাজিব মালয়েশিয়া উন্নয়নের একজন রূপকারও বটে। কিন্তু উন্নয়নকাজ আদৃত হলেও তার ব্যক্তিগত অন্যায় লাভের বিষয়টি গৌণ হয়ে যায়নি। এমনকি তার এককালের প্রধানমন্ত্রী তাকে ঠেকাতে দীর্ঘদিনের দল ছেড়ে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। বড় শত্রু আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে।
এতসব ঘটনা, নাজিবের বিরুদ্ধে বিলিয়ন ডলার দুর্নীতি বা তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতো না, যদি ভোটাররা তাদের রায় না দিতেন। ভোটারদের কেউ কেউ হুজুগে, বিবেচনাবোধহীন ও সহজে প্রভাবিত নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে চিহ্নিত করলেও তা সর্বাংশে যে সঠিক নয় তা মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়ার নির্বাচনের ফলাফল থেকে স্পষ্ট। একথা ঠিক যে, প্রায় সব দেশেই ভোটারদের একটি অংশ সঠিক ভোটদানে উদাসীন। কিন্তু ভোটারদের বড় অংশই তাঁদের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রয়োগে তৎপর-একথা ভুলে গেলেও চলবে না।
তবে সেক্ষেত্রে ভোটারকে ভোট প্রয়োগের অবাধ সুযোগদানের ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। এ দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশন এক্ষেত্রে যতটুকু তৎপরতা ও দক্ষতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হন ভোটার ততটাই সুষ্ঠু নির্বাচনে তাঁর মতামত নিঃসংকোচে জানাতে সক্ষম হন।
এটি গণতন্ত্রের শর্ত।
মানবাধিকারের শর্ত।
সভ্য সমাজের শর্ত।
মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকায় প্রশংসার দাবিদার নিঃসন্দেহে। একই সঙ্গে আমাদের নির্বাচন কমিশনও অনুরূপ যোগ্যতার সাথে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করুন- এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

আরো খবর

Disconnect