ফনেটিক ইউনিজয়
নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন

বাস সার্ভিস আছে এমন পথে প্রতিদিনের যাতায়াতে আমার বাহন লোকাল বাস। ঢাকা শহরের প্রায় প্রতি বাসে নারী, শিশু এবং অসুস্থদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা আছে। আমি এই সংরক্ষণের পক্ষে। যারা প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করেন, তারা বুঝবেন কেন কিছু আসন সংরক্ষিত থাকা দরকার। এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী সংরক্ষিত আসন সংখ্যা আরও বাড়ানোর দাবি তোলা উচিত বলেই মনে করি। কিন্তু জাতীয় সংসদে নারীর জন্য আসন ‘সংরক্ষিত’ রাখার পক্ষে নই। অন্যের কাঁধে ভর করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্মাণ!
কিছুদিন আগে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য পঞ্চাশটি আসন আরো পঁচিশ বছরের জন্য সংরক্ষণ করার একটি আইন পাস হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিনা আপত্তিতে আইনটি পাস হয়ে গেছে। ফলে আগামী আরও পাঁচটি সংসদে বাংলাদেশের নারীরা সংসদে যাবেন সংরক্ষিত কোটা সুবিধা নিয়ে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মনোনয়নে। একুশ শতকের এই সময়ে আমাদের দেশের মেয়েরা যখন হিমালয় জয় করছেন, বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, সংসারে বীরদর্পে কাজ করে চলেছেন- সেই সময়ে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হয়ে সংসদ সদস্য হবেনÑ ভাবতেই বিব্রত লাগছে।
তবে আইনটি নিয়ে যতটা প্রতিক্রিয়া হবার কথা ছিল ততটা হয়নি। একই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও পাস হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি খসড়াকালেই নানা আপত্তির মুখে পড়েছে, বেশ কয়েকবার সংশোধন হয়ে তবে সংসদে পাস হয়েছে। এখনও সরব বিরোধিতা। ডিজিটাল এই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার নিয়ে আমাদের মহা দুশ্চিন্তা। অনেকদিন ধরে প্রায় সব রকম সংবাদ মাধ্যম সরগরম হয়ে রয়েছে। ফেসবুকের ওয়ালগুলোও সরব ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েই। পাস হয়ে গেছে, এরপরও বিরোধিতাও চলছে- আর প্রয়োজনে সংশোধন করার আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন মন্ত্রী। যদিও সেই আশ্বাসে ভরসা রাখা যাচ্ছে না। আমরা প্রতিনিয়ত ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করছি। কিন্তু সংসদে আরও পঁচিশ বছরের জন্য নারী আসন সংরক্ষিত হয়ে মনোনীত নারীদের জন্য রাখা হলো- এই নিয়ে কোনো ওজর-আপত্তি চোখে পড়ছে না। জোরালো কোনো প্রতিবাদ রাজপথে দেখিনি, ফেসবুকও নীরব ছিল এই বিষয়ে।
গত ৩০ জানুয়ারি সকালে বিবিসি বাংলায় প্রস্তাবিত সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচার হয়। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মো. আবদুর রাজ্জাকের সাক্ষাৎকার শুনি। সেখানে তিনি যা বলেন তার সারমর্মটা এইরকম- সংসদ সদস্যদের কাজ খুব কঠিন। এই কাজ করা নারীদের জন্য কষ্টকর। সংসার সামাল দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া নারীর জন্য সহজ নয়। ফলে আরও বেশ কিছুদিন বাংলাদেশের নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হওয়া দরকার আছে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যর মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা। আইন প্রণয়ন হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নীতি- নির্ধারণ। নীতি-নির্ধারণ মেধা ও মননের কাজ। মানুষ হিসেবে মেধা এবং মনন পুরুষের চেয়ে নারীর কম- এমন কথা বৈজ্ঞানিক কোনো গবেষণায় নেই। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রীয় নীতি নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে বরাবর নারীদের অবহেলা করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের ৩০০ নির্বাচনী এলাকায় জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে হয়। এতে নারী-পুরুষ যে কেউ অংশ নিতে পারেন। দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যদিও আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও বিরোধী দল প্রধান নারী, রাজনৈতিক দলগুলোতেও বিপুলসংখ্যক নারী আছেন। তবু সমাজের আর সব ক্ষেত্রের মতো রাজনৈতিক দলেও পুরুষের প্রাধান্য, নির্বাচনে মনোনয়ন পান পুরুষেরা। সংসদে তাই নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের সংখ্যা দৃষ্টিকটু রকমের কম।
১৯৭২-এর সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য ১৫টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। নিয়ম করা হয়েছিল, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নারী সদস্যদের মনোনয়ন করবেন। তখন দশ বছর নারীরা সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হয়ে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে ভাবা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ বাড়িয়ে ১৫ বছর এবং আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০ করা হয়। এরপর ২০০৮ সালে অষ্টম সংসদে নারী আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। নবম সংসদ ২০১১-এর ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করে। ওই সংশোধনী অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনও ওই সংসদের মেয়াদকাল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। এবছর সংবিধানের সতের সংশোধনীতে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বাড়ানো হয়েছে। তারমানে ২০৪৪ পর্যন্ত নারী সংরক্ষিত আসন মনোনীত হয়ে সংসদ সদস্য হবেন।
এখন ২০১৮ সাল। জীবন-যাপনের সবরকম আয়োজনেই বাংলাদেশের নারী তার সক্ষম অবদান সুনামের সাথে রেখে চলেছেন। আমাদের নারীরা বিশ্বময় পর্বত জয় করছেন, ক্রিকেট, ফুটবলসহ অন্যান্য খেলার মাঠে সদর্পে খেলছেন, রত আছেন বিজ্ঞানের আবিষ্কারে, সরব আছেন শিল্প-সংস্কৃতিতে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্যবসা-বাণিজ্যে। আর নিজের শরীর থেকে সন্তান জন্ম দিয়ে পরিবার গড়তে এবং বাড়াতে ভূমিকা তো রেখেই চলেছেন। এমনকি প্রয়োজনে একাই সন্তান পালন, ভরণপোষণের দায়িত্বও পালন করছেন সমান দক্ষতায়। সন্তানকে বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলায় মায়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের নারীরা সেই ভূমিকাও নীরবে পালন করে যাচ্ছেন। তবে সংসদ সদস্য হিসেবে কেন তার জন্য আসন সংরক্ষণ করা? সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি আপলোড করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ভিডিওটি রাতে ধারণ করা। সেখানে সিএনজিতে বসা উত্তেজিত এক তরুণীকে কথা বলতে দেখি। কথোপকথনে বুঝতে পারি, পুলিশ তল্লাশির নামে তার সিএনজি থামিয়েছে। তরুণী কেন এত উত্তেজিত উঠলেন- সেটি এই ভিডিও থেকে জানা যায় না। তবে শুনতে পাই পুলিশ সদস্যরা তাকে বেশ কিছু অবমাননাকর কথা বলছেন। রাত আড়াইটায় কেন বাইরে, একলা কেন, বিশ্বসুন্দরী নন যে তার দিকে তাকিয়ে থাকা হবে, কোন মন্ত্রীর মেয়ে ইত্যাদি। পুলিশবাহিনীর দু’চারজন সদস্যর মুখ থেকে কথাগুলো শুনলেও- এগুলো আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কথা। এই সমাজ রাতের অন্ধকারে পাহারাদার ছাড়া নারীদের দেখতে অভ্যস্ত নয়। পুলিশ শুধু হেনস্তামূলক কথা বলার মধ্যে থাকেনি, ওই তরুণীকে সামাজিকভাবে অপদস্ত করার জন্য ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশ করেছে। তবে ভিডিও ক্লিপটি ভাইরাল হওয়ার সাথে সাথে মানুষ এর বিরোধিতা করেছে। পুলিশের এই আচরণের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে, সকলে পুলিশের এই আচরণের নিন্দা করেছেন। সেই নিন্দার ঝড়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ টহলকারী চার পুলিশ সদস্যকে সাসপেন্ড করেছে। হয়তো শাস্তিও পাবেন তারা।
তো আমাদের সমাজ এখন এইরকম জায়গায় আছে। এই সমাজে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা আছে, একই সাথে আছে নারীর অধিকার বিষয়ে সচেতনতাও। এইখানে মেয়েদের অবমাননা হলে তার প্রতিবাদ হয়। প্রয়োজনে একজন নারী রাতে বাইরে যাবেন এবং এজন্য তাকে হেনস্তা করা যাবে না। একজন পুরুষ যেমন যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় চলাচল করতে পারেন, তেমনি একজন নারীও সেটা পারেন। তাকে বাধা দেয়া যাবে না। তার মানে নারীর অধীন হয়ে থাকার ব্যাপারে সমাজের সায় নেই।
এই ২০১৮ সালে বসে আমরা তবে কেন আরও ২৫ বছরের জন্য সংসদে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করছি? সংরক্ষণে মনোনয়ন দিচ্ছি? মনোনীত হয়ে সংসদে যাওয়ায় সম্মত হচ্ছি?

আরো খবর

Disconnect