ফনেটিক ইউনিজয়
আহমদ ছফার বঙ্কিমবিচার
আবুল কাসেম ফজলুল হক

পূর্ব প্রকাশের পর
বীরপূজা, ব্যক্তিপূজা ইত্যাদি নানা জাতির মধ্যে নানাভাবে চালু আছে। উনিশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ কার্লাইল ১৮৪০-এর দশকে Heroes and Hero Worship নামে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী গ্রন্থ লিখেছিলেন। ইউরোপীয় সভ্যতায় সেই বই কিছু প্রভাব ফেলেছিল। বইটিতে Hero I Charisma (সম্মোহনশক্তি), ধর্মীয় বীর, জননেতা বীর, দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক-চিন্তক বীর, কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী বীর, - জাতীয় জীবনে এ-সবের ভূমিকা তিনি আলোচনা করেছেন। বীরদের সাচ্চাভক্ত, অন্ধভক্ত, ভ-ভক্ত ইত্যাদির ভূমিকা তিনি তাঁর উপলব্ধি অনুযায়ী ব্যক্ত করেছেন। কার্লাইল বীরপূজাকে ক্ষতিকর মনে করে জনমন থেকে বীরপূজার প্রবণতা দূর করার চেষ্টা করেছেন। মূর্তিপূজা ও ভাবমূর্তির পূজা কোনোটাই বিজ্ঞান সম্মত নয়। বাংলাদেশে এখন বীরপূজা, বীরের অন্ধভক্ত, বীরের ভ-ভক্ত ইত্যাদির প্রাচুর্য আছে। সাচ্চাভক্ত অবশ্য খুব কম। প্রগতির প্রয়োজনে এ বিষয়ে মূল্যবোধ ও বিচার-বিবেচনা দরকার।
আহমদ ছফাও কিছু লোকের কাছে বীর। তাঁদের মধ্যে অন্ধভক্ত এবং ভণ্ডভক্তও রয়েছেন। তাঁরা অত্যন্ত কর্মতৎপর। সাচ্চাভক্তও কি আছেন? এ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য, আহমদ ছফার জীবন ও কর্মেরও বিচার-বিশ্লেষণ দরকার। জাতীয় পর্যায়ে ভক্তি অন্ধ কিংবা ভণ্ড প্রকৃতির হলে তা ক্ষতির কারণ হয়। সাচ্চাভক্তি কি সহজে দেখা দেয়? জাতীয় জীবনে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি সমর্থন ও সক্রিয়তা এবং অসত্য ও অন্যায়ের প্রতি অসহযোগ ও ঘৃণা একান্ত দরকার। তা না থাকলে জাতির জীবন অসার হয়ে পড়ে। আহমদ ছফা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলেন, বন্ধুও ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আমি যতটা জানি, ততটা হয়তো খুব কম লোকেই জানেন। সে বিষয়ে যেতে চাই না। ছফার লেখা বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পড়লে বোঝা যায়। শক্তির সঙ্গে দুর্বলতার পরিচয়ও তাঁর লেখায় আছে।
আহমদ ছফার লেখায় নানা গুণ আছে, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ভুলভ্রান্তিও আছে। তিনি আত্মপ্রচারে অত্যন্ত তৎপর ও পারদর্শী ছিলেন। তাঁর লেখক-ব্যক্তিত্বকে বুঝতে হলে নিরাসক্ত মন নিয়ে, বিশ্লেষণমূলক ও বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাঁর রচনাবলী পাঠ করা দরকার। আমার ধারণা, তাঁর মানসপ্রবণতা ও মতামতে মৌলিক ত্রুটি আছে। তিনি কবি, ছোটগল্পলেখক, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, সর্বোপরি একজন চিন্তক। অনায়াসে লিখতেন, স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। কর্মীও ছিলেন তিনি। তাঁর লেখা, চিন্তা ও কাজের মূল্যবিচার কেবল অন্ধ ও ভ-ভক্তদের দ্বারা সম্পন্ন হতে পারে না। সাচ্চাভক্ত দরকার। মূল্যবোধ, যুক্তি ও বিচার-বিবেচনা দরকার।  
আমরা চাই, বাংলাদেশে নতুন রেনেসাঁস। তার জন্য দরকার অতীতের রেনেসাঁসের তাৎপর্য গভীরভাবে উপলব্ধি করে আজকের বাস্তবতা ও সম্ভাবনার উপলব্ধি নিয়ে নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। আগেকার রেনেসাঁস ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে নবসৃষ্টির অভিযাত্রা। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের ব্যাপারও তাতে ছিল। ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধারণার জায়গায় মানুষকেন্দ্রিক ধারণা প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। বিরোধের মোকাবিলা করে রেনেসাঁস বিকশিত হয়েছিল। রেনেসাঁসের মর্মে ছিল প্রগতির চেতনা। আজ নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের অন্যায়-অবিচার, ভাওতা-প্রতারণা, ভ্রান্তি, মিথ্যা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হওয়া ও নবসৃষ্টির কাজে নিবেদিত হওয়া। রেনেসাঁসে সব সময় আবিষ্কার-উদ্ভাবন থাকে। অতীতকে বর্জন করে কিংবা অস্বীকার করে কিংবা বিকৃত করে ‘গতি’ সম্ভব হলেও ‘প্রগতি’ সম্ভব হয় না। ক্লাসিকদের প্রতি আকর্ষণ ও শ্রদ্ধাবোধ দরকার। নতুন রেনেসাঁস সৃষ্টির জন্য নতুন ক্লাসিক সৃষ্টির স্পিরিট দরকার। দরকার উন্নত নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টির আবেগ।
আহমদ ছফাও রেনেসাঁস চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন মুসলিম রেনেসাঁস। তাঁর চিন্তা মনে হয়, ১৯৪০-এর দশকের ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র চিন্তার ধারাবাহিকতায় বিকশিত। বাঙালি মুসলমানদের পশ্চাৎবর্তিতায় তিনি ব্যথিত। ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইতে তিনি বাঙালি মুসলমানদের মনের যে পরিচয় দিয়েছেন, তাতে মুসলমানদের পশ্চাৎবর্তিতার জন্য তাঁর তীব্র মনোবেদনার প্রকাশ আছে। তবে এই বিবরণ মনগড়া- বাস্তবের সঙ্গে এর মিল অল্প আছে। এভাবে মনের ক্ষোভ প্রকাশ করে আঘাত দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের উন্নতিতে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব নয়। এতে বরং তাদের হীনতাবোধ বাড়ছে, মুসলমানি চেতনা শক্তিশালী হচ্ছে না, বিকারপ্রাপ্ত মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলিম রেনেসাঁসের স্পিরিট নেই - রেনেসাঁসের ধারায় উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টাও নেই। ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র মুসলমানি রেনেসাঁ সৃষ্টির চেষ্টা ব্রিটিশ আমলেই শেষ। সেটা দেখা দিয়েছিল মুসলিম লীগকে ভিত্তি করে। ১৯৪৭-এর পর ঢাকায় তার কোনো বিকাশ কি ঘটেছে? তমদ্দুন মজলিশের পাকিস্তানবাদ তো স্ফুলিঙ্গের মতো ব্যাপার ছিল। ১৯৪৭ সালে আরম্ভ হয়ে ১৯৫২ সালে এসে তা নিষ্প্রভ হয়ে যায়। মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইসলামি চেতনার যে পুনরুজ্জীবন দেখা যাচ্ছে, তাতে রেনেসাঁসের কোনো অভিব্যক্তি নেই। ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইয়ের ‘উত্তর ভূমিকা’য় আবুল ফজল সম্পর্কে ছফা যেসব কথা লিখেছেন তাও মনগড়া। আবুল ফজল কখনও নাস্তিকতা প্রচার করেননি। রাজনীতিতে ইসলামের অপব্যবহার দেখে লেখার মাধ্যমে তিনি যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন, তাতে আইয়ুব সরকারের মুসলিম লীগের লোকেরা তাঁকে নাস্তিক বলে তিরস্কার করেছে। আবুল ফজল কখনো নামাজ-রোজার বিরুদ্ধে কিছু প্রচার করেননি, - কাপড়ের গোলটুপি কখনো কখনো তাঁর মাথায় দেখা গেছে। তিনি ধর্মান্ধতার ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার ঘোর বিরোধী ছিলেন। ছফা যা লিখেছেন তা প্রকৃত ঘটনার বিবরণ নয়, মনগড়া বিবরণ। ছফার লেখায় আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহের হোসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির প্রমুখের চিন্তাধারা ও কাজকর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাবের প্রকাশ আছে। তমদ্দুন মজলিশের সঙ্গে ছফার সংশ্রব ছিল। পরে জাসদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হলেও, তমদ্দুন মজলিশ এবং আবুল হাশিমের প্রভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মোশতাকের পর বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়ার পর আবুল ফজল সরকারের মন্ত্রী-পর্যায়ের উপদেষ্টা হয়ে অনুচিত কাজ করেছিলেন এবং তাতে তাঁর মর্যাদাহানি ঘটেছে। আমি নিজেও এজন্য লিখিতভাবে তাঁর কাজের নিন্দা করেছি। তবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা হারাইনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব নিজে উদ্যোগী হয়ে আবুল ফজলকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু মুজিব-শাসন নিয়ে আবুল ফজল সন্তুষ্ট ছিলেন না। উপাচার্য থাকা কালে শিক্ষা বিষয়ক কিছু ব্যাপার নিয়ে তিনি একাধিকবার সাংবাদিক সম্মেলন করে সরকারি নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সরকারের উদ্দেশ্যে নানা রকম পরামর্শও তাঁর তখনকার লেখায় আছে। পরে সায়েম সরকার তাঁকে উপদেষ্টা হিসেবে পাওয়ার চেষ্টা করে এবং সেই চেষ্টায় সাড়া দিয়ে তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হন। আমাদের অবশ্যই ঘটনাবলি যেভাবে ঘটেছিল সেভাবে দেখার চেষ্টা করা উচিত। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের উক্তি ছফা নিজের ভাষায় যেভাবে উল্লেখ করেছেন তা বহুলাংশে মনগড়া। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শ বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শ অবলম্বন করেই বিকশিত। ছফা তাঁর বইগুলোতে নানা প্রসঙ্গে নিজের মতলব অনুযায়ী অনেক কথা বানিয়ে লিখেছেন।
ছফা তাঁর বইটিতে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসা করেও অনেক কথা লিখেছেন। তবে মুসলমানদের মনে বঙ্কিম-সাহিত্যের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টির যে চেষ্টা করেছেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়। ব্রিটিশশাসিত বাংলার রেনেসাঁস থেকে মুসলমানদের মনকে সরিয়ে এনে মুসলমানি রেনেসাঁস সৃষ্টির চিন্তাও কল্যাণকর নয়। ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বাঙালি মুসলমান সমাজে চিন্তাচর্চা এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসের বন্ধন থেকে মুক্ত করার ও রেনেসাঁসের ধারায় চলার যে চেষ্টা করেছিল, তাকে কলকাতা-অনুসারী মনে করে ছফা তার প্রতি বিরূপতা সৃষ্টির যে চেষ্টা করেছেন, তাও সমর্থনযোগ্য নয়। কোনো কোনো দিক দিয়ে এমনও মনে হতে পারে যে ছফা সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ও সৈয়দ আলী আহসানের চিন্তাধারার অনুসারী। আমি যতটা দেখেছি তাতে বলতে পারি, প্রথমে ছফা তমদ্দুন মজলিশ ও আবুল হাশিমের সঙ্গে এবং পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে সক্রিয় ছিলেন। তবে চিন্তা ও লেখায় ছফার স্বাতন্ত্র্যও ছিল। ছফার আবেগ-উচ্ছ্বাসপূর্ণ লেখা থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্যটাকে বুঝতে পারা সহজ কাজ নয়। ছফার ব্যক্তিগত জীবনও স্বাভাবিক ছিল না।
যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সময়ে প্রতিবাদের ফলাফলের কথাও ভাবা উচিত। ফলাফলের কথা না ভেবে বাংলাদেশে ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে যাঁরা মুসলমানদের মনে ক্রমাগত আঘাত করেছেন এবং গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে ব্যর্থ করে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচার করেছেন, তাঁরা এখন ইসলামের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। তাঁরা সুবিধাবাদী নন তো কী? তাঁদের কাজের ফলাফলের মধ্য দিয়ে আহমদ ছফার চিন্তা কার্যকর হচ্ছে। এতে দেশের কি কোনো কল্যাণ হচ্ছে? ১৯৮০-র দশক থেকেই অনেকে বলছেন, ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে। বাংলাদেশের নতুন রেনেসাঁস, সর্বজনীন গণতন্ত্র ও জনগণের রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার উপায় সম্পর্কে দিকনির্দেশ-মূলক মত প্রকাশ করা এখন বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় কর্তব্য। ইতিহাসের পশ্চাৎগতি নয়, চাই সম্মুখগতি। (সমাপ্ত)
লেখক: অধ্যাপক (অব.) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো খবর

Disconnect