ফনেটিক ইউনিজয়
ঘুরেফিরি কান্তজির মন্দির
মিমি ইসলাম

প্রতিবছর শীত মৌসুম এলেই কেন জানি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা বারবার মাথায় ঘুরপাক খায়। আমরা বন্ধুরা সেই সময়েরই অপেক্ষায় থাকি। খুব বেশি দিনের কথা নয়। কোথাও যাওয়ার ভাবনাই ভাবছিলাম সবাই মিলে। ভেবে ভেবে যখন সবাই ক্লান্ত, তখন এক বন্ধু হঠাৎ বলে বসল, উত্তরাঞ্চলের দিকে যাওয়া যাক। উত্তরবঙ্গেই প্রাচীন কীর্তিগুলোর দেখা পাওয়া যায় বেশি। উত্তরের প্রবেশদ্বারখ্যাত বগুড়ায় ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে বেশ করেকবার। তাই সব মিলিয়ে এবার ঠিক হলো উত্তরের জেলা দিনাজপুরের প্রাচীন কীর্তি কান্তজির মন্দির দেখতে যাব। কথামতোই শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। পরিকল্পনা মোতাবেক আমরা রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে দিনাজপুরগামী একটি বাসে উঠে পড়লাম। তখন সকাল আটটা। যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে আড্ডাও শুরু হয়ে গেল। গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া ও একসময় ঘুমÑএসব করতে করতে কখন যে ঘণ্টা পাঁচেক কেটে গেল, আমরা বুঝতেই পারিনি। বগুড়ার একটি হোটেলের সামনে যাত্রাবিরতি দেওয়া হলো। বিরতি শেষে আবার বাসে চড়ে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়লাম যে যার মতো। আমরা যখন দিনাজপুর পৌঁছাই, তখন গড়ির কাঁটা বিকেল পাঁচটা ছুঁই ছুঁই। তবে সেদিনের মতো আমার শহরের মধ্যেই ঘুরেফিরে দেখলাম। পরদিন সকালে সবাই মিলে রওনা হই কাক্সিক্ষত গন্তব্যে।
দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে, দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে অবস্থিত কান্তজির মন্দির। হইচই করতে করতে আমরা সবাই একটি বাসে উঠে  গেলাম। সকাল তখন নয়টা। রাস্তাটাও খুব বেশি বড় নয়। দিনাজপুর থেকে যেতে সময় লাগে বড়জোর এক ঘণ্টা। বাসের জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম রাস্তার  দুই পাশ দিয়ে চলা সারি সারি আলুখেত, লিচু-বাগান, কলা-বাগান। সময়টা কেটে গেল নিমেষেই। দশমাইল নামের জায়গাটি পার হতেই দূরে স্নিগ্ধ, সরু সেই নদী চোখে পড়ে। আমাদের নেমে যেতে বলা হলো নদীর পাড়েই। উপায় না দেখে আলুখেত মাড়িয়ে সবাইকে নদীর ওপর অর্ধ্ব নির্মিত সেতু পার হতে হলো হেঁটে হেঁটে। নদীর অন্য পাড়ে কান্তনগর। নামের মতোই অদ্ভুত সুন্দর এ গ্রাম। মন্দিরে পৌঁছাতে আরও দশবার মিনিটের হাঁটার রাস্তা বাকি তখনো। সারি বেঁধে সবাই চললাম সেই পথেই।
কান্তজির মন্দির ইটের তৈরি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে তৈরি এটি। এখানে দেশি-বিদেশি মানুষ ভ্রমণ করতে আসেন। কান্তজিউ মন্দির বা কান্তজির মন্দির বা কান্তনগর মন্দির নামে পরিচিত প্রাচীন এই মন্দির। এটি নবরতœ মন্দির নামেও পরিচিত কারণ তিনতলাবিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিল। মন্দিরের গায়ে লেখা রয়েছে প্রাচীন কাহিনি, রামায়ণ, মহাভারতের কথা।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় ১৭০৪ সালে এ মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। রাজা প্রাণনাথ এ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। ১৭২২ সালে প্রাণনাথের মৃত্যু হলে তাঁর দত্তক ছেলে রাজা রামনাথ পুনরায় এর নির্মাণকাজ শুরু করেন। ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য এবং  লোকমুখে শ্রুত আছে, শতাধিক শ্রমিক টানা ৪৮ বছর কাজ করে ১৭৫২ সালে এ মন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ করেন। শুরুতে মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। কিন্তু ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি ভূমিকম্পের শিকার হলে এর চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করলেও মন্দিরের চূড়াগুলো আর সংস্কার করা হয়নি।
পিরামিড আকৃতির মন্দিরটি তিনটি ধাপে ওপরে উঠে গিয়েছে। তিন ধাপের কোণগুলোর ওপরে নয়টি অলংকৃত শিখর বা রত্ন রয়েছে, যা দেখে মনে হয় যেন একটি উঁচু ভিত্তির ওপর প্রকাণ্ড অলংকৃত এক রথ দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরের চারদিকে খোলা খিলান পথ রয়েছে, যাতে যেকোনো দিক  থেকেই পূজারিরা ভেতরের পবিত্র স্থানে রাখা দেবমূর্তিকে দেখতে পান। বর্গাকৃতির মন্দিরটি একটি আয়তাকার প্রাঙ্গণের ওপর স্থাপিত। এর চারদিকে রয়েছে পূজারিদের বসার স্থান, যা ঢেউটিন দ্বারা আচ্ছাদিত। বর্গাকার প্রধান প্রকোষ্ঠটিকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ ইমারত নির্মিত হয়েছে। পুরো মন্দিরে প্রায় ১৫ হাজারের মতো টেরাকোটা টালি রয়েছে। নিচতলার সব প্রবেশপথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে। দুটো ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা হয়েছে, স্তম্ভ দুটো খুবই সুন্দর এবং সমৃদ্ধ অলংকরণযুক্ত। মন্দিরের পশ্চিম দিকের দ্বিতীয় বারান্দা থেকে সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গেছে। মন্দিরের নিচতলায় ২১টি এবং দ্বিতীয় তলায় ২৭টি দরজা-খিলান রয়েছে, তবে তৃতীয় তলায় রয়েছে মাত্র তিনটি করে।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে দিনাজপুরের দূরত্ব প্রায় ৪১৪ কিলোমিটার। এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে রয়েছে বেশ কয়টি আরামদায়ক কোচ সার্ভিস। নাবিল পরিবহন, আগমনী এক্সপ্রেস, এসআর প্লাস, হানিফ এসি ও নন-এসি বাস ইত্যাদি। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে করেও যেতে পারেন দিনাজপুর। সময় বেশি লাগলেও এতে স্বাচ্ছন্দ্য  বেশি।

Disconnect