ফনেটিক ইউনিজয়
আমিয়াখুম
আমাদের সুন্দরতম এক জলপ্রপাত
ভ্রমণ প্রতিবেদক

আমিয়াখুম। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি জলপ্রপাত। বাংলার ভূস্বর্গ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয় এ জলপ্রপাতকে। ভ্রমণের জন্য চমৎকার একটি জায়গা এটি। বাংলাদেশ-মিয়ানমার বর্ডারের কাছাকাছি, বান্দরবান পার্বত্য জেলার থানচি উপজেলায় এ জলপ্রপাতটির অবস্থান। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে প্রবল বেগে নেমে আসা আমিয়াখুমের জলধারা মুগ্ধ করে দেয় সব ভ্রমণপিপাসুকে। এমন দৃশ্য একবার দেখলে মনের গভীরে গেঁথে যাবে সারাজীবনের জন্য। তাই ব্যস্ত জীবন থেকে স্বস্তির জন্য বান্দরবান গিয়ে এ জলপ্রপাতটি না দেখে এলে ভ্রমণই বৃথা যাবে। কারও কারও বাংলাদেশের সুন্দরতম এ জলপ্রপাতের অবস্থান বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম নাক্ষিয়ং নামক স্থানে। থানচি উপজেলা বান্দরবান শহর থেকে  ৭৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বান্দরবান থেকে থানচি যেতে সময় লাগে তিন ঘণ্টা যদি রিজার্ভ করা চান্দের গাড়িতে যান। আর থানচি বাজার অবস্থিত সাঙ্গু নদীর পারেই। তাই ঢাকা থেকে বান্দরবান, এরপর এখান থেকে থানচি পৌঁছালেই হবে। বান্দরবানে এক আত্মীয়র বাসা থাকায় পরিবারের সবাই মিলে মাঝেমধ্যে ওই দিকটা ভ্রমণের সুযোগ হয়। তবে এবার উদ্দেশ্য ছিল শুধুই আমিয়াখুম ঝরনা।
বান্দরবান পৌঁছে একদিনের বিশ্রাম শেষে আমরা যথারীতি থানচি গিয়ে সাঙ্গু নদী ধরে ইঞ্জিনবোটে উজান ঠেলে রওনা দিই পদ্মঝিরি অভিমুখে। নদীর দুই পাশে সবুজে মোড়ানো প্রতিটি পাহাড় যেন মেঘের কোলে শুয়ে আছে অবলীলায়। অপূব সেই দৃশ্য! যেদিকেই তাকাই কেবল মুগ্ধতাই ঘিরে ফেলে। দুই ঘণ্টার ট্রলারযাত্রা শেষে আমরা পৌঁছে যাই পদ্মঝিরিতে। নৌকা থেকে নেমে পাহাড়ি ও ঝিরিপথ পেরিয়ে ত্রিপুরাপাড়া দিয়ে রোমাক্রি খালে  পৌঁছাতেই রাত হয়ে যায়। অগত্যা পাহাড়িদের সহযোগিতায় খাল পার হয়ে পৌঁছাই সাজিয়াপাড়ায়।
সেদিনের মতো সেখানেই রাতে থাকার ব্যবস্থা করেন আমাদের আত্মীয়। গল্প আর স্থানীয়দের সঙ্গে আড্ডায় ভালো কাটে সেই রাত। তাদের কাছ থেকে জানতে পারি,  অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় আমিয়াখুম জলপ্রপাতটি অবস্থিত। আগে আসলে ওখানে লোকজনের আনাগোনা তেমন একটা ছিল না। তবে বেশ কয়েক বছর আগে জলপ্রপাতটি প্রথমে ক্ষুদ্র কোনো নৃগোষ্ঠীর নজরে আসে । এরও বছর কয়েক পর থেকে পর্যটকের আনাগোনা শুরু হয় সেখানে। প্রথমদিকে পর্যটকরা খুব কম যেত। তবে পাঁচ বছর ধরে পর্যটকের আনাগোনা অনেক বেড়েছে। খাওয়াদাওয়া, আর জানা-অজানা অনেক গল্পে রাত কেটে যায়। পরদিন সকালে আমরা রওনা হই। আবারও ঝিরি পার হতে হলো। এরপর উঠে যাই দেবতা পাহাড়ে। পাহাড়ে ওঠার পর দেখা গেল সামনে সুউচ্চ দুটি পাথরের পাহাড়। আর তার নিচ থেকে অবিরাম ভেসে আসছে পানি পড়ার ভয়ংকর শব্দ। আমাদের কারওই বুঝতে বাকি রইল না যে জলপ্রপাতের অনেকটা ওপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এবার নামার পালা। কিন্তু তা যথেষ্টই কষ্টসাধ্য, ঝুঁকিও আছে। কারণ দেবতা পাহাড় থেকে  ১২০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি খাড়া পথ বেয়ে নামতে হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় ধরে আমরা বেশ সতর্কভাবেই নেমে আসি পাহাড়ের নিচে।
পাথর আর সবুজে ঘেরা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে রোমাক্রি খাল। খালে বিশাল সব পাথর। খালের পাশ দিয়ে পাথর পার হয়ে একটু উজানে যেতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল বিস্ময়কর আমিয়াখুম জলপ্রপাত। অভূতপূর্ব সৌন্দর্য। অনেক সময় ধরে আমরা জলপ্রপাতের পানিতে পা ভিজিয়ে আবার একই পথে ফিরে এলাম।

কীভাবে যাবেন
বাস বা জিপে করে সোজা বান্দরবান থেকে থানচি উপজেলায় যাওয়া যাবে। থানচি যেতে প্রায় তিন-চার ঘণ্টার মতো লাগবে। এবার থানচি থেকে নৌকা নিয়ে রোমাক্রি বাজার। থানচি থেকে রোমাক্রি বাজার প্রতিজন ২০০ টাকা করে ভাড়া। রোমাক্রি বাজারে থেকে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটলে নাফাখুম ঝরনার দেখা মিলবে। নাফাখুম ঝরনা থেকে ঘণ্টা কয়েক হাঁটার পর সাজিয়াপাড়া। এখান থেকে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা অসাধারণ সব রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই সমিনে পড়বে আমিয়াখুম ঝরনা।

Disconnect