ফনেটিক ইউনিজয়
চীন দেশে কোমল পর্বতের পথে পথে
ফাতিমা জাহান
শিনপিন গ্রামে লেখিকা
----

চীন দেশের গোয়াংশি প্রদেশের গুইলিন শহরে আমার ট্রেন যখন থামল, তখন বাজে রাত তিনটা। হোটেল আগে থেকেই ইন্টারনেটে বুক করা ছিল, তাই মাঝরাতে হোটেল খোঁজার ঝক্কি পোহাতে হয়নি। ট্রেনে সহযাত্রীদের জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলাম, কী করে হোটেলে পৌঁছাব। তাঁরা বলেন, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই ট্যাক্সি ধরে যাওয়াই ভালো। ট্রেন থেকে নেমেই দেখলাম একদল পুরুষ ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে একটি মেয়েও সেই মাঝরাতে তাদের ট্যুর প্যাকেজ কেনার জন্য ট্রেন থেকে নেমে পড়া যাত্রীদের অনুরোধ করছেন। আমি প্যাকেজ ট্যুরে কোথাও যাই না, তাই সবিনয়ে তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলাম।
ট্যাক্সি ধরে চললাম হোটেলের উদ্দেশে। মাঝপথে ট্রাফিক সিগন্যালে ট্যাক্সি থামল। আশপাশে আর কোনো যানবাহন চোখে পড়ল না। তবু নিয়ম মানার চেয়ে মধুর আর কিছুই নেই, আর সে ব্যাপারে চীনের মানুষজন সতর্ক। ট্যাক্সির জানালা দিয়ে দেখলাম এই সুনসান রাস্তায় একটি কুড়ি-বাইশ বছরের মেয়ে ফুটপাত ধরে চলতে চলতে মুঠোফোনে কাকে যেন টেক্সট করছে। তার হাঁটার গতি ছিল ধীর আর চোখে-মুখে ছিল না কোনো উদ্বেগের ছাপ। আমাদের দেশে কোনো মেয়ে এত নির্বিঘ্নে এ রকম মধ্যরাতে চলাফেরা করছে কল্পনা করা যায়! আর কেন নির্বিঘ্নে আমরা চলাফেরা করতে পারছি না, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
‘সোলো ট্রাভেলিং’ বা একা কোথাও ভ্রমণ করতে যাওয়া আদৌ কি সম্ভব? আমাকে এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন প্রায়ই হতে হয়। অনেকের কাছে শুনি, পরিবারসহ কোথাও ভ্রমণ করাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বা ভালো লাগে না। পাঁচ-ছয়টি পরিবার একসঙ্গে কোথাও গেলে তবেই নাকি ভ্রমণে আনন্দ আসে। অনেক পুরুষও বলে থাকেন, একা ভ্রমণ করার মতো সাহস নাকি তাঁদের নেই। কেন নেই, প্রশ্ন করলে তার সঠিক জবাব তাঁরা কখনোই দিতে পারেন না। আমাদের দেশে ভ্রমণ মানে তিন-চার দিন যেকোনো রিসোর্টে গিয়ে কাটিয়ে আসা। অথবা ট্রাভেল এজেন্টের ঠিক করে দেওয়া সময় ও প্ল্যান অনুযায়ী  সপ্তাহ খানেকের জন্য বেড়াতে যাওয়া।
আমি কোনো শহর বা গ্রামে গেলে নিদেনপক্ষে এক সপ্তাহ কাটিয়ে আসি। এর চেয়ে কম সময়ে সে স্থানের বর্ণ, গন্ধ, সংস্কৃতি বোঝা যায় না। অবশ্য যাদের হাতে একেবারেই সময় থাকে না তাদের কথা আলাদা।
একা মেয়ে ভ্রমণ করে এমন কথা আমাদের দেশে বিরল, অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর মেয়েরাই দূর-দূরান্তে চলে যাচ্ছে ভ্রমণ করতে। এখানে ভ্রমণ বলতে বোঝাতে চাইছি শুধুই ভ্রমণ, কোনো কাজ বা পড়ালেখার উদ্দেশ্যে কোথাও একা যাওয়া নয়। নিজেই নিজের ভ্রমণ প্ল্যান করা, বাস/ট্রেন/প্লেনের টিকেট কাটা, হোটেল বুক করা এবং যেখানে যাচ্ছি, সেখানেও একা ঘোরাফেরা করা। এই কাজগুলো আমাদের দেশের মেয়েদের পক্ষে আদৌ কি সম্ভব? আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলব, কেন নয়? আমাদের দেশের মেয়েরা বাস, প্লেন, রিকশা চালাচ্ছে, সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও নারীরা সমান দক্ষতায় কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে নারীর সরব পদচারণে মুখরিত হয়নি, তবে ভ্রমণে এত অনীহা কেন থাকবে! সমাজব্যবস্থার কারণে? আসলে আমরাই তো সমাজব্যবস্থা, আমরাই নিয়মনীতি তৈরি করি সমাজের দোহাই দিয়ে, আর এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সমাজ নারীবান্ধব নয়। আপনি বলতে পারেন পথেঘাটে তো নারীর নিরাপত্তা নেই। পথেঘাটে নারীর ওপর হামলে পড়ে, নির্যাতন করে কিন্তু পুরুষ। তবে কি এটাই ধরে নিতে বাধ্য হব যে নারীর সমতায় পুরুষ বিশ্বাসী নয়। অবশ্য এতে এটাও প্রমাণিত হয় যে নারীর সাধারণ চলাফেরায় পুরুষই বাধার সৃষ্টি করছে। ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলে কি কোনো পুরুষ নারীর চলার পথে ব্যাঘাত হানতেন?
অনেকেই বলেন, বিদেশ ভ্রমণ ঝামেলামুক্ত। কিন্তু যাঁরা ভাবেন, বিদেশ ভ্রমণে অনেক খরচ তাঁদের বলছি, বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম খরচে বিদেশের অনেক দেশেই ভ্রমণ করা যায়। আর আমাদের দেশে ‘সোলো ট্রাভেলিং’ আমাদেরই শুরু করতে হবে। আগে তো মেয়েরা স্কুল-কলেজেও পড়তে যেত না। কেউ মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রথম শুরু করেছেন, আর সে কারণেই আজ আমরা শিক্ষিত হতে পেরেছি। ঘর থেকে বের হতে পেরেছি শিক্ষার জন্য, তাহলে ভ্রমণের মতো মৌলিক মনোরঞ্জনকেই বা উপেক্ষা করব কী করে!
বাংলাদেশের যে কটা জায়গায় আমি সোলো ট্রাভেলিং করেছি, সেখানে হয়তো বা একটু বুঝেশুনে চলতে হয়। কিছু মানুষ এটা দেখে অভ্যস্ত নয় যে মেয়েরা ঘরের বাইরে যাচ্ছে। সে জন্য তাদের বৈরী মনোভাব তৈরি হয়। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে একা ভ্রমণ শুরু করলে সামাজিক দৃষ্টিকোণও বদলে যেতে বাধ্য। তবে আমার তেমন কোনো অসুবিধাই হয়নি। একা ট্রাভেল করেছি নিজের মতো, কারও সঙ্গে বা কারও সাহায্য নিয়ে নয়। মেয়েরা এগিয়ে আসলে যে কারোরই একা ভ্রমণ করা সম্ভব।
গুইলিন শহরে দুদিন থাকার ইচ্ছে ছিল। চীন দেশের সব শহরই আমাদের দেশ বা ভারতের চেয়েও বড় আর উন্নত মানের। নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধাই রয়েছে সেখানে। এমনকি গ্রামগুলো দেখলেও তাক লেগে যায়। আমি গুইলিন শহরে এসেছি চাংশা শহর থেকে। চাংশা শহর বিখ্যাত, কারণ এটি চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে-তুঙের জন্মস্থান এবং তাঁর রাজনীতিচর্চার স্থান। আর গুইলিন বিখ্যাত শহরের অপরূপ সারিবদ্ধ পাহাড়-পর্বতের জন্য।
মাঝরাতে পৌঁছানোয় আমার অ্যাপার্টমেন্টের হোস্টকে ফোন করে ওঠাতেই হলো। চীনে অনেকেই কোনো অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুমসহ একটা রুম ভাড়া দেন। আমিও সস্তা পেয়ে আর চীনা পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারব ভেবে অ্যাপার্টমেন্টের রুম ভাড়া করলাম। আমার অ্যাপার্টমেন্টের হোস্ট নিচে নেমে এলেন আমাকে ওপরে নিয়ে যেতে। যে পদ্ধতিতে ওপরে গেলাম, সেটায় আধো ঘুমে কিছুই মনে থাকবে না বলে লিখে নিলাম। নিচের প্রধান ফটকে নম্বর লক লিখলাম। তারপর ২৪তলা অ্যাপার্টমেন্টের মূল ফটকের নম্বর কম্বিনেশন এবং শেষে আমার নিজের রুমের দরজার নম্বর। আমার অ্যাপার্টমেন্টের হোস্ট এক বর্ণ ইংরেজি জানেন না। তিনি ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্টের নিচের অংশে থাকেন, আমাকে দিলেন ওপরের অংশে থাকতে। সব কথাই হচ্ছিল ইশারা-ইঙ্গিতে। আমি যে দু-চার শব্দ মান্দারিন জানি, তা প্রয়োগ করি চীন ভ্রমণের সব জায়গায়। অসুবিধা তেমন হয় না। এ দেশের মানুষ ভীষণ সৎ আর বন্ধুবৎসল। আর এ দেশ এতই নিরাপদ যে ধর্ষণ শব্দটি শুনেছে অনেকেই, কিন্তু প্রয়োগ হয় এমন কোথাও শোনা যায়নি। মেয়েরাও কাজে, ঘরে-বাইরে সমান সুবিধা ভোগ করেন। পোশাকের জন্য কেউ ‘বেশ্যা’ আর কেউ ‘সৎচরিত্র’ হয়ে যাবেন, এভাবেও তাঁরা ভাবতে শেখেননি।
পৃথিবীজুড়ে গুইলিন বিখ্যাত এর অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপের জন্য। পাহাড় ও অসাধারণ ভূপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এ অঞ্চল প্রসিদ্ধ। সুশৃঙ্খল প্রাকৃতিকভাবে নির্মিত সারিবদ্ধ পাহাড়ের এ রকম সৌন্দর্য আগে কোনো দেশে দেখিনি।
পরদিন শহর ভ্রমণে বের হলাম। ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম রিড ফ্লুট কেইভ (Reed Flute Cave)। এ গুহাগুলো লাখো বছরের পাললিক শিলা জমে নির্মিত হয়েছে। প্রবাল, জীবাশ্ম, চুনাপাথর ইত্যাদি জমে জমে গুহায় এক অসাধারণ ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। কোনোটা ওপর থেকে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে, আবার কোনোটা নিচ থেকে ওপরে। বিভিন্ন আকারের, কোনোটা পদ্মফুলের মতো, তো কোনোটা মেঘমঞ্জরি। কোনোটা হাতি বা উটের মতো। কিছু গুহার ভেতর নিশ্চিদ্র অন্ধকার, চীন সরকার পর্যটকদের সুবিধার জন্য গুহার ভেতরে হালকা আলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সেখানেও প্রকৃতির উদারতায় ভাস্কর্য ফুটে উঠেছে। প্রতি ঘণ্টায় মনোরম লাইট শো হয়। গুহায় প্রবেশমূল্য ১২০ ইউয়ান।
গুহা ভ্রমণ শেষ করে গেলাম এখানকার স্থানীয় খাবার খেতে সাধারণ মানের রেস্টুরেন্টে। ‘স্টার রেটেড’ রেস্টুরেন্টে একেবারে সাধারণ মানুষের রন্ধনপ্রণালির স্বাদ মেলে না। তাই যেকোনো শহর বা গ্রামে আমি সেখানকার স্থানীয়ভাবে তৈরি খাবার খুঁজে বেড়াই। বুফে সিস্টেমের খাবার, তাই ভিন্ন আইটেমের স্বাদও নেওয়া যায়। আমার মতে, সে খাবার ছিল অসাধারণ, কারণ বেশির ভাগ খাবারই সেদ্ধ বা স্যুপ-জাতীয়।
এরপর চলে গেলাম এলিফেন্ট ট্রাঙ্ক হিল (Elephant Trunk Hill)। প্রবেশমূল্য ৭৫ ইউয়ান। তাওহুয়া এবং লিজিয়াং নদীর মোহনায় অবস্থিত এ পাহাড়টি দেখলে মনে হবে যেন একটি হাতি নিচু হয়ে নদীর জল পান করছে। এলিফেন্ট ট্রাঙ্ক হিল গুইলিনের ‘ল্যান্ডমার্ক’ হিসেবে পরিচিত।
সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম শহরের পথে পথে। গুইলিন শহর এক বিশাল পর্যটনকেন্দ্র। সবকিছুই আধুনিক, সুউচ্চ দালান আর রাস্তায় সুশৃঙ্খল গাড়িবহর সভ্যতা আর উন্নয়নের ইশারা করে যায়। রাতের খাবার খেতে ফিরলাম অ্যাপার্টমেন্টে। অ্যাপার্টমেন্টের হোস্টকে আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম যে আমি স্যুপ-জাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করি। হোস্ট, তাঁর স্ত্রী আর তাঁদের সাত বছর বয়সী কন্যার সঙ্গে ভালোই সময় কাটল।
গুইলিন অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে চলে গেলাম লংশেং রাইস টেরেস দেখতে, যা গুইলিন থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাসে করে গেলে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টার মতো। কেউ চাইলে ট্যাক্সি ভাড়া করেও যেতে পারেন। পাহাড়ের গা কেটে কেটে ধানখেত শুধু ছবিতেই দেখেছিলাম। আজ নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না যে স্বপ্ন এত দিনে সত্যি হলো। সারা দিন লংশেং গ্রামে কাটালাম। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কথা খুব কম হলো, কারণ আমি মান্দারিন বুঝি না। তবে তাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম। আমি বাইরে থেকে এসেছি, তাই তারা ফল, কেক, খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করল। সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে এলাম গুইলিনে।
তৃতীয় দিনে রওনা দিলাম আরেকটি মনোরম স্থান ইয়াংশৌর উদ্দেশ্যে। লি নদীর কোল ঘেঁষে ইয়াংশৌর অবস্থান। এ শহরটি বিখ্যাত আমার মতো ব্যাকপ্যাকারদের জন্য, যারা পিঠে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে স্বল্প খরচে দুনিয়াটা প্রাণভরে দেখার ইচ্ছে রাখে। তবে এর অপরূপ শোভা দেখার জন্যও পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা আসে। গুইলিন শহর থেকে বাসে করে আসতে লাগে দেড় ঘণ্টার মতো। হোটেল অনলাইনে বুক করা ছিল। তাই হোটেল রুমে ঢুকে জানালার পর্দা সরাতেই দেখলাম সেই ভুবন ভোলানো পর্বতরাশি। একেকজন আরেকজনকে বিরক্ত না করে সারি সারি গাঢ় সবুজ কারপেট জড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে আছে।
ইয়াংশৌ আরেকটি কারণে বিখ্যাত, ছোট্ট শহরটি সব ধরনের দূষণমুক্ত, পরিচ্ছন্ন। যদিও গোটা চীনে আমি আমাদের দেশের মতো বায়ু, শব্দদূষণের চিহ্নমাত্র দেখিনি, তা-ও এদের স্ট্যান্ডার্ডে এ শহরটি দূষণমুক্ত।
বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল, আর এর মধ্যেই স্বভাবসুলভ হাঁটতে গেলাম ছাতা মাথায়। দুপুরের খাবারের জন্য পৌঁছে গেলাম ওয়েস্ট স্ট্রিট, যা এখনকার সবচেয়ে জমজমাট জায়গা। হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্যুভিনিয়রের দোকান কি নেই এখানে। আমি অবশ্য সেখান থেকে একটু দূরে নিরিবিলি গ্রামে একটি হোটেলে উঠেছি।
দুপুরের খাবার খেলাম এখানকার বিখ্যাত ফিস কারি আর ভাত। সাত-আট ইঞ্চি মাপের কার্প মাছ খেতে আমার বেশ বেগ পেতে হলো। হালকা মসলাদার এ ডিশটি ট্রাভেলারদের জন্য উপযুক্ত খাবার। মসলা বলতে পেঁয়াজ, কাটা আদা রসুন, টমেটো আর ধনেপাতা। খেয়ে হাঁটতে লাগলাম রাস্তা ধরে লি নদী পর্যন্ত। নদীর পার ধরে হাঁটলাম সন্ধ্যা অবধি।
পরদিন একটা মোটরবাইক ভাড়া করলাম আশপাশের গ্রাম আর দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য। এখানকার মোটরবাইক দেখে আমি খুব কনভিন্সড। যেহেতু পাহাড়ি এলাকা আর যখন-তখন বৃষ্টি হয় তাই বাইকে ছাতা লাগানো আছে। চীন দেশে যতই ঘুরছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি। জনসাধারণের সুবিধার জন্য কত পদ্ধতিই না আছে!
শুরু করলাম যাত্রা ইয়াংশৌ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের ‘মুন হিল’-এর দিকে। মোটরবাইক চালাতে চালাতে পথজুড়ে মনে হলো প্রকৃতি যেন সব সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে। পথে পদ্মপুকুর দেখে থামলাম। বিশাল এলাকাজুড়ে শুধুই পদ্মফুল, যা আমি আগে কখনো দেখিনি। খানিক এগিয়ে দেখলাম ‘বাটারফ্লাই হিল’। থামলাম ভেতরে যাওয়ার জন্য। খানিকটা পাহাড় বেয়ে উঠে চারপাশের দৃশ্য দেখে ছুটলাম মুন হিলের দিকে। সেখানে প্রবেশমূল্য ৫০ ইউয়ান। টিকিট কেটে ভেতরে না গেলে হয়তোবা বুঝতেই পারতাম না যে ভেতরের পাহাড়টি কত মনোরম। পাথুরে পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে গোলাকার চাঁদের মতো ছেদ। দেখলে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে চাঁদ ভেবে।
এরপর ঘুরতে গেলাম গ্রামে। নারী-পুরুষ সবাই চাষাবাদের কাজে ব্যস্ত। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা তখন বাড়িতে তাদের নাতি-নাতনিদের দেখা শোনার কাজ করেন। প্রতিটা গ্রামের রাস্তাঘাট পাকা এবং বাড়িগুলো আমাদের দেশের শহরের মতো দ্বিতল বা ত্রিতল। আরও বিস্মিত হলাম, যখন দেখলাম কৃষকদের বাড়িতে নাগরিক সব সুবিধাই রয়েছে, যেমন টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এসি ইত্যাদি। একটা দেশ কতখানি উন্নতি করলে, গ্রামের সাধারণ চাষিদের ঘরে সব সুখ-সুবিধা এনে দিতে পারে, সেটাই ভাবছিলাম। কৃষকদের মধ্যে দু-একজন ভাঙা ভাঙা ইংরেজি জানেন, তাঁদের সঙ্গে খানিকক্ষণ আলাপ হলো।
সারা দিন পাহাড় আর গ্রামবাসীদের সঙ্গে মিতালী করে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম। হোটেল লবিতে বসে চীন দেশের বিখ্যাত চা পান করতে করতে হোটেল মালিকদের একজনের সঙ্গে আলাপ হলো। তাঁর নাম আছুং, বয়স আমার মতোই হবে, জানলাম, তিনি মাউন্টেন ক্লাইম্বিং করেন, আরও আনন্দের বিষয় তিনি ইংরেজি জানেন। তাঁকে অনুরোধ করলাম, কাছে কোথায় ক্লাইম্বিং করা যায় জানাতে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে একজন রক ক্লাইম্বিং অর্গানাইজারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ঠিক হলো পরদিন সারা দিনের জন্য নিরুদ্দেশ হব রক ক্লাইম্বিং করতে।
পরদিন ভোরে সাইকেল চালিয়ে (যা হোটেল থেকে ফ্রি পাওয়া যায়) চলে গেলাম অর্গানাইজারের অফিসে, সেখান থেকে আমিসহ আরও আটজন ক্লাইম্বার প্রয়োজনীয় ক্লাইম্বিং গিয়ার সংগ্রহ করে দলবেঁধে সাইকেল বহর নিয়ে গেলাম ডিসুই রোডে। সেখানে সাইকেল রেখে কিছু হাঁটাপথ পাড়ি দিয়ে শুরু হলো চুনাপাথরের তৈরি গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে পিচ্ছিল পাহাড় চড়া। পাহাড়ের একদম ওপরে উঠতে ঘণ্টা দেড়েক লাগে আর সেখান থেকে পুরো ইয়াংশৌ শহর দেখা যায়। এ কারণেই এ শহরকে ‘রক ক্লাইম্বারদের মক্কা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশ দেখে, সঙ্গে আনা স্ন্যাকস খেতে খেতে অন্যান্য ক্লাইম্বারদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে দুপুর গড়িয়ে গেল। সূর্যাস্ত দেখে তারপর হোটেলে ফিরলাম।
গোয়াংশি প্রদেশে আমার ষষ্ট দিন। এখানকার বিখ্যাত ‘ফিশিং ভিলেজ’ না দেখে যাওয়া মানে মক্কা তীর্থে এসে মদিনায় না গিয়ে ফিরে আসা। কারণ এ গ্রামের একটি বিশেষ পাহাড়ি জায়গার ছবি চীনা মুদ্রা কুড়ি ইউয়ানে ছাপা আছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতেই বেরিয়ে পড়লাম শিংপিং ফিশিং ভিলেজ দেখতে। ইয়াংশৌ থেকে বাসে করে যেতে লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। কেউ ইচ্ছে করলে ট্যাক্সি করেও যেতে পারেন। তবে ইয়াংশৌর ট্যাক্সি ভাড়া চীনের অন্যান্য শহরের চেয়ে অনেক বেশি, তাই আমি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চলাফেরা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের দেশে বাসে চলাচল করাটা মেয়েদের জন্য এক বিপত্তিকর বিষয়। মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া, উত্ত্যক্ত করা বা চোখ দিয়ে গিলে ফেলার মতো পরিস্থিতি নেই চীনে। তাই নিশ্চিন্তে বাস ভ্রমণ শঙ্কাহীন, আরামদায়ক।
বাস থেকে নেমে হেঁটে প্রথমেই চলে গেলাম সেই বিখ্যাত দৃশ্য দেখতে, যা কুড়ি ইউয়ান নোটে ছাপা আছে। চলে গেলাম জেলেদের গ্রামে। পথে খানিকটা শপিং সারলাম। হাতে বোনা গায়ের চাদর, স্যুভিনিয়র ইত্যাদি কিনলাম।
জেলেদের গ্রাম ভীষণ পরিচ্ছন্ন আর আধুনিক। আমি খুঁজছিলাম এমন কাউকে, যিনি ইংরেজি জানেন। আর আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম এখানকার এক জেলে পরিবারে এক দিনের অতিথি হয়ে যাব। সে রকম ব্যবস্থা এখানে নেই, তবে ইয়াংশৌতে এক ভারতীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ায় তিনি আমাকে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যাদের অতিথি হলাম সে পরিবারের নাম আমিং, যৌথ পরিবার। বেশ হাসিখুশি পরিবার। অবশ্য চীন দেশের সব পরিবারই সুখী যৌথ পরিবার। বাড়িতে প্রবেশ করতেই বিভিন্ন রকমের ফল ও কেক দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো। এরপর দুপুরে ভাতের সঙ্গে কয়েক রকমের সবজি, বেশির ভাগই সেদ্ধ আর মাছ পরিবেশন করা হয়। খেতে খেতে তাদের পরিবারের আটজনের সঙ্গে লাইফস্টাইল, উৎসব, সামাজিক ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হলো। কেউই ইংরেজি জানেন না শুধু ১৪ বছরের লি ছাড়া, তিনিই ভাষান্তরের কাজ করছিলেন। আরেকটা কথা, জেলে বাড়িতে কিন্তু এক ফোঁটা মাছের গন্ধ ছিল না।
বিকেলে চলে গেলাম মাছ ধরা দেখতে। লি নদীতে জেলেরা সন্ধ্যা থেকে লন্ঠন জ্বালিয়ে মাছ ধরেন। মাছ ধরার জন্য এখানে করমোরেন্ট নামের এক পাখি ব্যবহার করেন আর সেটা দেখার জন্যই আমি মাছ ধরা দেখায় এত আগ্রহী। পাখির গলায় প্রথমে সুতা বাঁধা হয়, যাতে জলের নিচে গিয়ে পাখি মাছকে পুরোপুরি গিলে ফেলতে না পারে আর জেলেরা যেটা পরে জলের ওপর থেকে সংগ্রহ করে নেয়। জেলেদের পোষা এ পাখিগুলো তাই জলের নিচ থেকে সোজা জেলেদের কাছেই ফিরে আসে। জেলেরা মাছ ধরার জন্য বাঁশের তৈরি ভেলা ব্যবহার করেন।
মাছ ধরা দেখে ফিরে গেলাম আমার হোস্টের ডেরায়। রাতে খেলাম মাছের তৈরি নুডল স্যুপ। খেতে অসাধারণ। পরদিন সকালে আমিং পরিবারকে বিদায় জানিয়ে আর দুহাত ভরে তাদের দেওয়া উপহার আর মন ভরে মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বাসে চেপে রওনা দিলাম গুইলিন এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। সেখান থেকে বিমান উড়িয়ে নেবে আমার পরবর্তী গন্তব্য চীনের ঐতিহাসিক শহর শিয়ানে।

উল্লেখযোগ্য তথ্য:
গুইলিন শহরে চীনের যেকোনো শহর থেকে ট্রেন বা প্লেনে যাওয়া যায়। যেকোনো শহরের হোটেল স্টাফরা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
গুইলিন শহরে প্রায় ৪০টির মতো পাঁচতারা আর কয়েক শ চার-তিন তারা হোটেল আছে, যা অনলাইনে বুক করা যায় আগে থেকেই।
ইয়াংশৌ শহরে বেশ কিছু পাঁচতারা মানের হোটেল আছে। এর পাশাপাশি সব বাজেটের হোটেল/হোস্টেল তো আছেই।
শিংপিং গ্রামেও কিছু উন্নত মানের হোটেল আছে।

আরো খবর

Disconnect