ফনেটিক ইউনিজয়
রাজধানীর কাছেই কালের সাক্ষী
মিমি ইসলাম

মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরে অবস্থিত ৩৫০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি মোগল স্থাপত্য ইদ্রাকপুর কেল্লা বা দুর্গ। তৎকালীন মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে নদীবেষ্টিত রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ সমগ্র এলাকাকে সুরক্ষিত রাখতে ইছামতী নদীর তীরে দুর্গটি নির্মাণ করা হয়। কালের পরিক্রমায় সেই ইছামতীর গতিপথ পাল্টে গেছে। তবে দুর্গটির এক থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে ধলেশ্বরী, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদী এখনো বহমান। ইছামতী ও মেঘনা যেখানে মিলিত হয়, সেখানে নির্মিত এ দুর্গটি সামরিক কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সুরঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সঙ্গে এই দুর্গের সংযোগ ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশিত মুন্সিগঞ্জের ইতিহাস (২০০৩) বইয়ে দুর্গটি সম্পর্কে লেখা হয়, বারো ভূঁইয়াদের দমন এবং ঢাকাকে জলদস্যুদের কবল থেকে রক্ষার জন্য সুবেদার মীর জুমলা ১৬৬০ সালে ইদ্রাকপুর দুর্গ নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, এ দুর্গকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মুন্সিগঞ্জের বসতি। স্থাপনাটি থেকে প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে ইদ্রাকপুর নামে একটি এলাকাও রয়েছে।
১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় মোগলদের পতন হলে ইদ্র্রাকপুর দুর্গটি ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কর্তৃপক্ষ দুর্গটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। এটাতো গেল বিভিন্ন মাধ্যম হতে পাওয়া তথ্য। তবে ঐতিহাসিক এসব স্থান তো শুধু বইয়ের পাতার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। দু’চোখ ভরে দেখা বা কাছে গিয়ে জানার সাধ জাগে অনেকেরই। তবে সময় বা সুযোগেরও প্রয়োজন পড়ে। আর ঈদের ছুটির মতো বড় সুযোগ আমাদের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে খুব বেশি জোটে না।
যাই হোক, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঈদের একদিন পরই এক আত্মীয়সহ তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম কয়েকজন। বেশ সকাল বেলাই রওনা হই আমরা। আর ঈদের কারণে ঢাকার রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকায় গুলিস্থান যেতে সময় লাগেনি মোটেও। এখান থেকে যখন আমরা মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর পৌঁছালাম ঘড়ির কাটায় তখন সকাল ১১টা। এখান থেকে ইদ্রাকপুর কেল্লা বেশি দূরে নয়। অল্প কিছু পরই আমরা হাজির হলাম দূর্গের দরজায়। নিজেদের সঙ্গে আনা নাস্তা আর চা পর্ব শেষে আমরা ঢুকে পড়লাম কেল্লার ভিতরে।
সুউচ্চ প্রাচীরবিশিষ্ট এই দুর্গের প্রতিটা কোণায় রয়েছে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী। দুর্গের ভেতর থেকে শত্রুর প্রতি গোলা নিক্ষেপের জন্য প্রাচীরের মধ্যে অসংখ্য চতুষ্কোণাকার ফোঁকর রয়েছে। এর একমাত্র খিলানাকার দরজাটির অবস্থান উত্তর দিকে। মূল প্রাচীরের পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে ৩৩ মিটার ব্যাসের একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে। এই মঞ্চকে ঘিরে আরেকটি অতিরিক্ত প্রাচীর মূল দেয়ালের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার জন্য এটি নির্মিত হয়।
দুর্গে রয়েছে প্রাচীরবেষ্টিত একটি গোলাকার বৃহদাকৃতির ড্রাম। বৃহত্তর উন্মুক্ত চত্বর থেকে ড্রামের অংশে পৌঁছানোর জন্যও একটি পথ আছে। দুর্গটির অন্য একটি লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হলো ড্রামের পাদদেশে ভূগর্ভস্থ একটি কুঠরি এবং তাতে অবতরণের জন্য নির্মিত সিড়ি। এ সিড়িটি নাকি ছিল একটি গোপন সুরুঙ্গপথের অংশ যার মধ্য দিয়ে দুর্গে অবস্থানকারীরা জরুরি অবস্থায় নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরে যেতে পারতো। মূলত এটি একটি গোপন ভূগর্ভস্থ কক্ষে অবতরণের পথ এবং সে কক্ষটি ছিল অস্ত্রশস্ত্র ও  গোলাবারুদ মজুত রাখার গুদামঘর। দুর্গের প্রধান ফটক উত্তরদিকে। ফটকের উপরের অংশে রয়েছে শীর্ষভাগ খিলানাকার ফোকর বিশিষ্ট ও মারলন শোভিত উঁচু আয়তাকার বুরুজ। এ অংশটি ছিল প্রহরীদের কক্ষ।
মোগল স্থাপত্যের একটি অনন্য কীর্তি হিসেবে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ১৯০৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। এটিকে পর্যটন কেন্দ্রের আওতায় নেওয়া হলেও দুঃখজনকভাবে পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য খুব একটা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আবার অনেকেই এ ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্পর্কে জানেন না। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলে গৌরবময় ঐতিহ্যের পাশাপাশি দেশের পর্যটন শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে ইদ্রাকপুর দূর্গ। আর সে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই।

কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ বেড়াতে গেলে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব। বাসে করেও খুব সহজেই যাওয়া যায় সেখানে। ঢাকার গুলিস্তান থেকে সবসময় বাস পাওয়া যায়। পাশাপাশি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া ছোট ছোট কিছু লঞ্চে করে নৌপথেও এখানে যাওয়া যায়। ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ বাস ভাড়া পড়বে ১০০ টাকার মতো। আর ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলে তো কোনো অসুবিধাই নেই। ওখানে গিয়ে যারা থাকতে চান তাদের জন্য জেলা সদরে কিছু মানসম্পন্ন হোটেলও রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা রিসোর্ট, হোটেল থ্রি-স্টার, কমফোর্ট ইত্যাদি অন্যতম।

Disconnect