ফনেটিক ইউনিজয়
ঝিলপাড়ের বাংলো ও জোড়া রঙধনু
মঈনুস সুলতান

বাংলোয় ঢুকতে গিয়ে প্রথমেই খেয়াল হয় আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য লিসোটোর নিসর্গপটের বৈচিত্র্যের কথা। খানিক আগেও জঙ্গল ছিল উষর, বাদামি ঘাসে হলকা-পাতলা কয়েকটি কাঁটাওয়ালা গাছ বিরিক্ষের সমাহার। এদিককার প্রকৃতি সম্পূর্ণ সবুজ। একটি ঝিলের পাড়ে ছনের সাদামাটা ঘরটি আমি ও আমার ভ্রমণসঙ্গী নৃত্যশিল্পী নাকাতুলের খুব ভালো লাগে। ভেতরে খাট, সোফা ও ডাইনিং টেবিলের আসবাবÑ সবকিছু বেতের। সাউথ আফ্রিকার ব্রিংক দম্পতি অনেক বছর আগে বাংলোটি তৈরি করিয়েছিলেন তাদের ভ্যাকেশন হোম হিসেবে। পরে ওখানে ক্ষমতার পালাবদল হয়। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে ‘ব্ল্যাক এমপ্লয়মেন্ট এমপাওয়ারমেন্ট’ কর্মসূচির সূচনা হলে শ্বেতাঙ্গ ব্রিংক দম্পতির নারী-পুরুষ দুজনে চাকরি হারান। মি. ইয়োহান ব্রিংক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করতেন। তাকে অবসর দেয়া হয়। তার স্ত্রী মারিয়া ব্রিংক একটি কলেজের প্রশাসক ছিলেন, তিনিও চাকরিচ্যুত হন। সাউথ আফ্রিকায় বসবাস করা তারা নিরাপদ মনে করেননি। তাই এখানে এসে বাংলোর পেছনের গার্ডেন শেডে বাস করছেন। আর বাংলোটি ভাড়া দিচ্ছেন পর্যটকদের কাছে। ফ্লোরে মাদুর বিছানো ছিমছাম বেডরুম নাকাতুলের পছন্দ হয়। আমি ভেতরের দিকের উঠানে দাঁড়িয়ে মি. ইয়োহান ব্রিংককে হ্যালো বলি। তেমন বয়স্ক নন মানুষটি। গার্ডেন শেডের বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আছেন আইস-টির পেয়ালা হাতে। সামনে টিপয়ে রাখা একটি পেপারব্যাক ও খানকতক পুরনো পত্রিকা। চেহারা দেখে মনে হয়, জীবনে তার অবসর এসেছে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই।
মারিয়া ডাইনিং টেবিলে ঢাকা দিয়ে রেখেছেন, দুখানা কুকুম্বার স্যান্ডউইচ ও টিকোজি পরানো এক পট ধোঁয়া ওঠা চা। স্যান্ডউইচ খেতে খেতে আমাদের সফর গাউড মাকগাথলা মাবই ও ড্রাইভারের খোঁজ নেই। গাড়িসহ এরা গেল কোথায়? নাকাতুলে বলে যে, কাছেই একটি গ্রামের বোটল শপে তারা ড্রিংক করতে গেছে। গাড়িতে আছে কাঁথা-বালিশ ও কম্বল। পানাপান শেষ হলে পর প্রশস্ত সিটে সটান শুয়ে তারা কাটিয়ে দেবে রাত। অবশ্য কাল সকালে এসে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে মাসেরু শহরে। স্যান্ডউইচের সাথে কাটা কিউই ফল দেখে আমি অবাক হই। মারিয়া ব্রিংক পেয়ালায় চা ঢালতে ঢালতে বলেন, মি. ব্রিংক ঝিলের পানি ব্যবহার করে কিচেন গার্ডেনে কিছু সবজি ও ফলের চাষ করছেন। পানির ব্যবহার করছেন তিনি খুব সাবধানে ড্রিপ পদ্ধতিতে। এতে গাছের গোড়ায় সারা দিনমান ফোঁটায় ফোঁটায় সরু পাইপ থেকে ঝরে পানি। তিনি বাগানে কিউই ফলের চাষ করছেন।
বেলা পড়ে আসছে, তাই আমরা একটু হাঁটতে বেরোই। দেখি, বাংলোর সামনে পুকুরের পাড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে চমৎকার একটি হিরণ পাখি। আমি তার স্নাযাপশট নিতে গেলে, সে টুক টুক করে কাছে এসে আমাকে পরখ করে দেখে। আমার হাতের মুনস্টোন পাথরের আংটি বোধ করি তার পছন্দ হয়। সে ঠোঁটে পাথরটি আলতো করে ঠুকে দেয়। বারান্দা থেকে মি. ইয়োহান হাঁক পাড়েন, ‘অপেরা, টাইম ফর ইয়োর আফটারনুন স্নাযাক।’ পাখিরা বিকালে জলখাবার খায় নাকি? হিরণটি টুকটুকিয়ে তার কাছে গেলে, তিনি তাকে পিরিচে করে কাটা কিউই ফল খেতে দিয়ে বলেন, ‘দিস ইজ আওয়ার অ্যাডাপ্টেড বার্ড অপেরা। আ ফাইন নাইট হিরণ। সে আমাদের সাথে বাংলোর চিলেকোঠায় বাস করে।’ তিনি অপেরার নীল পালকে হাত বুলাতে বুলাতে আমাদের কাছেই একটি পাইন বনের দিকে হাঁটতে যাওয়ার রাস্তা বাতলে দেন।
বাটিকের স্কার্টের সাথে হলকা হলুদাভ সোয়েটার পরে আমার পাশে পাশে নীরবে হাঁটছে নাকাতুলে। চুল টেনে এমনভাবে গুচ্ছ করে বেঁধেছে যে, মনে হয় তার খোঁপায় গাঁথা পাকা গমের কয়েকটি সোনালি শিষ। পাহাড়ের ঢালে অজস্র পাইনের চমৎকার একটি বীথিকায় নিবিড় হয়ে লেগে আছে বেলা শেষের আলো। আমরা দাঁড়িয়ে পড়ে উপবনের প্রতিটি গাছের সতন্ত্র শেপ খুঁটিয়ে নজর করি। গোধূলির আলো উবে যাচ্ছে দ্রুত। এখানে নির্জনতা এমন প্রখর হয়ে আছে যে, মনে হয়, সন্ধ্যা নামলেই বৃক্ষগুলো নিজেদের মাঝে কথা বলবে ফিসফিসিয়ে। খানিকটা আলো মুছে যেতে যেতে নাকাতুলের চোখ-মুখ রাঙিয়ে দিচ্ছে অপার্থিব এক সোনালি আভায়। তখনই খেয়াল করি, পাইন বনের ওপারে সাদাটে পাথরের শিথানে বাঁকা হয়ে ফুটেছে অসামান্য একটি রঙধনু। দেখতে দেখতে তারও ওপর আলোরিক্ত দিগন্তে আঁকা হয় আরেকটি মিরর ইমেজ রঙধনু। রঙের গাঢ়তা ও তাদের মাঝখানে কালচে-নীলাভ বর্ণবিস্তারের জন্য আমি অনুমান করি, এ বিরল কিসিমের যুগল রঙধনুকে বলা হয়ে থাকে আলেকজান্ডারস ব্যান্ড রেইনবো। বিষয়টি আমি নাকাতুলেকে বলতে যাই। বলি, ‘তুলিকা, ইন ফ্যাক্ট দেয়ার আর ফাইভ অর সিক্স ডিফরেন্ট কাইন্ডস অব রেইনবোজ। দিস ওয়ান ইজ কল্ড আলেকজান্ডারস ব্যান্ড। মোস্ট রেয়ারেস্ট..।’ দেখি, সে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমার মাঝে শিক্ষকসুলভ প্রবণতা আছে। কোনো বিষয়ে তথ্য জানা থাকলে তা সঙ্গীদের আমি বলতে চাই। লেকচারের মতো এ আচরণ যে নাকাতুলে সবসময় পছন্দ করে তা নয়। এ ব্যাপারে আমি সচেতন বলে ভাবি, সে হয়তো রঙধনু নিয়ে আমার তথ্যবহুল আলোচনা পছন্দ করছে না। তাই বলি, ‘দুনিয়ায় কত ধরনের রঙধনু আছে এবং কেন আকাশে কখনওসখনও জোড়া রঙধনু দেখা দেয়, এসব আলাপ করার কোনো দরকার নেই। লেটস নট টক অ্যাবাউট দিস... তুলিকা, প্লিজ টার্ন অ্যারাউন্ড, আসো... একসাথে রঙধনুর সৌন্দর্যকে অ্যাপ্রিশিয়েট করি।’ তখনই খেয়াল করি, তার শরীর শুকনা পাতার স্তূপে আটকে যাওয়া বেনোজলের মতো ফুঁসে উঠছে। খানিক কেঁপে আমার দিকে মুখ ফেরালে আমি বুঝতে পারি, ভেঙে পড়েছে সে অঝোর কান্নায়। আমি নীরবে তাকিয়ে থাকি জোড়া রঙধনুর দিব্য সৌন্দর্যের সামনে আকুল হয়ে ক্রন্দনরতা তরুণীর দিকে। চোখ মুছতে মুছতে সে বলে, ‘মাত্র কয়েক মাস আগে গুড টাইম ক্যাফের গ্রিন রুমে অনেকক্ষণ ড্যান্সের প্র্যাকটিস করে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম বারান্দায়। অস্তগামী সূর্যের আলোয় আমার চোখের সামনে ফুটে ওঠে এ ধরনের একটি যুগল রঙধনু। খুব প্রত্যাশা করেছিলাম, যজম শিশু হবে আমার। ঠিক তখনই ব্যাপারটা ঘটে। খুব কষ্টে বাথরুম অবধি পৌঁছি। দেন আই লস্ট... লস্ট মাই বেবিজ... খুব দ্রুত, তাজা রক্তের উষ্ণ ধারায়...। সিন্স দেন আই হেট দিজ ডাবোল রেইনবোজ।’
বাংলোয় ফেরার পথে আমি তাকে কোনো প্রশ্ন করিনি। কিন্তু সে নিজ থেকেই বলে, ‘যমজ শিশু দুটির ভ্রুণ ছিল আমার কাউবয় ফ্রেন্ড ডিমাকাটসোর কাছ থেকে পাওয়া উপহার। আই ফিল সো স্যাড... স্যাড স্যাড স্যাড... আই ফিল টেরিবল দ্যাট আই কুড নট কিপ দেম।’ আমি এবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘তুলিকা, তুমি কী ডিমাকাটসোকে বিয়ে করবে?’ সে ইনডিরেক্টলি জবাব দেয়, ‘করতে চাইলেও তো অত সহজে বিয়ে করা যাচ্ছে না। ‘লাবোলা’ বা ব্রাইড প্রাইস হিসেবে আমার বাবা চায় ২২টি গরু। ডিমাকাটসোর আত্মীয়স্বজন আমি ভার্জিন নই বলে তা দামদর করে কমিয়ে এনেছে ১৬তে। কিন্তু রাখালি করে ডিমাকাটসো মালিক হয়েছে মাত্র সাতটি গরুর। এক্সট্রা নয়টি গরু জোগাড় করতে তার লেগে যাবে আরও কয়েক বছর।’ লিসোটোয় কনেপণ হিসেবে গবাদিপশু দেয়ার প্রথা সম্পর্কে আমি বিলক্ষণ অবগত। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সাহস পাই না। বছর তিন বা চারেক আগে জিম্বাবুয়েতে যখন নাকাতুলের সাথে প্রথম দেখা হয়, তখন বতসোয়ানার কবি বাতজিলির সাথে তার লিভ টুগেদার নিয়ে অনভিপ্রেতভাবে কৌতূহল প্রকাশ করেছিলাম। ষোড়শী মেয়েটি বাসোটো সম্প্রদায়ের অনুঢ়া কন্যাদের যে বিবাহবহির্ভূত ‘মোটাবো’ বা ‘দৈহিক সম্পর্কে’ তেমন কোনো বাধানিষেধ নেই, তা ব্যাখ্যা করে আমার মতো রক্ষণশীলের পিলে চমকে দিয়েছিল। আমি তার জীবনের অধিক কিছু জেনে আর চমকিত হতে চাই না। সুতরাং নীরবে ফিরে আসি বাংলোয়।
সন্ধ্যা একটু গাঢ় হতেই ব্রিংক দম্পতি পেছনের আঙিনায় খুব গুছিয়ে ক্যাম্প ফায়ারের আয়োজন করেন। আমরা বেতের মোড়ায় আগুন ঘিরে বসে শরীরে উষ্ণতা মাখি। মি. ইয়োহান ব্রিংক শুকনা হরিণের মাংস শিকে গেঁথে াগ্রল করেন। নাকাতুলে তার সিডি ওয়াকম্যানের সাথে দুটি মিনিয়েচার সাউন্ডবক্স জুড়ে দিয়ে তাতে লস অ্যাঞ্জেলেসের রক ব্যান্ড ঈগলসের ডিস্ক চড়ায়। কথাবার্তায় মনে হয়, মাঝে সাঝে এখানে নাকাতুলের পেট্রোন সুহৃদ ডক্টর ইনগ্রাম-হিল তার পপটপ ক্যাম্পার ট্রেইলার চালিয়ে এসে দু-এক রাত কাটিয়ে যান। আচার-আচরণে মনে হয়, নাকাতুলে ব্রিংক দম্পতির সাথে পরিচিত। বাংলোর সুযোগ-সুবিধা ও পথঘাটও মনে হয় তার চেনা। সেও কি তবে ডক্টর ইনগ্রাম-হিলের সঙ্গী হয়ে বাংলোয় কাটিয়ে গেছে দু-এক রাত? মারিয়া ব্রিংক মৃদু হাঁক পেড়ে ডাকেন, ‘অপেরা, সুইট গার্ল, কাম টু মি।’ হিরণ পাখিটি টুকটুকিয়ে এসে তার কোলে বসে। মি. ইয়োহান ব্রিংক চারটি গ্লাসে টনিক ওয়াটার মিশিয়ে ককটেল তৈরি করছেন। আমি জানতে চাই, ‘পাখিটির নাম অপেরা কেন?’ মারিয়া সিগ্রেট লাইট করে জবাব দেন, ‘হিরণ পাখির বাচ্চাটিকে আমরা দত্তক নিই লেইক মালাওয়েতে বেড়াতে গিয়ে। ছানাটি খাবারের প্রত্যাশায় চিঁউ চিঁউ করে ডাকছিল। বছর চারেক হলো সে আমাদের সাথে আছে। আমরা দুজনে ইতালীয় অপেরা শুনতে খুব ভালোবাসি। মাঝে মাঝে ঘরে অপেরার রেকর্ড বাজালে এ কিউট হিরণটি এসে রেকর্ড প্লেয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনে লিরিক। সেই থেকে আমরা তাকে অপেরা বলে ডাকি।’ মি. ইয়োহান আমাদের দিকে ককটেল গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘ইন লিসোটো ইউ রিয়েলি হ্যাভ টু ট্রাই সাম ফায়ার ওয়াটার। সামান্য মামপোর লিকারের সাথে টনিক ওয়াটার মিশিয়ে এ মুনশাইন খেলে মৌতাত খুব জমে।’ আমরা পিরিপিরি পেস্ট মিশিয়ে পোড়া হরিণের মাংসের সাথে মামপোরের ককটেলে চুমুক দিই। নাকাতুলের ছোট্ট সাউন্ডবক্সে বাজছে ‘ওয়ান অব দিজ নাইটস...।’ ককটেলে একটু আমেজ এসে যেতেই আমার চোখ মুদে আসে। মনে হয়, জোড়া রঙধনুটি নেমে এসেছে আমাদের মাথার ওপর। আলোর সাতরঙা সাঁকো বেয়ে দিগন্তের দিকে হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে রাখাল ছেলে ডিমাকাটসো ও নৃত্যশিল্পী নাকাতুলে। তাদের পেছন পেছন খিলখিল করে হাসতে হাসতে হাঁটছে যমজ দুটি শিশু। আমি আবার চোখ মেলি। দেখি, নাকাতুলে চায়ে বিস্কুট ভেজানোর মতো মামপোরের গ্লাসে ব্রেড ভিজিয়ে খাচ্ছে। আর ছোট্ট সাউন্ড বক্স দুটি যেন ড্যান্স করে গাইছে, ‘ওয়ান অব দিজ ক্রেজি ওল্ড নাইটস/ উই আর গোনা ফাইন্ড আউট প্রিটি মামা/ হোয়াট টার্নস অন ইয়োর লাইটস।’ নাকাতুলে এবার উঠে দাঁড়িয়ে দুখানা জ্বলন্ত লাকড়ি হাতে নিয়ে ড্যান্স করতে শুরু করলে আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে ফুলকি। বিষয় আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আমি ব্রিংক দম্পতিকে ‘গুড নাইট’ বলে নাকাতুলের হাত ধরি। সে খিলখিলিয়ে হেসে আমার কাঁধে মাথা রেখে শরীরের ভার ছেড়ে দেয়। খানিক টেনেহিঁচড়ে তাকে নিয়ে বাংলোর বারান্দায় উঠি। ড্রইংরুমে এসে হুড়মুড় করে সে শুয়ে পড়ে ডিভানে। আমি তার পাশে কুশনে হেলান দিয়ে ফ্লোরে পাতা মাদুরে পা ছড়িয়ে বসি। ভাবি, প্রথমে মামপোরের ঘোর একটু কাটুক, তারপর না হয় বেডরুমে যাওয়া যাবে। রাত তো বেশি কিছু হয়নি।
ভোরের সামান্য আগে তীব্র মাথা ধরা নিয়ে ঘুম ভাঙে। দেখি, ডিভানে কালো কষ্টিপাথরে গড়া গ্রিক মিথোলজির সবচেয়ে রূপসী দেবীর মাধুর্য ছড়িয়ে শুয়ে আছে নাকাতুলে। আমি মর্নিং ওয়াকের উদযোগ করে তাকে জাগাতে যাই। সে হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় চোখ বড় বড় করে ঘুমেল স্বরে বলে, ‘ হোয়াট দ্য হেল... হোয়ার ইজ মাই নাইটি? ইটস সো কোল্ড...।’ আমি তার দিকে কম্বল বাড়িয়ে দিলে সে সিসোটো ভাষায় ‘নটিওহেলে’ বা ‘লিভ মি অ্যালোন’ বলে পাশ ফিরে শোয়। ডাইনিং স্পেশে এসে আমি পানি খেতে খেতে দেখি, টাইমপিসে সকাল ৫টা বাজতে এখনও মিনিট বিশেক বাকি। দুয়ার খুলে আমি অতঃপর চলে আসি সামনের বারান্দায়।
ঝিলে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে শেষ রাতের তারাজ্বলা আকাশ। মাত্র সপ্তাহ দিন আগে নাসার ওয়েবসাইটে পড়া তথ্য পরিব্রাজক পাখির মতো ফিরে আসে স্মৃতিতে। এ সময়ে ভোরের আকাশে একাধিক গ্রহের কাছাকাছি আসার কথা প্রিডিক্ট করা হয়েছে। এদের পর্যবেক্ষণ করতে দুনিয়ার বিবিধ মানমন্দিরে জড়ো হবেন নানা ধরনের জ্যোতিষ্কপ্রিয় মানুষ। নীড়ে নীড়ে জেগে ওঠা অজস্র পাখির স্বরধ্বনি শুনতে শুনতে আমি সিঁড়ি বেয়ে নামতে যাই। গায়ে কম্বল জড়িয়ে নাকাতুলেও বেরিয়ে এসেছে। স্লিপার পায়ে এত আস্তে পা ফেলে যেন কিছুতেই সে ভাঙাতে চাচ্ছে না শিশির ভেজা ঘাসের গাঢ় ঘুম।
ঝিলের পাড়ে দাঁড়াতেই আমি তাদের পরিষ্কার দেখতে পাই। পুব আকাশে একটি ত্রিভুজ তৈরি করে ঝিলমিলিয়ে আলো ছড়াচ্ছেন তিন-তিনটি গ্রহ। আমি জীবনে প্রথমবারের মতো বৃহষ্পতি, শুক্র ও মঙ্গল গ্রহত্রয়কে একত্রে চাক্ষুস করি। সরোবরের পানিতে নীলাভ আলোর দ্যোতনা ছড়িয়ে উদাসীন ভঙ্গিতে ভাসছেন বৃহষ্পতি। বোধ করি তার উপস্থিতি পছন্দ হয়নি বলে লালচে নজরে উষ্মা প্রকাশ করছেন যুদ্ধ-বিগ্রহের দেবতা মঙ্গল। আর সমস্ত কিছু তুচ্ছ করে মহাশূন্যে সোনালি আলোর কিসতি ভাসিয়েছেন প্রণয়ের নিয়ন্ত্রক শুকতারা। আমার নিজের জীবনে অধুনা যে ত্রিভুজের সমীকরণ হচ্ছে, তা উপেক্ষা করে আমি গ্রহত্রয়ের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাই।
দিকচক্রবালে ছড়িয়ে পড়ছে আলো। উবে যাচ্ছে তরকাপুঞ্জের দীপ্তি। সচেতন হই যে, আমার জীবন থেকেও বিয়োগ হচ্ছে আরেকটি রাত। দেখতে দেখতে মিলিয়ে যায় গ্রহত্রয়ের প্রতিবিম্ব। অনুভব করি, এভাবে আমারও সমাপ্তি আসবে, কোথাও কোন চিহ্ন থাকবে না নিষ্ক্রমণের কিছুদিন পর। আলোর পসরে ঝিলপাড়ের ঝোপঝাড় গাছপালা পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠছে। দেখি, পানি থেকে উঠছে কুয়াশাচ্ছন্ন ধূসর ভাপ। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমাচ্ছে একটি উট পাখি। আমি তার দিকে তাকাতেই সে ডানা ঝাঁকিয়ে আড়মোড়া ভাঙে। ঝিলের ওপাড়ে বুনো কলার ঝাড় ভাঙছে একটি মাদি হাতি। তার পেছনে দুটি শিশুহাতি শুঁড় তুলে তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে আছে সূর্যোদয়ের দিকে। আমি মনে মনে হিসাব করি, তিন-তিনটি গ্রহ আবার একত্রে ত্রিভুজ রচনা করবে ২০২১ সালে। সে অবধি আমি জীবিত না থাকলেও আন্দাজ করি, নাকাতুলে বেঁচেবর্তে থাকবে যশস্বী নৃত্যশিল্পী হিসেবে। আমি তার চোখের দিকে তাকাই। ভাবি, কোথাও আমার কোনো কীর্তি না থাকলেও আমার প্রতিবিম্ব কি স্মৃতি হবে ওখানে কিছুকাল?
অপেরা উড়ে এসে ঝিলপাড়ে বসে। নাকাতুলে মৃদুস্বরে বলে, ‘মামপোর ইজ অ্য ভেরি স্ট্রং অ্যান্ড আই মাস্ট সে আ ভেরি নেস্টি ড্রিংকস। তোমার নিশ্চয়ই হ্যাংওভার হয়েছে। ডাইনিং স্পেসে মারিয়া থার্মসে গরম জল রেখেছেন। চলো আমি কফি করে দিচ্ছি।’

Disconnect