আন্দামান: এক ব্যয়বহুল অন্য ভারত

আন্দামানের নয়নাভিরাম রূপ।

আন্দামানের নয়নাভিরাম রূপ।

সেলুলার জেলখ্যাত ও নীলাভ-সবুজ রঙের জলখ্যাত আন্দামান। খানিকটা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন তার চেহারা। অনেকটা কাঁচা লঙ্কার মতো লম্বাটে। উড়োজাহাজ ব্যতীত তেমন কোনো যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে আধার আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জ প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। আন্দামানে মূলত চারটি আফ্রিকান গোত্র বাস করে-গ্রেট আন্দামানিজ, অনেজ, জারাওয়া এবং সেন্টিনেলিজ। নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে বাস করে দুটি মঙ্গোলয়েড গোত্র- শোম্পেন এবং নিকোবারিজ। 

আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জ ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। এই অঞ্চলটি ভারত মহাসাগরে অবস্থিত। এই অঞ্চলের পূর্বে আন্দামান সাগর ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। এ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার। জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। স্থলভাগের সামগ্রিক আয়তন ৬ হাজার ৪৯৬ বর্গকিলোমিটার। এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি কলকাতা হাইকোর্টের অন্তর্গত।

তবে জাহাজে করে প্রয়োজনীয় মালামাল মেইনল্যান্ড থেকে আনতে হয় বলে এখানে সবকিছুরই দাম বেশি। ভারতের মেইনল্যান্ডে যেখানে এক কেজি আলুর দাম ১০ থেকে ১৫ রুপি, সেখানে আন্দামানে তা ৪৫ রুপি প্রতি কেজি। পোর্ট ব্লেয়ারে দুটি দৃষ্টিনন্দন হোটেল রয়েছে- মেগাপট ও হর্নবিল। এ দুই হোটেলেই যদি ‘আন্ডা কারি’ মানে ডিমের ঝোল খেতে যাওয়া হয়, তার দাম পড়বে ১৫০ থেকে ১৭০ রুপি। এখানে সরকারি অতিথিশালায় আতিথ্য গ্রহণ করলে প্রাতরাশে ডিম কমপ্লিমেন্টারি মিলবে; কিন্তু পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ‘অবশ্য গন্তব্য’ হ্যাভলক দ্বীপের সরকারি অতিথিশালায় আতিথ্য নিলে প্রাতরাশ কমপ্লিমেন্টারি হলেও ডিম সেদ্ধ কিংবা পোচ কিংবা অমলেট কিনে খেতে হবে। এলিফ্যান্টা দ্বীপে খুব খিদে পেলে আপনি পেতে পারেন এক থালা ফল বা এক ঠোঙা ঝালমুড়ি। ফলের থালার দাম ১০০ থেকে ১৫০ রুপি আর ঝালমুড়ি ৫০ রুপি। চা ২০ রুপি!

এই দ্বীপভূমির সবচেয়ে ‘সম্মানিত’ মাছের নাম সুরমাছ। এখানকার লোকজনের বক্তব্য- ‘আপনাদের ইলিশের মতোই এর স্বাদ’। আর আছে অ-কুলীন জোনা মাছ। এটি আঞ্চলিক মাছ। কিন্তু তার স্বাদ-টাদ নিয়ে কোনো কথা না বলাই ভালো। এর দামই কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ রুপি। পোর্ট ব্লেয়ার হোক বা হ্যাভলক দ্বীপ, ১০ রুপির প্যাকেটের ম্যাগি সেদ্ধ করে মসলা দিয়ে পরিবেশিত হলে অবধারিত দাম ৪০ রুপি। ড্রাইভাররা বলছিলেন, ‘শসা, আনারস, পেঁপে বাদে আমাদের এখানে কিছু নেই। ভালো করে ধান চাষও হয় না। সব আসে মাদ্রাজ (তারা চেন্নাই বলেন না) বা ক্যালকাটা (কলকাতা) থেকে। আমাদের এখানে রুই-কাতলাও পাবেন না।’ চারদিকে গভীর সমুদ্র। জলের অসামান্য বর্ণ বৈচিত্র্য আর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু একই সঙ্গে মূল ভূখ- থেকে যাতায়াত যথেষ্ট ব্যয়সাধ্য বলে এখানে তারাই আসতে পারেন, যাদের বেড়াতে গিয়ে হিসাব করার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। এই সত্যটি বিলক্ষণ জানেন গাড়ির ড্রাইভার থেকে নামি-বেনামি হোটেল মালিক বা পথের ধারের ধাবাওয়ালারা। 

অন্যান্য ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ থেকে আন্দামান আরেকটি বিষয়ে স্বতন্ত্র। এখানে যারা বেড়াতে আসেন, তাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মানুষ আসেন ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে। ফলে দু’বেলা খাবার বা ঘোরার অর্থ যেহেতু তারা আগেই গচ্ছিত করে দেন, এখানকার অস্বাভাবিক দামের ব্যাপারটি তারা তেমনভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। আসলে এখানে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এখানে বেড়াতে এসে ৪০ রুপি দিয়ে একটা তন্দুরি রুটি খেতে হবে। পথের ধারে ধাবায় টমেটো, আলু, কড়াইশুটি, ফুলকপির তরকারির দাম ১৭০ রুপি! কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো অপর্যটকদের জন্য জিনিসপত্রের দাম আবার অন্যরকম। অর্থাৎ একই জিনিসের দু’রকম মূল্যের বাজার রয়েছে আন্দামানে।

হ্যাঁ, আন্দামানে এটাই বাস্তব। একই সঙ্গে দুই চরিত্রের সহাবস্থান এই দ্বীপভূমিতে। অসম্ভব সৌন্দর্য যেমন এই দ্বীপভূমির এ পাশে ছড়িয়ে আছে, ও পাশে ঠিক তেমনই আকাশছোঁয়া দাম। বার বার এই টাকার কথা ওঠার কারণ একটাই। সাধারণ মানুষের বেড়াতে আসার জন্য নয় আন্দামান। ভারতের কেন্দ্রে এতবার এত রকমের সরকার এসেছে; কিন্তু তারা কেউই মূল ভূখ- থেকে দূরে এই দ্বীপের সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনের জনজীবনের কথা ভাবেনি। অতএব, ভাত থেকে শুরু করে সব কিছুতেই অদৃশ্য আগুনের উত্তাপ।

এখানকার মানুষজন রাস্তায় নেমে দাবি আদায়ের আন্দোলন করেন না। বলা যেতে পারে বহুলাংশেই শান্তিপ্রিয় মানুষজন। মূল ভারত ভূখ- নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয় তারা। যে কোনো ধরনের অপরাধের পরিমাণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধু কমই নয়, হাতে গোনার চেয়েও কম। অতএব, মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন শান্ত নিরিবিলি এই জনপদের বাজারে আগুন লাগলেও, যেন সেই উত্তাপ মনে জ্বালা ধরায় না। কেননা যত দামই হোক না কেন, এখানকার মানুষ জানে এই বিচ্ছিন্ন ভূখ-ে পর্যটক আসবেই সৌন্দর্যের টানে এবং ফিরে যাবে অপূর্ব সবুজ বনরাজি আর বর্ণময় সমুদ্রের স্মৃতি নিয়ে।

উল্লেখ্য, উপনিবেশ আমলে এ অঞ্চল ব্রিটিশদের দখলে আসে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার এখানে একটি বন্দিনিবাস স্থাপনের পরিকল্পনা করে। ১৮৫৮ সালে ভাইপার দ্বীপে তৈরি হয় একটি কারাগার ও একটি জনবসতি। ২০০ জন বন্দিকে এই কারাগারে এনে রাখা হয়। তাদের অধিকাংশই ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী সৈনিক। ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী বাহিনীর সঙ্গে গ্রেটার আন্দামানিজ বাহিনীর প্রথম লড়াই হয় ১৮৫৯ সালে, যার ফলাফল সহজেই ধারণা করা যেতে পারে। বহু আদিবাসী ব্রিটিশদের হাতে নিহত হন। ১৯০৬ সালে পোর্ট ব্লেয়ারে সেলুলার জেল তৈরি হলে আগের কারাগারটি পরিত্যক্ত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালের ২১ মার্চ জাপানিরা আন্দামান দখল করে নেয়। পরে জাপানিরা এই দ্বীপপুঞ্জ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে তুলে দেয়। ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর সুভাষচন্দ্র পোর্ট ব্লেয়ারে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৪৫ সালের ৮ অক্টোবর জাপানি সেনাবাহিনীর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কমান্ড পোর্ট ব্লেয়ারে আত্মসমর্পণ করলে ব্রিটিশরা এই দ্বীপপুঞ্জের অধিকার আবার ফিরে পায়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ একত্রে ভারতের অঙ্গীভূত হয়।

মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন শান্ত নিরিবিলি এই জনপদের বাজারে আগুন লাগলেও, যেন সেই উত্তাপ মনে জ্বালা ধরায় না। কেননা যত দামই হোক না কেন, এখানকার মানুষ জানে এই বিচ্ছিন্ন ভূখন্ডে পর্যটক আসবেই সৌন্দর্যের টানে এবং ফিরে যাবে অপূর্ব সবুজ বনরাজি আর বর্ণময় সমুদ্রের স্মৃতি নিয়ে। 

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh