মন ভোলানো তুলিন

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পুরুলিয়া জেলার পশ্চিম প্রান্তে বাংলা ঝাড়খন্ডের সীমানায় এক অখ্যাত গ্রাম তুলিন। গ্রামটি একরত্তি। দূরে তিরতির করে বয়ে চলেছে সুবর্ণরেখা। ওপারে সিংভূম জেলার মুরি শহর। মুরিতে রয়েছে ইন্দালের কারখানা। লোহার আকরিক এনে এখানে গুঁড়া করা হয়। চালান হয়ে যায় অন্যত্র। চারদিকে ছোট ছোট টিলা, মেঘের চাদর গায়ে ঢাকা দিয়ে রয়েছে, ইতস্তত জঙ্গল আর দিগন্তে তরঙ্গায়িত নীল পাহাড়শ্রেণি।

সার বেঁধে ওপার থেকে শ্রমিকদের ছপছপ আওয়াজ তুলে সুবর্ণরেখা পার হয়ে যাওয়া অথবা ঝকঝকে এনামেলের হাঁড়ির পর হাঁড়ি সাজিয়ে সাঁওতাল রমণীদের কূপ থেকে জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার ছন্দবদ্ধ পদচারণা, দু-একটা পাখির ডাক, সুবর্ণরেখার অস্ফুট কলধ্বনি, শীতে পাতা ঝরার রিক্ততা, বসন্তে পলাশ, কুসুমের রক্তিম আভায় রঙিন প্রকৃতি- দুর্দান্ত সব সিল্যুয়েট নিয়েই তুলনাহীন তুলিন।

সুবর্ণরেখা নদীর ওপর সড়ক সেতু। ১৯২৯ সালে কুমারডুবি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড সুবর্ণরেখার ওপর এই সড়ক সেতু তৈরি করে। পরিত্যক্ত সেতুটি মনের মধ্যে এক অলস মায়াজাল বুনে চলে। নীরবে নিভৃতে সুন্দরকে উপভোগ করার মতো জায়গা তুলিনের মতো পুরুলিয়াতে কমই আছে। তুলিনে থাকার জায়গা হল পিডব্লিউডি বাংলো। প্রায় দু’একর জমি নিয়ে বাংলো, টালির ছাউনি। রয়েছে শতবর্ষ প্রাচীন এক বাঁধানো বেদিতে অশ্বত্থ গাছ।

কিছুক্ষণ পরপর গুম গুম আওয়াজ তুলে রেলগাড়ির সুবর্ণরেখার রেল ব্রিজ পার হয়ে যাওয়ার শব্দ। বাইরের পৃথিবী থেকে মনে হয় যেন অনেক দূরে! আর রয়েছে নতুন গড়ে ওঠা সন্ন্যাসী লজ। খানিকটা দূরে ছোট্ট মায়াবী নীলাঞ্জন মাখানো ছবির মতো সুন্দর তুলিন স্টেশন। সেখানে অনায়াসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। তুলিনে গোধূলি আলোয় সুবর্ণরেখা বড় মায়াময়, অপার্থিব সুন্দর। 

শহরের যানজটে জীবন যখন হাঁসফাঁস, তখন তুলি দিয়ে আঁকা জলরঙের ছবির মতো শান্ত তুলিন যেন বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। তুলিনে পৌঁছনোর সোজা উপায় হলো- হাওড়া থেকে আদ্রা-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে সকালে পুরুলিয়া স্টেশন। সেখান থেকে রিকশায় বাসস্ট্যান্ড। তার পর রাঁচির বাস ধরে সোজা তুলিন। এ ছাড়া পুরুলিয়া শহর থেকে দিনভর বাস ও ট্রেকারে সরাসরি তুলিন। এছাড়া রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেসে মুরি স্টেশনে নেমে রিকশায় তুলিন।

তুলিনকে ঘিরে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যায়, তুলিন থেকে যে পাহাড়টাকে হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায় সেটি হলো বাংসা পাহাড়। ঝালদা থেকে বাংসা অটোয় দশ মিনিট। শহরের কোলাহল থেকে পালিয়ে গিয়ে নিশ্চিন্তে নির্জনতার স্বাদ নিতে চাইলে চলে যেতে হবে ছোট্ট পাহাড়ি অজ পাড়াগাঁ বাংসা পাহাড়ের কোলে। ঝালদার গর্ব বাংসা। বাংসা পাহাড়ের মাথা থেকে দৃষ্টি চলে যায় বহু দূরে।

উন্মুক্ত প্রান্তর আর মাঝে মাঝে মরুদ্যানের মতো টিলা ও জলাশয় ঘিরে সবুজের বিন্যাস। বাংসা পাহাড়কে জড়িয়ে রেখেছে পলাশ, হরীতকী আর করঞ্জের দল। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাঁচি রোড ও রেলপথ। অদূরে সুবর্ণরেখার জলে সূর্যাস্তের শেষ রশ্মি পড়ে সুবর্ণরেখা সার্থকনামা হয়ে ওঠে। পাহাড়ের উলটো দিকে রাস্তার ওধারে একটি ছোট্ট জনপদ। পাহাড়ের নামেই নাম বাংসা।

জনশ্রুতি আছে- গ্রামে এক বৃদ্ধ থাকতেন, তার নাম ছিল বাংসা বাবা। তারই নামে নামকরণ হয় বাংসা গ্রাম আর বাংসা পাহাড়ের। পাহাড়ের অদূরে গাছতলায় রয়েছে কিছু দেবদেবীর মূর্তি। একটু এগিয়েই বাংসা ঠাকুর লেখা একটি ছোট মন্দির। জানুয়ারির মাঝামাঝি (১লা মাঘ) সারা গ্রাম মেতে ওঠে বাংসা বাবার পূজায়। সকাল থেকে দলে দলে ভক্তরা খালি পায়ে ওঠেন বাংসা পাহাড়ে পূজা দিতে। রাস্তার ধারে দোকানিরা পশরা সাজিয়ে বসে পড়েন। সন্ধ্যায় জমে ওঠে মোরগ লড়াই আর রাতে গ্রামবাসীরা মেতে ওঠেন ঝুমুর ঝুমুর নাচের ছন্দে।

সুন্দর শান্ত প্রকৃতি উপভোগই শুধু নয়, পাহাড়ে চড়ার অনুশীলনও চলে এ পাহাড় এবং আশপাশের টিলাকে ঘিরে। বাংসা গ্রাম শুধু পর্বতারোহীদের কাছেই নয়, যে কোনো পর্যটকদের কাছেই লোভনীয়। সকাল, সন্ধ্যা, রাত যে কোনো সময়ই বাংসা অনবদ্য। ভোরে সুপ্রভাত জানাবে ইন্ডিয়ান রবিন, ব্রাহ্মিণী, ময়না, বুলবুল, বাঁশপাতি, ঘুঘু, ছাতারে। 

এখানে থাকতে চাইলে ঝালদায় বনদফতরের রেস্ট হাউসে অথবা নিজস্ব ব্যবস্থায় তাঁবু। তুলিন থেকে হুড্রু ফলস, জোনা ফলস, রাঁচি বা ছিন্নমস্তা মন্দিরও ঘুরে আসা যায়। তবে কোথাও না গিয়ে তুলিনেও দিব্যি সময় কাটানো যেতে পারে।

সৌজন্যে : ওয়ালডটইন

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh